দূরদেশের লোকগল্প—দক্ষিণ আমেরিকা(অবাধ্য ছেলে) /চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প—দক্ষিণ আমেরিকা

অবাধ্য ছেলে

চিন্ময় দাশ

এক মা বাস করে তার ছেলেকে নিয়ে। একটিই ছেলে তার। কিন্তু হলে কী হবে, ভারি অবাধ্য সেই ছেলে! শুধু কি অবাধ্য? যেমন গোঁয়ার, তেমনি একরোখা। মায়ের একটা কথাও যদি কানে তোলে সে। যতই বোঝানো হোক না কেন, ছেলেটা চলে তার নিজের মর্জিতেই। মায়ের মনেও সুখ নাই সেজন্য।
অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে, বাবা-বাছা করেও কিছুই হয় না। ধরো, সকালে উঠে বেরোতে যাচ্ছে ছেলে, মা বলল—কোথায় যাচ্ছিস? কিছু খেয়ে যা। খালি পেটে বেরুতে নাই। 
কিন্তু কে শোনে কার কথা? মায়ের কথা যেন কানেই গেল না তার। গটগট করে বেরিয়ে গেল নিজের মেজাজে।
ছেলে না খেয়ে বেরিয়ে গেলে, মায়ের মুখে কি আর খাবার ওঠে? মা বসে রইল না খেয়ে। দূপুর গিয়ে, বিকেল হোল। বিকেল গিয়ে, সন্ধ্যা। তারপর রাত্রি। ছেলে ফিরল হয়ত মাঝ রাত্রিতে। সারাটা দিন খালি পেটেই কেটে গেল মায়ের।
--এসব তুই কী করছিস, বাবা? সারাটা দিন টো-টো করে কোথায় ঘুরে বেড়াস? এদিকে রাস্তার দিকে চেয়ে চেয়ে বসে থাকি আমি। একটা কথায় যদি কান দিস আমার?
ছেলের মুখে রা নাই। জবাবই দিল না কথার। মা বলল—এভাবে কী আর চলে, বাবা? আমি আর ক’দিনই বা বাঁচবো? তখন কী করবি তুই? 
ছেলের কোন সাড়া মিলল না তাতেও।
একেবারে নাজেহাল হয়ে পড়েছে মা। এক পাদরী সাহেব থাকেন দূরের এক গ্রামে। ছেলেটার ধর্মবাবা তিনি। পরদিনই তাঁর গির্জায় গিয়ে হাজির হোল মা— আমি যে আর পারি না আপনার ধর্মছেলেটাকে নিয়ে। ভারি অবাধ্য। একেবারে হতচ্ছাড়া একটা। কোন কথাই সে শোনে না আমার। ভেবেছি, আপনার কাছেই রেখে যাবে তাকে। আপনি সাধুমানুষ। বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিশ্চয় শোধরাতে পারবেন তাকে। একটু যদি সহবত শেখে, তাই অনেক।
পাদরী সাহেব হেসে বললেন—ঠিক আছে। এখানেই রেখে যাও তাকে। আমি একজন পাদরী। তার উপর সে হোল আমার ধর্মপুত্র। নিশ্চয় আমার কথা শুনবে সে। শুধু একজন বাধ্য ছেলেই নয়, কর্মঠ করেই আমি গড়ে তুলব তাকে। 
শুনে মা তো ভারি খুশি। অবাধ্য ছেলেটা বাধ্য হবে। মানুষের মত মানুষ হয়ে উঠবে, এর চেয়ে আনন্দের কথা আর কী হতে পারে? নিশ্চিন্ত মনে ঘরে ফিরে এলো। ছেলেকে ডেকে বলল— পাদরী সাহেবের কাছে গিয়েছিলাম। জানো তো, তিনি তোমার ধর্মপিতা। আমার কোন কথাই তো কানে নাও না তুমি। কথা বলে এলাম তাঁর সাথে। কাল থেকে তাঁর কাছেই গির্জায় থাকবে তুমি। 
ছেলে শান্ত গলাতেই বলল—ঠিক আছে, মা । তাই হবে। আমার ধর্মপিতার কাছে গিয়েই থাকব আমি। তোমার কোন কথাই তো আমি শুনি না। তাঁর কাছে গিয়েই থাকব। কাজকর্ম করব সেখানে। 
পরদিন ছেলেটা নিজেই এসে হাজির হল পাদরী সাহেবের কাছে—আমি এসে গেছি, ফাদার। এবার বলুন, কী করতে পারি আপনার জন্য? আমার মা বলল—যাও, ধর্মবাবার কাছে গিয়ে থাকো। এখানে তো কোন কাজেই লাগো না তুমি। 
পাদরী সাহেব বললেন—ঠিক আছে। ভালোই হয়েছে, তুমি আমার এখানে চলে এসেছ। তুমি এখানেই থাকবে। আমার কাজকর্ম করবে।
--কোন অসুবিধা নাই। সব কাজই করব আমি। যে কাজের কথাই বলবেন আপনি। সব করে ফেলব।
--ঠিক আছে, বাছা। এখন যা বলছি, শোন। ফাদার বললেন—তোমার প্রথম কাজ। কাল ভোরে উঠেই, চার্চের পুরো চত্বর সাফ করে ফেলবে। এই সাফাই দিয়েই তোমার কাজের শুরু হোক। আর শোন, এই আমি তোমার কাজ বলে দিলাম। সকালে কিন্তু ঘুম থেকে ডেকে তুলে দেব না তোমাকে। যা বলবার এখনই বলে দিলাম। 
ছেলেটা বলল—না, না। ডাকতে হবে না। আমার কাজ আমি ঠিক মতই করে ফেলব। 
ভোর না হতেই, উঠে পড়েছে ছেলেটা। চার্চের ভিতর-বাইর, চার দিকের রাস্তা, সিঁড়ি সব পরিষ্কার করে ফেলল যত্ন করে। কাজ শেষ করে ফাদারের ঘরে গিয়ে হাজির—যেমনটি বলেছিলেন, পরিষ্কার করে দিয়েছি সব। সেটাই বলতে এলাম আপনাকে। 
--সব কাজ সুন্দরভাবে করেছ। ভারি ভালো লাগল আমার। ফাদার বললেন—খুব খুশি হয়েছি আমি। এখন নিজের ঘরে চলে যাও। বিশ্রাম করো গিয়ে। আগামীকাল তোমার ছুটি। কাল বিকেলে একবার এসো। পরের দিনের কাজ বলে দেব।
ছেলেটা বিকেলে ফাদারের কাছে এলো কাজ বুঝে নিতে। ফাদার বললেন—শোন, কালকে তোমার কাজ গির্জার ঘন্টা বাজানো। ঠিক ৬টায় ঘন্টা বাজাতে যাবে। গুনে গুনে তিন বার বাজাবে ঘন্টা। কাজ শেষ করে আমাকে এসে বলে যাবে। আমি প্রিচিং-এ  যাবো।
--ঠিক আছে, ফাদার। ঘন্টা বাজিয়ে, জানিয়ে যাব আপনাকে।
পর দিন। ঠিক ৬টায় ঘন্টা বাজাল ছেলেটা। গুণে গুণে তিন বার। ফাদারের ঘরে গিয়ে বলল—ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছি, ফাদার। এবার উঠে পড়ুন আপনি। প্রিচিং-এ চলে যান।
--বাহ, ধন্যবাদ তোমাকে। ফাদার বললেন খুশি হয়ে। 
এভাবে গেল দিন কয়েক। একদিন ছেলেটাকে ডেকে ফাদার বললেন—আগামীকাল তুমি আবার ঘন্টা বাজাবে। তবে, কাল ঘন্টাটা বাজাতে হবে ঠিক ৩টায়। মনে রেখো কিন্তু, ৩টায়। ভোরও হবে না তখন।
--কিছু ভাববেন না আপনি। মনে থাকবে আমার। ৩টার সময়। 
ভোর হতে তখন অনেকই বাকি। ছেলেটা কিন্তু সময়মতই উঠে পড়েছে। ঘর ছেড়ে, চার্চের দিকে বেরিয়ে গেল সে।
এদিকে ফাদার একটা কাজ করে রেখেছেন। ছেলেটা তাঁর কথামত চলছে। যেমনটি তিনি বলছেন, কাজও করছে ঠিকঠাক। বেশ সুবোধ আর শান্ত স্বভাব হয়েছে। দেখে ভারি খুশি তিনি। তবে কি না, একবার একটু বাজিয়ে নেওয়া দরকার। এই ভেবে,ঘন্টাঘরে একটা কঙ্কাল রেখে এসেছেন তিনি। ছেলেটা সাহসী না ভীতুর ডিম, সেটা একটু যাচাই করে নিতে চান তিনি। 
গুদামঘরে আবলুশ কাঠের নকশা করা একটা বাক্সে রাখা ছিল কঙ্কালটা। চার্চের অনেক দিনের দামী জিনিষ। যত্ন করে রাখা আছে। সেই কঙ্কালটির কথা মনে পড়ে গেছল ফাদারের। নিজের হাতে অতি সাবধানে সাজিয়ে রেখে এসেছেন তিনি। দেখা যাক, কঙ্কালের সামনে পড়ে, কী করে ছেলেটা!
ঠিক ৩টার সময় ছেলেটা চার্চে হাজির। ঘন্টাঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে গেল। চৌকাঠেই আস্ত একটা কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে! 
রাস্তা আগলে থাকায়, কঙ্কালের উপর ভারি বিরক্ত হোল ছেলেটা। বিরক্ত হয়ে বলল—সরে যাও আমার রাস্তা থেকে। ফাদারের কথায় ঘন্টা বাজাতে এসেছি আমি। রাস্তা ছেড়ে দাও বলছি আমার।
কিন্তু কে শুনবে কার কথা? রাস্তা ছেড়ে, সরে যাওয়া তো অনেক অনেক দূরের কথা। নড়লও না, চড়লও না কঙ্কালটা। জবাব দিল না কথারও। 
ছেলেটা রেগে গিয়ে বলল—তাহলে বলে ফেলো তো, মারা পড়তে চাও আমার হাতে?
কোন জবাব এলো না এবারেও। ছেলেটা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল—এই শেষবারের মত বলছি, জবাব না দিলে আমার হাতেই মরণ হবে তোমার। ভেঙে গুঁড়ো করে ফেলব তোমাকে। মনে হচ্ছে, সেটাই চাও তুমি। ফাদারের কথায় ঘন্টা বাজাতে এসেছি আমি। ঘন্টা আমাকে বাজাতেই হবে। কোন বাধা কোন দিনই মানিনি আমি। আজও মানব না। পথের কাঁটা কী করে সরাতে হয়, ভালো করেই জানা আছে আমার। নীচে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি তোমাকে। তাতে কী হাল হবে নিজেই দেখতে পাবে এক্ষুনি। 
কথা শেষ করেই, কঙ্কালটা তুলে সজোরে এক আছাড়। অনেক কালের পুরাণো জিনিষ। এমন আঘাত তার সইবে কেন? বলতে গেলে, নীচে আছড়ে পড়ে, টুকরো টুকরো হয়ে গেল জিনিষটা। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রইল হাড়গোড়গুলো। 
বেশ খুশি মনে ঘন্টাঘরে ঢুকে, দড়ি ধরে টান লাগাল ছেলেটা। ঢং – ঢং – ঢং। পর পর তিন বার বেজে উঠল ঘন্টাটা। বাতাসে ভেসে যেতে লাগল গমগমে শব্দটা। 
এবার সোজা পাদ্রীসাহেবের ঘরে পৌঁছে, দরজায় টোকা দিল ছেলেটা। জেগেই ছিলেন তিনি। গির্জার ঘন্টা কানে গিয়েছে তাঁর। তা শুনে, বেশ খুশিও হয়েছেন মনে মনে। ছেলেটা কেবল শান্ত আর সুবোধই নয়। সাহসও আছে দেখছি! বাহ, এই তো চাই!এমন ছেলেরাই তো দেশের সম্পদ।
ভিতরে থেকেই পাদরী সাহেব জবাব দিলেন—দরজায় কে? কী হয়েছে? এত রাতে টোকা দিচ্ছো কেন?
--আমি, ফাদার! আপনার ধর্মছেলে। উঠে পড়ুন। ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছি। আর শুয়ে থাকবেন না।
পাদরী সাহেব অবাক হওয়ার মত করে বললেন—সে কী ঘন্টা বাজানো হয়ে গেছে? কোন অসুবিধা হয়নি তো?
ছেলেটা বলল—অসুবিধা একেবারেই কিছু হয়নি, তা নয় কিন্তু। হয়েছিল একটু ঝামেলা। সে আমি মিটিয়ে দিয়েছি। 
পাদরী সাহেব উ ৎসুক গলায় জানতে চাইলেন—কী অসুবিধা হোল আবার? কী মিটিয়ে দিয়েছ তুমি?
--আর বলবেন না। একটা হতচ্ছাড়া কঙ্কাল ঘন্টাঘরের পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল। তিন তিন বার সরে যেতে বললাম তাকে। একটা কথারও যদি জবাব দেয় হতভাগা। তখন আর কী করি? দিলাম তুলে সতের সিক্কার এক আছাড়। সব কেরামতি শেষ বাছাধনের। টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে রয়েছে মেঝেতে।
হায়-হায় করে উঠলেন পাদরী সাহেব। চোখ বুজতেই দেখতে গেলেন দৃশ্যটা। ভয়ে আঁতকে উঠলেন। কত দিনের মূল্যবান একটা জিনিষ! শেষ কালে তার কি না এই পরিণতি!
বললেন—সে কী? একেবারে ভেঙে ফেলেছ? কেন?
ছেলেটা শান্ত গলায় বলল—কেন আবার? আমার পথের বাধা আমি কোন দিন মানি না। ভালো কথায় সরে না গেলে, পথের বাধা কী করে সরাতে হয়, খুব ভালো করে জানি আমি।
মনে মনে আর একবার চমকে উঠলেন মানুষটি। মুখে কথা সরল না তাঁর। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন সামনের দিকে। কেবল বুকের ক্রশচিহ্নটা তুলে, মাথায় ছোঁয়ালেন আলতো করে। বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলেন—আমেন!

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল