প্রসাধনী, সাজসজ্জা ও অলংকার /সূর্যকান্ত মাহাতো

জঙ্গলমহলের জীবন ও প্রকৃতি

পর্ব - ৩৭

প্রসাধনী, সাজসজ্জা ও অলংকার

সূর্যকান্ত মাহাতো

"তুমি কি জানো, অনেক আগে বাঙালি মেয়েরা নয়, বরং ছেলেরাই হাতের আঙুলে লম্বা লম্বা নখ রাখত। নখের যত্ন নিত।" বেশ যত্ন করে ফুঁ দিয়ে দিয়ে নখে নেলপালিশ লাগাচ্ছিল সুচিত্রা। স্বামীর মুখে এমন উদ্ভট কথা শুনে অবাক চোখে একবার তাকাল স্বামীর দিকে। বলল, "হতেই পারে না। মেয়েরাই সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য আঙুলে বড় বড় নখ রাখে। মেয়েরা জাত শিল্পী। একটা আবেগ আর ধৈর্য নিয়ে যেভাবে রূপচর্চা করে তাতেই তার পরিচয় মেলে।"

স্বামী অলকেশ হাসিমুখেই বলল, "মেয়েরা যে লম্বা লম্বা নখ রাখত, এমন প্রমান কিন্তু কোথাও নেই। বরং ছেলেরা কেবল বড় বড় নখই রাখত না, সেগুলোর সৌন্দর্য ও শোভা বৃদ্ধির জন্য রঙও লাগাত। ঠিক তোমার মতো।"

 ছেলেরা যে নখ রাখে এমন দু এক জনকে সুচিত্রা দেখেছে। তবুও ভাবল, স্বামী নিশ্চয়ই তাকে কটাক্ষ করতেই হয়তো ছেলেদের পক্ষ নিয়ে বানিয়ে বানিয়ে এমন মিথ্যা কথা বলছে। তাই সে জোর দিয়ে বলল, "মিথ্যা কথা বলার জায়গা পাওনি। মেয়েরা নয়, অথচ ছেলেরা যে নখ রাখত, এমন কথা তোমাকে কে বলেছে?"

অলকেশ তেমনি হাসতে হাসতে বলল, "বাৎস্যায়ন।"

"কামসূত্র রচয়িতা বাৎস্যায়ন!" সুচিত্রা বেশ অবাক। বাঙালি নারীদের সম্পর্কে যিনি বলেছেন, মৃদুভাষিণী, অনুরাগবতী এবং কোমলাঙ্গী (মৃদুভাষিণ্যোহনুরাগবত্যো মুদ্বঙ্গ্যশ্চগৌড়্য)। সেই বাৎসায়ন এমন কথা বলেছেন! আর সেটাই বা তুমি জানলে কোথা থেকে?"

সে কথা আমি কেন অনেকেই জানেন। নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙালির ইতিহাস আদিপর্ব (পৃষ্ঠা ৫৯০) যারা পড়েছেন তারা সকলেই জানেন। পুরুষেরা কেন বড় বড় নখ রাখত আর নখে রং লাগাত জানো?"

সুচিত্রা বলল, "কেন?"

অলকেশ হাসিমুখে বলল, "যুবতী নারীদের মনোরঞ্জনের জন্য।"

সুচিত্রা অবাক হয়ে বলল, "সত্যি না কি! যাক, তা হলে এই প্রথম জেনে খুশি হলাম যে মেয়েদের মন পেতে ছেলেদেরকেউ একসময় সৌন্দর্য চর্চা করতে হত। ছেলেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই মেয়েরা সাজে, এমন একটা অপবাদ শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। তাই তোমার মুখে এমন বিপরীত কথা শুনে নিজের একটু ভালো লাগল।"

অলকেশ বলল, "শুধু তাই নয়, ছেলেরা নানান অলংকারও পরত।"

সুচিত্রা বলল, "ঠিক বলেছ। আমাদের জঙ্গলমহলে এখনো ছেলেদের অন্নপ্রাশনে রুপোর বাহুবন্ধন, কটিবন্ধন, গলার মালা, হাতের বালা প্রভৃতি উপহার হিসেবে দেয়। বড়রাও অনেকে এগুলো ব্যবহার করেন।"

অলকেশ বলল, "তুমি কি জানো, একদম পাড়া গাঁয়ের নারী পুরুষরা কোমরে লাল কিংবা কালো সুতোর  যে "ঘুনসী" ব্যবহার করে সেটাও একটা অলংকার!"

সুচিত্রা হেসে ফেলে বলল, "কী যে বল না!"

"আমি বলছি না। 'সেকালের বাঙালির গহনা'- প্রবন্ধে মহেন্দ্র নাথ দত্ত একথা বলেছেন। গ্রামের গরীব মানুষেরা ধাতুর কটিবন্ধনের  বিকল্প হিসেবে এগুলো ব্যবহার করত (লোকসংস্কৃতি গবেষণা, ২২ বর্ষ, ১-২ সংখ্যা)। এখনো করে।" অলকেশ বলল।

অলকেশ সুচিত্রার দিকে একটু ঘুরে বলল, "তোমরা যে 'ওড়না' বা 'দোপাট্টা' ব্যবহার কর, এটাও সেই আদিকাল থেকেই চলে আসছে। জঙ্গলমহলের সব মেয়েরাই এই 'ওড়না' ব্যবহার করে। তা তুমি কি জানো এই ওড়নার ব্যবহার কীভাবে এলো!"

সুচিত্রা বলল, "কেন আবার, লজ্জা নিবারণের জন্য।"

অলকেশ বলল, "হ্যাঁ। সে কথা সত্য। তবে তুমি এটা কি জানো যে, এই ওড়না আগে নারী ও পুরুষ উভয়েই ব্যবহার করত!"

সুচিত্রা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, "ধুর! কি যে তখন থেকে উল্টোপাল্টা বকছ!"

অলকেশ বলল, "উল্টোপাল্টা নয়, এটাই সত্য। এর একটা ইতিহাসও আছে। প্রাচীনকালে সেলাই করা কাপড়ের কোন ব্যবহার ছিল না। বিশেষ করে পূর্ব-পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতে। তখন সেলাই ছাড়া "একবস্ত্র" ব্যবহৃত হত। যেমন বাঙালি মেয়েরা 'একবস্ত্র' হিসেবে 'শাড়ি' এবং ছেলেরা 'ধুতি' পরত। নারী হোক বা পুরুষ সকলেই কোমর থেকে নিম্নাঙ্গ এই "একবস্ত্র" দিয়ে ঢেকে রাখত। শরীরের উত্তরভাগ ছিল একেবারেই উন্মুক্ত। এটাই ছিল সিংহভাগ বাংলার মানুষের বস্ত্র ও পরিধান ভঙ্গি। কিন্তু তাদের মধ্যেও যারা ছিলেন কিছুটা সম্ভ্রান্ত সেই সব নারী পুরুষেরা শরীরের উত্তর ভাগ ঢেকে রাখার জন্য অনুরূপ আরও একটি সেলাই বিহীন "একবস্ত্র" ব্যবহার করত। পুরুষদের ঐ বস্ত্রের নাম রাখা হল "উত্তরীয়", এবং মেয়েদের এক বস্ত্রটির নাম হল "ওড়না"। (বাঙালির ইতিহাস নীহাররঞ্জন রায়)। তাহলে বুঝতে পারছ 'ওড়না'-রই অন্য একটি নাম হল 'উত্তরীয়' যা পুরুষেরা ব্যবহার করত।"

সুচিত্রা অবাক হয়ে শুনছিল। স্বামীকে বলল, "আমাদের এই জঙ্গলমহলে মেয়েদের শাড়ি পড়ার একটা বিশেষ ধরণ আছে। সেটার ব্যাপারে তুমি কি কিছু জানো?"

অলকেশ বলল, "হ্যাঁ। তারও একটা ছোট্ট ইতিহাস আছে। একটু আগে বললাম না যে সম্ভ্রান্ত বাড়ির মেয়েরাই 'ওড়না' ব্যবহার করত। কিন্তু একেবারে সাধারণত দরিদ্র মেয়েদের 'ওড়না' ব্যবহারের ক্ষমতা ছিল না। তাই পরে পরে উন্মুক্ত উত্তরভাগ ঢেকে রাখার জন্য এক বস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত শাড়ীটাকেই তারা উত্তরভাগ ঢেকে রাখার কাজে ব্যবহার করতে শুরু করল। তাই শাড়ি পরার ধরনটাও একটু একটু করে পাল্টে গেল। কুচি দিয়ে শাড়ি পরার ধরনটা অনেকটাই আধুনিক। সেলাই যুক্ত ছোট জামা হিসাবে ব্লাউজ তৈরির পর। ব্লাউজের ব্যবহার এসেছে অনেক পরে। সেলাই যুক্ত জামা কাপড় ব্যবহারের সময়। মধ্য ও উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে সেলাই করা জামার প্রথম আমদানি ঘটেছিল। তবে সেটা সাধারণ দরিদ্র মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিল। তাই দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গলমহলের সাধারণ গ্রাম্য নারীরা ব্লাউজ ছাড়ায় "একবস্ত্র" ব্যবহার করে এসেছে। জঙ্গলমহলে এখনো কিছু কিছু নারীর মধ্যে এমন পোশাক দেখা যায়। তবে সেটা চার দেওয়ালের মধ্যেই। আগে কাপড়ে কোন নকশাও ছিল না। সাঁওতাল সম্প্রদায় সহ অন্যান্য  অনেক সম্প্রদায়ের মেয়েদেরকে এখনো নকশা বিহীন শাড়ি পরতে দেখা যায়। তবে জঙ্গলমহলে এখন প্রায় সব ধরণের পোশাকই ব্যবহৃত হয়। হাল আমলের কেতাদুরস্ত ফ্যাশনের পোশাক থেকে শুরু করে পুরোনো দিনের পোশাক সব কিছুই। তবে বিবাহিত নারীদের অধিকাংশ শাড়িই ব্যবহার করে। বিধবা মহিলারা উজ্জ্বল ও রঙিন শাড়ি এড়িয়ে চলে। এখন পুরুষেরাও নিম্নাঙ্গে ধুতি, লুঙ্গি, প্যান্ট এবং শরীরের উপরিভাগে শার্ট, পাঞ্জাবি, টি-শার্ট প্রায় সবকিছুই ব্যবহার করে। কিন্তু আগে কেবল ধুতিরই ব্যবহার ছিল।"

"তাহলে নকশা আঁকা শাড়ি কি আরও পরে এসেছে?" সুচিত্রা জানতে চাইল।

অলকেশ বলল, "একদমই তাই। খ্রিস্টীয় সপ্তম ও অষ্টম শতকে এই নকশা কাটা বস্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়। বিভিন্ন লতাপাতা, ফুল ও জ্যামিতিক চিত্রকে নকশার আকারে বস্ত্রের মধ্যে ফুটিয়ে তোলা হত। তবুও সেটা বাংলায় নয়। সিন্ধু, সৌরাষ্ট্র আর গুজরাটেই তা সীমাবদ্ধ ছিল। বাংলায় তথা এই জঙ্গলমহলের মানুষদের কাছে এমন নকশা করা বস্ত্র অনেক অনেক পরে এসেছে। পুরনো ধারায় অভ্যস্ত বাঙালি পুরুষেরা তাই তো এখনো সাদা জামা ও সাদা ধুতিতেই  অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।"

একটু থেমে অলকেশ ফের বলা শুরু করল, "জঙ্গলমহলের মেয়েদের প্রসাধনে তেমন কোন বিরাট কিছু পরিবর্তন ঘটেছে বলে মনে হয় না। তাদের সৌন্দর্য চর্চায় প্রসাধনী দ্রব্যগুলোর আধুনিকীকরণ ঘটেছে শুধু এটুকুই বলা যায়। আগে গলায় পরত ফুলের মালা। এখন দামি কিংবা সস্তা ধাতুর তৈরি মালা। তবে কেউ কেউ এখনও ফুলের মালা পরে।  মাথার খোপায় গোঁজা থাকত ফুল। অনেকে বেশ কারুকার্যময় রুপোর পানপাতাও ব্যবহার করত। এখনো তাই। চোখে লাগাত কাজল। কপালে পরত কাজলের টিপ। এখনও সেই ধারা অপরিবর্তীত। বিবাহিত নারীদের মধ্যে সিন্দুরের টিপ ব্যবহারের রীতি ছিল না। এখন অনেকেই সিঁদুরের লাল টিপ পরে। সিন্দুর আগে সিঁথিতেই পরত না। দুই ঠোঁট রাঙাতেও সিন্দুর ব্যবহার করত। রাঙা ঠোঁটের দুর্বলতা দেখছি বাঙালি মেয়েদের একেবারেই প্রাচীন রীতি। সিন্দুরের পরিবর্তে 'লাক্ষা' রসকেও ঠোঁটে ব্যবহার করা হত বলে বিশিষ্ট প্রাচীন কবি "সাঞ্চাধর" বলেছেন। আজকাল আধুনিক লিপস্টিক ব্যবহৃত হয়। এখন কেবল বিভিন্ন রকমের পাউডার, ক্রীম, ফেস ওয়াস, লোশন সংযুক্ত হয়েছে মাত্র। বিভিন্ন রঙের টিপের ব্যবহারও একেবারেই আধুনিক। আগে ছিল কেবলই কাজলের কালো টিপ।"

চন্দনের সুগন্ধি কৌটোটা হাতে নিয়ে অলকেশ ফের বলল, আগেও নারী পুরুষ সকলেই সুগন্ধি ব্যবহার করত। সুগন্ধী হিসাবে তখন কর্পূরকে ব্যবহার করা হত। এখন সকলেই বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আধুনিক সুগন্ধি ব্যবহার করে। তাই আজকের আধুনিক সুগন্ধিগুলো ব্যবহারের রীতি সেই প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে।"

সুচিত্রা বলল, "এইখানে আমি একটু দ্বিমত প্রকাশ করছি। মানছি সৌন্দর্য চর্চায় প্রাচীন রীতিনীতি এখনো সমান ধারায় বর্তমান। তারপরেও জঙ্গলমহলের বাজারে বাজারে যেভাবে বিউটি পার্লার গড়ে উঠছে তাতে সৌন্দর্য চর্চায় একটা বিপ্লব এসেছে বলতে পার। লিপস্টিক, নেলপালিশ, কাজল, কপালের টিপ, সবকিছুই প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে মানলাম। তারপরেও আধুনিকতা, হাল আমলের ফ্যাশন বা সৌন্দর্য আদিকালে কিন্তু ছিল না। ধীরে ধীরে সেটা এই শালের জঙ্গলে অনুপ্রবেশ করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটা শহুরে কিংবা বিদেশি ছোঁয়াও এখন জঙ্গলমহলে পৌঁছে গেছে। আগে একটা নারীর অলংকার বলতে ছিল, নাখে নথ, কানে পাশা, ঝুমকো বা মাকড়ি, রুপোর হার, হাতে চুর, কনুইয়ের উপর বাজু বা টাড, হাতের আঙুলে আংটি, পায়ে মল। এখনো আছে। তবে কিছু আর ব্যবহৃত হয় না। যেমন 'চুর', 'বাজু' বা 'টাড'। আবার  কিছু সংযোজিত হয়েছে। যেমন 'দুল'। এটা নাকি বিলাতি চলন।

অলকেশ বলল, "এটা তো সময়ের দোষ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই পরিবর্তনশীল। কিন্তু আমি বলছি যে প্রাচীন রীতিগুলো আমাদের শিকড়ের সঙ্গে যেভাবে সংযুক্ত সেগুলোকে তুমি কোনভাবেই এড়িয়ে যেতে পারো না। সমস্ত কিছুটাই সেখান থেকে আহৃত। যেমন আগে ছেলেরা লম্বা লম্বা চুল রাখত। চুলের পরিচর্চা করত। একে বলত, "বাবরি ছাঁট"। ঘাড়ের উপর চুলগুলো ঝুঁকে ঝুঁকে পড়ত। কিছু চুল আবার বাঁক নিয়ে একটু উপরের দিকে উঠে যেত। মেয়েদের মতোই হেয়ার ব্যান্ডের পরিবর্তে ছেলেরা তখন একটা কাপড়ের ফেটি বাঁধত। যা দিয়ে কপালের সামনে ঝুঁকে পড়া চুলগুলোকে আটকে রাখত। জঙ্গলমহলে এখনো দু একজন আছে যারা এমনি ফেটি বেঁধে ঘোরে। কিছু কিছু লোধা শবর সহ অন্য সম্প্রদায়ের ছেলেদের মধ্যেও এমন চুলের স্টাইল এখনও লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ওই যে বললাম, সময়ের দোষ। তাই এখন বাবরি-ছাঁটের পরিবর্তে আর্মি ছাঁট সর্বত্র জায়গা করে নিয়েছে। লাল, সবুজ, সোনালী রঙে রঙিন করছে। কানের দুই পাস অনেকটাই ন্যাড়া, নয় তো একেবারেই ছোট ছোট করে কাটা।"

সুচিত্রা বলল, "কিন্তু মেয়েরা বরাবরই লম্বা চুল রেখে আসছে। খোঁপা করে চুলও বাঁধে। নয় তো পিঠে খোলা চুল এলিয়ে দেয়। এটা আগেও ছিল এখনো আছে। লম্বা চুলগুলোকে কেবল খোঁপা করেই বাঁধে না। বেনী করেও বাঁধে। বিনুনির শেষটা শিখার মতো ছেড়ে দেওয়ার রীতি আগে ভরতমুনি তাঁর নাট্যশাস্ত্রে যেমনটি বলেছেন, "গৌড়ী নামলকপ্রায়ং সশিখাপাশবেণীকম"---এখনও তাই। কিন্তু আজকের দিনের মেয়েরা সেই ভরতমুনিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ছেলেদের "বাবরি ছাঁট"-কে গ্রহণ করছে। চুলকে ঘাড়ের কাছাকাছি কেটে ছোট করে ফেলছে। বেনী করার কথা তারা এখন আর অত ভাবে না। সেই সৌন্দর্যকে এখন অনেকেই এড়িয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট চুলেই নানান স্টাইল তৈরি করছে। তবে সেটা সংখ্যায় খুব কম। আগে চুলের পরিচর্চা বলতে 'নারকেল তেল' আর 'কাঁকুই'(চিরুণী) এর ব্যবহার। এখনো আছে। তবে কতকিছুর বদল ঘটেছে। সেটা পার্লারগুলোতে গেলেই লক্ষ্য করা যায়।"

সুচিত্রা একটু থেমে আবার বলল,"ধাতুর অলংকার প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহার করে আসছে জঙ্গলমহলের মেয়েরাও। তখন বেশি চল ছিল "রুপো"। তবে সকলেই ব্যবহার করতে পারত এমনটা নয়। আদিকালে যাদের ব্যবহার করার ক্ষমতা ছিল কেবল তারাই ব্যবহার করত। এখনও তাই। তাই বলে দরিদ্র ও সাধারণ মানুষেরা কি অলংকার ব্যবহার করত না! তা নয়, তারাও ব্যবহার করত। তবে সেগুলো সবই প্রাকৃতিক। যেমন গলায় ফুলের মালা পরত। খোপায় গুঁজত ফুল। কানে পরত তালপাতার কর্ণাভরণ। হাতে পরত ফুলের বালা। এখন সকলেই নামী দামি কিংবা সস্তার ধাতু নির্মিত অলংকার ব্যবহার করছে। সোনার তৈরি অলংকারের ব্যবহার জঙ্গলমহলে অনেক পরে এসেছে।

অলকেশ বলল, "তবে কি জান, প্রাচীনকালের মতো এখনো শহুরে স্টাইল বা শহুরে পোশাক আশাক গ্রামে অনেকটাই বেমানান ও অচল। এখনকার জিন্স পরা শহুরে মেয়েরা যেমন গ্রামের মানুষের কাছে বেমানান। আগেও তেমনটা ছিল। 'গোবর্ধন আচার্যের' একটি পদে সে কথা বলাও আছে। সেখানে এক সখি আরেক সখিকে বলছেন, 'সখি নগরের আচার ছেড়ে সোজা পা ফেলে চল, না হলে পল্লীপতি ডাকিনি বলে দন্ড দিবেন।"'

সুচিত্রা বলল, "এটা কিছুকাল আগেও ছিল। আমি যখন প্রথম সাইকেল শিখি, পরে স্কুটার শিখি তখন অনেকেই আমার সম্পর্কে নানারকম মন্তব্য করেছিল। আমার প্রথম জিন্স পরা নিয়েও অনেকে খারাপ মন্তব্য করেছিল। কিন্তু এখন দেখো জঙ্গলমহলেরই প্রায় অর্ধেক ভাগ পরিবারের মেয়েরাই জিন্স পরা শিখে গেছে। এটাও কি কম বড় পরিবর্তন! শুধু পোশাক-আশাকে নয় মানসিকতারও বদল ঘটেছে বলেই তো এটা সম্ভব হয়েছে।"

অলকেশ বলল, "একদম। তারপরেও অনেকেই জঙ্গলমহলের মানুষের গায়ের রং নিয়ে এখনো ঠাট্টা তামাশা করে। কিন্তু তারা জানেই না প্রাচীন বাঙালির দেহের বর্ণই ছিল শ্যাম রঙের। এটা আমার কথা নয়। সেই আভাস ভরত নাট্যশাস্ত্রেই মিলেছে--- "অঙ্গবঙ্গকলিঙ্গাস্তু শ্যামা কার্যাস্তু  বর্ণত"(অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ বাসীদের বর্ণ করতে হবে শ্যাম)। আবার রাজ শেখর বসু ও বলেছেন---

"শ্যাবেষ্বঙ্গেষু গৌড়ীনাং সূত্রহারৈহারিষু।
চক্রীকৃত্য ধনু পৌষ্পমনঙ্গো বল্গু বল্গতি।।"

সুতরাং পোশাক আশাক ও শরীরের বর্ণ নিয়ে জঙ্গলমহল বাসীকে কিছুটা অন্য চোখে দেখা মানে তো বাঙালির প্রাচীনতাকেই একরকম অস্বীকার করা। তবে সময় দ্রুত বদলাচ্ছে। এটাই আশার আলো।"

তথ্যসূত্র:১) বাঙালির ইতিহাস(আদি পর্ব)/ নীহাররঞ্জন রায়
২) লোক সংস্কৃতি গবেষণা(২২ বর্ষ, ১-২ সংখ্যা)

 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল