খর্জুর বীথির ধারে -১৫/মলয় সরকার

খর্জুর বীথির ধারে

মলয় সরকার
(১৫শ পর্ব ) পঞ্চদশ পর্ব (শেষ পর্ব)

রোদে শরীর যেন ঝলসে যাচ্ছে। তার উপরে এখানে তো অন্য কোন রঙ নেই, সবটাই সাদাটে হলুদ রঙের বেলে পাথরের। ফলে এত পাথরের মাঝে রোদটা আরও বেশি করে যেন লাগছে। বড় বড় থাম, দেওয়াল আর ভাঙ্গা ইতস্ততঃ ছড়ানো বিভিন্ন ইমারতের  অংশ। এর মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছি প্রেতের মত, কেমন যেন একটা মন্ত্রমুগ্ধের মত বেশ আচ্ছন্ন হয়ে।ছায়া নেই কোথাও। মনে হল, মাঝে মাঝে কিছু ছায়া বা বসার জায়গা থাকলে বেশ হত। কিন্তু, কি থাকলে কি হত, ভেবে লাভ নেই।দুঃখ না করে যা পারছি ,দেখে নেওয়াই লাভের। আর জীবনে কি কোন দিনও আসব এখানে! হয়ত কোন দিনই নয়। আবার হয়ত ছুটে যাব অন্য কোথাও অন্য কোন টানে।

এর পর গেলাম পাশেই একটি জায়গায় যেখানে অনেকগুলো থাম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রয়েছে। গাইড বললেন, এটি আসলে সাধারণ মানুষের দৈনিক বাজারের জায়গা ছিল। এর নাম  Marcellum। এতে , বোঝাই যায়, হাত পড়েছে মুসলিম ও বাইজান্টাইন স্থাপত্য রীতির।এরও মাঝে একটি ফোয়ারার মত জায়গা রয়েছে। এর স্তম্ভের নীচের দিকে পাশে একটা ফুটো আছে, সেটি নাকি সীসার পাইপ দিয়ে জল আসার কাজে ব্যবহার হত সেই ফোয়ারার জন্য।  
এর পর দেখলাম একটি  ক্যাথেড্রালের অংশ। এটি সেই রাজপথ বা Cardo র পশ্চিম দিকে রয়েছে।এটি আর্টেমিসের যে বিশাল মন্দির রয়েছে, তার সামনে। এর ভিতরে রয়েছে একটি জায়গা যেটি সম্ভবতঃ চার্চের বিশপের বসার জায়গা।এটি একট আর্চ করা  ছোট অর্ধবৃত্তাকারে ঢাকা জায়গা ।

 আর একটি দেখলাম বেশ বড় ফোয়ারার জায়গা। এগুলোকে বলে Nymphaeum। এরকমও দেখেছি অনেক জায়গায় । এটি একটি বড় ফোয়ারা, যাকে ঘিরে বেশ অনেকখানি জায়গা, দেওয়াল ঘেরা, থামগুলো নানা কারুকার্য করা । বেদীর মত উঁচু মঞ্চের উপর  থাকত ফোয়ারা। অর্থাৎ একটা বড় ফোয়ারার জায়গা।এর থাম এবং দেওয়ালের মাথার দিকেও অসম্ভব কারুকার্য করা। 

এর কাছেই রয়েছে আর্টেমিসের মন্দির, যিনি এই শহরের রক্ষাকর্ত্রী দেবী ছিলেন। তাঁর মন্দিরে ঢোকার জন্য দুপাশে দুটি সুন্দর থাম রয়েছে। এটিও দ্বিতীয় শতাব্দীতে তৈরী আর মন্দির বলতে এখন যা আছে তা শুধু একটু উঁচু মঞ্চের উপর গোটা আষ্টেক থাম মাত্র।

এখানে রয়েছে দুটি মুক্তমঞ্চ , নর্থ থিয়েটার ও সাউথ থিয়েটার। সেগুলি  অন্যান্য রোমান থিয়েটার যেমন হয় তেমনই। তবে এগুলি অপেক্ষাকৃত ছোট আয়তনে। এগুলি হয়ত ছোট খাটো কোন অনুষ্ঠান বা মন্ত্রীসভার কোন সভা ইত্যাদির জন্য ব্যবহার হত। এতে বসার দর্শকাসন ছিল ৭০০-৮০০ মত।তবে দক্ষিণ থিয়েটারে কিছু বেশি , প্রায় ৩৫০০ এর মত।এগুলি দ্বিতীয় শতাব্দীতে সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের সময়ই তৈরী হয়েছিল।তবে মঞ্চগুলি কিন্তু ব্যবহারযোগ্যই আছে। বোধ হয় সংস্কার হয়েছে, বা বর্তমানেও ব্যবহার হয়। এই গুলিতে দুপাশেই দুটি করে দরজা পাশাপাশি থাকত, একটি উঁচু একটি নীচু। উঁচু দরজা দিয়ে উচ্চাসনে আসতেন বাদ্যযন্ত্রীরা, এর নীচু দরজা দিয়ে আসতেন কলাকুশলীরা সোজা মঞ্চে।এই সব রোমান থিয়েটার গুলিতে অনেক গুলোতেই সিট নির্দিষ্ট ও চিহ্নিত থাকত। এমন কি সিট নম্বরও থাকত। অর্থাৎ আমরা সে যুগের থেকে এ ব্যাপারে কিছুই এগোই নি। হয়ত পিছিয়েছি। তাদের কিন্তু সব মুক্ত মঞ্চ ছিল। অর্থাৎ রাতে অনুষ্ঠান হত না , সবই দিনের বেলায় হত, কাজেই আলোর যে ব্যবহার, আজকের দিনের মত, তা হয়ত ছিল না। 
একটি চার্চ রয়েছে, যার মেঝের মোজাইকের কারুকাজ ভীষণ ভাবে সুন্দর। এরা যে মোজাইকের কাজে দক্ষ ছিল তার প্রমাণ আমরা মাদাবাতে আগেই দেখেছি। বর্তমান শিল্পীরাও দেখেছি কি সুন্দর কাজ করছেন।

গেলাম জিউসের মন্দিরে । জিউস অলিম্পিয়াস যেমন সব থেকে বড় দেবতা, তাঁর মন্দিরও তেমনি। এটিই সম্ভবতঃ সবচেয়ে বড় মন্দির এই জেরাশে। বেশ উঁচু বেদীর উপরে অনেকখানি জায়গা জুড়ে এই মন্দির । মন্দির গর্ভটি অনেকখানি আছে। রয়েছে , বেশ কিছু থাম এবং দেওয়াল। এটি খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে তৈরী। এর থাম গুলি প্রায় ১৫ মিটার করে উঁচু।এগুলি এতই দৃঢ় ভাবে বানানো হয়েছিল যে, বেশ কিছু ভূমিকম্পের সাথে যুদ্ধ করেও আজ বেশ ভালভাবেই বেঁচে রয়েছে।এটি দক্ষিণ থিয়েটার ও  এক্রোপোলিশের মাঝে রয়েছে। আসলে যে কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ওই ওভাল প্লাজাতে শুরু হয়ে ওখান থেকে ধীরে ধীরে এই মন্দিরে উঠে আসত। এর  উপরে ওঠার সিঁড়িগুলো বেশ লম্বা , প্রায় পুরো মন্দির জুড়ে, যাতে অনেক মানুষ একসঙ্গে উপরে উঠতে পারে। মন্দিরের সামনে চাতাল বা বারান্দাটাও পুরো মন্দিরটি জুড়ে।অষ্টম শতাব্দীতেই এক ভূমিকম্পে এটির যথেষ্ট ক্ষতিসাধন হয়। এই মন্দিরে পুজা বন্ধ হয় খৃষ্টানদের আগমনের ফলে, যখন রোমান বা বাইজান্টাইনরা এখানে আসে। 

 এখান থেকে মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম পুরো জায়গাটিকে । এখান থেকে দূরে দেখা যাচ্ছে সেই ওভাল প্লাজা, রাজপথ, চার্চ  সবটাই।কারণ এটা বেশ উঁচুতে। তাছাড়া জায়গাটা একটু পাহাড়ী মত উঁচুনীচু তো। চারিদিকে বেলে পাথরের এক শহরের মৃত ধ্বংসাবশেষ তার সাথে চকচকে মধ্য দিনের রোদে , ক্লান্ত লাগছিল বৈকি। বুলবুল দাঁড়াচ্ছিল মাঝে মাঝেই কোন থাম কি দেওয়ালের আড়ালে। 

আমাদের গাইড , বোধহয় সরকারী গাইড। তিনি ঐ প্রধান রাজপথটুকু ভাল করে দেখালেন, তারপর আমাদের দূর থেকেই আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিলেন কোনটা কি, আর রাস্তা দেখিয়ে ,দিক নির্দেশ করে বললেন, এবার আপনারা নিজেই দেখে নিতে পারবেন, সব জায়গায় লেখা আছে পরিচয়। 

মনে মনে বললাম। বাঃ বেশ। দায়িত্ব কেমন শেষ হয়ে গেল। যা লেখা আছে, তার বাইরে কি কিছু বলার নেই? উনি বোধ হয় আবার নতুন কোন খদ্দেরের সন্ধানে গেলেন, বা এমনও হতে পারে, আমাদের টুর কোম্পানী একে এইরকম কাজের জন্যই কম পয়সায় রাজী করিয়েছিল। সমস্তটা ঘুরিয়ে দেখালে বেশি সময় লাগবে, তাই হয়ত ততটা দেয় নি, যেমনটি দিয়েছিল আমাদের তুরস্ক ঘোরার সময় সারাদিনের গাইড সব বুঝিয়ে দেখানোর জন্য।

আমরা আর কিছু না বলে নিজেদের পড়া শোনা ,বোধের আর লেখার উপর ভিত্তি করেই ঘুরলাম। 
তবে তাতে যে খুব কম ঘোরা হয়েছে বা বোঝা হয়েছে এমন নয়। এর তারপর যা বাকী রইল, তা রইল।

এরপর এখান ছেড়ে যেতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। ভাবছিলাম, এরকম একটা শহরের বোধ হয় আমিও একটা অংশ হয়ে গেছি। কেমন এক আত্মিকতায় যেন আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম।


আমরা এই ইতিহাসকে পিছনে ফেলে ধীরে ধীরে এগোলাম, আমাদের এয়ারপোর্টের বিদায় মঞ্চের দিকে। রায়েধকে বিদায় দিতে গিয়ে, চোখ জলে ভরে এল ওর, আর সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও। ও নিজের মেল আই ডি দিয়ে বলল, আপনাদের আমি ভুলতে পারব না। ওকে কিছু বাড়তি দিনার দিয়ে বললাম, ভাল থেকো ভাই। বড় ভাইয়ের মত দিলাম , নিও।ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। 

ও আমাকে জড়িয়ে ধরল। আর বুলবুলকে মাথা নীচু করে বলল, সিস্টার, কয়েকদিন আপনাকে পেয়ে আমি খুব আনন্দে ছিলাম। হয়ত আরও অনেক মানুষ আসবে আমার গাড়িতে তাদের নিয়ে যাব এখান ওখান , কিন্তু আপনাদের আমি ভুলতে পারব না।
এগিয়ে গেলাম জর্ডনের কুইন আলিয়া ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের ভিতরের দিকে। জানি না আর কোন দিন এখানে আসব কি না, রায়েধের সঙ্গে দেখা হবে কি না। যদিও বেশ কিছুটা সময় বাকী ছিল, প্লেন সেই রাত ৮.২৫এ এর সময়, আর এখন বেলা ৬ টা । তবু বিশ্রাম নিতে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম কাউন্টারের দিকে।

এই ভাবেই আমি জড়িয়ে পড়ি পৃথিবীর বিভিন্ন মানুষেরর সঙ্গে।সেটা রোম কি মেক্সিকো ,চীন কি কম্বোডিয়া যাই হোক। মনে হয় তখন আমি নির্দিষ্ট কোন দেশের মানুষ নই, আমি সারা পৃথিবীর মানুষ। আমার নির্দিষ্ট কোন দেশের ঠিকানা নেই, জাতি নেই ধর্ম নেই, সব ওই এক, মানুষ জাতি। এই ভাবেই যদি জীবনের উপলব্ধি শেষ দিন পর্যন্ত থাকে ,আমার অভাব কি- 

“ জীবন পুরের পথিক রে ভাই 
কোন দেশেই সাকিন নাই
………
তালুক ছেড়ে মুলুক ফেলে হই রে ঘরের বার। “

 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন