যেতে যেতে পথে -৩৬/রোশেনারা খান

যেতে যেতে পথে
রোশেনারা খান
পর্ব ৩৬

আজ জারার বয়স ছ’দিন। সকালে একজন মিডওয়াইফ এসেছিলেন। বেবি ও মাকে দেখে গেলেন। এই মিডওয়াইফরাও(ধাত্রী) নিজের গাড়ি চালিয়ে আসেন। এদের জীবনযাত্রার মান এতটাই উঁচু। এখানে সিজারের পর মাকে এণ্টিবায়োটিক দেওয়া হয় না। সংক্রামণের বিষয়ে খুব সচেতন। সংক্রামণ হওয়ার কোনও সুযোগ থাকেনা বললেই হয়। বেশ কয়েকদিন দু’বেলা দুটি করে প্যারাসিটেমল খেতে হয়। কোয়ার্টারে ফিরে চতুর্থ দিন থেকেই বাবলি সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করছে। কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ১২ দিনের দিন জারাকে প্র্যেমে শুইয়ে আমরা মা মেয়ে বেশ কিছুটা হেঁটে এলাম। অনেকদিন পর ফোনে মা আর ভারতীদির সঙ্গে কথা বললাম। মা তো খুশি ছিলেনই, ভারতীদিও খুব খুশি।
    এতদিন বাড়ি ছেড়ে কখনো থাকা হয়নি। মাঝে মাঝে মনটা অস্থির হয়ে ওঠে, ছেলেটার জন্য মনখারাপ হয়। আবার এই রাজকন্যাকে ছেড়ে যেতে হবে ভাবলেই কষ্ট হয়। প্রায় দিনই ফোনে কথা হয়। একটি ছেলেকে বাড়িতে ঘুমাতে বলে এসেছি। পাশেই বাড়ি, তার মাকে ফোন করে খবর নিই। কাজের মেয়ে গাছে ঠিকমত জল দিচ্ছে কিনা। নানান চিন্তা হচ্ছে। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী কে কেমন আছেন জানিনা। এতদূর থেকে সবার খবর নেওয়া তো সম্ভভ নয়। 
      কয়েকদিন  খুব ঠাণ্ডা পড়েছে। ১০/১২ ডিগ্রী তাপমাত্রা হলেও মাঝে মাঝে শূন্য ডিগ্রীতে নেমে যাচ্ছে। তবুও আজ জারাকে তেল মালিশ করে স্নান করিয়ে দিতে খুব ঘুমালো, রাতে কী করবে জানিনা। একদিন দু’জন নার্স এলেন মা ও বেবি ঠিক আছে কিনা দেখতে। জারার ওজন ২ গ্রাম কমেছে। অনেকক্ষণ না খাওয়া বা বেশি পটি করলে এমনটা হতে পারে। আবার ওরা নাকি সোমবার আসবে। তিনদিনে কী করে ওজন বাড়বে? আমাকে দেখে একজন নার্স বললেন, তোমার মা তো খুব ইয়ং, উনি নিশ্চয়  তোমাকে ঠিকমত সাহায্য করছেন, উপদেশ দিচ্ছেন। র্যা শের জন্য এখন কিছুদিন জারাকে তেল মাখাতে নিষেধ  করলেন। তাছাড়া ওকে ৪০ মিনিট ধরে খাওয়াতে বলেছেন। কিন্তু ও তো একটু খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে!
    শীতে পাতা ঝরে যাওয়া ন্যাড়া গাছগুলোতে কবে যেন পাতা গজিয়েছে, কুঁড়ি এসেছে এবং ২/১ টি করে ফুলও ফুটছে। লনের গাছগুলোও সাদা ফুলে ঢেকে গেছে। তবে ঠাণ্ডাও বেশ আছে। এখানে কাচের জানালা, তার একটা পাল্লা শুধু খোলা যায়। আমার বন্ধ জায়গায় দম বন্ধ হয়ে আসে। এটা একটা ফোবিয়া।  যাইহোক, এখানে তো সবসময় জানলা দরজা বন্ধ থাকে। বুঝতে পারিনা কোথা  থেকে অক্সিজেন আসে? আমি রোজ রাতে ঘুমনোর আগে জানলার পাল্লা সামান্য আলগা করে রাখতাম। একদিন সকালে উঠে দেখলাম জানলায় বরফ জমেছে। এই জন্য কিনা জানিনা্‌, খান সাহেবের বেশ ঠাণ্ডা লেগে গেল। জ্বরের ওষুধ খেতে হল। পাশের শহর বারমিংহামে গত রাতে  প্রচুর বরফ পড়েছে, বাড়ি গাড়ি,গাছ  পাতা, সব বরফে ঢেকে গেছে। দীপের এক সিনিয়ার দাদা(ডাক্তার)ছবি পাঠিয়েছে।
      প্রথম দিকে দীপের চাকরির স্থায়িত্ব ছিল ৬ মাস। এইসময়ের মধ্যে আবার নতুন চাকরির জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে এপ্ল্যায় করতে হত। দীপ এই সিটি হাসপাতাল ছাড়াও গ্লাসগোতে, বেলফাস্টে এপ্লাই করেছিল। দীপ একদিন এই চাকরির প্রসঙ্গে বলল ওকে ২৮ এপ্রিল বেলফাস্ট যেতে হবে। শুনেই যাওয়ার জন্য মনটা অস্থির হয়ে উঠল। কারণ এখানেই যে টাইটানিক জাহাজ তৈরি হয়ে ডক থেকে ভেসেছিল। ঠিক হল, আমিও যাব। কিন্তু তার আগেই জানা গেল দীপ যতগুলো  জায়গায় চাকরির জন্য এপ্লাই করেছিল, সবকটি জায়গাতেই ও সিলেক্ট হয়েছে। তাই সাগর ডিঙ্গিয়ে বেলফাস্ট যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু আমার জন্য ওকে যেতে হল। নটিংহাম এয়ারপোর্ট থেকে বেলফাস্টের জর্জ বেস্ট এয়ারপোর্ট পৌঁছাতে  ৩০/৩৫ মিনিট সময় লাগে। আকাশপথ আর জলপথ ছাড়া আর কোনও যোগাযোগের উপায় নেই। ভোরবেলা ফ্লাইট ধরলাম। জানালা ধারের সিটে বসে ছিলাম। ফ্লাইট উড়তে শুরু করলে নিচে তাকিয়ে দেখি, সব দেখা যাচ্ছে। পুরো  পথটা জুড়েই আটলাণ্টিক মহাসাগর। তার পর হলুদ ফুলে ঢাকা রেপসিড ক্ষেত।  তারপর চোখে পড়ল বাড়িঘর। তবে মাঝে মাঝে সাদা মেঘে সব আবছা হয়ে  যাচ্ছিল। ফ্লাইট ল্যান্ড করার পর এয়ারপোর্টের ভিতরেই দীপ গাইডবুক নিল। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে আমরা  বাইরে বেরিয়ে সিটিলিংক এর বাসের জন্য অপেক্ষা করলাম। এয়ারপোর্টের নাম যার নামে সেই জর্জ বেস্ট এখানকার একজন নামী ফুটবল প্লেয়ার ছিলেন। তাঁকে সাদা পেলে বলা হত।
    যাইহোক, বাস ধরে আমরা সিটি সেন্টারে পৌঁছে  সিটি হলের সামনে বেঞ্চে বসলাম। দীপ খাবার নিয়ে এলে খেলাম। কিছু কেনাকাটা করলাম। তারপর সিটি টুরের দোতলা বাসে চড়লাম। এই বাসের ওপরের তলার অর্ধেক অংশ ঢাকা, সামনের অর্ধেক খোলা। ভাল করে দেখার জন্য দোতলার খোলা অংশে বসলাম।  আকাশ মেঘলা, গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হতে শাল দিয়ে মাথা ঢেকে নিলাম। এই সিটি  টুরের বাস আমাদের ১৯ টি স্পট ঘুরিয়ে দেখাবে। বাস রওনা দিলে গাইড মাইক্রোফোনে স্পটের ইতিহাস বলা শুরু করলেন। প্রত্যেকটা স্পটে খুব সামান্য সময় বাস দাঁড়াচ্ছে। আনেকে নেমে যাচ্ছেন। এই বাস ছেড়ে চলে গেলেও অসুবিধা নেই। এই একই কোম্পানির বাস দশ মিনিট অন্তর পাওয়া যায়।  প্রথমে আমরা সবগুলো স্পট বাস থেকেই দেখলাম। একবার টিকিট কেটে সারাদিন ঘোরা যায়। আমরা ফিরে এসে কিছুক্ষণ পর আবার সিটি টুরের বাসে চড়লাম। এখানে একসময়  যে জাহাজ নির্মাণ কারখানা ছিল, তার প্রমাণ স্বরূপ শহরের মধ্যে মস্ত বড় বড় ক্রেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেখানে টাইটানিক নির্মাণ করা হয়েছিল, সেখানে  লাল রঙের ভাঙ্গাচোরা অবস্থায় একটি বিল্ডিং দাঁড়িয়ে আছে। গাইড জানালেন এই বিল্ডিঙে টাইটানিকের ইঞ্জিনিয়ার ও অফিসাররা বাস করতেন। বিল্ডিঙটিকে সারিয়ে মিউজিয়াম তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে( দীপের কাছেই জানলাম বর্তমানে ওখানে টাইটানিকের আদলে একটি রেস্টুরেন্ট তৈরি হয়েছে)। শহরের বুকে বয়ে চলেছে ‘লগন নদী’। চারিদিকটা এতটাই সাজানো গোছানো দেখে ‘স্বপ্নপুরী’ মনে হচ্ছে।  কিছু কিছু এলাকা নিচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। একসময় যখন ইংল্যান্ডের প্রোটেস্ট্যান্ট ও আয়ারল্যান্ডের ক্যাথিলিক পন্থীদের মধ্যে বিবাদ চলছিল, তখন ওরা এভাবে নিজের  নিজের এলাকা ভাগ করে নিয়েছিল। এখানে বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে  বড়বড় ছবি আঁকা রয়েছে, যেগুলি বিভিন্ন ঘটনাকে ইঙ্গিত করে। গাইড জানালেন  আইরিশরা এভাবেই দেশবিদেশের বিভিন্ন অন্যায়ের প্রতিবাদ জানায়। একটা ছবিতে  দেখলাম বুস পাইপ দিয়ে ইরাক থেকে তেল চুরি করে খাচ্ছে। আর একটি ছবিতে একজন মহিলার মুখ আঁকা রয়েছে। মহিলাটি এম পি ছিলেন। রাজনৈতিক বন্দি থাকা কালে অনশনরত অবস্থায় মারা যান। রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে তাঁরা আসামিদের ড্রেস পরতে রাজি হননি। পরিবর্তে কম্বল পরে অনশন শুরু করেছিলেন। এখানকার রয়েল হাসপাতালের বাউণ্ডারির গ্রিলে ক্রোমোজোমের (X Y) ডিজাইন করা রয়েছে। এই হাসপাতালেই প্রথম  এসি মেশিন বসেছিল। কারণ এই শহরেই এসি আবিষ্কৃত হয়েছিল।
      এয়ারপোর্টে একজন বেলফাস্টের বোটানিক গার্ডেনটি ঘুরে দেখতে বলে ছিলেন। আমরা কুইন ইউনিভার্সিটির সামনে বাস থেকে নেমে পড়লাম। এর পাশেই বোটানিক গার্ডেন। ভিতরে ঢুকে চারিদিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কেয়ারি করা অজস্র টিউলিপ ফুটে রয়েছে। রঙ্গিন ফুল আর সবুজই চোখে পড়ছে। একটি কাচের সুদৃশ্য ঘরে ঢুকে দেখলাম বিভিন্ন ধরণের অর্কিড রয়েছে। ভিতরে এবং বাইরে বেশ কয়েকটি কাঠের মূর্তি রয়েছে। তার মধ্যে  পদ্মফুলের ওপরে বীণাহাতে বসে থাকা  মূর্তিটি অবিকল সরস্বতী দেবীর মত। রেলিং দিয়ে ঘেরা বিশাল সবুজ মাঠে কয়েকজন পুরুষ কী যেন খেলছে। মানচিত্রে একটি একটি জলাশয় দেখা যাচ্ছে। আমাদের হাতে সময় কম। ফ্লাইটের সময় হয়ে আসছে। তাই আরো কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে ছবি তুললাম। একসময় বেরিয়ে এসে সিটি টুরের বাসের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। বাস ধরে আবার সিটি সেন্টারে পৌঁছালাম। এখানে জারার জন্য কিছু খেলনা কিনে সিটিলিংকের বাসে এয়ারপোর্ট পৌঁছে দেখলাম বেশ কিছুটা সময়    হাতে আছে। এখানেও ছোট ছোট কিছু জিনিস কিনলাম, স্মারক হিসেবে একে ওকে দেওয়ার জন্য। জিনিসগুলি উল্টে পাল্টে দেখলাম, লেখা আছে ‘মেড ইন চাইনা’। 
                      ক্রমশ

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল