তানসেন - এক অসাধারণ সঙ্গীতশিল্পী/দশম পর্ব /দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী

তানসেন - এক অসাধারণ সঙ্গীতশিল্পী               
দশম পর্ব         
দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী


রূপোয়াতী

জুম্মাবারে দরবারে তানসেন যে অসাধারণ সংগীত পরিবেশন করেছিলেন তা'তে স্বয়ং সম্রাট থেকে দরবারের সকলেই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন এবং সম্রাট আকবর খুশী হয়ে তাঁর হাতে হীরক অঙ্গুরীয় পরিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর প্রায় সাত-আট দিন কেটে গেছে। দিনগুলি আগের নিয়মেই অতিবাহিত হচ্ছে। আকাশে শুকতারা ফুটে উঠলেই যেমন তানসেন প্রাতঃস্নান করে ফিরে এসে সংগীত কক্ষে প্রবেশ করে কিছুক্ষণ রেওয়াজ করার পরে কন্যা সরস্বতীকে তালিম দেন। তারপরে যথারীতি জলযোগ করে দরবারে চলে যান। এদিনও তেমনি  দরবারে যেয়ে ফিরে এসে মধ্যাহ্নভোজ সমাধা করে তিনি নিজের কক্ষে না যেয়ে সঙ্গীত সাধনার কক্ষে প্রবেশ করলেন। কিন্তু সেখানে প্রবেশ করে তাঁর একটু অন্য রকম লাগলো। আজ সকালেও দেখেছেন কক্ষের গালিচার উপরে ধুলো জমেছে, বাদ্যযন্ত্র গুলোর উপরও ধুলোর আস্তরণ অল্প অল্প পড়েছে। সেই সময় নিজের মনেই তিনি বলেছিলেন 'বাদ্যযন্ত্র গুলি পরিষ্কার করে কক্ষটি পরিষ্কার করতে হবে'। কিন্তু বীণাযন্ত্রগুলি মুছে মেঝের গালিচা পরিপাটি করে কক্ষটি সাজিয়ে রাখার মতন সময় তাঁর নেই। আর এই ঘরে তিনি অন্য কাউকে প্রবেশ করতেও দেন না। যাইহোক সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে তিনি স্থির করেছিলেন এর মধ্যে কোন একদিন দুপুরে কক্ষটিকে ভালোভাবে সাজিয়ে রাখবেন। কিন্তু তার পূর্বে আজকেই তিনি দুপুরে এসে দেখছেন কক্ষটি পরিপাটি করে সাজানো হয়েছে তাঁর অজান্তে। কে এই কক্ষে প্রবেশ করে এত সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখল ভাবতে লাগলেন। বিকেলে আয়েশাকে কি জিজ্ঞেস করবেন এই ব্যাপারে? এইসব ভাবতে ভাবতে তিনি তার গ্রন্থ রচনায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন। কিন্তু মাঝে মাঝেই তার চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটছে এইভেবে যে কে কক্ষে প্রবেশ করেছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত না আয়েশার কাছ থেকে কোন সংবাদ পান ততক্ষণ পর্যন্ত উৎকণ্ঠা তার মনের মধ্যে জেগেই থাকবে। তবে যাই হোক যেই কক্ষটি পরিষ্কার করে সাজিয়ে রাখুক না কেন তার রুচিবোধের প্রশংসা করতে হয়। একসময় বিকেল হল। বিকেলের সময় তিনি সাধারণত কক্ষের দ্বিতলে একটি চাতালে গিয়ে বসেন যেখান থেকে দুর্গ প্রাকারের বাইরে যমুনা নদী দৃশ্যমান। এদিনও সেই ভাবে দ্বিতলের চত্বরে বসে দেখতে পেলেন ধীরে ধীরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হল। সন্ধ্যের পূর্বমুহুর্তে দিগন্তে এক মুঠো আবির ছড়িয়ে দিয়ে সূর্যদেব যেন যমুনার জলে টুপ করে ডুবে গেলেন। এরপরে নিচে নামতে হবে। সন্ধ্যের সময় রক্ষীরা চারিদিকে মশাল জ্বেলে দিয়ে আলোকিত করছে। ওপর থেকে নামার সময় তাঁর সাথে প্রধান বাঁদী আয়েশার দেখা হয়ে গেল। দুপুর থেকে যে প্রশ্ন থাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল তিনি আয়েশাকে দেখেই সেই প্রশ্নের অবতারণা করে জিজ্ঞেস করলেন "আয়েশা, আমার অবর্তমানে এই কক্ষে কেউ কি প্রবেশ করেছিল? এই কক্ষে  একমাত্র আমি এবং সরস্বতী ছাড়া কারো প্রবেশ করার অধিকার নেই একথা সকলেরেই জানা"। আয়েশা মাথা নিচু করে বলল "হুজুর আপনি আজ যখন দরবারে গিয়েছিলেন সেই সময়ে রূপোয়াতী আপনার কক্ষে প্রবেশ করে বীণা যন্ত্রগুলি সুচারুভাবে পরিষ্কার করে কক্ষটিকে ধুলি মুক্ত করে সমস্ত কিছু সাজিয়ে রেখেছে"। আয়েশার কাছে এই কথা শুনে তানসেন আয়েশাকে বললেন "ঠিক আছে, তুমি রূপোয়াতী একবার আমার পক্ষে পাঠিয়ে দিও"। কিছুক্ষণ পরেই তিনি দেখলেন দরজার কাছে একটা ছায়া মূর্তিকে। ছায়া মূর্তি দেখে তিনি প্রশ্ন করলেন "কে ওখানে দাঁড়িয়ে আছো ভেতরে এসো"। রূপোয়াতী ভিতরে প্রবেশ করে অবগুন্ঠন মুক্ত করে বলল "হুজুর, আপনি আমাকে তলব করেছিলেন"। তানসেন বললেন "হ্যাঁ আয়েশার কাছে শুনলাম তুমি আমার এই কক্ষ পরিষ্কার করে আমার বীণাযন্ত্রগুলি তুমি পরিষ্কার করে সবকিছু সাজিয়ে রেখেছো। কিন্তু তুমি কি জানো এই বীণাযন্ত্র গুলি কত মূল্যবান? এর কোন একটি যন্ত্রের তারের এপাশ-ওপাশ হয়ে গেলে সেটিকে পুনরায় স্বস্থানে আনতে অনেক কষ্ট করতে হয়"। রূপোয়াতী বললেন "গোস্তাকি মাফ করুন হুজুর। আপনি আজ সকালে যখন নিজের মনে বলছিলেন কক্ষটি পরিষ্কার করার কথা আমি তখন সেই কথা শুনে কক্ষটি পরিষ্কার করেছি। আর আমার স্থির বিশ্বাস আপনার এই মহামূল্যবান বীণাযন্ত্রগুলি আপনি বাজিয়ে দেখুন কোন তারের ক্ষতি সাধিত হয়নি। তবে আমি শপথ করছি আমি কোনদিন আর আপনার এই কক্ষে প্রবেশ করব না"। তানসেন লক্ষ্য করলেন রূপোয়াতী এই কথাগুলি বলার সময় মুক্তো বিন্দুর মতো তার চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু ঝরে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তানসেন বুঝতে পারলেন রূপোয়াতী নিজের কর্মের জন্য অনুতপ্ত এবং তাকে একটু রূঢ়ভাবে ভৎর্সনা করা হয়েছে। রূপোয়াতীকে বললেন "ঠিক আছে তুমি চোখের জল মুছে এখানে বস, আমি তোমার সাথে কিছু কথা বলবো"। রূপোয়াতী চোখ মুছে তানসেনের কিছুটা তফাতে গালিচার উপরে পা মুড়ে বসলো। তানসেন তাকে প্রশ্ন করলেন "সত্যিই তুমি কোথাও সংগীতের শিক্ষা গ্রহণ করনি? যে রাগগুলো তুমি গাও তা'কি সবই আমার থেকে শুনে শেখা"? রূপোয়াতী অনুচ্চ কণ্ঠে বলল "হ্যাঁ প্রভু, আমার তো কোথাও সংগীতের শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ ঘটেনি এ কথা আপনাকে পূর্বেই বলেছি। আপনি সকালে আপনার কন্যাকে যখন সঙ্গীতের তালিম দেন এবং আপনি নিজে যখন এই কক্ষে বসে সংগীতের রেওয়াজ করেন সেই গুলি শুনে শুনে আমি এই সংগীতের শিক্ষা গ্রহণ করেছি"। তানসেন বললেন "তুমি কি কি রাগ শিখতে পেরেছ শুনে শুনে আমাকে বলতো"। রূপোয়াতী বলল "তোড়ি, আশাবরী, ভীমপলশ্রী, মধুবন্তী, মালকোশ প্রভৃতি"। তানসেনের স্মরণে এলো 'হ্যাঁ এই রাগগুলিই তিনি সরস্বতীকে তালিম দেন এবং নিজেও মাঝে মাঝে রেওয়াজ করেন'।      

তানসেন বললেন "উত্তম, তুমি তো বললে শুনে শুনে রাগগুলি শিখেছ। বেশ আমি তোমার পরীক্ষা নেব। সবেতো সন্ধ্যা হয়েছে। আমি এই সময়ে রাগ ইমনকল্যাণ গাইছি। সম্পূর্ণ রাগটি আমি তোমাকে গেয়ে শোনাবো, তারপরে পুনরায় আমি রাগটির স্থায়ী গাইবো তারপরে বাকি অংশ তুমি গাইবে। যদি সঠিকভাবে গাইতে পারো তাহলে বুঝবো যে তুমি যা বলেছ তা সত্য"। এই কথা বলে তানসেন বীণাযন্ত্র কোলের উপর বসিয়ে ইমনকল্যাণ রাগটি সম্পূর্ণ গাওয়ার পরে পুনরায় স্থায়ীতে চলে গেলেন। স্থায়ী যেখানে শেষ করলেন রূপোয়াতী সেখান থেকে শুরু করলেন অন্তরা এবং শেষে সঞ্চারী অংশ গেয়ে গানটি শেষ করলেন। রূপোয়াতীর এই অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি ও গলার সূক্ষ্ম কাজ শুনে তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। গানটি শেষ হতে তানসেন আনন্দে বললেন "বহুৎ আচ্ছা, তুমহতো কামাল কর দিয়া। ঠিক হ্যায়, লেকিন আভিতো সাঁঝ খতম হো গিয়া তুম আভি মালহার রাগ তো মেরেকো শুনাও"। রূপোয়াতী নিখুঁতভাবে মালহার রাগ গাইবার পরে তানসেন খুশিতে বলে উঠলেন "বলো তুমি কি পুরস্কার চাও আমার কাছে"? তানসেনের কথা শুনে রূপোয়াতী বলল "হুজুর, আপনি আমাকে গানের তালিম দেবেন তাই হবে আপনার কাছে আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার"। রুপোয়াতীর এই কথা শুনে তানসেন বললেন "রূপোয়াতী তা' সম্ভব নয়"। রূপোয়াতী বলল "কেন সম্ভব নয় হুজুর"? তানসেন বললেন "দেখ, যতদিন আমি দরবারের প্রধান সভা গায়কের পদে থাকবো ততদিন সম্রাটের বিনা অনুমতিতে নিজের পুত্র কন্যা ব্যতীত অন্য কাউকে তালিম দিতে পারবো না। প্রধান সভাগায়ক পদে থাকার এটাই একমাত্র শর্ত। তুমি যদি ইচ্ছা প্রকাশ করো তাহলে আমি তোমার জন্য অন্য কোনো সভাগায়কের কাছে তোমাকে তালিম দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারি"। তানসেনের কাছে এই কথা শুনে রূপোয়াতী বিষন্ন মুখে তানসেনকে প্রণাম করে কক্ষ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল। তানসেন বুঝতে পারলেন তাঁর কথায় রূপোয়াতী মনে কষ্ট পেল, কিন্তু এ ছাড়া তার কোনো উপায় ছিল না। কারণ সম্রাট কোনো ভাবে জানতে পারলে তাকে বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হবে।     
                                                                 ক্রমশঃ

 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল