তানসেন - এক অসাধারণ সঙ্গীতশিল্পী/অষ্টম পর্ব /দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী

তানসেন - এক অসাধারণ সঙ্গীতশিল্পী               
অষ্টম পর্ব         
দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী

বিদ্বেষের সূত্রপাত

সেদিনের দরবারে এক আলোচনায় তানসেনকে যোগ দিতেই হল কারণ সেই আলোচনাটি ছিল সংগীত সম্পর্কিত। দরবারের কাজকর্ম যখন সমাপ্তিলগ্নে রাজা মানসিংহ তখন সম্রাটের গোচরে আনার জন্য একটি পত্রের অবতারণা করলেন। রাজস্থানের কমলমীড় দুর্গের অধিপতি সামন্তরাজ চম্পক সিংহ পত্রে আকবর বাদশাকে অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন রামনবমী উৎসব উপলক্ষে সম্রাটের দরবারের কোন সভাগায়ককে                                                                 কমলমীড়ে পাঠাবার জন্য। শ্রীরামনবমী উৎসব রাজপুতদের কাছে এক বিশেষ পবিত্র দিন। সেই দিনে রাজপুত সামন্ত রাজারা অস্ত্র পূজা ও যুদ্ধাশ্বের পূজা করে থাকেন। প্রতিটি দুর্গপ্রাসাদে সামন্ত প্রভুরা এই উৎসব উপলক্ষে আলোকমালায় সজ্জিত করেন, অঢেল খানাপিনার আয়োজন করে রাত্রি জাগরন করেন ও সংগীতের আসর বসান। নিজেদের সাধ্যমত তারা বিভিন্ন সংগীতশিল্পীকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যান তাদের প্রাসাদে সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য। এই সঙ্গীত উৎসব শোনার জন্য বহু মানুষের সমাগম ঘটে। রাজা মানসিংহ সেই পত্রের অবতারণা করতেই সম্রাট বললেন "চম্পক সিংহ আমার বিশেষ অনুগত ও বিশ্বস্ত। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার দুর্গে একজন সভাগায়ককে পাঠাবো। আপনারাই বলুন সেখানে কাকে পাঠানো যায়?"                           

সভার গায়কদের মধ্যে এই বিষয়ে অতিরিক্ত উৎসাহ দেখা যায় কারণ যিনি যাবেন তার সমস্ত যাতায়াতের, আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা এবং পরিশেষে সামন্তপ্রভুদের কাছ থেকে প্রচুর উপঢৌকন পাওয়া যায়। সম্রাটের কথা শুনে প্রবীণ গায়ক মিঞা খোদাবক্স বললেন "কমলমীড়ে পাঠাবার জন্য আমি একটি নাম প্রস্তাব রাখছি, তিনি হলেন সুফি গায়ক নবাব খাঁ। আপনার নির্দেশ পেলে তিনি সানন্দে কমলমীড় রওনা হবেন। মিঞা খোদাবক্সের প্রস্তাব শুনে সম্রাট তানসেনের দিকে তাকিয়ে বললেন "এ ব্যাপারে আপনার কোন বক্তব্য আছে কি"? সাধারনতঃ এই সমস্ত ব্যাপারে তানসেন কোন মন্তব্য করেন না কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি বললেন "সম্রাট, সন্দেহ নেই নবাব খাঁ একজন শ্রেষ্ঠ সুফি গায়ক, কিন্তু রাজপুতনার লোকেরা সুফি গানের থেকে ভজন গান শুনতে বেশি আগ্রহী, কারণ আপনি জানেন রাজস্থানের মহীয়সী সাধিকা মীরার ভজন সেখানকার প্রতিটি মন্দিরে গাওয়া হয়। সেক্ষেত্রে আমার মনে হয় সেখানে এমন একজন সংগীতজ্ঞকে পাঠানো উচিত যিনি ভজন ও রাজস্থানী ভাট সংগীতে ওস্তাদ। তাহলে এই উৎসব উপলক্ষে শিশোদীয় বংশের রাজপূতরা সংগীতের পরিপূর্ণ রস আস্বাদন করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে আমার প্রস্তাব নবাব খাঁকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে এক্ষেত্রে সুরদাসকে পাঠানো যুক্তিযুক্ত হবে"। তানসেনের কথা শুনে রাজপুত রাজা মানসিংহ বললেন "সম্রাট আমারও মনে হয় তানসেন সঠিক বক্তব্য সবার কাছে তুলে ধরেছেন। সুফি অথবা কাওয়ালী গানের থেকে রাজপুতরা ভজন বা ভাট সঙ্গীত শুনতে বেশি আগ্রহী"।

 মিঞা খোদাবক্স নবাব খাঁর প্রতি বরাবরই একটু অনুরক্ত কারণ সম্পর্কে নবাব খাঁ মিঞা খোদাবক্সের শ্যালক। তানসেন এবং মানসিংহের বক্তব্যের পরে মিঞা খোদাবক্স সম্রাটের উদ্দেশ্যে বললেন "তানসেন বা মানসিংহ হয়তো সঠিক কথাই বলেছেন যে রাজপুতানার মানুষদের কাছে ভক্তিগীতি বা ভজন অধিক জনপ্রিয়। কিন্তু সম্রাট, সঙ্গীত তো দেশকালের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। সঙ্গীতের আসল মাধুর্য থাকে তার সুরে, আর সুরের মায়াজালে হৃদয়কে আন্দোলিত করানোর জন্য নবাব খাঁ নিঃসন্দেহে একজন উপযুক্ত ব্যক্তি"। মিঞা খোদাবক্সের বক্তব্যের পরে সম্রাট কমলমীড়ে কাউকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে একটু ইতস্তত করলেন কারণ মানসিংহ বা তানসেনের বক্তব্যের মধ্যেও যেমন যথেষ্ট যুক্তি নিহিত আছে তেমনি খোদাবক্সের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য না করারও কোন কারণ নেই। এই সময়ে সমস্যা সমাধানের জন্য সম্রাট প্রধান পরামর্শদাতা আবুল ফজলকে অনুরোধ করলেন। আবুল ফজল বললেন "তানসেন সঠিক কথাই বলেছেন। সুরদাসকেই কমলমীড়ে পাঠানো উচিত কারণ আমরা যারা সংগীতের কমবেশি সমঝদার তাদের কাছে সুফি সঙ্গীত অথবা মীরার ভজন গান দুটিই পরম গ্রহণীয় এবং আদরণীয়। কিন্তু এখানে একটি কথা আমাদের চিন্তা করতে হবে সুফিগীত ও মীরার ভজনের মধ্যে আলাদা আলাদা ধর্ম ভাবনা নিহিত আছে। সবার কাছে অন্য ধর্ম ভাবনার সংগীত গ্রহণীয় নাও হতে পারে। রাজপুতানার শ্রোতাদের মনে যেন এরকম কোন ধারনা না হয় সম্রাট কৌশলে অন্য ধর্ম ভাবনার সংগীত তাদের উপরে চাপিয়ে দিচ্ছেন”। প্রধান পরামর্শদাতা আবুল ফজলের বক্তব্যের পরে সম্রাট আর কালক্ষেপ না করে সুরদাসকে কমলমীড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে দরবার সেদিনের মতো স্থগিত করে দিলেন। 

দরবার শেষ হওয়ার পরে মিঞা খোদাবক্স আর নবাব খাঁ একসাথে সভা থেকে বেরিয়ে গেলেন। মিঞা খোদাবক্স নবাব খাঁকে উত্তেজিত করার জন্য বললেন "তোমার কমলমীড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা বরবাদ হলো কেবলমাত্র তানসেনের কথা শুনে”। খোদাবক্সের আশা ছিল যেহেতু তিনি সম্রাটের পিতা হুমায়ুনের আমল থেকে সভাগায়ক এবং বর্ষীয়ান তাই তার কথা হয়তো সম্রাট মেনে নেবেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সম্রাট সংগীতের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নেবার সময় তানসেনের উপরেই সর্বাগ্রে নির্ভর করেন এবং তার বক্তব্যকেই গ্রহণ করেন। মিঞা খোদাবক্সের কথা শুনে নবাব খাঁ উত্তেজিত হয়ে বললেন "দেখুন রেওয়া রাজ্য থেকে তানসেনকে এখানে আনার পরে সম্রাট তানসেনকে সভার সমস্ত গায়কদের উপরে মর্যাদা দিচ্ছেন। এতদিন দরবারে আমাদের যে প্রতিপত্তি ছিল তা ক্রমশ খর্ব করে দিচ্ছেন। এই অপমান কিন্তু নীরবে সহ্য করা যায় না, আপনি এর একটা বিহিত করুন"।

রূপবতীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের পরে বেশ কয়েক দিন পেরিয়ে গেছে । ইতিমধ্যে কমলমীড় থেকে সুরদাস ফিরে এসেছেন। দরবারে সুরদাস প্রবেশ করার পরে নিজের আসন গ্রহণ করেছেন। তানসেন এই দিন তাঁর নির্দিষ্ট আসনের দিকে এগিয়ে যাবার সময় সুরদাস নিজের আসন ছেড়ে তানসেনকে আদাব জানালেন। তানসেন তাকে প্রশ্ন করলেন "সঙ্গীতানুষ্ঠান কেমন হলো"? সুরদাস বললেন "আমার জীবনে এ এক অতুলনীয় অভিজ্ঞতা। সন্ধ্যা থেকে শেষে রাত্রি পর্যন্ত একের পর এক ভজন গীত পরিবেশন করতে হয়েছে আমাকে। আর কমলমীড় দুর্গে অভিজাত ব্যক্তিরা ছাড়াও সাধারণ মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এসে সমবেত হয়েছিলেন সঙ্গীতানুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য। রাজা চম্পক সিংহের আতিথেয়তাও অতুলনীয়। তাঁর প্রাসাদেই তিনি আমার থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। ফিরে আসার সময়ে নানান উপহারের সঙ্গে তিনি আমাকে একটি অশ্ব, দুটি উট, এক সহস্ত্র স্বর্ণমুদ্রা ও এই মুক্তামালা উপহার দিয়েছেন"। এই বলে প্রবীণ গায়ক সুরদাস তাঁর গলায় ঝোলানো মুক্তার হারটি তানসেনকে দেখালেন। তিনি আরো বললেন "আপনার জন্যই আমার এই সমস্ত প্রাপ্তি"। মিঞা তানসেন বললেন "দেখুন আমিতো উপলক্ষ মাত্র। আপনার এই প্রাপ্তি সম্ভব হয়েছে আপনার অতুলনীয় কণ্ঠের জন্য। আমি শুধুমাত্র যথার্থ ব্যক্তির নাম সম্রাটের কাছে প্রস্তাব করেছিলাম"। তাঁদের এই কথোপকথন শুনে কিছুটা দূরে মিঞা খোদাবক্স এবং নবাব খাঁ গম্ভীরভাবে নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করলেন। মিঞা তানসেন এর পরে তাঁর আসনের দিকে এগিয়ে গেলেন।                   

তানসেন যখন দরবারে পৌছলেন তখনও সভার কাজ শুরু হয়নি সম্রাট এসে না পৌঁছানোর জন্য। কক্ষে সম্রাটের সিংহাসন একটি উঁচু বেদীর উপর স্থাপিত। তার নিচে দুপাশের আসন অলংকৃত করেন বাদশাহের নবরত্ন সভার সদস্যরা। সম্রাটের বাম দিকে সেনাপতি মানসিংহ, অর্থমন্ত্রী টোডরমল, প্রধান পরামর্শদাতা আবুল ফজল ও অন্য মন্ত্রীদের বসার স্থান, আর তার ডান দিকে সঙ্গীতসম্রাট মিঞা তানসেন, কবিবর বীরবল, ফৈজিসহ নবরত্ন সভায় অন্যান্যদের বসার স্থান। সিংহাসন বেদীর নিকটে একটি দন্ডের উপরে বৃহৎ আকারের একটি পিতলের চাকতি ঝোলানো আছে। তাতে আঘাত দিয়ে দরবারের সূচনা ও সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। সম্রাটের সিংহাসনের নীচে কিছুটা ফাঁকা জায়গা আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে যারা সম্রাটের সাক্ষাৎপ্রার্থী তারা তাদের বক্তব্য নিবেদন করেন। সেই স্থানের বামদিকের আসনগুলি মনসবদার ও জায়গীরদারদের আর ডানদিকে বসেন দরবারের অন্য সভাগায়ক, বাদ্যকর ও চিত্রকরের দল।                                                

কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্বারীরা শিঙ্গা ও কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে সম্রাটের আগমন বার্তা ঘোষণা করল। দরবারে উপস্থিত সকলেই নিজের আসন ছেড়ে সম্রাটকে অভিবাদন জানালেন। সিংহাসনে বসার পরে সম্রাটের হস্তের নির্দেশে বরকন্দাজ পেতলের চাকতিতে আঘাত দিয়ে সভার সূচনা করল। প্রথমেই সেনাপতি মানসিংহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ উপস্থাপন করলেন সম্রাটের সম্মুখে। তিনি বললেন "জনাব, গুপ্তচর মারফত খবর এসেছে চিতোরগড়ের সিংহাসনচ্যুত রানা প্রতাপ সিংহ কয়েকজন সামন্ত সরদারকে একত্রিত করে ঝালোয়ার দুর্গ পুনরায় উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। ঝালোয়ার দুর্গের দুর্গাধিপতি তাই সম্রাটের কাছে আবেদন করেছেন অতিসত্বর সেনা পাঠানোর জন্য”। সেনাপতি মানসিংহের বক্তব্য শোনার পরে সম্রাট তাঁর সেনাপতির সাথে আলোচনা করে এবং প্রধান পরামর্শদাতা আবুল ফজলের পরামর্শে স্থির করলেন ঝালোয়ার দুর্গের নিকটবর্তী যেসকল দুর্গে মোগল সৈন্যদের আধিক্য আছে সেখান থেকে দ্রুত ঝালোয়ার দুর্গে সেনা পাঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য। এই কথা তানসেনের কর্ণ গোচরে আসামাত্র তার স্মরণ হল তাঁর কাছে যে যুবতীটি আশ্রিতা হয়ে আছে তার বাড়িও তো ঝালোয়ারে। এক অজানা আশঙ্কায় তিনি সাময়িকভাবে বিচলিত হলেন কারণ যুবতীর কাছে আজ সকালে সমস্ত ঘটনা শুনে তিনি ভেবেছিলেন সম্রাটকে অনুরোধ করে তাকে তার বাড়ি ঝালোয়ারে পাঠাবার ব্যবস্থা করবেন এবং সেখানে কোন রাজপুতের সঙ্গে তার বিয়ে দেবেন। ঝালোয়ার দুর্গ নিয়ে যখন আলোচনা সমাপ্ত হলো তখন দরবারের সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। দীর্ঘক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ায় এবং বিগত কয়েকদিন নানা কাজের চাপে সম্রাটের মনে হল এই সময় যদি গান শোনা যেত তাহলে হয়তো মনের উপরে যে চাপ পড়েছে তা কেটে যেত। সম্রাট তাই বললেন "দরবার শেষ করার পূর্বে আমি প্রস্তাব রাখছি কেউ সংগীত পরিবেশন করে দরবারের আবহাওয়াকে শীতল করে তুলুন। কয়েকদিনের কাজের চাপে আমি বড়ই ক্লান্ত অনুভব করছি"।               
                                                                  ক্রমশঃ

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল