দূরদেশের লোকগল্প—ইউরোপ (ডেনমার্ক)/এক লাফে দুই লাভ /চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প—ইউরোপ (ডেনমার্ক)

এক লাফে দুই লাভ

 চিন্ময় দাশ

একটা ঝিঁঝিঁপোকা, একটা তেলাপোকা (আমরা যাকে আরশোলা বলি) আর একটা জোনাকি। ভারি ভাবসাব তিনজনের। আসলে কাছাকাছি এক জায়গায় থাকে তারা। তা থেকেই মিলমিশ। পরে খানিকটা বন্ধুত্বও গড়ে উঠেছে। 
একদিন ঝিঁঝিঁপোকা বলল—একঘেয়ে হয়ে গেল জীবনটা। একটু আমোদ-আহ্লাদের আয়োজন করলে, কেমন হয়? 
বাকি দু’জনে খুশি। বলল—তা হোক না। ভালোই তো হয়।
ঝিঁঝিঁপোকা ভারি সেয়ানা। সে বলল—এসো, তাহলে লম্ফন প্রতিযোগিতা হয়ে যাক একবার। দেখি, কে কতোটা লাফাতে পারে। 
বাকি দু’জন চেঁচিয়ে উঠল—সে কী করে হয়? আমরা কি লাফাতে পারি না কি? তার চেয়ে এসো, লম্ফনের বদলে, বরং উড়ান প্রতিযোগিতা হোক। তিনজনেরই ডানা আছে আমাদের। কারও কিছু বলার নাই। 
ঝিঁঝিঁপোকা বলল—আরে ভাই, অতো চিন্তা করছো কেন? এতে হারজিতের তো কিছু নাই। কেবল একটু মজা করে নেওয়া—এই যা।
মনে একটু খুঁতখুঁতোনি থাকলেও, তেলাপোকা আর জোনাকি মেনেই  নিল প্রস্তাবটা।
এলাকার যতো পোকামাকড় সবাইকে ডাকা হয়েছে দর্শক হিসাবে। মজার জিনিষ যাদেরই পছন্দ, সবাই আসতে পারে। সবাই স্বাগত!
একটা খোলা জায়গায় জমায়েত হয়েছে। মুফতে মজা দেখতে, কে না চায়! ভালোই জমায়েত হয়েছে সেদিন। 
ভীমরুল হল পোকামাকড়দের রাজা। সে দেখতে সুন্দর। যেমন ছিপছিপে চেহারা, তেমনি ঝকঝকে রঙ তার গায়ের। এছাড়া, দাপটও বেশি তার। একবার হুল ফোটালে, আর রক্ষা নাই। ভীমরুলের বিষের ভয়াণক জ্বালা! দেখা গেল, সেই ভীমরুলও এসে হাজির হয়েছে সেদিন। একা আসেনি, বউ আর মেয়েকেও সাথে এনেছে। সেদিন রাজার দু’পাশে দুটো আসন। একদিকে রাজার বউ, অন্যদিকের আসনে বসেছে তাদের কুমারী মেয়েটি।
রাজা বলল—এমনি এমনি তিনজন লাফাবে? সেটা কী করে হয়? পুরস্কার না থাকলে, সেটা আবার প্রতিযোগিতা নাকি? 
সবাই হইহই করে উঠল শুনে—এই না হলে রাজা।
কিন্তু কী পুরস্কার দেওয়া হবে? দেবেটাই বা কে সেটা? এসব ভাবনা কাউকে ভাবতে হোল না। রাজা নিজেই বলে দিল—যে এখানে আজ ভালো লাফাবে, তার সঙ্গে বিয়ে দেব আমার মেয়ের। 
সে এক হুলুস্থুলু কাণ্ড। এমন কথা কেউ শোনেনি কোনদিন। ছিল একটা সাধারণ মজার খেলা, একেবারে একটা রাজকীয় লড়াই হয়ে উঠল আজ।
আনন্দে তিন প্রতিযোগীর বুক ফেটে যাওয়ার জোগাড়। তিনজনেই চোখ তেরছা করে ভীমরুল-কন্যাকে দেখছে। মনে মনে ভাবছে, সে-ই জিতবে আজকের এই প্রতিযোগিতা। তারই বিয়ে হবে রাজার মেয়ের সাথে। 
রাজার ডাক পেয়ে, একটা উচ্চিংড়ে এগিয়ে এল ভীড়ের ভেতর থেকে। তার গলার ভারি জোর। সে হেঁকে বলল-- প্রতিযোগিতা শুরু হোল। প্রথমে ঝিঁঝিঁপোকা এগিয়ে এসো। 
সুন্দর বাঁধানো চেহারা ঝিঁঝিঁপোকার। ভাঁজ করা দুটো পা খাড়া করে উঁচু হয়ে দাঁড়াল সে। দু’দিকে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অভিবাদন করল জমায়েতের সবাইকে। 
সামনেই রাজামশাই বসে আছে। এমন সুযোগ ছাড়া যায় না কি? বেশ গর্বের গলায় নিজের পরিচয় দিয়ে বলল—অনেক প্রাচীন বংশ আমার। আমাদের আদি বসবাস হোল মালয়েশিয়া। তবে, এই ডেনমার্ক দেশটাকে পরবাস বলে ভাবি না আমি। 
কথা শেষ করেই এক লাফ! লাফ দিয়েই একেবারে উধাও হয়ে গেছে ঝিঁঝিঁপোকাটা। আসলে, এতো লম্বা লাফ দিয়েছে, চোখের আড়াল হয়ে গেছে সকলের। দেখতেই পাওয়া যাচ্ছে না তাকে। 
উচ্চিংড়ের ডাকে, এবার এগিয়ে এলো তেলাপোকা। সেও নিজের পরিচয় দিয়ে বলল—মালয়েশিয়া বলো বা মসিসিপি, কোন নির্দিষ্ট একটা দেশ আমাদের নিবাস নয়। পৃথিবীর সব দেশে সব খানেই আমরা আছি। পোকামাকড়দের মধ্যে দুনিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন জাতি আমরাই। 
একটু থেমে আবার বলল—অন্য কারও মত বেঁটে আর খাটো চেহারা নয় আমাদের। আমাদের চেহারা যেমন বনেদি, গায়ের রঙটাও সবার থেকে আলাদা। 
আসলে, রাজার মেয়ের জন্য, ঝিঁঝিঁপোকার চেয়ে, সে-ই যে উপযুক্ত-- এটাই বলতে চাইছে সে। কথা শেষ করে, লাফ দিল তেলাপোকা। আসলে হয়েছে কী, ছোট বড় মিলিয়ে ছ’-ছখানা লম্বা পা আছে বটে তার, কিন্তু কোন দিন তো লাফায় না সে। হেঁটে বা দৌড়ে চলাফেরা করে। তেমন জরুরি কিছু হলে, ডানা মেলে উড়ে চলে যায়। 
এখন যেই না লাফ দিয়েছে, নিজের অজান্তেই কখন ডানা মেলে ফেলেছে বেচারা! উড়ে যেতে লেগেছে।
রাজামশাই ভীমরুল তো রেগে কাঁই। বিরক্ত গলায় বলে উঠল—আরে, হচ্ছেটা কী? এ হতভাগা তো প্রতিযোগিতার নিয়ম কানুনই জানে না! না দৌড়ে, উড়তে শুরু করেছে! 
এবার জোনাকির পালা। ছোট্ট এইটুকুন একটা পোকা। না আছে অন্য দুজনের মত বড় চেহারা। না পারে লাফাতে। কেবল তিন জনের একটা মজার খেলা ভেবে, রাজি হয়েছিল প্রতিযোগিতায় নামতে। কিন্তু স্বয়ং রাজামশাই এখানে মেয়েকে নিয়ে হাজির হয়ে যাবে, এটা সে জানবে কী করে?
এদিকে রাজামশাই ঘোষণা করে দিয়েছে, যে জিতবে তার সাথেই মেয়ের বিয়ে দেবে। এরই মধ্যে মনে মনে রাজার মেয়েকে ভারি পছন্দও করে ফেলেছে জোনাকি। যেভাবেই হোক, জিততে হবে আজ। রাজার মেয়ে বলে কথা। কোন মতেই হাতছাড়া করা যাবে না তাকে।
এতক্ষণ চুপটি করে ফন্দি আঁটছিল জোনাকি। উচ্চিংড়ে যখন তার নাম ধরে ডাক পাড়ল, গুটি গুটি পায়ে রাজার একেবারে কাছাকাছি এগিয়ে গেল সে। মাথা ঝুঁকিয়ে পেন্নাম করল রাজা আর রানিকে। তা দেখে রাজা-রানি দুজনেই ভারি খুশি। সহবত জানে দেখছি ব্যাটা। 
জোনাকি মাথা তুলে বলল—আর সকলকেও আমার পেন্নাম। বংশপরিচয় দেওয়ার মত কিচ্ছুটি নাই আমার। বড় চেহারা, লম্বা লম্বা ঠ্যাঙ বা চকচকে রঙও নাই। তবে বিধাতা মগজ দিয়েছে আমাকে। সেটুকুই আমার সম্বল। তা দিয়েই আমি চেষ্টা করছি জিতবার। 
বলেই ছোট্ট একটা লাফ। সোজা রাজার মেয়ের কোলে গিয়ে বসে পড়েছে জোনাকিটা। সবাই অবাক। সবাই ভয় পেয়ে গেছে তা দেখে। এমন বে-আক্কেলে কাজ করে কোন আহাম্মক? এখন বুঝবে মজা।
সত্যি বলতে কী, রাজামশাইও প্রথমে একটু ভ্যাবাচ্যাকাই খেয়ে গিয়েছিল। হোল কী এটা? দু’-চার বার মুণ্ডুটাকে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখল, চুপটি করে তার মেয়ের কোলে চেপে বসে আছে পুঁচকে জোনাকিটা। কিন্তু মেয়ের মুখে তো এক ফোঁটা বিরক্তি দেখা যাচ্ছে না। বরং একটু যেন হাসি হাসি ভাব! 
দেখে ভারি ভালো লাগল রাজার। খুশি খুশি গলায় বলল-- আমার কাছে আমার মেয়ের আসন সব চাইতে উঁচুতে। যে প্রতিযোগী সেখানে পৌঁছতে পেরেছে, সে-ই আজ বিজয়ী। ঠিক কথাই বলেছে জোনাকি। বিধাতা পুরুষ এক্টুখানি করে মগজও দিয়েছে সবাইকে। সেটা কাজে লাগাতে পেরেছে জোনাকি। ভারি বুদ্ধিমান সে। তারই জয় হয়েছে। তার সাথেই বিয়ে হবে আমার মেয়ের। 
সবাই হইহই করে উঠল আনন্দে। 
রাজার উপরে কথা বলার সাহস নাই ঝিঁঝিঁপোকা বা তেলাপোকার। দুজনেই গলা নামিয়ে বলতে লাগল-- এদেশে দেখছি সুবিচার নাই। কারচুপি করেও বিজয়ী হওয়া যায়!
রাজা গর্জন করে উঠল—কী বিড়বিড় করছিস রে, হতভাগারা? আয় তো এদিকে? দেখাচ্ছি মজা!
আসবে কী, ভয়ে দুজনের প্রাণ যায় আর কি। তিড়িং করে এক লাফ দিল ঝিঁঝিঁপোকা। সরে পড়ল রাজার সামনে থেকে। আরশোলাটাও ফরফর শব্দে, উড়তে উড়তে কোথায় গিয়ে সেঁধিয়ে গেল, টিকির দেখাও পাওয়া গেল না তার।
রাজার ভয়ে পালিয়ে গিয়ে, ঘাসের বনে ঠাঁই নিয়েছে ঝিঁঝিঁপোকা। দিনের বেলা সাহস পায় না, রাতের বেলাই কেবল বের হয়। তখন গলা ছেড়ে, মনের দুঃখ আর জেহাদ জানায় ঝিঁঝিঁরা। ঝিঁঝিঁর ডাক আমরা সবাই শুনি। আসলে সেটা তাদের কান্না। ঝিঁঝিঁপোকার কান্নাই শুনি আমরা। 
আর আরশোলা? প্রতিযোগিতার মাঠ থেকে সেই যে সরে পড়েছে, সহজে বেরোয় না আর। সারা জীবন  আড়ালে-আবডালে কোথায় যে ঘাপটি মেরে থাকে তারা, টিকির দেখাটিও পাওয়া যায় না সহজে।  
এদিকে জোনাকি খুব খুশি। লড়াই জিতেছে। রাজার মেয়েও জুটেছে কপালে। দু’-দুটো লাভ হয়েছে তার। 
আপদ দুটো বিদায় হয়েছে, এখন রাজা খুশি। বুদ্ধিমান ছেলে জুটেছে মেয়ের জন্য, খুশি তো হওয়ারই কথা। রানিমাও খুশি। মেয়েও কম খুশি নয়। 
তাহলে আর কী? ভীমরুল কন্যার সাথে, ঘটা করে বিয়ে হয়ে গেল জোনাকির। মহানন্দে বিয়েবাড়ির ভোজ খেল পোকামাকড়ের দল।
 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন