সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ৩০

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক)

ভাস্করব্রত পতি

সেটা ১৯৭০ সাল। রাজ্য জুড়ে খাদ্য সঙ্কটে জেরবার রাজ্যবাসী। চারিদিকে হাহাকার। একমুঠো ভাতের জন্য মানুষের সে কি আর্তি। তমলুক শহরের পাশ দিয়েই রূপনারায়ণ। সেই নদীর পাড়ে তখন আদুল গায়ের দুটো বেওয়ারিশ শিশু। খিদেয় পেট জ্বলছে। চোখের জল শুকিয়ে গেছে। মুখময় যন্ত্রনার প্রতিচ্ছবি। আর সেই দুই কচিপানা মুখগুলো দেখে নিজেকে সামলাতে পারেননি সনাতন দাস। সংস্কৃতিবান চিত্রশিল্পী। কোলে করে নিয়ে এলেন বাড়িতে। আদরে যতনে ভরিয়ে দিলেন না খেতে পাওয়া ছেলেদুটোকে। পরে অবশ্য এক রিক্সাওয়ালা তাঁদের দত্তক নিয়ে নেয়। কিন্তু সেদিন তিনি তাঁর শিল্পীসত্বা থেকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন মানবতার চূড়ান্ত নিদর্শন রেখে। 

মানুষের পাশে দাঁড়ান বলেই তাঁর ছবি কথা বলে। মানুষের কথা। জীবনের কথা। বেঁচে থাকার কথা। একটা শহরের জীবনের চলমান রেখাচিত্র মূর্ত হয়ে ওঠে তাঁর তুলির ক্যানভাসে। 

একসময় ছিলেন তাম্রলিপ্ত পৌরসভার কর্মী। পেটের জন্য চাকুরি তাঁকে করতে হত। আর অন্য সময়ে তিনি জীবনের জন্য ছবি আঁকেন। মানুষের ছবি, মনের ছবি, চেতনার ছবি... তাঁর মূল উপজীব্য বিষয়।

চিত্রশিল্পী সনাতন দাস তমলুক পৌরসভার ৭ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং অবসরপ্রাপ্ত পৌরকর্মী। ছেলেবেলা থেকেই ছবি আঁকছেন। ১৯৫৭ এর ১৬ ই আগস্ট তাঁর জন্ম। বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা কমিউনিস্ট নেতা ফণীভূষণ দাস তাঁর আঁকার শিক্ষাগুরু। ১৯৭২-৭৩ সাল নাগাদ ফণীবাবুর সংস্পর্শে আসেন। ব্যাস, সেই শুরু। এরপরই অঙ্কনশিল্প হয়ে ওঠে সনাতন দাসের রক্তের লোহিত কণিকা।

তিনি কোনো স্বীকৃত আর্ট কলেজ থেকে আঁকা শেখেননি। ডিগ্রিও নেই। কেবল বিখ্যাত বিখ্যাত শিল্পীদের সান্নিধ্যে এসে এবং তাঁদের অনুসরণ করেই তাঁর অঙ্কন চলছে। স্বভাবজাত প্রতিভাকে পাথেয় করেই তিনি নিজেকে সাজিয়েছেন রঙ তুলির জগতে। সেই মহিমায় মহিমান্বিত হয়েছে আজ গোটা তমলুক শহর। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তিতে সেই ১৯৯২ সাল থেকে পোষ্টকার্ডে ছবি এঁকে সমাজের বিশিষ্ট মানুষদের কাছে পৌঁছে দেন বিশেষ উপহার। ১৯৯৬ তে দূরদর্শনে তাঁর আঁকা ২৪ টি ছবির প্রদর্শনীও হয়েছিল।

পরিতোষ সেন, নির্মাল্য নাগ, সুনীল চৌধুরী, লেডি রানু মুখার্জীদের পাশে থেকেছেন বছরের পর বছর। মনোনিবেশ করেছেন অঙ্কনে। সেখান থেকেই তাঁর উত্তরণ। তুলির কারুকার্যে তিনি মূর্ত করে তোলেন মূর্তিকে। আপাতত নিষ্প্রাণ ছবিকে সপ্রাণ করে তোলেন রঙ আর জলের মিশ্রণে। কোনো আর্ট কলেজ থেকে না পড়েও কলকাতায় ছবি প্রদর্শনী করার দক্ষতা তিনি দেখিয়েছেন। এ কৃতিত্ব অর্জনে তমলুকের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি। আজ তাঁরই আগ্রহে এবং ইচ্ছায় গোটা তমলুক শহর জুড়ে অঙ্কন বিদ্যায় জোয়ার এসেছে। প্রচুর ছেলেমেয়ে আজ তমলুকের বুকে আঁকা শিখছে। এই মুহূর্তে তমলুক শহরে দু'হাজারের বেশি ছেলেমেয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আঁকা শিখছে। অনায়াসে এই তমলুক শহরকে ছবি আঁকার শহর বলা যেতে পারে। জনগণ অবশ্য তেমনটাই মনে করে। ছবি আঁকার প্রতি ছেলেমেয়েদের এই আগ্রহের পেছনে অনেকটাই অবদান তাঁর। মেদিনীপুরকে আলোয় আনতে সচেষ্ট তিনি। একান্তে সেই কাজ করে চলেছেন রঙ তুলি হাতে নিয়ে। 

১৯৭৮ এ প্রতিষ্ঠা করেন 'দি সোনা আর্ট এন্ড কালচার'। নিজেই এখনও তা পরিচালনা করেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন 'সোনা আর্ট এন্ড কালচার' এবং 'সোনা আর্ট'। আজ তাঁর কাছে অঙ্কন শিখে দেশ বিদেশ থেকে প্রচুর পুরস্কার পাচ্ছে তমলুক এলাকার ছেলেমেয়েরা। জাপান, পোল্যাণ্ড, বাংলাদেশ, চেকোস্লোভাকিয়া, ইউনেস্কো থেকে বিশ্বমানের পুরস্কার পাচ্ছে সনাতন দাসের ছাত্রছাত্রীরা। নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়াম, শেখর ইন্টারন্যাশনাল থেকে মিলছে পুরস্কার। আজ অনেকেই তমলুক থেকে গিয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অঙ্কন শিল্পে যথেষ্ট পরিচিত নাম। এঁদের কেউ কেউ সনাতন দাসের 'দি সোনা আর্ট এণ্ড কালচার' এর ছাত্র।

এক সময় তমলুকের বুকে ছবি আঁকার চল আজকের মতো জনপ্রিয় বিষয় ছিলনা। তখন যাঁরা ছবি আঁকতেন তাঁরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। অন্যের কথা ভাবার সময় কোথায়? সেই পরিস্থিতি বদলে যায় সনাতন দাসের হাত ধরে। তমলুকের ছেলেমেয়েরা আজ ওয়াটার কালারে বিশারদ হয়ে উঠেছে। যা কিনা সারা ভারতের মধ্যে নামকরা।

১৯৯১, ১৯৯৪, ১৯৯৫, ১৯৯৬, ২০০২, ২০০৭, ২০১২ সালে কলকাতায় একক বা গ্রুপ প্রদর্শনী করেছেন ছবির। ১৯৯৫ তে অ্যাকাডেমী অব ফাইন আর্টসে সনাতন দাসের এক চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন লেডি রাণু মুখোপাধ্যায়। বিভিন্ন সময়ে তাঁর চিত্র প্রদর্শনীতে এসেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমীর আইচ, বিমানবিহারী দাস, পরিতোষ সেন প্রমুখ বিশিষ্ট মানুষজন।

তাঁর আঁকা ছবি সংগ্রহ করেছে মেট্রো রেল, বাটা কোম্পানী, কলকাতা রোটারি ক্লাব, ফোর্ট উইলিয়াম সহ বিভিন্ন এলাকায় সংরক্ষিত। ভারতীয় সেনাবাহিনী তাঁর আঁকা কিছু ছবি সংরক্ষণ করে রেখেছে। মেট্রো রেল দিয়েছে 'সার্টিফিকেট অব মেরিট' সম্মান। ২০০৫ এ পেয়েছেন 'চিত্র বিশারদ' সম্মান। এছাড়া আর তেমন বড় মাপের সম্মান জোটেনি তাঁর কপালে। না, তাতে তাঁর দুঃখ নেই। কষ্ট নেই।

তিনি চান ছবি আঁকতে। ছবি আঁকাতে। মূক মুখে ভাষা যোগাতে। তাঁর ছবি কথা বলে। শিল্পের কথা বলে। বেঁচে থাকার কথা বলে। অগ্রগতির কথা বলে। তাঁর হাত ধরে একটা শহরে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠছে একটা শিল্প। জন্ম নিচ্ছে বহু প্রতিভার। ছবি আঁকাও যে মানুষকে আপন করতে পারে, তা দেখিয়েছেন মেদিনীপুরের মানুষ রতন সনাতন দাস।

চিত্র- সনাতন দাস

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন