জ্বলদর্চি

হুদুম দেও পূজা /ভাস্করব্রত পতি

পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব, পর্ব -- ৬১

হুদুম দেও পূজা 

ভাস্করব্রত পতি 

“ওঠ হুদুম চৈতন হান চক্ষু মেলি চাও 
আগুনে না পোড়া গেইছে মোর সর্ব গাও।
ওরে ম্যাঘ কালা ম্যাঘ দুইজনে সোদর ভাই 
হুদুম চেতন হইছে এলা এ্যাও ধুয়রা বাড়ি যাই।” -- 
হুদুম দেও পূজাকে 'মেঘপূজা'ও বলে। আসলে বৃষ্টির কামনায় জাদুধর্মী এই লৌকিক উৎসবটি পালন করেন বিবাহিত মহিলারা। বসুন্ধরা নারীর সঙ্গে পুরুষ মেঘের মিলনই হল মেঘপূজা। মূল লক্ষ্য, রুখা মাটিতে বৃষ্টির স্নেহবর্ষণ।

উত্তর পূর্বাঞ্চলে কৃষির ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কোচ রাজবংশীরা। তাঁরা প্রথম থেকেই তাঁদের উন্নত কর্ম সংস্কৃতি ধরে রেখেছে। প্রকৃতির রোষে পড়া কৃষিক্ষেত্রকে শষ্য শ্যামলা করতে বৃষ্টির প্রয়োজন। তাই বৃষ্টির কামনায় বাংলাদেশের রঙপুর, দিনাজপুর, আসামের গোয়ালপাড়া এবং পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও দার্জিলিং জেলায় কোচ রাজবংশী জনগোষ্ঠীর মহিলাদের পালন করতে দেখা যায় এই 'হুদুম দেও' লৌকিক উৎসব।

অনাবৃষ্টির ফলে দেশজুড়ে দুর্ভিক্ষের কারণে কৃষি নির্ভরশীল কোচ রাজবংশী জনগোষ্ঠীর মহিলাদের সমাজে পালিত হয় 'হুদুম দেও'। অনাবৃষ্টির দেবতা হুদুমের পূজা করা হয় বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসের যে কোনো শনিবার বা মঙ্গলবার। যেকোনও বিবাহিত তথা সধবা কিংবা বিধবা মহিলারা এই পূজায় অংশগ্রহণ করে। গ্রামের কোনো গোপন যায়গায় গিয়ে নৃত্য গীতের মাধ্যমে এই পূজা হয়। এই নৃত্য গীতে অধিবাস থেকে শুরু করে বিবাহ, বিরহ, মিলন, দেবতার কৃপা ভিক্ষা সব কিছুই গীত হয় মহিলাদের দ্বারা।

অশোক বিশ্বাস তাঁর 'বাংলাদেশের রাজবংশী সমাজ ও সংস্কৃতি' বইতে লিখেছেন, "রাজবংশী সঙ্গীতের মধ্যে যে সঙ্গীত এখনো আদিম ঐতিহ্যবাহী হিসাবে সমাজে প্রচলিত রয়েছে, সেটি হলো হুদুম দ্যেও এর উদ্দেশ্যে নৃত্যগীত। হুদুম দ্যেও বৃষ্টির দেবতা। প্রকৃতিতে চৈত্র বৈশাখ মাসে খরা অনাবৃষ্টি দেখা দিলে রাজবংশী মেয়েরা বিশেষ করে বিধবা মহিলারা বিবসনা হয়ে নৃত্যসহ গীত পরিবেশন করতেন। এ নৃত্যগীতের উদ্দেশ্যে হলো হুদুম দ্যেও দেবতাকে খুশি করা। হুদুম দ্যেও এর উদ্দেশ্যে যে গান পরিবেশিত হয় তা যাদুপ্রভাবজাত। এগুলো তাঁদের সমাজের চিরন্তন ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকৃতি পূজার প্রত্যক্ষ প্রভাব বহন করে চলেছে।"

আসলে এই লৌকিক উৎসব একান্তভাবে মহিলাদের। ড. শীলা বসাক হুদুম দেওকে 'হুদুম চুকা' বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, "হুদুক চুকা জলের দেবতা। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে পাড়ার মেয়েরা বস্ত্রবিমুক্ত হয়ে এই অনুষ্ঠান করে। লোকালয়ের বাইরে শূন্য মাঠের মধ্যে কলাগাছ পুঁতে এই দেবতার পূজা করা হয়। রাত্রিবেলা মেয়েরা উলঙ্গ অবস্থায় নৃত্যগীতের মাধ্যমে এই পূজা করে। এই অনুষ্ঠানে পুরুষদের যোগ দেওয়া কিংবা দেখা উভয়ই নিষেধ। নারীদের বিশ্বাস, যে কোনো পুরুষ এই অনুষ্ঠানের নাচ দেখলে হুদুম রাগ করেন, ফলে বৃষ্টি না হওয়ার সম্ভাবনা।" তাই হুদুম দেওতে পুরুষের প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।

'হুদুম' অর্থে 'হুদু চড়াই'। যা কিনা বর্ষার দেবতা বরুণের প্রতিক বলে মনে করা হয়। হুদু চড়াইয়ের কাছে তিনবার কাঁদলে বর্ষার আগমন ঘটে বলে বিশ্বাস। একটি হুদু চড়াই ধরে এনে খুঁটিতে বেঁধে তার চারপাশে গোল হয়ে গ্রামের বিবাহিত মহিলারা সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে নাচ গান করে। তবে এখন এই পাখি ধরে রাখা বেআইনি। তাই এখন শুধু কলা গাছের কাণ্ড পোঁতা হয়। উত্তরবঙ্গে হুদুম দেও পূজায় লাগে ফিঙে পাখির বাসা।

কলাগাছের এই খুঁটিকে বলা হয় 'হুদুম খুঁটি'। খুব নিষ্ঠা সহকারে এনে পোঁতা হয়। জনবিশ্বাস যে, হুদুমখুঁটি পোঁতা হলেই তিনদিনের মধ্যে বৃষ্টি আসে। 
"কালো ম্যাঘোক পূজো মাও মুই / কালা কইতর দিয়া। ধওলা ম্যাঘোক পূজো মাও মুই / ধূপ সেন্দুর দিয়া 
কি ম্যাঘোরাজ জমিনে বইষ্যো গিয়া। 
তোমার নরনোক মরেছে ম্যাঘোরাজ / জল জল বলিয়া এক আড়া জল দে ম্যাঘোরাজ পিরথিমি ছিটিয়া
কি ম্যাঘোরাজ জমিনে বইষ্যো গিয়া।” (সংগ্রহ - মোহাম্মদ আবদুল হাফিজ)

এই কলাগাছটি এক সন্তানের মা (এক কুশিয়া ছাওয়া) উলঙ্গ হয়ে কেটে আনবে রাতের অন্ধকারে। কলাগাছে একটি মার্কিন কাপড় বেঁধে দেওয়া হয়। এই খুঁটি পোঁতার সাতদিন আগে প্রধান পূজারিণীর আহ্বানে প্রত্যেক দিন সাত আটজন মহিলা মাগন করতে বের হয়। দলনেতৃ আগে আগে যায় লাঠি ঠুকতে ঠুকতে শব্দ করে করে।
"আগ দুয়ারী কে রে, পাছ দুয়ারী কে রে— 
আসিছে হুদুমা দুয়ার খুলিয়া দে রে।"

পূজার স্থান নির্বাচন করা হয় গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে। যেখানে অন্য কোনো পুরুষের প্রবেশ নিষেধ। ফাঁকা মাঠে রাতের অন্ধকারে মশাল জ্বালিয়ে একটি স্থানে গর্ত খোঁড়া হয়। এবার উলুধ্বনির মাধ্যমে পূজা শুরু হয়। দলনেতৃ ঐ গর্তে সংগৃহীত সামগ্রী গুলি ঢেলে কলাগাছটি পুঁতে দেন। তারপর সবাই স্নান করে শুদ্ধাচারে আসেন।
হুদুম খুঁটি পোঁতার সময় একটি লাঙলে ধুয়ে মুছে সিঁদুর ফোঁটা লাগিয়ে দেওয়া হয় (আসামের গোয়ালপাড়া)। আর তখন কেউ বলদের অভিনয় করে, কেউবা হেল্যার অভিনয় করে হলকর্ষণের কাজ উপস্থাপন করে। তখন বিভিন্ন বাড়ি থেকে মাগন করে আনা সাত ঘরের জল ছিটিয়ে দেয় সেই গাছে। এছাড়া থাকে গণিকার বাড়ির মাটি, ঢেঁকি ধোওয়া জল, পতিতার যৌনকেশ, বুড়ি মানুষের কাপড়ের সূতা, সন্তান থাকা মায়ের স্নানকরা জল ইত্যাদি। মাগনের জল কুলোয় ঢেলে কলাগাছটি খুব ভালো করে জলসিঞ্চন করে স্নান করানো হয়। লাগাতর উলুধ্বনি চলে সেসময়। নীহারবালা বড়ুয়া এই উপচার সম্পর্কে জানিয়েছেন, "গা ধোয়া জল কুলোয় ঢেলে ঘন ঘন উলুধ্বনির মাঝে মেঘদেবতার প্রতীক সেই কলাগাছটিতে ছিটিয়ে দিয়ে গাছটিকে স্নান করানো হয়। অতঃপর জলপূর্ণ ঘটির ভেতর এক জোড়া গুয়াপান ও বারোশস্য দিয়ে গাছের নীচে ঘটস্থাপন করে ধূপ বাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এইভাবে পূজার পাঠ শেষ হলে শুরু হয় আবাহন পালা। আবাহন পর্বটি নৃত্য গীত, রঙ্গ রসিকতা, অনুনয় বিনয়, শ্লেষ ধিষ্কার, ছলাকলায় প্রেমাস্পদকে বিমোহিত করার প্রচেষ্টায় ভরে ওঠে। বসনমুক্ত নারীদের একদল কলাগাছটির অদুরে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে গান ধরেন ও মাঝে মাঝে উলুধ্বনি দেন। আর অন্য নারীরা দেবতারূপী সেই পুরুষ কলাগাছটির চারি দিকে ঘিরে নৃত্য করেন।" (লোকসংস্কৃতির বিশ্বকোষ) 
“আয়রে দেওয়া গর্জি / ধান চাল যাক ভিজি 
আয়রে দেওয়া শো শেয়া মাং নিয়া যাক ভাসেয়া
আয়রে দেওয়া ডাকিয়া / ধান চাল যাক ভাসিয়া 
আয়রে দেওয়া ডাকিয়া / দই চিড়া দেং মাখিয়া”। (সংগ্রহ - ড. মহম্মদ আব্দুল জলিল)

এছাড়াও পূজায় লাগে আম পাতা, জলপূর্ণ ঘট, নানা রকম শষ্য, ধূপ ধুনা, ফল মূল, চাল, চিনি, গুড়, দই, পান, সুপারি, সরিষার তেল ইত্যাদি। তবে কোনো ফুল ব্যবহৃত হয়না। কোনো বাঁধাধরা নিয়মও নেই। লৌকিক পদ্ধতিতে পূজা শেষের পর রাজবংশী মহিলারা ঐ হুদুমখুঁটির চারপাশে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে যৌনধর্মী গান গায় বৃষ্টির কামনায় --
“আয় আয় হুদুমাও 
আয় ঝাড় তোর শো শেয়া 
মেঘ নিয়া যা ভাসেয়া 
হুদুমা নিলে নাঙল জোয়াল 
হুদুমী নিলে মই
আধ ঘাটাতে যায় হুদুমী
চিতর হয়া পইল। (সংগ্রহ - হাবিবুর রহমান)

বিশ্বেন্দু নন্দ হুদুম দেওর প্রসঙ্গে লিখেছেন, "এই ব্রতের নাচের মধ্যে যে যৌনক্রিয়ার অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে সে বিষয়ে কিন্তু গবেষক মহলে কোনো দ্বিমত নেই — শিশির মজুমদারের জবানে শুনেছি এই ব্রতপালনে মহিলারা সারিবদ্ধ হয়ে ঘড়া ঘড়া জল নিয়ে উলঙ্গ হয়ে ঘুরে ঘুরে নাচেন। হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মহিলারাই এই ব্রতে অংশগ্রহণ করেন। রাজবংশী ভূমিপুত্র সুখবিলাস বর্মা বলছেন বাল্যবয়সে তিনি তাঁর দিদিমার সঙ্গী হন এই নাচে টিন বাজাতে।"
"হিল হিলায়ছে কমরটা মোর / শির শিরায়াছে গাও। কোণঠে কিনা গেইলে এলা / হুদুমার দেখা পাও। 
পাটানী খান পড়ছে খসিয়া, 
আইসেক রে হুদুমা দেও / তোর বাদে ঘুঁই আঁছ বসিয়া।”

লোকসমাজে বিশ্বাস যে, কৃষকদের কাছে পৃথিবীর মাটি তথা বসুন্ধরা হল নারী সদৃশ। আর হুদুম বা বরুণ বা ইন্দ্র হল তাঁর পতি। এই স্বামীদেবতার বীর্য তথা বর্ষণ তথা বৃষ্টি সেই মাটিতে পড়লে স্ত্রীরূপী বসুন্ধরা উর্বর হয়ে ওঠে। শষ্য ফল ফুলে ভরে ওঠে পৃথিবীর মাটি।
"হুদুম দ্যাওরে হুদুম দ্যাও, এক ছলকা পানি দ্যাও
ছুঁয়ায় আনি নাই পানি, ছুঁয়ায় ছুঁতি বারা পানি 
কালা ম্যাঘ ধওল ম্যাঘ, ম্যাঘ সোদর ভাই। 
এক ঝাঁক পানি দ্যাও, গা ধুবার চাই।”

ড. শীলা বসাক উল্লেখ করেছেন, "এই অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ উর্বরতাবাদের সঙ্গে যুক্ত। শস্যজন্মের সঙ্গে এই অনুষ্ঠানের যোগ তুলনীয়। আবার নাচ গানের মধ্যে দিয়ে বৃষ্টি নামানো এক যাদুক্রিয়া বা এক সুপ্রাচীন সংস্কার।" নিম্ন আসামের 'সাত শাক তোলা বিহু'র সঙ্গে হুদুম দেও মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কোনো কোনো লোকসংস্কৃতিবিদ এটিকে 'লিঙ্গ পূজা' বা শিব পূজা বলে আখ্যা দিয়েছেন। ইয়াক পূজাও বলা হয়। ইয়াক কিরাট জনগোষ্ঠীর মহিলাদের করা 'বৃষ্টি বন্দনা' বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন অনেকে। এই হুদুম দেওর পূজায় আরো যেসব গান শোনা যায় ---
“হুদুম দ্যাওরে হুদুম দ্যাও হাগি আচ্ছি পানি দেও
হামার দ্যাশত নাই পানি হাগা টিকার বারা পানি।”
"আসিল হুদমা দ্যাও দুয়ার ছাড়িয়া দ্যাও
বেটা ছাওয়া নোকলা তমরা পালাও রে পালাও।"
“হুদুম হুদুম হুদুম রে, হুদুম কি কাম করে রে
ক্যাশ দিয়া ঘর ছায়া হুদুম ভিজি মরে রে।” 

এইভাবে পূজা করতে করতে রাত কাবার হয়ে আসে। প্রধান পূজারিণী জলপূর্ণ ঘট এবং কলাগাছটি নদীতে ভাসিয়ে দেন। বাকিরাও সেসময় থাকেন। শেষকালে জল ছিটিয়ে উলুধ্বনি করার পাশাপাশি সবাই স্নান সেরে বাড়ি ফেরার পথ ধরেন। এরপর সত্যিকারের বৃষ্টি এসে ঊষর বসুন্ধরাকে প্লাবিত করে। কৃষক মহলে আনন্দ বয়ে আসে মেঘপূজার সফলতায়।
“থাক থাক বিটিলা হুদুম / বরিসা ছয়খান মাস
কি নব দুর্গা হুদুম রে।
চরোতে বসিয়া হুদুম দেখে / চতুর দিকে
কি নব দুর্গা হুদুর রে 
এবার যদি দোন ওঠে তোর / নিজের মামিক দিয়া
কি নব দূর্গা হুদুম রে 
এবার যদি দোন ওঠে তোর / নিজের বইনক দিয়া
কি নব দূর্গা হুদুম রে।
এই চান্দে বিটিলা হুদুমের নাম কি
কি নব দুর্গা হুদুম রে।” (বেনু দত্তরায়)



জ্বলদর্চি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। 👇



Post a Comment

0 Comments