মহাভারতের কর্ণ - এক বিতর্কিত চরিত্র-১৩/দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী

মহাভারতের কর্ণ - এক বিতর্কিত চরিত্র                   ত্রয়োদশ পর্ব      
                       
দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী    

         
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পঞ্চদশ দিবসে ধৃষ্টদ্যুম্নের খড়্গাঘাতে গুরু দ্রোণাচার্য নিহত হবার পরে দুর্যোধনের অনুরোধে কৌরব পক্ষের সেনাপতি হলেন কর্ণ। ইতিপূর্বে সপ্তরথী একত্রে অর্জুন পুত্র অভিমন্যুকে অন্যায় ভাবে একযোগে বান বরিষণ করে নিহত করেছেন। সেই শোকানলে দগ্ধ হয়ে অর্জুন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কর্ণবধে। কর্ণ নিশ্চিত আগামীকালের যুদ্ধে প্রমাণিত হবে অর্জুন ও কর্ণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর কে? ইতিমধ্যেই তিনি দেবরাজ ইন্দ্র প্রদত্ত 'একাঘ্নী' অস্ত্র ব্যবহার করে বৃকোদর পুত্র ঘটোৎকচকে হত্যা করেছেন। সূর্যদেব প্রদত্ত সহজাত কবচকুণ্ডল ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে দেবরাজ ইন্দ্র স্বীয় পুত্র অর্জুনের জীবন রক্ষার্থে হস্তগত করেছেন। পরশুরামের অভিশাপ ও ব্রাহ্মণের অভিশাপ কর্ণের উপরে। ব্রাহ্মণের অভিশাপে যুদ্ধক্ষেত্রে কর্ণের রথচক্র মেদিনী গ্রাস করবে এবং ভার্গবের অভিশাপে তাঁর প্রদত্ত অস্ত্র নিক্ষেপকালে অস্ত্র প্রয়োগের মন্ত্রের বিস্মরণ ঘটবে। তথাপি প্রঞ্চদশ রজনীতে কর্ণের মস্তিষ্কে একটি চিন্তা আবর্তিত হচ্ছিল - স্বয়ং যদুপতি, যাঁকে সকলে দ্বাপরাধিপতি বলে এবং যিনি রক্তের সম্বন্ধে অভিমন্যুর মাতুল - তিনি স্বয়ং কেন বালক অভিমুন্যর প্রাণ রক্ষা করলেন না। ইতিমধ্যে তাঁর গুপ্তচর বিচিত্রবুদ্ধি পাণ্ডব শিবিরের পুর নারীদের মধ্যে আলোচিত এমন একটি সংবাদ তাঁকে দান করলেন যা শুনে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। 
প্রথম চিন্তার উত্তরে তিনি নিঃসংশয় যে স্বয়ং বাসুদেব এই যুদ্ধের ঋত্বিক এবং তিনি চেয়েছেন যে ভাবে হোক কৌরবদের সহিত সমগ্র ক্ষত্রিয় সমাজ বিনষ্ট হোক, তা না হলে যুদ্ধের প্রাক্কালে অর্জুনের প্রতি তাঁর যে উপদেশ "পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্, ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে" - এই বাণী ব্যর্থ হয়ে যাবে।       
প্রতিদিনই বিচিত্রবুদ্ধি শয়নের পূর্বে সারাদিনের সংবাদ কর্ণের কাছে জানায়, আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কর্ণের কাছে এসে সে বলল "আপনি সেনাপতির দায়িত্বভার নেওয়ায় পাণ্ডব শিবিরে পট্টমহাদেবী দ্রৌপদী খুবই উৎকণ্ঠিত। পিতামহ ভীষ্ম বা শস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য যখন সেনাপতি হয়েছিলেন তখন তাঁকে এত বিচলিত দেখা যায়নি। তিনি তার এক স্বপত্নীর কাছে আক্ষেপ করে বলেছেন 'তুমি হয়তো জানো না অঙ্গরাজ কর্ণ তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন সম্বন্ধে অন্তরে কী বিপুল পরিমাণ ঈর্ষা ও বিদ্বেষ পোষণ করেন যা অন্য কারো প্রতি করেন না। হয়ত রণনীতি নৈপুণ্যে দুজনেই সমান। কিন্তু মানুষের অন্তরে যখন ঈর্ষা পোষিত হয় তখন ক্রোধে সে ন্যায় নীতি বিগর্হিত যুদ্ধরীতির পথে পা দেয়। তাছাড়া অর্জুনের প্রতি তাঁর এই ঈর্ষা বা বিদ্বেষ শৈশবকাল থেকেই" 
সপত্নী বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছিল 'এই বিদ্রোহের কারণ কি মহাদেবী'? 
মহাদেবী উত্তর দিয়েছিলেন 'তার কারণ আমি নিজে। বিদ্বেষেই আমার জন্ম এবং এই মহাসমর তারই ফল। দ্রোণাচার্যের নিকট অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়ে আমার পিতা প্রতিশোধ স্বরূপ দ্রোণাচার্যের মৃত্যু কামনায় এক যজ্ঞ করেছিলেন এবং সেই নিমিত্তেই ধৃষ্টদ্যুম্ন ও আমার জন্ম যজ্ঞবেদী থেকে। এরপরে আমার স্বয়ম্বর সভায় কর্ণ আমার কাছে অপমানিত হয়েছিলেন। সেই অপমানের জ্বালা হয়তো তিনি আজন্ম স্মরণে রেখেছেন এবং তার জন্য তাঁকে দোষ দেওয়াও অনুচিত। আমার প্রবঞ্চনা ও প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের জন্য রাজন্য সমাজে তিনি পরিহাসের পাত্র হয়েছিলেন'। 
'আপনি কেন তাঁকে প্রবঞ্চিত করেছিলেন'? স্বপত্নীর এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন 'আমার পিতাকে অর্জুন পরাজিত করে তাঁকে দ্রোণাচার্যের নিকটে নিয়ে যেয়ে অপমানিত করেছিলেন বলে তাঁর বাসনা ছিল অর্জুনকে জামাতারূপে বরণ করে সেই অপমানের প্রতিশোধ নিবেন। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি স্বয়ংবর সভায় এক কঠিন পরীক্ষা রেখেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল অর্জুন ব্যতীত অন্য কেউ সেই ধনুকে জ্যা রোপন করে লক্ষ্যভেদ করতে পারবেন না আমিও পিতার সেই বাসনা অবগত ছিলাম। কিন্তু যখন মহাবীর কর্ণ সেই অসাধ্যসাধন করেছিলেন তখন আমি নিতান্ত নিরুপায় হয়ে স্বয়ংবর সভার শর্তের অবমাননা করে পিতার মনোবাসনা রক্ষা করার জন্যে বলেছিলাম 'প্রাণ থাকতে আমি সুতপুত্রের গলায় বরমাল্য অর্পন করব না'।আমার সেই কথা শুনে সমবেত রাজন্যবর্গের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এবং বাক্যবাণে আঘাতে জর্জরিত অঙ্গাধিপতি কোন বাক্য উচ্চারণ না করে ঊর্ধ্বাকাশে মধ্যগগনে দিবাকরের প্রতি দৃষ্টিপাত করে কারুণ্যমিশ্রিত হাস্যে বলেছিলেন 'আমার জন্য আপনাকে প্রাণ ত্যাগ করতে হবেনা, কল্যাণী। আপনি দীর্ঘায়ু আয়ুষ্মতী হোন'। তাঁর সেই করুণাঘন মুখমণ্ডল দেখে আমি নিজের কাছে নিজেই লজ্জিত হয়েছিলাম। আমার সেই আঘাত কি মহাবীর কর্ণ কোনদিন ক্ষমা করতে পেরেছেন? আজও নিশ্চয়ই তিনি সেই না পাওয়ার দুঃসহ যাতনা মনে রেখেছেন। আজকের রাত্রি প্রভাত হলে আগামীকাল মহাবীর কর্ণ ও তৃতীয় পাণ্ডবের মধ্যে যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হবে আমি দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি সেই যুদ্ধশেষে হয় আমরা অথবা কর্নের মহিষীগন তাদের প্রিয়তম স্বামীকে হারাবেন। যদি সম্ভব হত তাহলে আমি নিজে যেয়ে কর্ণের কাছে আমার সেই প্রবঞ্চনার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিতাম। তিনি উদারমনা ব্যক্তি নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করতেন এবং এই যুদ্ধও তাহলে বন্ধ হতো। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতি তাতে আমার কাছে আর সে পথও খোলা নেই, বিশেষত অভিমুন্য বধের পরে"।                        
বিচিত্রবুদ্ধির কাছে এই কথা শোনার পরে কর্ণ যেন স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছেন কৃষ্ণা ভীতা, সম্ভাব্য অমঙ্গলের আশঙ্কায় চিন্তিতা। তাঁর সেই নীল পদ্মের মতো আয়তচোখ থেকে মুক্তা বিন্দুর মতো অনুশোচনার অশ্রু ঝরে পড়ছে। আসন্ন সর্বনাশের আশঙ্কায় সেই সুন্দর মুখশ্রী বেদনায় বিকৃত হয়ে উঠেছে। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি স্বগতক্তি করলেন 'আমি তোমাকে আগেও বলেছি - তুমি সুখী ও আয়ুষ্মতী হও - আমার সেই আশীর্বাদ তোমার উপর বর্ষিত হোক। তোমার ললাটে রক্তসিদুঁর চিরদিন অক্ষয় হয়ে থাকুক, মণিবন্ধে শ্বেতশুভ্র শঙ্খবলয় অনন্তকাল চিরায়তীর গৌরব বহন করুক, তোমার মুখশ্রী থাক চির উজ্জ্বল, অম্লান। কর্ণ হতভাগ্য, চিরদিন চিরঞ্জিতের দলেই থাকুক তার অন্তরের বেদনা সমস্ত বঞ্চনার ইতিহাস তার সঙ্গে চিতা ভাষ্য বিলীন হয়ে যাক দুরভাগ্য কর্নেল থাক অর্জুন থাকুন আমার মৃত্যুতে এই মনে করে সান্তনা পাব যে তুমি কর্ণের সঠিক মূল্যায়ন করে তোমার এই স্বীকৃতি আমার মহাযাত্রা পথের পাথেয় হোক। কর্ণ নিজে থেকেই উপলব্ধি করলেন সারা জীবনে দ্রৌপদীকে না পাওয়ার জ্বালা যে তাকে অহরহ দগ্ধ করেছিল তা যেন এক নিমেষেই শীতল হয়ে গেল। কৃষ্ণা যে তাঁর উপরে অবিচার করেছিলেন সে কথা স্বীকার করেছেন। দ্রৌপদীকে ক্ষমা করতে পেরেছেন কিনা সেকথা কর্ণ প্রকাশ না করলেও তিনি যে আনন্দিতই এ কথা বলার প্রয়োজন নেই। কিন্তু একটা সত্য দ্রৌপদী আজও জানেন না যে কর্ণ জ্যেষ্ঠ পান্ডব এবং সেই পরিচয় যদি তিনি জানতেন তাহলে তাঁকে প্রবঞ্চনা না করে তাঁর গলাতেই বরমাল্য দিতেন। তবে আজ না হোক আগামীকাল একথা কৃষ্ণা অবশ্যই জানবেন। কারণ পাণ্ডবেরা একথা না জানলেও পান্ডব জননী কুন্তী ও যদু কুলপতি শ্রীকৃষ্ণের কাছে এ কথা শুনতে পাবেন। ভাগ্যপীড়িত বলেই আজ তিনি কৃষ্ণার বিপক্ষে অবস্থান করছেন। যদি সত্য প্রকাশ পেত তাহলে কৃষ্ণা অন্যান্য পাণ্ডবভ্রাতাদের মতো তারও অঙ্কশায়িনী হতেন।                            
সময় আগত, কিন্তু আজ কর্ণ কেন যেন ইষ্ট দেবতার স্মরণ, মণনে একাগ্রচিত্ত হতে পারছেন না। তার মন যেন কি এক চিন্তায় উচাটন হয়েছে। আজন্ম যে সূর্যপূজায় তিনি মন-প্রাণ সমর্পন করতেন আজ সেখানে যেন কোন বিঘ্ন ঘটছে। অথচ আজই তাঁর জীবনের এক চরম সন্ধিক্ষণ। বিচিত্র বুদ্ধির কাছে কৃষ্ণার মনের কথা জানতে পেরে তিনি যেন খুব ব্যাকুল, অথচ আজ তাঁর চিরশত্রু অর্জুনের সঙ্গে সম্মুখ সমর।    
কর্ণের চিন্তাশক্তির ছেদ পড়ল তাঁর রথের সারথি শল্যের কাছে বিদ্রূপের কষাঘাতে। তিনি বললেন "কি সুতপুত্র, তুমি কি মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়ে যুদ্ধযাত্রায় বিলম্ব করছ? তবে মনে হয় তার আর দেরি নেই। মনে হচ্ছে আজই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে মহাশ্মশানের নীরবতা নেমে আসবে। কৌরব শিবিরে মহাকালের করাল দংষ্ট্রা নেমে আসতে আর বিলম্ব নেই"। কর্ণ প্রশ্ন করলেন "তার অর্থ"?  

…….পরবর্তী সংখ্যায় দেখুন



জ্বলদর্চি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। 👇



Post a Comment

0 Comments