জ্বলদর্চি

মাতৃভাষা চর্চা ও স্কুল স্তরে বিজ্ঞান শিক্ষা/সৌমেন রায়

   

 মাতৃভাষা চর্চা ও  স্কুল স্তরে বিজ্ঞান শিক্ষা

                       সৌমেন রায়

 সমস্যা দার্শনিক হোক বা বস্তুগত, আনন্দে আত্মহারা হই বা দুঃখে ম্রিয়মাণ আমরা যার শরণাপন্ন হই সেই গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং বলে গেছেন শিক্ষার ভাষা কি হওয়া উচিত। ' শিক্ষায় মাতৃভাষাই মাতৃদুগ্ধ’। যদিও অতীতে বক্তব্যের এই খন্ডিত অংশটি অপব্যবহার করা হয়েছে। তাও মূল সুরটি সর্বদা অপরিবর্তনীয়। বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে কথাটি একটু বেশি রকমের সত্যি। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, যার নাম স্বয়ং আইনস্টাইনের সঙ্গে উচ্চারিত হয় তারও একটি বিখ্যাত উক্তি ' যারা বলেন বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা করা যায় না, হয় তারা বিজ্ঞান বোঝেন না বা বাংলা জানেন না।' শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে ভাষা যে মাতৃভাষা হওয়া উচিত সেই ব্যাপারে সওয়াল করে গেছেন আমাদের আরো দুই আচার্য, জগদীশচন্দ্র বসু ও প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। এরপর আর বলার  অবকাশ থাকেনা যে  বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা যায় এবং তা করা উচিত।

     তবে আমরা যদি শক্ত বক্তব্যকে সরিয়ে রাখি তাও সাধারণ বোধ বুদ্ধি থেকে আমরা বলতে পারি যে শিশু অবস্থায় পড়ার মাধ্যম অবশ্যই হওয়া উচিত মাতৃভাষা। তার কারণ একটি শিশু যদি ভাষা নিয়েই ব্যস্ত থাকে, ভাষা বুঝতেই তার অর্ধেক সময় এবং শক্তি ব্যয় হয় তাহলে সে বিষয় বুঝবে কি করে! তাই বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে বিজ্ঞান শিক্ষা তথা সমগ্র শিক্ষার মাধ্যম অন্তত উচ্চ প্রাথমিক পর্যন্ত হওয়া উচিত মাতৃভাষা। যে ভাষায় সে দৈনন্দিন কথা বলে,আনন্দ ও দুঃখ প্রকাশ করে সেই ভাষা। এই বয়সে অনেকখানি সময় কল্পলোকে বিরাজ করে শিশু কিশোররা। এই গল্পলোক বা কল্পলোক অনেক অভিভাবকের কাছে সময়ের অপচয় এবং  চিন্তার বিষয় হলেও ভবিষ্যতে এই কল্পলোক কিন্তু পড়াশোনাতেও সাহায্য করে। যে কোন উচ্চস্তরের গবেষণা, আবিষ্কার নির্ভর করে কল্পনাশক্তির ওপর। ভেবে দেখুন মানুষ ভাবতে পেরেছিল পাখির মত ডানা মেলে উড়বে, তাই কিন্তু আবিষ্কার হয়েছিল এরোপ্লেন।উচ্চস্তরের বিজ্ঞান প্রায় পুরোটাই বিমূর্ত ভাবনা,তাই কল্পনা শক্তি পড়ার অপরিহার্য অঙ্গ। আর  বিষয়ের ভাষা বুঝতে শিশুকে যদি প্রবল কষ্ট করতে হয় তাহলে দুমড়ে যায় তার সেই কল্পলোকটি।মৌলিক ভাবনা থেকে সরে আসে সে।অসাধারণ মেধাবী শিশু, যে অনায়াস দক্ষতায় অর্জন করে ফেলে আরও একটি ভাষা তার কথা আলাদা।

        বিজ্ঞান শিক্ষার সমস্যা কি এক কথায় তা বলা খুবই মুশকিল। আসলে সমস্যা বিবিধ তার মধ্যে অন্যতম ছাত্র-ছাত্রীদের প্রবল অনীহা,যার আবার অন্যতম কারণ উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব। মৌলিক বিজ্ঞান পড়ার ক্ষেত্রে সেটি তো ভীষণভাবে প্রকট। গোটা ছাত্র জীবন ধরে প্রচন্ড শ্রমের পরও প্রবল অনিশ্চয়তা তাদের । এ সমস্যার অনেক মাত্রা,তবে সে প্রসঙ্গ আজকের বিষয় থেকে ভিন্ন।বিজ্ঞান শিক্ষার অন্যতম বাধা হলো ভাষা, আমাদের আলোচনা সেই বিষয়ে। প্রকৃত সমস্যা ভাষা না পরিভাষা? অনেকেই পরিভাষা  প্রধান সমস্যা বলে মনে করেন।মনে করেন সঠিক পরিভাষার অভাবেই সঠিক বিজ্ঞান শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু ভিন্নমতও আছে। আর তা হলো পরিভাষা প্রধান সমস্যা নয়। মাধ্যমিক স্তর এমনকি উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বাংলায় বিজ্ঞানের পরিভাষা যথেষ্ট শক্তিশালী।প্রায় সমস্ত বৈজ্ঞানিক টার্মের  উপযুক্ত পরিভাষা আমাদের আছে।অল্প কিছু পরিভাষা যা নেই সেগুলিতে ছেলে মেয়েরা অভ্যস্ত। জোর করে পরিভাষা তৈরির প্রয়োজন নেই। সেটা চেয়ার কে কেদারা বলার মতো হয়ে যাবে। হ্যাঁ পরিভাষার অভাব আছে উচ্চস্তরে। তবে সেখানেও জোর করে পরিভাষা তৈরির কোন মানে হয় না। তার কারণ আমরা ইউরোপীয় দেশগুলির মত বিজ্ঞানে স্বয়ংসম্পূর্ণ নই। উচ্চতর গবেষণার জন্য ,যথোপযুক্ত কর্মসংস্থানের জন্য আমাদের ছেলেমেয়েদের রাজ্যের বাইরে,দেশের বাইরে যেতেই হয়। তাই সময় থাকতে ইংরেজি ভাষাটি রপ্ত করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। জার্মানিতে যেমন জার্মান ভাষাতেই উচ্চ স্তর পর্যন্ত বিজ্ঞান পড়া হয় কারণ তারা বিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের যথেষ্ট গবেষণার সুযোগ দিতে পারে এবং গবেষণা শেষে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করতে পারে।আমাদের তা সম্ভব নয়।তাই ইংরেজি ভাষাটা আমাদের শিখে নিতেই হয়। এমনকি বাংলা মাধ্যমের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যমিক স্তর থেকে ইংরেজি পরিভাষা গুলিও বাংলার সাথে সাথে বুঝে নেওয়া উচিত। 

      পরিভাষা যদি থেকেই থাকে তাহলে  ভাষা নিয়ে সমস্যা কোথায ? বাংলা মাধ্যম স্কুলে তো মাতৃভাষা বাংলাতেই পড়াশোনা করা হয়। হ্যাঁ, এটা ঠিক বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলিতে বাংলাতেই পড়াশোনা করা হয়। কিন্তু  বইয়ের বাংলা ভাষা আমাদের বিভিন্ন অঞ্চলের কথ্য ভাষার সঙ্গে মেলেনা। একে তো ছাত্রছাত্রীদের নিজের জীবন বহির্ভূত বেশ কিছু জিনিস শিখতে হয় সঙ্গত কারণেই। তার ওপর আবার সে যে ভাষায় কথা বলে সে ভাষায় বই লেখা হয় না। তার ফলে ব্যাপারটা গ্রহণ করতেই তাদের সমস্যা হয়। সাবলীলভাবে রপ্ত করতে না পারার জন্য তারা মনের সমস্ত বাতায়ন বন্ধ করে মুখস্ত করে।ফলে দ্রুত তা মুছে যায় মন থেকে,মৌলিক ভাবনাও বিকশিত করা দুষ্কর হয়ে উঠে। আবার ইদানিংকালে নম্বর কেন্দ্রিক পড়া দৃষ্টিকটুভাবে বেড়ে গেছে।চাহিদা পূরণ করতে, প্রাথমিক স্তর থেকে স্কুলের সময় বাদে বাকি সময়ের ( ক্ষেত্রবিশেষে স্কুল বন্ধ করে) সিংহভাগ অংশ টিউশন ছোটাছুটি করে ছাত্রছাত্রীরা।ফলত তার হাতে অবসর বলে কিছু থাকে না। 'অপচয়' করার মত সময় না পাওয়ায় পাঠ্য বই ছাড়া অন্য বই পড়বে কখন?গল্পবই পড়া কমে গেছে বলা ঠিক নয় , আসলে ওটা কমতে কমতে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি এসে ঠেকেছে। ফলে একটি ছাত্র বা ছাত্রীর ভাষার ওপর দখল অত্যন্ত হতাশাজনক। তারা সাধারণ বাংলারও মানে বোঝেনা, ফলে বিজ্ঞান পড়ানো ক্রমশই কঠিন হয়ে উঠছে। একটা উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। যেমন ধরা যাক আর্কিমিডিসের নীতি পড়ানো হচ্ছে। সেখানে বিজ্ঞান শিক্ষক বললেন 'অপসারিত তরলের ওজন’, এখন এই  'অপসারিত' শব্দটির মানে সে জানেন। উত্তল লেন্স পড়াতে গিয়ে যদি বলা হয় যে 'অভিসারি রশ্মি গুচ্ছে পরিণত হচ্ছে’, সে অভিসারী মানে জানেনা। বিজ্ঞান ক্লাসে কিছু হাতেনাতে করে দেখানো যায় বা টুকটাক এসব মানে বলে দেওয়া যায়। কিন্তু যদি অনেক শব্দেরই  মানে বলে দিতে হয় তাহলে আসলে সেটা হয়ে ওঠে ভাষা শিক্ষার ক্লাস। তখন সে সরে আসে বিজ্ঞান বোঝা থেকে। তার সর্বশক্তি নিয়োগ করে ভাষাটি বোঝার জন্য।বোঝাই যাচ্ছে বিজ্ঞানে বাংলা পরিভাষা আর ইংরেজির মধ্যে কোনো তফাৎ নেই তাদের কাছে । কোন ছাত্র-ছাত্রী যদি গড় গড় করে বাংলা রিডিং পড়তে না পারে তাহলে প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞান কেন, তার কোন শিক্ষাই সম্ভব নয়।আর সেটা করতে গেলে পাঠ্য বহির্ভূত পড়াও দরকার। এই সহজ কথাটি অনেক শিক্ষিত অভিভাবকও মানতে চান না। তারা ছেলেমেয়েদের পাঠ্য বহির্ভূত বিষয় পড়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। সমস্যাটা যে শুধু বিজ্ঞানে তা নয় কিন্তু ।এই সমস্যা সমস্ত বিষয়ের ক্ষেত্র প্রযোজ্য।

                   সমস্যা তো বোঝা গেল, তাহলে সমাধান কি? সমাধান খুবই সোজা এবং সকলেই তা জানেন।আর সেই কারণেই মনে হয় সমাধান অধরা থেকে যায়। সমাধান টা  হচ্ছে প্রাথমিক স্তরে ভাষা শিক্ষার উপর জোর দেওয়া। তাত্ত্বিকভাবে হয়তো সেটা দেওয়াও হয়। কিন্তু বাস্তব? অন্তত উচ্চ প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত ছেলেদের সিলেবাসের বোঝা যদি প্রয়োজন হয় তা কমিয়ে  মাতৃভাষার চর্চা বাড়ানো উচিত। এ সবই তাত্ত্বিকভাবে ভাবা হয় কিন্তু বাস্তবে প্রযুক্ত হয়না। প্রতিবার বিস্তর আলাপ-আলোচনার পর সিলেবাস কমার বদলে বেড়ে যায়। ভাষা শিক্ষা নিয়ে বাংলা শিক্ষকরা বলছেন তাদের এখন নাকি প্রতি ক্লাসে ত্রিশটা মতো  করে গদ্য ,পদ্য পড়াতে হয়।তাহলে তিনি  একটা প্রান্তিক  ছেলে পড়তে পারে কিনা, লিখে তার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে কিনা সেটা দেখার সময় পাবেন কোথায়? কথাটা অস্বীকার করার মত নয়।কাগজে কলমে স্কুলে কর্মদিবস  বেড়েছে, বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের মাধ্যমে ছাত্র ছাত্রী দের সার্বিকভাবে উন্নয়নের চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু নিবিড় পাঠের সময় গেছে কমে।।সমাধানের উপায় জানা নেই।

        মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা করলে বৈজ্ঞানিক চেতনার বিকাশ ঘটে সহজে,এটা সহজ সত্য। তাই মাতৃভাষার চর্চার বিকল্প কিছু নেই। মাতৃভাষার চর্চা যেভাবেই হোক বাড়াতেই হবে।কিভাবে তা করা যাবে সেটা সর্বস্তরে ভাবা উচিত বলে মনে হয়।ভাষা দিবসে সেই ভাবনাই শুরু হোক।

🍂



Post a Comment

0 Comments