মিলি ঘোষ
তাহলে বুদ্ধিজীবী কারা? দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের সময় যাঁরা চুপচাপ একটার পর একটা দৃশ্য দেখে গেছেন,তাঁরা? নাকি, যাঁরা বুদ্ধিকে জীবিকা করে বেঁচে আছেন, তাঁরা? সে তো আমার বাড়িতে যে মহিলাটি বাসন মাজে, ঘর মোছে সেও বুদ্ধিজীবী। সে তো প্রতি পদক্ষেপে তার বুদ্ধিকে প্রয়োগ করে যাচ্ছে। আর ভাবছে, কাজের বাড়ির বউদিগুলো কী বোকা! বুদ্ধিজীবী মাত্রেই কি তাই? অন্যকে বোকা ভাবে? কিন্তু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী বলতে আমরা যাঁদের বুঝি, তাঁদের বুদ্ধিজীবী বানিয়েছে কারা? এই জনগণ। যে জনগণ আজকে তাঁদের দেখলে চ দিয়ে কী একটা চার অক্ষর আছে, সেটা বলে যত দূর অপমান করা যায়, করে। আসলে বুদ্ধিজীবী কোনও মানুষ নয়। বুদ্ধিজীবী একটা স্রোত। সময়ের সঙ্গে পাল্টি খাওয়া একটা প্রবাহ। তাঁরা আমাদের মত চুনো-পুঁটি লোক না। নিজের অবস্থান ধরে রাখার তাগিদ থাকে। প্রতিবাদ তাঁরা এমন ভাবে করবেন, করাও হলো, আবার সেই চার অক্ষরও হলো।
এই প্রসঙ্গে কবি সৈকত কুণ্ডুর লেখা 'আমার কথা' কবিতাটির চার লাইন উল্লেখ করছি।
বদল সে তো নতুন কথা নয়,
বদল সে তো হবেই বারে বারে।
আসল কথা সেই বদলের সাথে
কে কতদূর বদলে যেতে পারে।
সৃষ্টির আদিকাল থেকে এই নির্মমতা ছিল কিনা জানি না। তবে, মহাভারত তো সেই একই গল্প শুনিয়েছে। সেই বঞ্চনা, সেই না পাওয়া, সেই অত্যাচার অপমানের গল্প।
রান্না করতে করতে মা তাঁর পাঁচ ছেলেকে বললেন, "যা এনেছ, পাঁচ ভাইতে ভাগ করে নাও।"
ওহ্, মাতৃ আজ্ঞা পালনের কী অসাধারণ নমুনা! বড়'র অধিকারে যুধিষ্ঠির পেলেন একদম টাটকা ফলটি। নকুল সহদেব পিছে পিছে হাঁটে। দাদাদের ফাই-ফরমাস খাটে। ওদের ছিবড়েটুকু দিলেই হবে। দরকার মতো যাবতীয় দোষ ওদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই কেল্লা ফতে। সততার প্রতীক যুধিষ্ঠির, তাঁর বাড়ি স্বস্তিক চিহ্ন, পঞ্চমুখী হনুমান দেবতা আরও কী কী সব দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছেন। যাতে কোনও 'অশুভ শক্তি' তাঁকে স্পর্শ করতে না পারে। যদিও তিনি গুণী মানুষ। শিক্ষায় দীক্ষায় আদব কায়দায় এক্কেবারে পারফেক্ট ম্যান। তবু, এত কিসের ভয় তাঁর? যে চারদিক থেকে নিজেকে আড়াল করে রেখেছেন? অশুভ শক্তির স্পর্শ পাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। কারণ, সমমেরু পরস্পরকে বিকর্ষণ করবেই। কিন্তু এই যুধিষ্ঠির কে? যাঁকে নাগালের মধ্যে পেয়েও কেউ কিছু করতে পারে না? কী ভাবছেন? মানুষ মরণশীল। অতএব যুধিষ্ঠিরকেও একদিন মরতে হবে। ভুল, ভুল ভাবছেন। যুধিষ্ঠিরদের মরণ নেই। তাঁরা যুগে যুগে কালে কালে বেঁচে আছেন। বেঁচে থাকবেন। যতদিন না সিস্টেম চেঞ্জ হয়। সিস্টেমের বাংলাটা যেন কী? পদ্ধতি। ঠিক, ভুলে গেছিলাম। আসলে এই সিস্টেম কথাটাও সিস্টেমেরই একটা অঙ্গ।
🍂
আরও পড়ুন 👇
আচ্ছা, একজন ডাক্তার বা একজন কলেজ পড়ুয়া যদি নিজের কর্মক্ষেত্রে বা নিজের কলেজে চরম অত্যাচারের শিকার হয়ে মৃত্যু বরণ করেন এবং তাই নিয়ে যদি প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, সেটা কি এলিট সোসাইটির আন্দোলন বলে ভূষিত হবে? সব ক্ষেত্রে কি 'আমরা ওরা'র বিভাজনের প্রয়োজন হয়? বরং ভাবা যেতে পারে অন্যভাবে। একটি নামকরা সরকারি হাসপাতাল, যেটি সেই ডাক্তার মেয়েটির কর্মস্থল, সেখানে তিনি নিরাপদ নন বললে কম বলা হয়। পড়ুয়া ছেলেটিও নিজের মেধার জোরে একটি আপাদমস্তক নামি প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পেয়েও চূড়ান্ত অমানবিকতার সম্মুখীন হয়ে প্রাণ হারালেন। এদের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে শহরতলীর যে মেয়েটি রাত করে ছাত্র পড়িয়ে বাড়ি ফেরে, তার নিরাপত্তা কোথায়? হতভাগ্য সেই মেয়েটির সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের জন্য বিচারের দাবির সাথে সাথে মেয়েদের নিরাপত্তার দাবি উঠছে। নিধান কী? মেয়েরা রাতে কাজ করবে না। বাড়ি থেকে বেরোবে না। কারণ, রাতে ডক্টর জেকিল ঘুরে বেড়াবেই। তাদের আটকানো যাবে না কোনোমতেই। মেয়েরা ক্যারাটে শেখো, সম্ভব হলে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢেকে রাখো। কারণ ওই যে, ডক্টর জেকিল ঘুরছে। সম্পূর্ণ শরীর কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখলেই কি রেহাই পাওয়া যায়? যায় না। যায়নি। ঝুড়ি ঝুড়ি উদাহরণ আছে তার। কাজেই সিস্টেম জলের মতো স্বচ্ছ।
সিস্টেমের একটু গোড়ার দিকে যাওয়া যাক। ধরুন একটি মেয়ে শ্বশুর বাড়ির অন্য লোকেদের কথা ছেড়েই দিলাম, নিজের স্বামীর কাছেই মারধর খেয়ে জীবন কাটাচ্ছে। মেয়েটির নিজের কোনও আয় নেই, না বললেও চলে। এই অবস্থায় তার মা, মাসিদের ভূমিকাটা কী থাকে?
ওরকম আমাদেরও অনেক হয়েছে। অর্থাৎ, এটাই সিস্টেম। নয় তো বলবে, তোর হাজব্যান্ডের সম্বন্ধে বলছিস, এটা তো খুব গর্বের নয়।
কারা বলছে? একদল মহিলা। সত্যিই তো, নিজের যন্ত্রণার কথা আপনজনদের কাছে বলা কখনোই গর্বের না। বরং লজ্জার। লজ্জা তো পাবে সে, যে অত্যাচারিত। আর কে কলার তুলে চলবে? যে বীর। একজন মহিলার গায় হাত তুলে যে নিজের পৌরুষ দেখায়। এবার সেই বীরটির প্রসঙ্গে আসি। সে কিন্তু ছোট থেকে পেতে শিখেছে। তাই থামতে শেখেনি। পারিবারিক শিক্ষা কাকে বলে, সে জানেই না। এসবই সিস্টেম। আপনার পাড়ার কোনও ছেলে সাইকেল চালিয়ে বাস রাস্তায় গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়লে দোষ কিন্তু ছেলেটিরই। যা জোরে চালায়! আপনার বাচ্চাটিকে কুকুরে তাড়া করলে দোষ আপনার ছেলের। ওই তো ইট মারছিল। হয়তো একপাল কুকুর দেখে বাচ্চাটি দৌড়েছে। তাই তাড়া খেয়েছে। কিন্তু ইট মারেনি। সে যাই হোক, তাড়া যখন খেয়েছে, ও'ই ইট মেরেছে। তার মানে, যে ক্ষতিগ্রস্ত দোষ তার। যেমন অত রাতে ডাক্তার মেয়েটি একা কেন শুতে গেল? যাদবপুরের ছেলেটি নিশ্চয়ই বড় দাদাদের সঙ্গে মুখে মুখে তর্ক করেছে। আচ্ছা, পাণ্ডবদের বিচার সভায় দোষটা আসলে কার ছিল? কৃষ্ণা, কৃষ্ণা। অত ফিসফিস করে বলার কী আছে? জোরে বললেই হয়। আমাদের দ্রৌপদী তো। হ্যাঁ, জানি। বাসি খবর দিস কেন? এবার বলুন তো, দু'জন সমকামী মানুষ শান্তিতে ঘর বাঁধতে পারে? মানে, আপনারা দেন এদের শান্তিতে থাকতে? পৃথিবীর যত হাতা খুন্তি আছে, সব তো ছুঁড়ে মারেন ওদের দিকে। বিজ্ঞান বোঝেন না? না না, কেমিস্ট্রির অধ্যাপক আপনি। আপনাকে ছোট করতে পারি? এই তো সেদিন চাঁদ, সূর্য, পৃথিবী যেই এক লাইনে চলে এল, অমনি আপনি উপোস করে সারাদিন কাটিয়ে দিলেন। আপনার ফ্রিজের খাবারগুলো কী হলো? কাল রাতে যে মিষ্টিগুলো এনে ঢোকালেন ফ্রিজে, ফেলে দিয়েছেন? ও আচ্ছা। গ্রহণ কেটে যাবার পর খেয়েছেন। সে তো খেতেই হবে। শরীরের নাম মহাশয় বলে কথা। যা সওয়াবেন তাই সইবে না দাদা। দিন কাল বড়ো খারাপ। আর যাই করুন, সিস্টেমের বাইরে যাওয়া চলবে না।
কালের নিয়মে কত কী তো হারিয়ে গেছে। প্রকাশ্যে আসেনি। কিন্তু ঘটনা ঘটে চলেছে আবহমানকাল ধরে। সম্ভব, আমূল পরিবর্তন? বাহ্যিক পরিবর্তন যেটুকু হয়েছে তা শিক্ষার মোড়কে, অর্থের আভিজাত্যে আসলটুকু ঢেকে রাখা। তাই সিস্টেম পাল্টানো সহজ কথা নয়। তবে, অন্যায় দেখে মুখ ঘুরিয়ে থাকলে আপনি সমাজের বোঝা। অনেকে আবার ধরি মাছ না ছুঁই পানিতে বিশ্বাসী। সে যাইহোক,প্রতিবাদ থাকবে প্রতিবাদের মতোই। অন্যায় যদি সীমা ছাড়ায় প্রতিবাদও রূপ পাল্টাবে। সে তখন দেশ কালের বেড়া ডিঙিয়ে সার্বজনীন প্রতিবাদ। যতক্ষণ দোষীরা শাস্তি না পায় এ আওয়াজ থামবে না। শিশু থেকে বৃদ্ধ রাস্তায় হাঁটছে। মিছিলে স্লোগান দিচ্ছে। রাত জেগে পথে পথে বিচার চেয়ে ছবি আঁকছে। তাক লাগানো হাতের লেখায় ভরিয়ে দিচ্ছে গলি থেকে রাজপথ। স্টেডিয়ামে সত্তর হাজার ফুটবল প্রেমী এক সঙ্গে ধ্বনি তুলতে চাইছে। আর এখানেই ভয় তাঁর, যাঁর হাতে ছড়ি আছে। বাধা তিনি দেবেনই, কারণ তিনি ভয় পেয়েছেন। তাছাড়া তাঁর সৈন্য-সামন্ত, লোক-লস্কর, পাইক-বরকন্দাজ রয়েছে। এমনি এমনি? আমি তো এমনি এমনিই খাই, বললেই হবে? পয়সা লাগে না?
এতদিনের চেনা পৃথিবী তাহলে দুলে উঠেছে। এখন আর মানুষ বিচার চাইছে না। বিচার দাবি করছে।
আর যুধিষ্ঠির? তিনি কি এখনও আশা করছেন পার পেয়ে যাবার? পলিগ্রাফ! পলিগ্রাফ দেখাচ্ছে! সেই মহাভারতের সময় থেকে ওরকম কত পলিগ্রাফ দেখলেন! ওসব তাঁর জাস্ট বাঁ হাতের খেল।
আচ্ছা রবীন্দ্রনাথ কার কথা ভেবে লিখেছিলেন?
সে নিশ্চয় বুঝিয়াছে ত্রিভুবন দোলে,
ঝাঁপ দিয়া উঠিবারে তারই প্রভু-কোলে।
মনিবের পাতে ঝোল খাবে চুকুচুকু,
বিশ্বে শুধু নড়িবেক তারই লেজটুকু।
0 Comments