জ্বলদর্চি

অ্যান্টনি রথা (পর্তুগিজ নাবিক, মীরপুর, মহিষাদল) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ১৮৮
অ্যান্টনি রথা (পর্তুগিজ নাবিক, মীরপুর, মহিষাদল) 

ভাস্করব্রত পতি

তিনি ছিলেন একজন পর্তুগিজ নাবিক। খ্রীষ্টান। কিন্তু মনেপ্রাণে বাঙালি। মেদিনীপুরের সুযোগ্য সন্তান। দীর্ঘসময় ধরে বংশপরম্পরায় তিনি মেদিনীপুরের বুকে একটা ঐতিহ্যবাহী এবং ঐতিহ্যশালী ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর এই প্রয়াস আজও এক সম্প্রীতির নিদর্শন হয়ে বেঁচে আছে মহিষাদলের মীরপুরে। 
গ্রামে ঢোকার মুখে পর্তুগিজদের ইতিহাস লেখা রয়েছে

তিনি প্রয়াত অ্যান্টনি রথা। মীরপুরের অন্যতম ব্যক্তিত্ব। মৃত্যুর অনেক আগেই তিনি তাঁর সমাধি মন্দির নির্মাণ করে রেখেছিলেন মীরপুরের কবরস্থানে। যা এক দর্শনীয় বিষয়। তিনি ও তাঁর স্ত্রী চঞ্চলা মারিয়া রথা ছিলেন এই পর্তুগিজ কলোনির সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং মুক্তমনা পর্তুগিজ বাঙালি। তাঁদের মৃত্যুর পর এই মীরপুরের মাটিতেই চিরনিদ্রায় শোয়ানো হয়েছে। কিন্তু আজও তিনি জেগে রয়েছেন এখানকার মানুষের মনের গভীরে।
মৃত্যুর আগেই নিজের এই সমাধি মন্দির তৈরি করেছিলেন অ্যান্টনি রথা

বাঙালিয়ানা এখন মীরপুরের পর্তুগীজদের সাথে সমার্থক। এখানে মিলবে যেসব পর্তুগীজ পদবি, সেগুলি হল - তেসরা, সুত, রথা, লোবো, নুনিস, রোজারিও, এলারি, ডিকোস্টা, পালিয়ন, আইজাক, ডিক্রুস, গোমস, পেরেরা ইত্যাদি। যদিও এখন মিত্র, বিশ্বাস, মল্লিক, পাত্ররাও খ্রিস্টান হচ্ছেন পর্তুগীজ মহিলাদের বিবাহ করে। এই 'রথা' কোনও পর্তুগীজ পদবি নয়। এটি আসলে ROCCHHA বা 'রচা'-র অপভ্রংশ 'রতা' থেকে হয়েছে 'রথা'। তবে পরবর্তীকালে বেশকিছু পর্তুগীজ পদবিধারী মানুষ এখানে এসেছেন। যেমন— গোমস, ডিসুজা ইত্যাদি। মীরপুরে প্রথম যে ১২ জন পর্তুগীজ পদার্পণ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে কেউ এঁরা ছিলেন না। একসময় বিনয় ঘোষ এই গ্রামে এসেছিলেন। তখন এখানে ৪০ - ৫০ টি পরিবারের ২৫০ - ৩০০ জন পর্তুগীজ বসবাস করতো। ১৯৯৬ তে ১৩০ টি পরিবারের খোঁজ মিলেছে। এখন তা বেড়ে অনেক হয়েছে।
 চঞ্চলা মারিয়া রথা

অ্যান্টনি রথার গ্রাম মীরপুর হল পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মহিষাদল থানার বেতকুন্ডু মৌজার (জে.এল. নং ১৬৪) অন্তর্গত। মীরপুরে তাঁর মত আরও যেসব বিদেশিরা বসবাস করেন, তাঁরা সবাই পর্তুগীজ মানুষ। ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোদের দেশের লোক তাঁরা। কিন্তু আজ তাঁরা বাঙালি পর্তুগীজ। রক্তের মধ্যে পর্তুগীজ জাতির ছোঁয়া থাকলেও এখন তাঁরা পুরোদস্তুর বাঙালি। হিন্দু নয়, খ্রিস্টান। কিন্তু হিন্দুদের মতোই অনেক আচার আচরণ। সবাই বলে খ্রিস্টানপাড়া। কেউ বলে ফিরিঙ্গিপাড়া। রূপনারায়ণের পাড়ের এই গ্রাম এখন এক অন্য ইতিহাসের সাক্ষী। পর্তুগীজ জলদস্যু থেকে রূপান্তরের কাহিনি চিত্রায়িত এই গ্রামে। 

মীরপুর গ্রামে ঢোকার মুখেই লেখা আছে গ্রামের ইতিহাস। সেই ইতিহাসে মেলে -- "আজ থেকে বিগত ১৭ শতাব্দীর শুরুতে যখন মোঘল সম্রাট এবং পর্তুগীজ একত্রে বসবাস করতেন তখন এই ঘটনার সূত্রপাত। বহু খ্রিস্টান গোয়া থেকে আসেন এবং হুগলি নদীর তীরে বসবাস করেন। মীরপুরে বহু ক্যাথলিক খ্রিস্টান ভক্ত বসবাস করেন। যার ইতিহাস হল – একসময় মহিষাদলের রাজা বর্গিদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গোয়া থেকে পর্তুগীজদের আনেন এবং জমি জায়গা দিয়ে বসবাস করার সুব্যবস্থা করেন। ১৮৩৮ সালে একজন পুরোহিত আসেন, ১০৮ পরিবারকে তাদের ভাষা সংস্কৃতি প্রভৃতি দেখা শোনা করেছিলেন। ১৫০ বছর আগে বহু পরজাতীয় সম্প্রদায় স্ব-ইচ্ছায় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। খ্রিস্ট প্রচারকগণ বিশ্বাসীদের বিশ্বাস বৃদ্ধির জন্য ধর্মপ্রচার করেন। বর্তমানে যে ক্যাথলিক গির্জাটি আছে তাহা শ্রদ্ধেয় ফা: সি. মিগনন এস.জে., শ্রদ্ধেয় এল. টি. পিকাচি. এস. জে. (কার্ডিনাল) মহোদয়ের সম্পূর্ণ সহযোগিতায় ১৯৭৫ সালে ২০শে এপ্রিল সান্ত্বনাদায়িনী মা মারীয়া গির্জা স্থাপিত হয়। গির্জার প্রবেশ দ্বারের সম্মুখে প্রভু যিশুর ক্রুশ আছে। রবিবার এবং সপ্তাহের অন্যান্য দিনে উপাসনা হয়। ক্যাথলিক ভক্তগণ না মারীয়া এবং অন্যান্য সাধু সাধ্বীদের পর্ব খুবই আনন্দের সঙ্গে পালন করে থাকে। এবং শুভ বড়োদিন ও পুণ্য শুক্রবার খ্রিস্টান ভক্তগণ কীর্তনগানের মধ্য দিয়ে খ্রিস্টকে প্রচার করে থাকে"।

এল.এস.এস ও'ম্যালি তাঁর 'বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার মিডনাপুর'-তে লিখেছেন— "After these thanas most are found in thana Maslandpur (Mahisadal), where there is a curious colony of Christians near Geonkhali. They say that they are descendants of some portuguese artillerymen, whom the Raja of Mahishadal imported to protect his estates from the Maratha raids. Eucept that, they are Christians and that some have Portuguese names, they can not be distinguished from their neighbours, indeed, in the same family one man may have a Portuguese name, such as Pedro and another a Hindu name, such as Gopal."

এখানকার পর্তুগীজরা আজ বিয়ে করছেন বাঙালি মহিলাকে। ফলে তাঁদের দৈহিক অবয়বে পরিবর্তন ঘটছে। একটা মিশ্র গড়ন লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাঁদের দেহের মধ্যে। অ্যান্টনির মধ্যেও রয়েছে। তিনি যাঁকে বিয়ে করেছিলেন, তাঁর নাম চঞ্চলা। 'বাঙালি পর্তুগীজরা' শিরোনামে সাগর চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন 'অ্যান্টনির পূর্বজদের প্রত্যেকেরই বিবাহবন্ধন হিন্দু বাঙালি মেয়ের সঙ্গে। নৃতত্ত্বের দৃষ্টিকোণে উত্তরসুরিদের মধ্যে ক্রমশ প্রাধান্য পেয়েছে বাঙালি আদল। মুছে গেছে পর্তুগীজ অবয়ব। আংশিক নীল চোখ আর সাহেবি উপাধিটুকু বাদ দিলে মীরপুরের পর্তুগীজরা সবাই আজ নিপাট বাঙালি'। 

মীরপুরে পর্তুগীজ কলোনি গড়ে ওঠার নেপথ্য ইতিহাস বেশ চমকপ্রদই। বাংলায় তখন বর্গি হামলা চলছে। লুঠতরাজ, হামলা, খুনোখনি চলছে বিভিন্ন এলাকায়। মারাঠা দস্যুদের আক্রমণে গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে তখন হাহাকার। অনবরত হত্যালীলা বাংলার গ্রাম গ্রামান্তরে। সেসময় বাংলার কোনও জমিদার বা ছোট ছোট রাজাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিলনা এই বর্গি আক্রমণ প্রতিহত করার।
মীরপুর গ্রামের দুই ধরনের গীর্জা

বর্গি আক্রমণে দিশাহারা অবস্থা ছিল মহিষাদলের রাজ পরিবারেও। ৩২৩ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে মহিষাদল রাজ্যের বিস্তৃতি। সেসময় মহিষাদলের রানি ছিলেন জানকী দেবী। ১৭৬৯ সালে অপুত্রক অবস্থায় মারা যান আনন্দলাল উপাধ্যায়। ১৭৭০ সালে তখন মহিষাদলের রাণি হন তাঁর বিধবা স্ত্রী জানকী দেবী। তিনি অত্যন্ত কর্মকুশলী এবং মহীয়সী নারী ছিলেন। ১৮০৪ সালে (১২১১ বঙ্গাব্দ) তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর এই রাজত্বকালে (১৭৭০-১৮০৪ খ্রিস্টাব্দ) তিনি যে কয়টি কাজ করেছিলেন তার মধ্যে অন্যতম বর্গি দমন। তিনিই পর্তুগীজ সৈনিক নিযুক্ত করেছিলেন সেসময়। মীরপুর গ্রামটিতে তাঁদের বসবাসের জন্য এবং কৃষিকাজের জন্য নিষ্কর জমি দান করেছিলেন। অনেকে বলেন, সেসময় নাকি রাণি জানকী নিজেও যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। গড়কমলপুরের একদল বিদ্রোহী সৈন্য দ্বারা আক্রান্ত হলে রাণি জানকী নিজেই নিজের সৈন্যদের সামনে থেকে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেছিলেন। তাড়িয়ে দেন বিদ্রোহী সেনাদের।

সেই রাণি জানকী দেবীই মাথায় প্যাঁচ কষলেন যে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হবে। দস্যুবর্গিদের তাড়াতে দস্যু পর্তুগীজদের এনে। এরকমই ঘটনা ঘটিয়েছিলেন রাজা প্রতাপাদিত্যও। মোঘলদের তাড়াতে তিনি দুর্ধর্ষ পর্তুগীজ জলদস্যু অগাস্টাস পেড্রো, ফ্রেডেরিখ ভুডলি, ফ্রান্সিসকো রড্ডাদের এনেছিলেন। সফলও হয়েছিলেন। রাজা প্রতাপাদিত্যের মতোই মহিষাদলের রাণি জানকী দেবী হাত বাড়ালেন গোয়ার দিকে। সেখানকার পর্তুগীজ সরকারের কাছে আর্জি জানালেন। যদিও এখানে দ্বিমত আছে। অনেকের অভিমত যে রাণি জানকী গোয়াতে নয়, বরং হুগলির ব্যান্ডেলে গির্জা সংলগ্ন পর্তুগীজ ঘাঁটির প্রধানকে আর্জি জানান। কী সেই আর্জি? ঘাঁটি থেকে অবিলম্বে কিছু সমর বিশেষজ্ঞ এবং অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী পর্তুগীজ যুবককে পাঠানো হোক। আমার মতে এই আর্জি জানানোর কাজটি গোয়ার তুলনায় ব্যান্ডেলে করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

অ্যান্টনি রথার কথায়, রাণির আর্জি শুনে গোয়া দমন দিউর পর্তুগীজ সরকার এরপর পাঠিয়েছিল ১৫ জন দুর্ধর্ষ জলদস্যুকে। এদের মধ্যে ১২ জন এসেছিল মহিষাদলে রাণির দরবারে। অ্যান্টনি রথার দাদুর বাবা সিমসেম রথা সেই ১২ জনেরই একজন। 
যীশুকে নিয়েই মীরপুরের অ্যান্টনি রথাদের পর্তুগিজ পাড়া

রাজবাড়ির প্রতিরক্ষায় নিযুক্ত হলেন সিমসেম রথা সহ আরও ১১ জন। তাঁদের সাথে যুক্ত হল শক্তিশালী অস্ত্র। বলাবাহুল্য এঁদের দাপটে বর্গিদস্যুরা ভয় পেয়েছিল। আক্রমণ করার সাহস হয়ে ওঠেনি তাঁদের। রাণি জানকী এরপর খুশি হয়ে ওই ১২ জন পর্তুগীজ জলদস্যুকে মীরপুরে ১০০ বিঘা নিষ্কর জমি দেন বসবাসের জন্য। সেইসময় থেকে মেদিনীপুরের বুকে একটা ভিন্ন দেশের, ভিন্ন সংস্কৃতির, ভিন্ন গড়নের, ভিন্ন আচার আচরণের একটি সম্প্রদায়ের অবস্থান শুরু হল এতদঞ্চলে। সেই ধারাকে পরবর্তীতে টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন এই অ্যান্টনি রথার পরিবার ও অন্যান্যরা। সেই থেকে মীরপুর গ্রামে আজও রয়েছেন ওই পর্তুগীজ বংশধররা। মোটামুটি বলা যায়, ১৭৭০ থেকে ১৮০৪ এর মধ্যে কোনও এক সময়ই এঁরা এখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন।

কিন্তু মহিষাদলের রাণি কেন এঁদের রাজবাড়ি থেকে কয়েক কিমি দূরে থাকার ব্যবস্থা করলেন? নিশ্চয় কোনও দুরভিসন্ধি ছিল। আসলে তখন গেঁওখালি হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর। স্বভাবতই প্রতিরক্ষার বিষয়টি অনুধাবন করেই বন্দর সংলগ্ন গ্রামে তাঁদের ঠাই দেওয়া হয়। এই বন্দর দিয়েই বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্য আসত মহিষাদল রাজার কাছে। তাই সেই বিষয়টি মাথায় এসেছিল রানি জানকী দেবীর।

মীরপুরে দু'ধরনের খ্রিস্টান পর্তুগীজ বসবাস করেন। যাঁরা মাদার মেরীর উপাসনা করেন তাঁরা হলেন রোমান ক্যাথলিক। এঁরা ভ্যাটিকান সিটির পোপের অধীনে চলেন। অন্যটি সি.এন.আই. বা প্রোটেস্ট্যান্ট। দুটি শিবির মিলিয়ে মীরপুরে খ্রিস্টান পর্তুগীজদের সংখ্যা প্রায় ৮০০ জন। যদিও পাশাপাশি হিন্দু পরিবারের মানুষজনও বসবাস করছেন বহাল তবিয়তে। মীরপুরের খ্রিস্টান মহিলারা অনেকেই হিন্দুদের মতোই শাঁখা সিঁদুর পরেন। ২৫ শে ডিসেম্বরের সময় এখানকার লোকজনেরা নতুন জামাকাপড় পরেন। যা বাঙালিরা দুর্গাপূজার সময় পরে থাকেন। বিধবারা রঙিন কাপড় পরেন না। অ্যান্টনি রথারা কোনও বিভেদকে প্রাধান্য দেয়নি। বরং মেদিনীপুরের বুকে থেকে দুই ভিন্ন দেশের ভিন্ন সংস্কৃতিকে মিলিয়ে রূপনারায়ণের পাড়ে একটা ঐতিহ্যবাহী জনসংস্কৃতি টিকিয়ে রেখে চলেছেন বছরের পর বছর।
🍂

Post a Comment

0 Comments