জ্বলদর্চি

চাতকের কান্না/ পর্ব-২/মৌসুমী ভট্টাচার্য্য

চাতকের কান্না 
পর্ব-২
মৌসুমী ভট্টাচার্য্য


স্কুল থেকে ফিরে রনি কিছু খেয়ে চুপচাপ শুয়ে রইল। বিষণ্ণ ভাবটা যাচ্ছে না কিছুতেই। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনা তাকে আপসেট করে ফেলেছে। এক,ক্লাসমেট মৌমিতার হঠাৎ করে ঐ পাঞ্জাবি মনজিতের সাথে ঘনিষ্ঠতা,মাঝে মাঝে দৃষ্টিকটূ ভাবে ঢলানি,….দুই,তার বুজম ফ্রেণ্ড সুপ্রতীকের বাবা সুইসাইড করেছে।সুইসাইডের পেছনের কারণ বড় ভয়ানক ও লজ্জাকর। সুপ্রতীকের মায়ের নাকি অন্য কারো সাথে অ্যাফেয়ার ছিল,এ নিয়ে ওর মা-বাবার মধ্যে অশান্তি হত খুব। সুপ্রতীকের মা এত শপিং করে যে তার বাবার রীতিমত দেনা হয়ে যায়। বাড়িতে অশান্তি,পাওনাদারদের তাগিদ,সব মিলিয়ে ওর বাবা ডিপ্রেশনের রোগী হয়। স্কুলেও বন্ধুরা ফিসফাস করছে,অনেক মুখরোচক কথা বলছে।  “ হিজ মাদার ইজ এ হোর,নো ওয়ান মিঙ্গলস্ উইথ দেম’’,বলল সুচেতা । সুচেতা,সুপ্রতীকের পাড়ায় থাকে। সুপ্রতীকের দিকে তাকানো যাচ্ছে না,সারা মুখে যেন কেউ কালি ঢেলে দিয়েছে! রনি তাকে নিয়ে আলাদা বসে টিফিন খাচ্ছিল,সুপ্রতীককে কি সান্ত্বনা দেবে,বুঝছিল না। “ হোয়াই মি? বলতে পারিস,আমার সাথেই কেন এমন হল? কেন আমার মা এমন হল?” কান্নাভেজা গলায় সুপ্রতীক বলল।“ আয়াম মিসিং মাই ড্যাড। আমিও চলে যাব তার কাছে । ঐ মহিলা থাকুক তার লাইফ নিয়ে। একটা দিনের জন্যে বাবা শান্তি পায় নি। এখন,আয়াম ফিলিং সো আমবারাসড্! সবাই এ নিয়ে কথা বলছে,আমাকে দেখলেই চুপ হয়ে যাচ্ছে।আই নেভার কল হার ‘মম’,নেভার’’। দু চোখ দিয়ে জলের ধারা বইছিল। রনির বুক ফেটে যায় কিন্তু কি করে বন্ধুর দুঃখ দূর করবে! সুপ্রতীকের বাবার  নাকি সেভিংস কিছুই নেই,উল্টো ধারদেনা রয়েছে। সুপ্রতীকের হায়ার স্টাডি অনিশ্চিত।

🍂
 
ছুটির পর স্কুলবাসে  মৌমিতা মনজিতের পাশে বসে এত হিহি করে হাসছিল যে মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। কেন তার রাগ হচ্ছে সেটাও অজানা।নিজের উপরও বিরক্ত হচ্ছে। রাতুল বলল, “ মেয়েরা পয়সা দেখে রে। ঐ মনজিতের বাপের ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা,হেব্বি পয়সা ওদের। আমাদের মত কেরিয়ারের চাপ নেই ওদের’’। 
মনজিতের বাবার ট্রান্সপোর্টের ট্রাক,কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি,পশ্চিমবঙ্গের অন্য জায়গায় যায়। তাছাড়া,বিহার,উড়িষ্যা মায় দিল্লী অব্দি যাতয়াত করে। এ বয়সেই এত পকেট খরচা পায় আর বন্ধুদের দেদার ট্রিট দেয়। ওর সত্যি চাপ নেই পড়াশোনার। রনির তো একটু হিংসেই হয়। কত সহজ জীবন ওদের! আর রনির পড়ার চাপ,কেরিয়ারের চাপ,বাড়িটা সবসময় কোল্ড স্টোরেজ হয়ে আছে। মাকে সবসময়ই টেনশনে থাকতে দেখে,হয় কাজের লোক নয়তো বাবা,নয় চাকরী,কিছু চাপ থাকেই। আর বাবা লোকটাকে সে কোনদিন বুঝতে পারল না। বাড়িতে অতিথির মত থাকে,আর সংসারের কিছুতে থাকে না। সবসময় গোমড়া মুখ,বছরে হাতে গোনা যাবে যে ক দিন হাসিমুখ দেখেছে! মা যে রেগে গেলে ‘এসকেপিস্ট’, ‘ডাবল্ ফেসড’ বলে,খুব ভুল নয়। মা কোন ছুটির দিনে লং ড্রাইভের প্ল্যান করলে,তার বাবা বেরোবে ঠিকই,গোমড়া মুখে,শেষ পর্যন্ত ঝগড়া দিয়ে শেষ হবে,সমস্ত আনন্দ মাটি করে দেবে।‘স্যাডিস্ট’, এ ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় না। অথচ বাবার কোনো বন্ধু বাড়িতে এলে,তখন অন্য মানুষ। হাসি মুখে গল্প করে সবার সাথে।একই ব্যক্তির দুই রকম পরস্পর বিরোধী চেহারা তার মেনে নিতে কষ্ট হয়। অথচ,হাসলে বাবাকে কি কিউট লাগে!

অনীকের মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে,যখন সে শুনল খবরটা। যে প্রজেক্টের কাজে তার বস্টন যাওয়া ঠিক ছিল,সে জায়গায় হায়ার এডুকশন ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর যাবেন। যে কাজের সাথে লোকটার দূর দূর পর্যন্ত সম্পর্ক নেই,শুধু একটু সুপারভাইজিং,তাও না –এর পর্যায়ে,কি করে দিল্লী হেড অফিসে কাঠি করে  বস্টন যাওয়া ম্যানেজ করল!এমনিতে সে স্বল্পভাষী,রাজনীতি করতে পারে না,তবে নোংরা রাজনীতির শিকার হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের এই স্টেট গভঃ প্রজেক্টে সেই প্রজেক্ট ম্যানেজার,সেই কর্ণধার। এত খেটে কাজ করছে,দিল্লীর ন্যাশনাল ইমপ্লিমেনটেশন  অফিস খুশী,বারবার বিদেশ যাবার সুযোগ হয়,কেউ না কেউ বাগড়া দিয়ে বসে!কোটি কোটি টাকা আসছে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক থেকে,একদল সহকর্মীর ইচ্ছে,মিলেমিশে কিছু নয়ছয় করা হোক!অনীকের তাতে তীব্র আপত্তি,না সে নিজে খাবে,না খেতে দেবে। এক বিশাল চক্রান্তের শিকার হচ্ছে সে। মেজাজটা খিঁচড়ে বাড়ি এল। শুধু শুধু ডিনার নিয়ে কথা শোনাল তৃষাকে। অন্যদিন তৃষাও ছেড়ে দেয় না,কিন্তু আজ হয়ত কিছু আন্দাজ করেছে,চুপ করেই রইল। রনি বাবার দিকে করুণ ভাবে তাকায়। অনীক তার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে। শুনতে পায়,রনি ফিসফিস করে তৃষাকে জিজ্ঞেস করছে, “ বাবার আজ কি হয়েছে? আরো মুড অফ্?” 
 “ হবে অফিসে কোনো টেনশন! শেয়ার তো করে না”,তৃষার কথা কানে আসে।ওরা মা ছেলে ডিনার করতে বসে। টুকটাক কথা বলছে,হঠাৎ অনীকের ভীষণ একা লাগে। সে নিজেই দূরত্ব সৃষ্টি করে রেখেছে,কোনো কাজেই সে থাকে না। নিজের চারপাশে যে এক অদৃ্শ্য দেয়াল তুলে রেখেছে,আজ তাতেই নিজেকে বন্দী মনে হচ্ছে।

( চলবে)

Post a Comment

0 Comments