অনুপম পালধি (বিপর্যয় মোকাবিলা প্রশিক্ষক, কবি, খড়গপুর)
ভাস্করব্রত পতি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'অপরিচিতা' গল্পের প্রধান চরিত্র 'অনুপম' ছিলেন একজন শিক্ষিত যুবক। যাঁর মধ্যে সামাজিক প্রথা ও সংস্কারের প্রতি দুর্বলতা ছিল। এই গল্পের আরও কিছু চরিত্র ছিল কল্যাণী, অনুপমের মা এবং মামা। গল্পের মূল বিষয় হলো সামাজিক প্রথা ও সংস্কারের বিরুদ্ধে এক নারীর আত্মমর্যাদার লড়াই। সেই লড়াইতে গল্পের অনুপম ছিলেন নিষ্কৃয় এক চরিত্র। 
সমাজসেবার বিশেষ অবদানের জন্য পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ড. সি ভি আনন্দ বোসের কাছ থেকে পুরষ্কৃত হচ্ছেন
কিন্তু মেদিনীপুরের কবি অনুপম সামাজিক অবক্ষয়, প্রথা, সমাজের দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেননি। যৌতুক, পণপ্রথাকে মননে স্থান দেননি। গল্পের অনুপমের মা ও মামা সমাজের প্রচলিত ধারণা ও সংস্কারের প্রতি অনুগত ও অনুরক্ত ছিল। গল্পের অনুপম কাহিনির নায়িকা কল্যাণীকে পছন্দ করত। কিন্তু তাঁর মামার প্ররোচনা ও সমাজের চাপ অনুভব করে কল্যাণীকে বিয়ে করতে রাজি হয়নি। কিন্তু কবি অনুপম তাঁর পছন্দের কাকলীকে বিয়ে করেছিল সম্পূর্ণ যৌতুকহীন ভাবে। কোনও সামাজিক সংস্কার, ধ্যানধারণা কে প্রশ্রয় দেননি। আর এ কাজে পূর্ণ সমর্থন পেয়েছিলেন নিজের মায়ের কাছে।
'মনে আছে
তুই আর আমি ছুটছিলাম মরুভূমিতে
হাসতে হাসতে চক্কর কাটা দুজনের
পড়ে গিয়ে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠেছিলাম আমি
হাত ধরে তুলেছিলি তুইই আমাকে.... '।
তিনি কবি অনুপম পালধি। । তিনি লেখেন কবিতা। । গড়পড়তা শিক্ষিত বাঙালির মতো তাঁর মননে চিন্তনে সৃজনে প্রস্ফুটিত হয় প্রেম, বিরহ, অভিমান, ভালোবাসা, দ্বন্দ্ব, প্রতিবাদ, খুনসুটি, হাসিকান্না আর নির্মেদ সাহিত্যের লালিত্য...
'হঠাৎ ভোকাট্টা আওয়াজে আলগা হয় লাটাই
কাটাকুটির খেলায় ধরাশায়ী বিজিত অভিমন্যু।
কাটা ঘুড়ি ধরতে গিয়ে দৌড়াই আমিও
গোত্তা খেয়ে আটকায় বদ্ধ আঙিনায়।
বাবা বলে, কাটা ঘুড়ি আকাঙ্খার উচ্চ প্রতীক।
উড়ন্ত ঘুড়ি ভেসে বেড়ায় সৃষ্টির আনন্দে।
কখনও পাখি নতুবা কালিদাসের দূত হয়ে
মুক্তির আনন্দের পাঠশালা চত্বরে'।
কবিতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করতেও ভালোবাসেন। এই দুই চর্চার প্রতি দুর্বলতার কারণে তিনি নিজেকে পরিশীলিত করলেন সাহিত্য জগতের অন্দরমহলে।
পাঁশকুড়ার বন্যায় দুর্গতদের পাশে
১৯৯৬ সালে খড়গপুর রেল প্লাটফর্মে বসে ঠিক করলেন একটি পত্রিকা প্রকাশ করবেন। সেখানে থাকবে কবিতার কারিকুরি আর সাংবাদিকতার বিবরণ। সেসময় সেখানে বসে নতুন সেই পত্রিকার নামকরণ করেছিলেন গল্পকার অনিল ঘড়াই ও কবি মানস কুমার চিনি। যাঁদের দুজনই আজ আর পৃথিবীতে নেই। কবির কথায়...
'এখন
ভেঙে গেছে আড্ডার কথকতার আসর
ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেশের এখানে ওখানে
রাত আর জাগিস না, নিশ্চিন্তে ঘুমা
আমি যে অস্ত্র হাতে সীমান্তের সৈনিক'।
সেদিন অনুপম পালধির সম্পাদনায় জন্ম নেয় সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা 'কবি ও সাংবাদিক'। যা আজও প্রকাশিত হয়ে চলেছে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে। আর ঘটমান জীবনের প্রতিচ্ছবিগুলো উন্মুক্ত হয়ে ওড়ে কবিতার ডানায় ভর করে..
'আবার
সাগরের নোনা জলে আমাদের সূর্যস্নান
ঢেউয়ের ধাক্কায় নুড়ি পাথরে তোর অন্তরীণ
সাহস করে ডুব সাঁতরে উদ্ধারকর্তা নাবিক
আমার স্পর্শে তোর জীবনের পুনর্নির্মাণ।
তারপর
হোটেলের ব্যালকনিতে তারা ছোঁয়ার গল্প
উপচে পড়া গ্লাসে সমূদ্রের সাদা ফেনা
মাঝ রাতের চাঁদ কামড়ায় সেঁকা পাঁপড়
নির্বাক বেলাভূমি ঢেউ গোনে বসন্ত বাহারে'।
১৯৬০ সালের ১৫ ই অক্টোবর পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলের বাড় উত্তর হিংলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। যদিও তাঁর বেড়ে ওঠা রেলশহর খড়গপুরে। বাবা হারা তিন মেয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে মায়ের কি লড়াই। খুব কাছ থেকে দেখেছেন সমাজের বাস্তব রূপ। তাই তার মানসিতায় স্থান পেয়েছিল পেলব রূপ। এহেন মায়ের সন্তান হিসেবে অনুপম পেয়েছিলেন অন্যরকম রসদ। 
বিপর্যয় মোকাবিলার প্রশিক্ষন দিচ্ছেন
খড়গপুরে রেলের বয়েস হাইস্কুলে পড়াশোনা। এরপর মেদিনীপুর কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন। তারপর সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশুনা। অবশেষে চাকরি। আজ তিনি রেলের অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক। কিন্তু অবসরকালীন জীবন হলেও তিনি নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন সামাজিক কাজে। যে কাজ তিনি করেন, তা মেদিনীপুরের বুকে এক অন্যধারার কাজ। 