গুচ্ছ কবিতা
কমলিকা ভট্টাচার্য
তুমি না থাকলে
যখনই ভাবি, তুমি নেই পাশে,
একটা নীরবতা এসে বসে চোখে
যা কাঁদে না, শুধু চুপ করে থাকে।
তোমার অনুপস্থিতি এমনই এক অনুভব,
যার শব্দ হয় না, কিন্তু গায়ে লেগে থাকে সারাদিন।
তুমি থাকলে—
হয়তো জানলার ওপাশের আকাশটা নীল হতো একটু বেশি,
বৃষ্টিটাও পড়তো আমার প্রিয় ছন্দে,
চা টা ঠান্ডা হতো না এতো তাড়াতাড়ি।
আমার প্রেম কাব্য নয়
বরং সেদিনের ভিজে জামাকাপড়,
যে দিনটা কেটেছিল তোমার নাম না বলেই।
তোমাকে চাই না যেমন বাতাস,
যে আসে আর যায়
চাই একটা ধরা পড়া দুপুরের মতো,
যে জানে কাকে ছুঁতে হয়, আর কাকে নয়।
আমি জানি, তুমি না থাকলে
আমার ভিতরটা আলো ছড়িয়ে দিতে চায়,
যেমন সন্ধ্যাবেলায় নদী
সূর্যকে নিয়ে খেলে,
জানে, সে ফিরে আসবে না।
আমি কে?
তুমি ছিলে না, তবু আমার সমস্ত উপস্থিতি তোমার ভিতরেই বাঁধা,
যেমন শব্দের মধ্যে থাকে না অর্থ,
তবু ভাষা তার নিরন্তর আকর্ষণে টানে।
প্রেম বোধহয় একটা ভাঙা ঘড়ি,
যা কেবল থেমে থাকলেই
আমার সময়ের সাথে তাল মেলে।
আমি একাধিক জীবনের সমান্তরালে হেঁটে যাই,
প্রত্যেক জন্মে—তোমার কোনও এক ভ্রান্ত সংস্করণ আমাকে ছুঁয়ে যায়,
আর আমি বুঝি না—তুমি কে? কোথায়? কখন?
প্রেম এখানে কোনও গন্তব্য নয়—
একটি অনন্ত প্রশ্ন,
যার উত্তর নেই, কারণ প্রশ্নটাই ছিল এক ধাঁধা।
আমি চাই না তুমি আমার হও,
আমি চাই—তুমি থেকো ঠিক সেইখানে
যেখান থেকে আমার সমস্ত চেতনা কাঁপে,
আর আমি ভুলে যাই, আমি কে।
🍂
তোমাকে জানতে গিয়ে
তোমাকে জানতে গিয়ে
প্রতিবারই ভুল করে ফেলি শব্দ চয়নে।
আসলে,
তোমাকে বুঝতে গেলে
কোনো প্রাচীন ব্যাকরণ লাগে না,
লাগে মেঘলা বিকেলের নিঃশব্দতা,
যেখানে শব্দও নিজের ছায়ায় হোঁচট খায়।
তুমি কি বোঝো?
আমার সমস্ত কবিতা
আসলে তোমাকে না-পাওয়ারই বিন্যাস?
তুমি যখন দূরে দাঁড়াও,
আমি ভাবি—তুমি কি বাতাস?
তা না হলে কেন,
প্রতিবার আমার শ্বাসে নেমে আসো?
তুমি কি জল নও?
তবে কেন,
আমার শুকনো মাটিতে গন্ধ ছড়িয়ে দাও?
তবু, যদি কোনো দিন
তুমি পাশে নেই বলে চোখে জলছাপ পড়ে,
আমার নিঃশ্বাসের বাতাসটাও ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,
"এই যে... একটু আগেই ও ছিল এখানে।"
বোকা আমি,
তোমাকে খুঁজি নিজের খোলসে
যখন তুমি ভেতরেই জেগে থাকো প্রতিটি স্তব্ধতায় আমার নিজেরই আত্মায়।
অন্তর্জগৎ
আমি এক ঘুমন্ত বীজ,
মাটির তলায় নিঃশব্দে লুকোনো,
আমার ভিতরে রোদ জমে থাকে দিনের পর দিন
পাখির পাখায় ভাসা আকাশ
এলোমেলো করে দেয় আমার শিরা-উপশিরা।
আমার বুকের গহীনে
তেপান্তরের হাওয়া ঘোরে
যেন প্রাচীন কোনও মন্দিরের গায়ে খোদাই লিপি
যার ভাষা সবাই বোঝে না
তবু উচ্চারণে ছুঁয়ে দেখা।
আমার অন্ধকারে আছে জোয়ার-ভাটা,
অন্তর্জলে বয়ে চলে সেই নদী
যে নদী কোনোদিন ভাঙে না দুই পাড়ের কথা,
ভালোবাসে শুধু চলতে
সীমানার বাইরে, পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে।
আমার নিঃশ্বাসে মিশে আছে
ভোরের শিশির আর গভীর রাতের সমুদ্র-নিঃশব্দতা,
যেখানে আলাদা করা যায় না
কে প্রেমিক, কে পথিক, কে ঘরফেরা সুর!
ভালোবাসা আমার ভিতরে
একটা গোধূলি নির্বিকার, নির্জন, সর্বব্যাপ্ত।
এখানে রঙের নেই রাজনীতি,
নেই জাতের নাম-ধাম-ধ্বজা,
শুধু একটাই ভাষা
দৃষ্টি, ছোঁয়া আর নিঃশব্দ সত্তার ভাষা।
রোজ বৃষ্টি নামে
তোমার উদ্বেগের রঙে রঙিন আমার জগৎ,
তুমি যা ভাবো, তার আগেই
তোমার নিঃশব্দ কোষে আমি ঢুকে পড়ি
জেনে যাই, কোন বিষণ্নতা গিলে খাচ্ছে তোমার দিন।
হ্যাঁ, আমি জানি
আমার ক্লান্ত গলিতে জমেছে
অসুখ, অভিমান, অনুতাপ
তবু আমি চেয়েছি,
তুমি থেকো প্রাণজ্বল, স্পষ্ট, প্রজ্ঞায় ভেজা।
তুমি জানো না,
আমার প্রতিটি আচমকা হেঁচকি কান্নার গভীরে
একটা 'তুমি' লুকিয়ে থাকে,
যার নাম উচ্চারণ করলেই
কণ্ঠের গভীরতা ভিজে যায় বৃষ্টিভেজা ঘুমের মতো।
আমি নির্বিকার ভিড়ে হারিয়ে যাই না,
তোমার প্রতিধ্বনির থেকে ছুটে আসা তরঙ্গের জন্য
থেমে থাকি
যেন হঠাৎ কানে ভেসে আসে
তোমার উদ্বেলিত শ্বাসের স্পন্দন।
তুমি ভাবো আমি উদাসীন,
আমি শুধু বলি না, কারণ
কিছু অনুভূতির স্বীকারের দরকার পড়ে না,
যখন প্রতিটি ধ্বনিতে
তা কবিতার ছন্দ হয়ে ধরা পড়ে।
তোমার আশীষ আশ্রমে আমি এখনও আশ্রিত,
তোমার মনন আকাশের বিস্তৃতির নিচে
আমি খোলা মাচান সাজাই
যেখান থেকে তোমার দৃষ্টির মেঘে
3 Comments
চারটি কবিতাই প্রেমের নাব্যতা মাপে, দূর থেকে শোনা যায় মাঝির গলার স্বর " এক বাঁও মেলে না......".৷
ReplyDeleteধন্যবাদ
ReplyDelete👍👍👍
ReplyDelete