জ্বলদর্চি

কাড়ান ছাতুর কিস্যা/ তনুশ্রী ভট্টাচার্য

কাড়ান ছাতুর কিস্যা 

তনুশ্রী ভট্টাচার্য 
 
আশ্বিনা টানের দিনে
কাড়ান  ছাতুর পার্বণী
আইসব্যে জামাই রাইত্যে
দুগ্গা ছাতু দিব উয়ার পাত্যে---

 বাঁকুড়া পুরুলিয়া পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার  জঙ্গলমহল এলাকার একটি জনপ্রিয় খাদ্যবস্তু ছাতু এবং তাকে নিয়েই এই   জনপ্রিয়  ছড়া। না, এ কোনো ছোলার ছাতু নয় । এটি ঐ জেলাগুলোর  ব্যাপক ভারি ঘন জঙ্গলের একটি ফসল । খুব সাময়িক এর উৎপাদন আর বিপণন। স্বল্পস্থায়ী এক ফসল। একান্ত জঙ্গলের। বেলপাহাড়ি ঝাড়গ্রাম কাঁকড়াঝোড় প্রভৃতি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এলাকায় Rainy season  tourism চালু হয়েছে আর এইসব হোমস্টে বা হোটেলের পর্যটকদের কাছে এই ছাতুর বিভিন্ন  মাউথওয়াটারিং ডিশ খুব জনপ্রিয়।


মা আসছেন ধরায়। আমরা কত না সজ্জা করি! কিন্তু দুগ্গামা  নিজে যে  কত কিছুই  গুছিয়ে নিয়ে আসেন আমাদের মত এই অভাগী অভাবী   মানুষের জন্য সেতো আমরা ভেবেই দেখি না। পরমা প্রকৃতি মা নিজেই প্রকৃতিকে ভরিয়ে দেন থরে বিথরে। মাঠ ভরা  ধান, পুকুর ভরা মাছ, বাগান ভরা ফল ,ফুল ---সবই থাকে। কিন্তু এই চিরচেনা ছকের বাইরেও  এই বিপুল ধরণীতে মায়ের কৃপা কখন‌ কোথায় কিভাবে ঝরে পড়ে তার কতটুকুই বা আমরা জানি! জগৎপালিকা মায়ের করুণা থেকে একটি প্রাণীও বঞ্চিত হয় না।

           ললিতা  মুর্মুরাও হয় নি।  দুগ্গাছাতু আর ললিতাদের কথা জঙ্গলমহলের  সবাই জানে।  সবাই মানে বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুরের শাল পিয়ালের বন,   ভাদর আশ্বিনের  ঘন জঙ্গলের ভিজে মাটি  আর কাঠফাটা রোদে সেঁকা  সে ভেজা মাটি থেকে উঠে আসা   ভ্যাপসা গরম।   সেই  ছিটফিটানি গরমকে আঁতুড় ঘর করে  জঙ্গল ভর্তি ফুটে  ওঠে সহস্র  ছাতুর সাদা টুপির ছাতা  আর তার লম্বা  ধূসর ডান্ডায় লেখা থাকে শতশত ললিতার সম্বৎসরের খোরাক জোগানোর গল্প। জীবিকার টানাপোড়েন সঙ্গে  আনন্দ আয়োজন। লালমাটির ঘন সবুজ জঙ্গলের আড়ে আড়ে  ইতিউতি থোকা থোকা সাদা ফুলের মতো  ছাতুর সৌন্দর্য্য  দেখে মেটে  মনের আশ আর চোখের  খিদে আর আর্থিক লাভ দিয়ে মেটে পেটের খিদে। 

না, একে শুদ্ধ ভাষায় ছত্রাক বললে তার মান থাকে
না। এর বৈজ্ঞানিক নাম আছে---Termitomyces heimii . কিন্তু ভাদ্রের প্রথম কাঁচা রোদের নীরব আহ্লাদ মেখে অঙ্কুরিত হয়ে   যে  ফুলটি নিজের সাদা ধবধবে মাথাখানি নিয়ে উঁকি দেয় নতুন কুমারী  মাটিতে  ----তাকে   ছাতু বৈ অন্য কিছু নামে ডাকা যায় না। ডাকতে নেই। তার অভিমান হবে। এমনিতেই সে অভিমানী। কুমারী মৃত্তিকার ভ্রুণ। সঠিকমাত্রায় উষ্ণতা আর বর্ষণ না পেলে হাসিমুখটি তার দেখতে পায় না ললিতাবালা , কুসুমকলি  পানমণিরা।  তাও থাকে তো কেবল মাসখানেক। মা দুগ্গার সঙ্গেই তার ভাব ভালোবাসা। তার আসা যাওয়াকে সম্মান দিয়েই ফোটে সে।

 দুগ্গাছাতু বা কাড়ানছাতু বা পরব ছাতু  এই বাংলার জঙ্গলমহলের---পশ্চিম মেদিনীপুর  ঝাড়গ্রাম বাঁকুড়া বীরভুম পুরুলিয়ার প্রকৃতির  এক বিশেষ দান যা ভাদরের মাঝামাঝি বা আশ্বিনের শুরু থেকে ফুটতে থাকে। কলকাতা নগরী থেকে যোজন যোজন দূরে। জেলাগুলির  শহর থেকেও দূরে।  এদিকে যখন  ঢাকে পড়ে  কাঠি , শুরু হয় শিউলি ঝরা ওদিকে শাল পিয়াল  সেগুন জারুল  মহুয়ার ঘনঅরণ্যে ফুটতে থাকে রাশি রাশি ছাতু। একটি অত্যন্ত উপাদেয় খাদ্যগুণ সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক ফসল। লো কোলেস্টরেল, সুপাচ্য, ভিটামিন প্রোটিন  কার্বোহাইড্রেট ও কিছু খনিজের সুষম মিশেলে এ ছাতু  প্রকৃতির নিজস্ব সৃষ্টি।  কোনো চাষ নেই , সার নেই তদ্বির তদারক নেই ---আপনা হতেই গভীর জঙ্গলে ফোটে এই ছাতু। একটি অর্থকরী ফসল।  শ্রাবণ ভাদ্রের বর্ষায় পাতাপচে  মাটির খাদ্য তৈরী হয় আর তার ওপরে পড়া ভাদ্র- আশ্বিনের  প্রখর সূর্যালোক শুষে যে বিক্রিয়া হয় তারই ফলে এই ছাতুর জন্ম। জঙ্গলের সঙ্গে যাদের জীবন ওতোপ্রতোভাবে জড়িত, যারা জঙ্গলের ব্যাকরণ জানেন তারাই জানেন‌ জঙ্গলের কোথায় কোথায় ছাতু ফোটে।  অরণ্যবাসীদের  ঋতুগত আয়ের একটি জোরালো উৎস এই দুগ্গা ছাতু। ললিতা, কবিতা, সবিতা,  খাঁদুমণি, যাদুমণি, ধনি, বীরানী, ছুটকি,জিতু রামু বীরসা হেদোলের  মতো  কিশোর কিশোরীরা একটু রোদ উঠলেই বনে যায়। ঝুড়ি ভর্তি করে ছাতু তোলে ঠিক দুক্কুরবেলা। সূর্য হেলে পড়লেই ছাতুও নরম হয়ে হেলে পড়ে, সেই টানটান ভাবটা থাকে না। এলিয়ে পড়ে। তখন তুলতে অসুবিধে হয়। মাটি ভেদ করে ওঠে লড়াকু ছাতু। বারো থেকে  আঠেরো ইঞ্চির বেশ শক্ত কান্ড। মাথার ছাতা আকৃতিটি সাদা আর দন্ডটি ধূসর ,মাটির তলা থেকে টেনে তুলতে হয় । বিশেষ একজায়গায় চাপ দিলে প্রায় গোটাটাই উঠে আসে। অভিজ্ঞরা জানেন খুব যত্ন করে সাবধানে তুলতে হয়। নতুবা ছিঁড়ে যায়।সেগুলোর দাম বেশী পাওয়া যায় না। তবে  সবটা উঠে আসে না কিছুটা থেকে যায় শিকড় বা বীজ হিসাবে পরবর্তী প্রস্ফুটনের জন্য। দুপুর বেলা তুলেই হাটে  বা পাশাপাশি এলাকায় বিক্রি করতে চলে যায় ওরা। চলে যায় পনেরো ষোলো কিমি দূরে শহরের বাজারে। না--- রোজের বাজারে তাদের ঠাঁই হয় না। তাদের জন্য কোনো একটা চারমাথার মোড় বরাদ্দ থাকে বা কলেজরোড। মেদিনীপুর শহরে যেমন কলেজ রোড  সেজে ওঠে ছাতুসুন্দরীর আগমনে। নীল পলিথিনের ওপর সারি সারি  সাদা সাদা ফুলফুল ছাতু নিয়ে বসে পড়ে দেহাতি মানুষগুলো। সেই সময়টায় ঐ এলাকার রূপটাই খুলে যায়। ছাতুর  ঢলঢলে সৌন্দর্যের টানেই‌ শহুরে বাবুরা দাঁড়িয়ে পড়ে পলিথিনের সামনে। দরদাম করে তুমুল উৎসাহ নিয়ে। এককথায়  হামলে পড়ে। দুগ্গাছাতুর  হাই ডিম্যান্ড থাকে।মনে রাখতে হবে এগুলো কালচার মাশরুম নয় বা বাটন মাশরুম নয়। দুটোর স্বাদ গন্ধ এক্কেবারে আলাদা । এখানেই  দুগ্গাছাতু টেক্কা দেয় মাশরুমকে। নিজস্ব ঘরাণায়  সৃষ্ট প্রকৃতির ফসল যেন অরণ্যভূমির সন্তান। দুগ্গাছাতু ফোটে ঠিক দুর্গোৎসবের  মাসখানেক আগে থেকে ।  দুপুরবেলা ঘরফেরতা মানুষ  কিনে নিয়ে গিয়ে তোলে হেঁসেলে। একটু  লালমাটি  মাখা থাকে। তবে সেগুলো জলভর্তি গামলায় ঢেলে ভিজিয়ে রাখলেই ছেড়ে যায় মাটি  আপনা থেকে। একেবারে প্রাকৃতিক নিউট্রিশন। দুঘন্টার মধ্যে  স্টক সোল্ড আউট।  নায্য দাম বুঝে নিয়ে শহর থেকে ফিরতি বাসে চলে যায়  সেই দেহাতিমানুষগুলো শহর থেকে প্রয়োজনের  জিনিস সওদা করে। 
🍂

 এর অন্য নাম আড়ানি ছাতু।  জঙ্গলের বিশেষ  একটা জায়গা থাকে যাকে ওরা আড়ানি বলে । উইয়ের ঢিবির কাছাকাছি জায়গাটার নাম আড়ানি।   ওর চারপাশে বেশী পাওয়া যায় তাই ওর নাম আড়ানিছাতু। সেজন্যই  এর বৈজ্ঞানিক নামটিও তেমনই। আবার এই ছাতু তোলা নিয়ে এত কাড়াকাড়ি পড়ে  যায় লোকে বলে কাড়ানি ছাতু।  বাঙালির দুগ্গাপুজোর পরবের সময়েই এর উত্থান বিস্তার ও বিপণন ---তাই এর নাম পরব ছাতু, আর দুগ্গার নামে নাম তো আছেই --- দুগ্গা ছাতু। বেশ উঁচু দামেই এটি  বিক্রি হয়--পাঁচশো থেকে নশো বারোশো টাকা কেজি দামও উঠে যায়।  এর বিভিন্ন সুস্বাদু রেসিপি আছে । পেঁয়াজ রসুন আদা দিয়ে কষা  রান্না বা ঝিঙে কুদরী দিয়ে  তরকারী বা অল্প  পোস্তসরষে দিয়ে বাটিচচ্চড়ি। শুরুতে একটু ভেজে নিতে হয়। বড় আহ্লাদিনী সে পদ  ভোজনরসিককে বলতে চায়--- ---সারা বছরের একঘেয়ে  শহুরে স্বাদের বদল করে  চেখে নাও এই ছাতুর স্বাদ ---দু দিন বৈ ত নয় । কারণ পুজা শেষ হয়ে যাবার পর  ততটা বেশী পরিমাণে আর ফোটে না। তাই আর পাওয়াও যায় না। প্রাকৃতিক আবহাওয়ায় যেইমাত্র বদল আসতে শুরু করে বা হেমন্তের হিম পড়ার আগে পর্যন্তই এর জীবদ্দশা।
তবে ঐ দেড় বা দুমাসে  ছাতু বিক্রি করে  জঙ্গলমহলের মানুষের মুখে হাসি ফোটে। ছাতুর লাভ থেকে বহু মানুষই অর্থিক ভাবে পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে। 

 তবে এত সুখের গল্প কি এতটাই  নিরঙ্কুশ? তাও কি হয়?‌ হয় না। কারণ ঐ ছাতু তুলতে যাওয়ার বিপদ পদে পদে। জঙ্গলের মধ্যে বিষাক্ত সাপের উপদ্রব ত আছেই।  জঙ্গলের গভীরে উইঢিবির পাশে বেশি ছাতু ফোটে আর উইঢিবিগুলোই  সাপের বাসস্থান। এছাড়াও বিষাক্ত পোকা মাকড় ত আছেই। আছে ভয় বিষাক্ত ছাতুরও। 
তবুও ওদের যেতে হয়। সম্বৎসরের যোগাড় ।  ছাতু বিক্রির পয়সা দিয়েই বাড়ি মেরামত  হয়,‌মেয়ের বিয়ে হয় বা ছোটোখাটো  শখ মেটে। 

তাই  লালমাটির দ্যাশে ছাতু কে খুব খুব মানিয়ে যায়। লালপাহাড়ীর দেশের  কিশোরীরা কিশোরদের সঙ্গে খুনসুটি করতে করতে   ঢুকে পড়ে জঙ্গলে। কাঁখে নেয় ঝুড়ি, মাথায় থাকে ঝাঁকা। আঙুলে  আঙুল কি ছোঁয়?  ঝাঁকা  ভর্তি করে জঙ্গল থেকে ওরা  বেরিয়ে আসে উপচে পড়া খিলখিল খুশি নিয়ে। সে খুশি কিসের সবটা নাই বা জানা হোল।  সব জানলে নষ্ট জীবন। 
এ ছাতু টাটকা  রেঁধে ফেলতে হয়। বাসি হলে নষ্ট স্বাদ।

Post a Comment

0 Comments