কবি দিলীপ মহান্তী বিরচিত "মেঘেদের বর্ণপরিচয়" কবিতা গ্রন্থটি সম্পর্কে কিছু কথা
স্বাতী ভৌমিক
কবির কল্পনার রং তুলির বর্ণালেখ্য হুবহুভাবে সবসময় সর্বতোভাবে কবির মতো করে অনুধাবন করা সম্ভব হয় না। আপন অনুভবে অনুভূত কবি কথাকে ব্যাখ্যাপ্রসঙ্গে নিজ ভাবে ব্যক্ত করার ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত কোন ভুল- ত্রুটি উদাত্ত কবি হৃদয়ের কাছে ক্ষমার্হ্য অপরাধ বলে পরিগণিত হবে- এই আশা রেখে শ্রদ্ধেয় কবি দিলীপ মহান্তী বিরচিত "মেঘেদের বর্ণপরিচয়" গ্রন্থটি সম্পর্কে দু' চার কথা ব্যক্ত করার প্রচেষ্টা করছি।
বর্ণপরিচয়ে যেমন নানা বর্ণের সমারোহ থাকে, ঠিক তেমনি কবি দিলীপ মহান্তীর এই গ্রন্থখানিতে যে কবিতাগুচ্ছ লিপিবদ্ধ আছে, তা বিভিন্ন বর্ণের সমারোহে বৈচিত্র্যমন্ডিত। জীবন আকাশে যে মেঘ থাকে তা আকাশের মেঘেদের মতোই বিচিত্র। জীবনের নানা ক্ষেত্র, নানা পরিস্থিতি মনের ওপর নানা ছাপ রেখে যায়। অভিজ্ঞতার নানাবিধ বর্ণের সমারোহে হয় জীবনের বর্ণপরিচয়।
🍂
সমুদ্রের কাছে হয়তো যায় অনেকেই, কিন্তু সমুদ্রের উদার আহ্বানের ডাক সবাই শুনতে পায় না। কবির ভাষায়, "সাগরের বুকে বসে সাগরের ছোঁয়া" পাওয়া, অনির্বচনীয় হৃদয় অনুভব ছাড়া কখনোই সম্ভব হয় না।
কবির কবিতা গ্রন্থটিতে স্থানে স্থানে নানা প্রাকৃতিক স্থানের প্রসঙ্গ এসেছে। প্রকৃতির বিচিত্র অঙ্গনে নানা বৈচিত্র্যের ছোঁয়া কবি মননের বিচিত্র অনুভবে নানাভাবে বিচিত্রিত। তবে প্রকৃতির মুক্ত অঙ্গনে বসে, "পৃথিবীর যাবতীয় জটিলতা দূরে রেখে" প্রকৃতিময় চেতনায় ভাস্বর হওয়া হয়তো একমাত্র অলৌকিক কবি দৃষ্টিতেই সম্ভব।
প্রকৃতির মাঝে বাঁচে জীবকুল। "বসন্তের জাগরণে কোকিলের ভালো থাকা"- কি অপূর্ব কবি অনুভূতি!
প্রকৃতির বিস্তৃত অঙ্গনে কবির সুদীর্ঘ পদচারনায় প্রকৃতির নানা রূপ, নানাস্থান নানাভাবে কবিকল্পনার রং তুলিতে হয়েছে বিচিত্রিত। বুরুডির ড্যাম, আদিবাসী গ্রাম প্রভৃতি স্থানের দৃশ্য রূপের বাইরে অদৃশ্য রূপ আমাদের কাছে প্রকাশিত হয়েছে কবির কবিত্ব গুনে। চেনা প্রকৃতির অচেনা রূপ ধরা পড়েছে কবির দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে।
কবি ঠিকই বলেছেন," জীবন চঞ্চল"। এই চঞ্চল জীবনে মুহূর্তরা আসে- চলে যায়। অনুভবের ছোঁয়ায় জাগতিক জিনিসের অব্যাখ্যাত রূপ তার পরিপূর্ণ প্রকাশ নিয়ে প্রতিভাত হয় মনের নিভৃত কক্ষে। অলৌকিক প্রত্যক্ষের মাধ্যমে কবির ভাষায় "বন্ধ দুচোখেও সৌন্দর্য হয় প্রস্ফুটিত "। যখন কথারা রুগ্ন হয়ে যায়, তখন নীরব ভাষা তার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে। নীরবতার নিবিড়তায় "অতল স্মৃতির" অথৈ জলে ভেসে যায় জীবনের পেরিয়ে আসা মুহূর্তরা। কবির ভাষায়, "মন খারাপের সেই চোখের অঝোরে" ঝরে পড়া মুক্তকণারা শব্দহীন আবেগে মনের কোণ ঘিরে থাকে।
কেউ ঠিক জানেনা, জীবনের "কোন রাস্তা কোথায় গিয়ে থামে!" কবি বর্তমান সভ্যতায় মানবের অমানবিকতার পরিচয় দিতে গিয়ে যথার্থই বলেছেন, " পশুরা অনেক ভদ্র/ মানুষের মতো হিংস্র নয়!" বাস্তবিক, " দিশেহারা দুচোখে বাসার ঠিকানা" খুঁজে ফেরে নীড়নষ্ট পাখি। অজানার স্রোতে ভেসে চলে মানুষের আকুল অনুসন্ধান- পূর্ণতার খোঁজে।
নিজের অস্তিত্বকে নিজ দায়িত্বে টিকিয়ে রাখতে হয়। জীবন যুদ্ধে হতাশ হয়ে যে হারিয়ে যায়, সেই হারানোর ব্যাখ্যা ভাঙ্গা মন ছাড়া বোঝে কে! জীবনের হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তরা মুহূর্তের মাঝে আশ্রয় খোঁজে। জীবন পথের পথিক কবি দিলীপ মহান্তীর ভাষায় "পথিক হাঁটছে সুখে বাঁচার আগ্রহে।" কিন্তু জীবন পথে হাহাকার রবে উত্তাল হয়ে ওঠে জীবনের পটভূমি - হিংসায় উন্মত্ত দৃষ্টিতে মানুষ প্রায়শঃই মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী।কিন্তু কবির ভাষায়, "পোড়া হিংসা শুধু ব্যর্থতাকেই জ্বালে"- এ অত্যন্ত উপলব্ধিলব্ধ বার্তা। হিংসা ব্যর্থতাকে হাতছানি দিয়ে ডেকে আনে। সাফল্য তো নিজের সাথে নিজের নতুন পরিচয়। হিংসা তো ধ্বংস করে।
মানুষমাত্রই ভুল করে। জীবনের পথ অজানা। এই পথে হেঁটে মানুষ জীবনের পাঠ শেখে ধীরে ধীরে। এই ভুলের মাধ্যমেই নতুন সৃষ্টিরা পায় ছাড়পত্র।
জীবনে ঠিক- ভুলের হিসাব একসময় থেমে যায় সময়ের শাসনে। ক্লান্ত জীবন বাঁচতে শিখে যায় বেহিসেবী হয়ে আপন মনে। দর্শক হয়ে জীবনকে জীবনের মত করে দেখতে শেখে ব্যক্তি। বেদনা, আবেগের ব্যর্থতাকে উপলব্ধি করে একসময় হয়ে যায় উড়ো মেঘ। স্মৃতির অতলে তলিয়ে যায় কখনো কখনো কাটিয়ে আসা জীবনের সময়রাশি। কেবল অনুভূতির অনুভবে বেঁচে থাকে সেই সময়ের ইতিকথা।
বাস্তবের কঠোরতা, কোমল মনের কোমল বিচারকে একসময় করে দেয় তারই অনুসারী। কবির ভাষায়, "মুগ্ধতার ভাষাগুলি পথের দু' ধারে ঝরে ঝরে পড়ে/ বিদ্বেষের শব্দরাশি বাতাসে বাতাসে ভাঙে"।সময়ের ইতিহাস ভরা পাতায় আশ্রয় নেয় তা, সময়ের সারণি বেয়ে। নিষ্ঠুরতার বিলাপ, অনুরণনের ক্লান্তিতে একসময় হয়ে যায় শ্রান্ত। "পথ নেই, তবু পথের খোঁজে" কবির কথায় রোদনের ভাষা ভুলে আশা বা নিরাশার ডানায় ভর করে ব্যক্তিকে চলতে হয় জীবনের পথে।
0 Comments