পর্ব ৬
অরিজিৎ লাহিড়ী
দরজাটা খুলে ঢুকে এল মহানির্বাণ মিত্র নামের যুবক, হাসিমুখে। চোখে ঠান্ডা আত্মবিশ্বাস।হাত নেড়ে বলল—‘একটু অপ্রচলিত হলেও আমাদের আতিথেয়তা খারাপ নয়।’
তার সঙ্গে সঙ্গেই ভেতরে ঢুকল দু’জন স্টাফ।ট্রেতে রাখা ধোঁয়া ওঠা নুডুলস আর বড় মগে কড়া কফি। বিনয়ের সঙ্গে দু’জনের সামনে নামিয়ে রাখা হল।
হাজরা হালকা হাসলেন—‘ওয়াও! গুপ্তসংগঠনের এই ফুড সার্ভিসটা দারুণ।’
মহানির্বাণও হাসল—‘খাওয়া-দাওয়া জরুরি, স্যার। বড় বড় ইতিহাস ভুলেও পেট খালি থাকলে কেউ বেশি ভাবতে পারে না।’
ঋতব্রত ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল—‘আপনারা কে? ঠিক কী কাজ আপনারা করেন?’
মহানির্বাণ চোখে স্থির দৃষ্টি রেখে বলল—‘আমরা একটা ব্যালেন্স গ্রুপ।বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কাজ করি।আমরা চাই—পৃথিবী থেকে বিকৃত ইতিহাসের আধিপত্য সরিয়ে একটা ধর্মহীন, বস্তুনিষ্ঠ, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির জগত তৈরি করতে। আমাদের প্রাথমিক অস্ত্র—জ্ঞান, দ্বিতীয় অস্ত্র—প্রযুক্তি। তৃতীয়—নির্মোহ দর্শন।’
হাজরা ভেপের ধোঁয়া ছাড়লেন—‘শব্দগুলো দারুণ। প্র্যাকটিক্যালটা কেমন?’
মহানির্বাণ মৃদু হাসল—‘প্র্যাকটিক্যাল খুব কঠিন। কারণ, মানুষ ইতিহাসে বাঁচে।মানুষ মিথ্যেতে বাঁচে।
আমাদের কাজ সেই মিথ্যের ভিত নাড়া দেওয়া।’
তিনি পকেট থেকে একটা ছোটো চিপ বের করল। টেবলে রাখল সেটা।
—‘এই চিপে আছে—ঋতব্রত গুহ এবং তাঁর “অশোক” সন্দেহের পেছনে থাকা গোপন ইতিহাসের সূত্র।’
মহানির্বাণ মিত্র শান্ত মুখে বসে আছে। ট্রেতে রাখা নুডুলসের ধোঁয়া হালকা উড়ছে। ঋতব্রত কফির কাপ ধরে আছেন। মৃগাঙ্ক হাজরা—চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে, মুখে সেই চেনা ঠোঁট বাঁকানো হাসি।
‘দেখো ভাই মহানির্বাণ,’—হাজরা বললেন ধীর গলায়—
‘গত দু’দিন ধরে যে কাণ্ডকারখানা চলছে, সেটা দেখে আমার একটা জিনিস ক্লিয়ার—দুনিয়াটা সিম্যুলেশন হোক আর রিয়েল—চানাচুরের থেকেও বেশি মিক্সড আপ।’
ঋতব্রত চুপচাপ।হাজরা একটু গম্ভীর হলেন—‘তবে একটা কথা বলি—আমি মোটামুটি বুঝে গেছি তোমাদের মোটিভ, প্রাথমিক এজেন্ডা।কিন্তু দুটো ব্যাপার এখনও পরিষ্কার নয়।প্রথমত—তোমরা ঋতব্রত গুহকেই কেন বেছেছ? পৃথিবীতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর আর ষড়যন্ত্র-তত্ত্বের কিসিমের লোকের কী অভাব আছে?আর দ্বিতীয়ত—অশোকের ন্যারেটিভটা কীভাবে বদলাতে চাও?মানে, বোধিসত্ত্ব স্টাইল নাকি নেটফ্লিক্স সিরিজ স্টাইল?’
ঋতব্রত না চেয়েও হেসে ফেললেন। মহানির্বাণও সামান্য মুচকি হাসলেন।হাজরা ভেপে টান দিয়ে বললেন—‘শোনো, বিশ্বাস বদলাতে হলে গল্প বদলাতে হয়। আর গল্প বদলাতে হলে চরিত্রের বুনট ভাঙতে হয়।
তোমরা কী সেই বুনট ভাঙতে যাচ্ছো? আর এই ছোকরা—ওই কেন?’
মহানির্বাণ এবার আস্তে উঠে দাঁড়াল। জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন—‘ভালো প্রশ্ন, স্যার।উত্তর দেব… তবে খালি পেটে নয়।’
হাজরা হেসে বললেন—‘তবে কফিটা ডার্ক হোক, ঠিক আছে? আর নুডুলস যেন কোরিয়ার মত স্পাইসি না হয়।যাই হোক—ডাইজেস্ট করতে হবে তো!’
মহানির্বাণ মাথা নাড়ল। জানালার বাইরে অন্ধকার ছুটছে। ভিতরে সাসপেন্স ঘন হচ্ছে।
মহানির্বাণ ধীর গলায় বলল—‘আপনারা জানতে চেয়েছেন— কেন আপনাকেই বেছে নেওয়া হয়েছে, প্রফেসর গুহ।কারণটা শুধুই সন্দেহ নয়। সন্দেহ তো অনেকেরই থাকে। কিন্তু প্রমাণসহ সন্দেহ— এটা বিরল।’
সে একটু থেমে চোখে চোখ রাখল ঋতব্রতের।
—‘আপনি কেবল সন্দেহ করেননি। আপনি সেই সন্দেহের গর্তে নেমে, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, লিপি বিশ্লেষণ, স্থানীয় লোককথা, আর পুরাতাত্ত্বিক অসঙ্গতিগুলো খুঁজে তুলে এনেছেন।আপনার গবেষণার এই গভীরতা আমাদের নজরে এসেছে। আর সেই গবেষণার কিছু অংশ—বিশেষ করে অশোক ও পরবর্তী স্তম্ভলিপি—ডার্ক ওয়েবের গোপন ট্র্যাকার ধরতে পেরেছে।’
ডক্টর হাজরা এবার একটু হেসে বললেন—‘মানে, ভাই বেচারা নিজে জানত না, ওর মাথার ভিতর বোমা ফাটাচ্ছেন স্বয়ং অশোক।’
মহানির্বাণ বলল—‘ঠিক তাই, ডক্টর হাজরা। ঋতব্রত বাবু—আপনি জানেন না, কিন্তু আপনার গত দুই বছরের গবেষণা এমন কয়েকটা ফলাফল সামনে এনেছে—যেগুলো আন্তর্জাতিক সিস্টেমের বহু পুরনো স্টোরিহ্যাকারদের পক্ষে হুমকি। বিশেষ করে অশোকের কিংবদন্তী যেটা কালের পর কাল ধরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শক্তিগুলোর ভিত তৈরি করেছে।’
টেবিলে রাখা ছোটো চিপটা দেখিয়ে বলল—‘এটা আপনার গবেষণার সেই অংশগুলোর সংকলন, যেগুলো আপনি নিজে একসাথে দেখেননি কখনও।আমরা সেগুলো বিশ্লেষণ করে বুঝেছি—আপনি অজান্তেই সত্যের খুব কাছাকাছি চলে এসেছেন।’
ঋতব্রত স্তব্ধ। মুখে অসহায় বিস্ময়।
—‘আমি… আমি কি তাহলে…?’
হাজরা ঠোঁটে বাঁকা হাসি এনে বললেন—‘তুমি আসলে ভুল জায়গায় ঠিক সময়ে ঠিক কথাটা ভেবেছো। এটাই তো বিপ্লবের প্রথম ধাপ।’
মহানির্বাণ মৃদু হাসল—‘আমাদের দরকার ছিল এমন একজন—যিনি নিজের গবেষণায় এগিয়ে গিয়ে, নিজের মনের ভিতর সেই অস্বস্তি জমিয়ে তুলেছেন। যিনি কারও নির্দেশে নয়—নিজের ভেতরের সন্দেহ থেকেই গল্পের ছিদ্র খুঁজেছেন। আপনিই সেই মানুষ, প্রফেসর গুহ।’
ঋতব্রত গলার স্বর সামলিয়ে বললেন—‘কিন্তু… আমার গবেষণা তো একেবারে ব্যক্তিগত। আমি তো কোথাও, কাউকে কিছু বলিনি।’
কথাটা শেষ হতে না হতেই মহানির্বাণ মিত্র শান্ত গলায় বললেন—‘ঠিক বলেননি, প্রফেসর। আপনার মুখে নয়, লিক হয়েছে আপনার ছায়া থেকে।’
ঋতব্রত কপালে ভাঁজ, বললেন—‘মানে?’
মহানির্বাণ টেবিলের উপর আঙুল ঠুকঠুক করে বলল—‘মকসুদা হক।আপনার অধীনে পিএইচডি করছে। তার কাজ ছিল— আপনার গবেষণার নির্দিষ্ট কিছু অংশ নিয়ে এগোনো। আসলে সে নো গড নামক সংগঠনের গোপন রিক্রুট। আমাদের বিরোধী গোষ্ঠীর সদস্য। আর তারাই আজ সকাল থেকে আপনাদের হ্যারাস করে চলেছে।’
ঋতব্রত আস্তে ফিসফিস করে বলল—‘না… না… এটা হতে পারে না। মকসুদা তো…’
হাজরা ভেপের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন—‘খেলাটা সাইড থেকে খেলা হয়, ভাই।যতক্ষণ না বোঝো— কে নিজের ছায়া, আর কে শত্রু।’
🍂
ঋতব্রতের যেন দম বন্ধ হয়ে এলো। চোখের সামনে যেন ছায়াছায়া ভেসে উঠল—মকসুদা। শেষ এক বছরে অদ্ভুতভাবে পালটে যাওয়া সেই ছাত্রী। যে আর আগের মতো নিয়মিত আসত না। প্রায়ই হঠাৎ হঠাৎ অজুহাত দিত। মেইল পাঠাত না। ফোন ধরত না।
মহানির্বাণ স্থির গলায় বলল—‘ওদের কাজ— সত্যের বিপরীত গল্পকে ধরে রাখা। মানুষের মস্তিষ্কে ইতিহাসের বিকৃতি বজায় রাখা। তাদের ফাঁদেই পা দিয়েছে আপনার ছাত্রী।’
ঋতব্রতের চোখে স্পষ্ট শক।মনে পড়ে গেল—বার বার গবেষণার গতি কমে যাওয়া…হঠাৎ করে কথা কমিয়ে দেওয়া…আর শেষ কয়েক মাসের সেই শীতল অচেনা আচরণ।
মহানির্বাণ মিত্র ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। চোখদুটো নিবদ্ধ, কিন্তু ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা।
—‘প্রফেসর গুহ,আমাদের এই যুদ্ধটা খুব সরল কিছু নয়।আমরা চাই একটি বিকল্প সিম্যুলেশন তৈরি করতে।
একটা ইতিহাস—যা বিকৃত নয়, বরং প্রমাণের ভিত্তিতে, বস্তুনিষ্ঠতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।’
মহানির্বাণ এক পা এগিয়ে এসে সংযোজন করল—
‘আপনার গবেষণা হতে পারে সেই সিম্যুলেশনের ভিত্তি।
আমরা চাই আপনাকে সাহায্য করতে—
নথি, তথ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্র, প্রযুক্তি— সব রকম সহায়তা দিতে পারি।
কিন্তু…’
তিনি থেমে গেলেন। হাজরা একটু ভ্রু তুললেন—‘কিন্তু?’
মহানির্বাণ গম্ভীর মুখে বলল—‘নো গড। তাদের থামাতে হবে সবার আগে। তারা চাইছে এমন সমস্ত প্রমাণ, সমস্ত রেফারেন্স—প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, শিলালিপি, স্মারক, এমনকি লোককথা—যা তাদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে যায়—সব ধ্বংস করে দিতে।’
তিনি একটা ক্লান্ত কাঁধ ঝাঁকালেন—‘তারা জানে—যদি অশোকের এই বিকল্প গল্পটা ফাঁস হয়, তাহলে শুধু ধর্ম নয়, শক্তি, আধিপত্য, বিশ্বাসের বহু পুরনো স্তম্ভগুলো ধ্বসে পড়বে। তারা সেটা হতে দেবে না।’
ঋতব্রত আর হাজরা নীরবে শুনলেন। কেবিনের বাতাসটা যেন ভারী হয়ে উঠল। কত শতাব্দীর পুরনো মিথ, ভুল ইতিহাসের গন্ধ যেন ভেসে এল অদৃশ্য এক স্রোতে।
মহানির্বাণ এবার নিচু গলায় বললেন—‘আমরা চাই আপনাকে, প্রফেসর।কারণ আপনি কেবল সন্দেহ করেননি—আপনি সেই সন্দেহের যুক্তিসহ প্রমাণের খোঁজ করেছেন।আপনার ভিতরে আছে সেই স্পর্ধা—যা দিয়ে একটি নতুন, সৎ বয়ান তৈরি হতে পারে।অর্থহীন বিশ্বাস নয়—যুক্তি, প্রমাণ, সন্দেহ আর বিবেকের ওপরে দাঁড়ানো সত্য।’
হাজরা ঠোঁটে বাঁকা হাসি এনে বললেন—
‘মানে এই বয়ানটা হবে— প্রমাণ-সহ পোস্ট-ট্রুথ?’
মহানির্বাণ হেসে মাথা নাড়লেন—‘হয়তো।কিন্তু তার আগে আমাদের নো গড-কে প্রতিহত করতে হবে।কারণ তারা কেবল ইতিহাস মুছে দিতে চায় না—আপনার এবং সম্ভবত ডক্টর হাজরার অস্তিত্বও বিলীন করে দিতে পারে।’
ঘরের ভিতর নিঃশব্দে গুমরে ওঠে বাতাস। ঋতব্রত নুডুলসের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ঠান্ডা, বিস্বাদ। কফির ধোঁয়া মিলিয়ে গেছে।কিন্তু প্রশ্ন আর অস্বস্তির উত্তাপ যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল।
ওদিকে কালো এস ইউ ভি-র পাশে দাঁড়িয়ে ভোম্বল দাস, যে ভুবনেশ্বরে নিয়ে এসেছিল ঋতব্রত আর ডক্টর হাজরাকে, তার সারা গা দিয়ে ঘাম ঝরছে।মোবাইলটা হাতে কাঁপছে। ওপাশে— মহারূপ চ্যাটার্জী, নো গডের ভারতীয় শাখার মূল কর্মকর্তা।
কণ্ঠস্বর শুনেই বোঝা যায়— আজ খেলা শেষ।
—‘ভোম্বল… ভোম্বল… ভোম্বল দাস! তুই সত্যিই গাধা। ২৪ ক্যারেটের বিশুদ্ধ গাধা। তোকে কে বলেছিল অতো ভেবেচিন্তে কাজ করতে?তুই কী ভেবেছিলি—ওদের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে ফুচকা খাবি? পিকনিক করবি?ওরা তো শত্রু!শত্রু মানেই শত্রু!’
ভোম্বল হকচকিয়ে বলল—‘দাদা… আমি তো আপনার কথামতোই—’
মহারূপ গর্জে উঠলেন—‘চুপ! চুপ কর!তোকে বলেছিলাম না?ওদের টাইট করতে।হামদর্দি নয়, হুমকি!গবেষক… গবেষক…তোকে কি স্কুলবই পড়তে পাঠিয়েছিলাম?ঋতব্রত গুহ—ও যে কী জানে, তুই জানিস না। অশোকের সেই শিলালিপির কথা—যা আজও কেউ জানে না। ওই একটা পাথর—যেটা ভেঙে দিতে পারে ধর্ম, রাজনীতি, বিশ্বাসের হাজার বছরের ইঁট-কাঠ-পাথর।তুই কি বুঝলি?’
ভোম্বল গলা নামিয়ে বলল—‘বোঝার চেষ্টা করছি, দাদা…’
—‘বোঝার চেষ্টা…?
বোঝার চেষ্টা করে না, ভোম্বল দাস—অমান্য করলে মরতে হয়।নো গড-এর নিয়ম—যারা কথা শোনে না, তারা থাকে না। ওদের— মহানির্বাণ আর ওই পাগলের ডাক্তার হাজরা—ওদের ফালাফালা করে দে।অবিলম্বে।
ঋতব্রত?ওকে চাই— মাথাসুদ্ধ। কিন্তু ডিম্বসুদ্ধ নয়। বুঝলি?’
থ
মহারূপের কন্ঠে ক্রোধ ঝরে ঝরে পড়ছে।
ভোম্বল আর উত্তর দিতে পারল না। মহারূপ শেষবার বললেন—‘ভোম্বল… ভুল করিস না।আমার ধৈর্যেরও সীমা আছে।তুই জানিস, আমি যাত্রা ভালোবাসি—কিন্তু রক্তের দৃশ্যটা সবসময় মাঝখানেই রাখি।’
2 Comments
অসাধারণ। চালিয়ে যান।
ReplyDeletePassive smoker হওয়া থেকে বেঁচে,এবার দারুণ লাগছে পড়তে,চলুক
ReplyDelete