(২৭পর্ব)
চিত্রা ভট্টাচার্য্য
(নজরুলের শ্যামা সঙ্গীতের পরবর্তী অংশ)
বিংশ শতাব্দীর প্রাক্কালে এক নতুন ধারার শাক্ত সঙ্গীত বাংলায় নিয়ে এলেন কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলার একান্ত নিজস্ব ঐতিহ্য শ্যামাসঙ্গীতে নজরুল যে স্বাতন্ত্রতার রূপ দেখিয়েছেন সেখানে মা শ্যামা বা শক্তির আরাধ্যা দেবী মা কালী অপেক্ষা দেশমাতা রূপে প্রধানতঃ মা রূপায়িত হয়েছেন।
ইতিহাসে আছে , কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ মধ্যযুগে কালীমূর্তি তৈরি করেছিলেন। তারপরের চারশো বছরে বাঙালি কর্তৃক মা কালীর উপাসনা ছিল শাক্তধর্ম। বস্তুতঃ এই ' শক্তির উপাসনা' ধর্মসংস্কার আন্দোলন যেন দাবানলের মত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল।
বিদ্রোহী কবি নজরুল তার রচিত গানের মধ্যে শ্যামাসংগীতে এনেছেন প্রত্যক্ষ স্বদেশীয়ানা।'' শ্বেতাঙ্গ শাসকদের বিনাশিনীরূপে অবতীর্ণা মহাকালীর - বীরত্বের কাছে হার মানার প্রতীক হিসেবে বাংলার শোষিত জনগণের বিক্রম সাহস ও আন্দোলনকে নির্দেশ করেছেন।
১৮৬৭ সালে হিন্দুমেলা প্রতিষ্ঠার আগে দেশমাতৃকার বন্দনারূপে তেমন কোনো গানের চিহ্নই বাংলার সংগীত ইতিহাসে পাওয়া যায় না। স্বদেশী গানে দেশকে 'মা', 'মাতা' সম্বোধন করে সেকালে বহুগান রচিত হয়েছিল।নজরুলের দেশমাতৃকার নীরব পূজা শ্যামাসংগীতের রচনার শুরু মূলতঃ সেখান থেকেই।
মায়ের দিগবসনা হওয়ার ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন এক নতুন ভাবে- শ্যামাকে মা কে আত্মসচেতন, নিরহংকারিণী, শুভ-চিন্তার উদ্রেককারিণী, অশুভনাশিনী, আমিত্ববিনাশিনী ইত্যাদি গুণধারিণী হিসাবে বিভিন্ন রূপের বর্ণনা পাই তাঁর শ্যামাসংগীতে ।
“সিন্ধুতে মা’র বিন্দুখানিক, ঠিকরে পড়ে রূপের মাণিক,
বিশ্বেমায়ের রূপ ধরেনা, মা আমার তাই দিগবসন।।”
🍂
নজরুল বাংলাগানের সমৃদ্ধ পটভূমিতে শ্যামাকে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন কালোরূপে কখোনো বিশ্বরূপা রূপে, তাঁর পায়ের তলায় আলোর নাচন দেখিয়েছেন, যে আলোর ঝলকে রুদ্র শিবও পরাস্ত যাঁর হাতে আছে বিশ্বের মরণ-বাঁচন। কখনো তিনি সর্বধর্মে সমন্বয় ঘটান, শ্যামারূপে প্রতিফলিত হয় শ্যামল দেশ, কখনো বা তিনি আসেন সমাজতন্ত্রের রূপকার হয়ে।এর সাথে বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ রূপ জনমানসকে সরাসরি বিপ্লবী ও প্রতিবাদী করে তুলতে সাহায্য করেছিল। তাই তিনি প্রতীক আকারে বেছে নিয়েছিলেন অশুভনাশিনী পরাক্রম শক্তি শ্যামাকে। সর্বোপরি তিনি শ্যামাকে তাঁর অসংখ্য গানে বিভিন্ন রূপ ও চরিত্রে, ভাবে ও প্রেমে সাজিয়েছেন। ।
কালি দিয়ে লিখলি হিসাব কেতাব পুঁথি, শিখলি পড়া,
তোর মাঠে ফসল ফুল ফোটালো কালো মেঘের কালি—ঝরা।
তোর চোখে জ্বলে কালির কালো, তাই জগতে দেখিস আলো
প্রসাদ গুণে সেই আলো তুই হূদ—পদ্মে দেখবি কবে?'
এই গানে 'কালী' শব্দটিকে গুরুত্ব প্রদান করে দেশপ্রেমের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন কবি।
" – 'কালি' শব্দটি বিদ্যার প্রতীক বা শুধুই লেখার উপকরণ কালি নয়, বরং এটি জ্ঞান তথা বিদ্যার আধার , দেবী কালী (শক্তি), এবং জীবন বা জল (জীবিকা)—এই তিনটি ভিন্ন অর্থ বহন করে দেশপ্রেমের গভীরতাকে বোঝায়, যা কলমের কালি, দেবী কালী, এবং জীবনের উপাদান—এই তিন অর্থেই ব্যবহৃত হয়ে গভীর ভাব প্রকাশ করেছে। এখানে বর্ণিত পুঁথি মানে হাতে লেখা প্রাচীন দলিল বা গ্রন্থ, যা কালি-কলম ও মনের সমন্বয়ে লেখা এবং যা জ্ঞান ও ঐতিহ্যের ধারক।
বঙ্গজীবনের কাব্যে সংগীতে সংস্কৃতিতে শাক্তগীতি তে কবি যেমন আপন উজ্জ্বল স্থান স্বমহীমায় প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছেন তেমনি সংগীতের জগতের বৈচিত্র্যময় সঙ্গীতধারার অংশ হিসেবে কীর্তন, ভজন ও কৃষ্ণগীতির রচয়িতা ইত্যাদি বিভিন্ন ধারায় নানা রূপে তাঁর অবিস্মরণীয় প্রকাশ পেয়েছি। তিনি হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী ও রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলাকে তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন, যাতে বৈষ্ণব পদাবলীর ভক্তিভাব ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে লোকজ সুর ও আরবি-ফারসি প্রভাব মিশে গেছে, যা তাঁর 'নজরুল গীতি'র এক বিশেষ দিককে প্রকাশ করে ।
কালীকীর্তন বা শাক্তগীতিতে সন্তানবৎসলা মাতা রূপে নারীশক্তির আরাধনাই শাক্ত-কাব্যের মূল ভাবরস ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। হিন্দুধর্মের একটি শাখাসম্প্রদায় এই শক্তির -অনুসারীরা দিব্য মাতৃকা-শক্তি বা দেবী পরম ও সর্বোচ্চ ঈশ্বর– এই মতবাদের ওপর ভিত্তি করেই শাক্তধর্মের উদ্ভব ও প্রসারতার প্রচার করেছেন যা ছিল শুধুই মুষ্টিমেয় দার্শনিক বা ধর্মপ্রচারকের প্রেরিত সংস্কার নয়, এ ছিল গণসংস্কার। অৰ্থাৎ আদিকাল থেকে প্রচলিত রীতিনীতিকে নতুনভাবে রূপদিয়ে পুনর্গঠন করে রক্ষা করা ।
শাক্ত-কাব্যের মত বৈষ্ণব-সাহিত্যের মূলেও ছিল ভক্তিগীতি। তবে আধুনিক বৈষ্ণব সাহিত্যে ছিল আদিরসের প্রাধান্য। বৈষ্ণব সাহিত্যের মূল উপাদান রাধাকৃষ্ণের প্রেম। ভক্তকে রাধা বা ষোড়শসহস্র গোপিনীদের একজন রূপে কল্পনা করে পরমপুরুষ বা পুরুষোত্তম বিষ্ণুর কাছে নিঃশর্তে আত্মনিবেদনেই বৈষ্ণব কাব্যের সার্থকতা। বিষ্ণুপুরাণ বা হরিবংশের পরবর্তীকালে কৃষ্ণসহচরীরূপে রাধাকে সংগীত-কাব্যে নিয়ে আসেন বাংলার সংস্কৃত-কবি জয়দেব ও মৈথিল-কবি বিদ্যাপতি। তারপর পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে ঘটে চৈতন্যদেবের আবির্ভাব ও সেইসঙ্গে সুরদাস, কবীর, মীরাবাঈ, চণ্ডীদাস প্রমুখ একরাশ সমসাময়িক কবি-প্রতিভা ভারতে ভক্তিযুগের প্লাবন নিয়ে আসে। বেদের কিছু অংশ, শিবপুরাণ ও চণ্ডীর মাধ্যমে যে শক্তিপূজার সূচনা হয়েছিল এককালে তার রেশ স্তিমিত হয়ে থেকে যায় মুষ্টিমেয় তামসিক ও বুদ্ধোত্তরকালীন হীনযানী-বজ্রযানী তান্ত্রিক সাধকদের মধ্যে।
সঙ্গীতের একটি বিশেষ ধারা ভজন এক জাতীয় আরাধনা সঙ্গীত বা ভক্তিগীতি। ঈশ্বর বন্দনাই এ গানের উদ্দেশ্য। নজরুলের গানে এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে ভজন গান।অন্য কোন বাংলা গান রচয়িতা নজরুলের মত এত উৎকৃষ্ট, সমৃদ্ধ এবং বিপুল ভজন রচনা করতে সক্ষম হননি। তাঁর ভজন তথা হিন্দুধর্মীয় সঙ্গীত যেমন বিপুল, তেমনি বিস্ময়কর। এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। সন্তান হারা হৃদয়ের অন্তর্গত বিষাদ ও আধ্যাত্মিকতাচিন্তায় উৎসর্গীকৃত কবি মন ছিল তার চৈতন্যের বাদীস্বর। ভজনগুলো সেই অনুভূতিরই বহিঃপ্রকাশ। নজরুলের গানের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এই ভজন গানগুলো। কিছুকিছু ভজন গানে শিবের আরাধনা ব্যক্ত হয়েছে। কোনটায় আবার কৃষ্ণের কথা। পদাবলী কীর্তনের ঢঙে নজরুল প্রচুর কীর্তন রচনা করেছেন। কিছু গানে ভজন ও কীর্তন দুইয়েরই প্রভাব রয়েছে। যেমন:
''‘হৃদি পদ্মে চরণ রাখো’, ‘বাঁকা ঘনশ্যাম’
হৃদি-পদ্মে চরণ রাখো বাঁকা ঘনশ্যাম
বাঁকা শিখী-পাখা নয়ন বাঁকা বঙ্কিম ঠাম
হৃদি-পদ্মে চরণ রাখো বাঁকা ঘনশ্যাম
বাঁকা শিখী-পাখা নয়ন বাঁকা বঙ্কিম ঠাম
তুমি দাঁড়ায়ো ত্রিভঙ্গে
অধরে মুরলী ধরি দাঁড়ায়ো ত্রিভঙ্গে-''--
কবি গানটি তে ভক্তের হৃদয়কে পবিত্রতার প্রতীক পদ্মফুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে (বাঁকা ঘনশ্যাম) যিনি বাঁকানো ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বাঁশি বাজান এবং ঘোর শ্যাম বর্ণের তাঁকে ভক্তের হৃদয়ে স্থান দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। গানটিতে ভক্তি, প্রেম এবং আত্মসমর্পণের ভাব প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে ভক্ত নিজেকে ঈশ্বরের পায়ের ধুলো বা নূপুরের সঙ্গে তুলনা করে হৃদয়ে তাঁর উপস্থিতি কামনা করেছেন । গানটি পদাবলী কীর্তনের ঢঙে লেখা, যা গভীর আধ্যাত্মিকতার ভাব বহন করে।
‘হে গোবিন্দ রাখো চরণে’,/মোরা তব চরণে শরণাগত আশ্রয় দাও আশ্রিত জনে হে। '' "গানটিতে কবি ঈশ্বরের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও শরণাপন্ন হওয়ার আকুতি জানিয়েছেন, যেখানে তিনি ভক্তের অসহায়ত্ব, দুঃখ-কষ্ট দূর করে শ্রীকৃষ্ণের চরণে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন, যেন তাঁর করুণা ও কৃপা লাভ করে ত্রিবিধ তাপ থেকে ভক্তের মুক্তি মেলে, যেখানে শ্রীকৃষ্ণের চরণ থেকেই গঙ্গা প্রবাহিত, অথচ ভক্ত দুঃখ পায়—এই বৈপরীত্য ফুটিয়ে তুলেছেন। কবি তাঁর দুঃখের কারণ ও সমাধানের জন্য শ্রীহরির করুণা প্রার্থনা করছেন, যেন তিনি সকল তাপ দূর করেন।.
‘গোষ্ঠের রাখাল বলে দেরে কোথায় বৃন্দাবন’ /যেথা রাখাল রাজা গোপাল আমার। খেলে অনুক্ষন। এই গানটিতে ও ভক্তের আকুল প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা, যেখানে সাধারণ রাখাল সেজে ভক্ত ভগবানের বৃন্দাবনের ঠিকানা জানতে চাইছে, যা আসলে অন্তরের সেই পবিত্র স্থান যেখানে শ্রীকৃষ্ণের লীলা হয়; গানটি এই চিরন্তন সত্য তুলে ধরে যে, ভক্তি ও প্রেমই সেই বৃন্দাবনে পৌঁছানোর একমাত্র পথ, যেখানে দিনরাত শ্রীকৃষ্ণের প্রেমময় লীলা চলছে, এবং তাঁর নাম ও পদচিহ্ন সর্বত্র বিদ্যমান।
গানে 'গোঠের রাখাল' ছদ্মবেশে ভক্ত তাঁর আরাধ্য শ্রীকৃষ্ণকে খুঁজছেন, ----
অন্য কোন বাংলা গান রচয়িতা নজরুলের মত এত উৎকৃষ্ট, সমৃদ্ধ এবং বিপুল ভজন রচনা করেন নি। তাঁর ভজন তথা হিন্দুধর্মীয় সঙ্গীত যেমন বিপুল, তেমনি বিস্ময়কর ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে তাঁর রচিত আরো কত বিখ্যাত রাশিরাশি সঙ্গীত ‘ ‘সখি সে হরি কেমন বল,’ ‘খেলছি এ বিশ্বলয়ে,’ ‘অনাদি কাল হতে অনন্ত লোক গাহে তোমারি জয়’, ‘আহার দিবেন তিনি রে মন, ‘জিভ দিয়াছেন যিনি,’ ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’, কোথা তুই খুঁজিস ভগবান’ যে গান আজো প্রাণে সাড়া জাগায়।
কবি নজরুলের ভজন গান আজো শ্রোতার হৃদয়ে গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক প্রভাব ফেলে, যা তাঁর ধর্মীয় সমন্বয়বাদী চেতনার প্রতিফলন। ভক্তি, প্রেম ও মানবতাবাদের গভীর অনুভূতি জাগায়,। ভক্তি দিয়ে সুরের মালা অদৃশ্য ঈশ্বর কে নিবেদন করে রচিত হওয়ায় শ্রোতারা সব একই সূত্রে বাঁধা পড়েন। যা ভক্ত মনের হৃদয়ের গভীরে এক অলৌকিক প্রশান্তি এনে দেয় এবং ধর্মীয় বিভেদ ভুলে ভক্তির একতার সুরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ক্রমশঃ
তথ্য সূত্র :---১)নজরুল জীবনী / করুণা ময় গোস্বামী
২)নজরুল গবেষক ও অনুবাদক / পীযুষ ভট্টাচাৰ্য
৩)নজরুল-চরিতমানস, ডঃ সুশীলকুমার গুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং (২০১৫)।
৪) নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি (২০০৭)।
0 Comments