জ্বলদর্চি

বর্ষ শেষের পরে.../কমলিকা ভট্টাচার্য

বর্ষ শেষের পরে...
কমলিকা ভট্টাচার্য

সময়

সময় কোনো রেখা নয়,
এটা একটি ভুল বোঝা অনুভব।
আমরা তাকে ক্যালেন্ডারে পিন করে দিই,
যেন পালিয়ে না যায়,
দিন, সপ্তাহ, বছর—
সংখ্যার খাঁচায় বন্দি করি
নিজেদেরই শ্বাস।
যাকে কখনো দেখা যায়নি,
সে আমাদের চোখে ঢেলে দেয় স্মৃতি—
কিছু জ্বলন্ত,
কিছু ধুলো হয়ে যাওয়া,
কিছু এখনো নামহীন।
তারপর সে নিজেকে মুহূর্ত বানায়,
আর মুহূর্তকে বানায় শর্ত।
থামা মানে পিছিয়ে পড়া,
থাকা মানে দেরি।
আমরা উৎসব বানাই বিভাজনকে,
নতুনের আলোয়
পুরোনোকে বিদায় দিই—
যেন স্মৃতিরও অবসর লাগে।
কিন্তু সময় নির্বিকার।
সে কাউকে ছাড়ে না,
কাউকে ধরে না।
সে শুধু লিখে যায়—
আমাদের অনুপস্থিতিগুলোকে
ইতিহাসের ভাষায়।
🍂

প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা

আমি আজ বনের ভেতর এসেছি,
পুরোনো প্রেমটা হাতে নিয়ে—
ভাঙা নয়,
শুধু একটু ক্লান্ত।
হে বাতাস!
তুমি তো জানো কিভাবে
শুকনো পাতার গায়ে
আবার শব্দ জাগাতে হয়—
একবার আমার প্রেমটার ভেতর দিয়ে
বয়ে যাও না।
হে রোদ!
তুমি তো প্রতিদিন
একই আকাশে নতুন করে জন্মাও,
আমার এই চেনা মুখটার ওপর
একটু নতুন আলো ফেলো।
নদী!
তুমি জানো কিভাবে
একই জল কখনো থাকে না—
আমাদের স্মৃতিগুলো ভাসিয়ে নাও,
কিন্তু ডুবিয়ে দিও না।
আমি কিছু ভাঙতে চাই না,
আমি শুধু চাই—
যে নামটা একদিন
পাতার শিরায় লিখেছিলাম,
সে নামটা আবার ফুটুক
অন্য কোনো ঋতুতে।
যদি সম্ভব হয়, হে প্রকৃতি!
আমার এই পুরোনো ভালোবাসাটাকে
নতুন করে শেখাও—
কিভাবে হাত ধরতে হয়
অভ্যাস নয়, বিস্ময় নিয়ে।
আমি জানি,
সব নতুনই আলাদা হয়—
তবু যদি পারো,
আমার চেনা মানুষটার চোখে
একদিনের জন্য হলেও
আমাকে অচেনা করে দাও।


আমার ভালোবাসা

সবসময় তুমি ছিলে—
আমাকে ঘিরে ভালোবাসা!
কখনো তোমার অমিত আলোয় স্নান সেরে
খোলা চুলে বারান্দায় দাঁড়িয়েছি আমি,
আমফুলের গন্ধে হালকা নেশা,
ভোরের মন্ত্র উচ্চারণে
নিঃশব্দে নিয়েছি তোমার নাম—
ভালোবাসা।
পথের ধারের বাগানে ফোটা পদ্মে
নিজের পরিচয় আমরণ জেনে
আমি খুশিতে নেচেছি— 
দূরে কোথাও
আমার অনুপস্থিতিও আদরে সযত্নে আছে,
এই ভাবনাটুকুই বড় স্বস্তি দেয়
ভালোবাসা,
আমি বাঁধন মানি না—
তাই তো তোমায় বেঁধে রাখিনি।
তুমি আকাশের বুকে মেঘ হয়ে
নির্ভয়ে ঘুমোও,
আলোর সঙ্গে মন লাগিয়ে
লুটোপুটি খাও।
যেখানে কোনো তালা নেই,
সেখানেই তো রাখি আমি তোমায়, আমার ভালোবাসা ,সেখানে থেকেই
যে আরো গভীরের তল খোঁজা যায়।তুমি তো বঝো ভলোবাসা,
বলো বোঝোনা নাকি ?


নতুন বছরে ...

বছর বদলায়—
কিন্তু ভালোবাসা কোনো ক্যালেন্ডার মানে না।
ডিসেম্বরের ক্লান্ত সন্ধ্যা পেরিয়ে
সে হেঁটে আসে জানুয়ারির আলোয়,
হাত ধরে রাখে ঠিক যেমন সূর্য ধরে রাখে
দিন–রাত্রির অদৃশ্য চক্র।
ভালোবাসা শেষ হয় না,
সে শুধু রং বদলায়—
কখনো কচি পাতার সবুজ,
কখনো শরতের সোনালি নীরবতা।
যেমন নদী জানে না সে পুরোনো,
জল শুধু চলতে জানে।
তুমি যদি নববর্ষ হও—
আমি সেই প্রথম শ্বাস,
যেটা নিয়ে মানুষ বলে—
“আচ্ছা, এবার বাঁচা যাক ভালো করে।”
চুলে রুপোর রেখা নামলেও
হৃদয়ে নামবে না সন্ধ্যা,
কারণ ভালোবাসা কোনো বয়স নয়—
সে তো আজীবনের অভ্যাস,
প্রতিদিন নতুন করে
একই মানুষকে বেছে নেওয়ার সাহস।
এই নতুন বছরে
ভালোবাসা থাকুক সবার ঘরে—
শিশুর হাসিতে,
মায়ের চোখের অপেক্ষায়,
বৃদ্ধের নীরব হাত ধরায়,
আর দু’টি ক্লান্ত মানুষের মাঝখানে
যেখানে শব্দ ফুরিয়ে গেলে
শুধু থাকা-ই যথেষ্ট।
নতুন বছর আসুক—
ভালোবাসা যায় না কোথাও।
সে থাকুক ঠিক যেমন থাকে শ্বাস—
চোখে দেখা যায় না,
কিন্তু ছাড়া যায় না কোনো দিন।
নতুন বছরে ভালোবাসায় থেকো সবাই—
জেনো ,সময় শুধু অজুহাত,
আর ভালোবাসা চিরকালীন কারণ।

Post a Comment

4 Comments

  1. Replies
    1. কমলিকা ভট্টাচার্যDecember 31, 2025

      A small purple heart, yet vast in grace,
      It found my words, their quiet place.
      No louder praise could mean so much—
      Thank you for this tender touch.💜

      Delete
  2. আদ্যন্ত ভালোবাসার কবিতা। কবি ভালোবাসায় সিক্ত অক্ষরে নিজস্ব নিপুনতায় রূপ দিয়েছেন কবিতার।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকা ভট্টাচার্যDecember 31, 2025

      কবির বাস পাঠকের ভলোবাসা সিক্ত মনে।
      Thank you

      Delete