নিউজিল্যান্ডের কিছু সামাজিক প্রথা':
কথাকলি সেনগুপ্ত
গত শনিবারে আমরা সমুদ্রের ওদিকে সামনার অঞ্চলে বেড়াতে গিয়েছিলাম; কাছেই একটি সুন্দর ঘন সবুজে ঘেরা পার্কেতে একটা এদেশীয় বিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছিলো। এখানে সবাই কিন্তু চার্চ এতে গিয়েই যে বিয়ে করে তা নয়। সুদৃশ্য কোনো জায়গা, তা সে পার্ক হোক কী সমুদ্রের ধারে হোক, বিয়ে হতে পারে। আর মিনিট দশেকের মধ্যেই রেজিস্টার আসা শপথ গ্রহণ আংটি ইত্যাদি হয়ে গেল। ব্যস, ঝামেলা সেখানেই শেষ। তারপর খাওয়া দাওয়া - বেশির ভাগই কাছে পিঠের কোনো ক্যাফে তে সেটার ব্যবস্থা করে নেয়। কেক কাটা পান ভোজন উপহার দেয়া আদি সব হৈ চৈ এরকম ভাবেই মিটিয়ে নিয়ে যে যার বাড়ি মুখো হয়ে যায়! আর আমাদের বেলায়? বিয়ের বাজার মানে বিশাল একটা লিস্ট হাতে থাকে তো, আমি বাড়িতে ছোট ছিলাম বলে নির্দ্বিধায় মা, দাদার আর দিদি'র ঘাড়ে সর্ব রকম দায়িত্ব দিয়ে শুধু বিয়ে করে সবাইকে ধন্য করতে প্রায় শেষ মুহূর্তে হাজির হয়েছিলাম; কী কীর্তি আমার!
এই প্রসংগে একটা মজার ব্যাপার বলে নিই। এখানে মানে নিউজিল্যান্ডের সমাজে বাড়ির ছেলে কি মেয়ে, যার ই বিয়ে হোক না কেন, মা বাবার তরফে খরচা-পাতি কিন্তু নগণ্য। যারা দুজনে বিয়ে করতে চলেছে, সেটা তাদের নিজেদের উপার্জিত বা জমানো টাকা দিয়েই করতে হয়! মা বাবা আর দশজন নিমন্ত্রিত অতিথির মতোই আসেন। আর অনুষ্ঠান হয়ে যাবার পর উপহারটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে যান! বিশ্বাস করতে পারেন? আমিও শুরু শুরুতে যখন এসেছিলাম এদেশে, নিজের কানে শুনে আর চোখে দেখেও বুঝে উঠতে পারি নি যে এরকম টা হতে পারে! ধীরে ধীরে দেখতে পেলাম এটাই এদেশে সত্যি। তবে হ্যাঁ, ছেলে মেয়ের একুশ বছরের জন্মদিনটি এরা বেশ বড় করে পালন করেন। আর সেইদিন বড় মাপের পান - ভোজনের সাথে মা বাবা তাদের নতুন মোটরবাইক হোক, গাড়ি হোক, ধনী হলে আলাদা ফ্ল্যাটের চাবি হোক, বড় কোনো উপহার তাদের দিয়ে থাকেন। তবে আমাদের দেশের প্রচলিত প্রথা মতো বিয়েতে কিন্তু নয়।
🍂
যাক যে; এবার আমার এখানকার একটা বিশেষ অভিজ্ঞতার কথা বলি; সেটা হচ্ছে - আমি একটা `বুক লঞ্চ' অনুষ্ঠান এতে গিয়েছিলাম; আর একাই। প্রায় প্রতিদিন যে অভনহেড পার্ক এতে হাঁটতে যাই, সেখানে একজন মহিলার সাথে আমার বিশেষ বন্ধুত্ব হয়েছে; তার নাম হলো জো, জো সল্ট (Jo সল্ট); চেহারা দেখে তো মাওরি নয়, কিউই বলেই মনে হয়। সে দু - দুটো আমাদের সেই পুরানো পোষ্য জিপসি'র চেহারার মিনি dachshund কুকুর নিয়ে আসে হাঁটতে; মাঝে মধ্যে আমাদের দেখা হয়; তার পরে একদিন জানলাম যে সে অফ টাইম এতে পটারি পেইন্টিং করে; আর বাচ্চা দের জন্য গল্পের বই লিখতে ভালোবাসে। তারই বই নিজের 'কুপার' নামের কুকুর টিকে নিয়ে লেখা `কুপার ইন দা ফার্ম' বইটার ফাংশন এতে গিয়েছিলাম। এছাড়া সেদিন তার ষাট-তম জন্মদিন ও ছিল। তাই এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতোন দুটো অনুষ্ঠানই ছিল।
আমাদের বাড়ির থেকে খুব বেশি দূরে নয়, বলতে গেলে গাড়িতে চড়ে এই মিনিট সাতেক গেলে বিরাট একটা পার্ক পড়ে, বার্নসাইড পার্ক। আমাদের এভনহেড এতে যেমন বড় ছোট খেলা যা হয় ফুটবল, ওখানে সেসবের সাথে এদিককার সবচাইতে প্রিয় খেলা রাগবি ও চলে। তাদের ক্লাব হাউস ভাড়া করে হলো; সুন্দর ছোট ছোট টুনি বালব দিয়ে সাজিয়েছিল! চার পাঁচ জন্যে একসাথে করে বসবার অনেক গুলো টেবিল; প্রত্যেক টিতে আবার নানা রঙের হিলিয়াম বেলুন দিয়ে সাজানো।
এদিককার প্রথা অনুযায়ী প্রথম ড্রিঙ্কস এর খরচ আমন্ত্রণ কত্রীর, তার পরের বাকি যে যা পান করবে তা নিজের পয়সাতে। ঢুকবার মুখে ওর আরেক বন্ধু সবাইকে জন্যে নাম টাগ করে জামাতে আটকে দিচ্ছিলেন, যাতে সবাই সবাইয়ের নাম না জিজ্ঞেস করেও জানতে পারে। আমার নামের আগে ডাক্তার / Dr থাকতে যারা পার্ক এতে আমায় নিয়মিত দেখে, তারাও অবাক `আচ্ছা, তুমি `ডক' একজন'? হিঃ হিঃ! যেন মস্ত বিরাট ব্যাপার এটা; কেউ কি হাঁটতে গেলে বুকে পিঠে Dr ঝোলায় নাকি বলুন তো? যা বলছিলাম - জো একটা caterer কে `ফিঙ্গার ফুড সাপ্লাই' করতে বলে রেখেছিলো; তারা দফায় দফায় স্প্রিং রোল, সিঙ্গারা, চিকেন নাগেট, চীজ / টমেটো/ শশা sandwich, আদি নানা রকমের খাবার টেবিল এতে এসে এসে দিয়ে যাচ্ছিলো।
আমি ভিভিয়ান নামের আমার পার্ক এর ই আরেক বয়স্ক হন্টন বন্ধু'র সাথে এক টেবিল এতে বসেছিলাম; তাঁর ও দুটো পোষ্য, একটা ভারি বুড়ো হয়ে গেছে, ষোলো বছরের `শীতজু' সে; যাকে যিনি pram এতে বসিয়ে ঠেলে নিয়ে আসেন; মাঝে মধ্যে একটু ক্ষণের জন্যে নামে, বেচারা ছোট বড় কর্ম সেরেই `এবারে আমায় একটু তুলে নেবে' মতন মুখ করে উনার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে; তাকে আবার বসিয়ে উনার চলা শুরু হয়। আরেকটা হলো `বিশন ফ্রিজে' ফ্রেডি, সে মাত্র দুই বছরের।
আজকে কথা প্রসংগে জানতে পারলাম যে ওই ভিভিয়ান এর একবার ইন্দোনেশিয়া তে চার বছরের জন্য থাকবার সুযোগ হয়েছিল। ইনার হাসব্যান্ড সেখানকার সুলায়েসি নামের একটা জায়গা তে হাইড্রো ইলেকট্রিক পাওয়ার কিভাবে তৈরি করা যায় এ বিষয়ে চার বছরের জন্যে ('85 - '89) ওখানে কোনো প্রজেক্ট এতে গিয়েছিলেন। ইনার তিন সন্তান - এক মেয়ে আর দুই ছেলে, সবাই এখন নিজের নিজের কর্মক্ষেত্রে দূরে থাকে, তখন খুব ছোট ছোট; সবে নিউজিলান্ড থেকে গেছেন, যেখানে ভয়ের কোনো এনিম্যাল পোকা আদি পাওয়া যায় না।
উনাদের থাকবার জায়গা ছিল বেশ নিরালা নির্জন একটা বনের কাছাকাছি; যেমন আর কি ওই রকম প্রজেক্ট তৈরি'র জায়গা হয়ে থাকে। তা একদিন উনি সামনের সমুদ্র' এতে বাচ্চা তিন জন কে সাঁতার দিতে পাঠিয়ে পাড়েতে বসে আছেন; হঠাৎ দেখেন - সামনের বাঁ দিকের ঘন জঙ্গল থেকে একটা সুলায়েসি Ape তথা বনমানুষ বেরিয়ে এসেছে!
এগুলো'র শরীরের ওপরের ভাগ টা খুব ব্যায়াম-বীর এর মতন চওড়া, কিন্তু নিচের দিক খানা ততো ভারী হয় না; উনি তো নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে ছিলেন, একেবারে নড়েন নি। খানিক উনার দিকে তাকিয়ে সেই দলপতি'র মনে হয়েছে যে তাহলে বাকিদের কে ডাকা যেতে পারে; এবারে বনের ভেতর থেকে আরো সাত টা মেয়ে Ape আর তাদের চারটে ছোট বাচ্চা বেরিয়ে এলো; মোট এগারো জনের দল। সবাই প্রথম জনের পেছন পেছন খানিক দূরের আরেকটা ভাগের জঙ্গলেতে গিয়ে ঢুকে পড়লো। উনি আজোও সেই অভিজ্ঞতা ভুলতে পারেন নি। ভাবা যায়? তাঁর বাচ্চারা তখন যথাক্রমে পাঁচ, আট আর দশ বছরের।
তা ভিভিয়ান বলছিলেন যে গত পরশু দিন ই সকালে লন্ডন থেকে উনার বড় ছেলের ফোন পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলেন। ক্রিসমাস এসেছে, প্রায় এক বছর বাদে সে উনাকে ফোন করলো; `নিজের মা কে এক বছরে মাত্র একবার ফোন করেছে' শুনে তো আমার চোখ না জেনেই কপালে উঠে যাবার দাখিল! তা উনি নিজে থেকেই বলছিলেন যে `উনার এই ছেলেটি খুব একটা কমুনিকেটিভ নয়'; সে দেড় ঘন্টা মা'র সাথে গল্প করবার মধ্যে জানিয়েছিল যে ইস্ট ইউরোপীয়ান কান্ট্রি গুলোতে বেড়াতে গেছিলো; নিজে ইয়ট (yacht) ভাড়া করে; ক্রোয়েশিয়া গিয়ে সে নাকি একটা বিচ্ছিরি ইনফেকশন এতে পড়েছিল; দুই মাস হাসপাতাল এতে ভর্তি থেকে কষ্টে সেটা থেকে খানিক সুস্থ হয়েছে; পাছে দূরে থেকে ভিভিয়ান ব্যস্ত হন, দুশ্চিন্তায় পড়েন, তাই না কি সে চেপে বসেছিল; হাইড্রোজেওলোজিস্ট সে প্রফেশন এতে।
তা নানা কথা ফাঁকে ফোকরে যার বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে আসা, সেই জো নিজেও এসে খুব আনন্দ প্রকাশ করলো, ছবি তোলার জন্য বাইরের ফটোগ্রাফার রেখেছিলো; প্রায় ১৪৭ জনা অতিথি সবাইকে একসাথে করে সে তিন চারটে ক্লিক ও করলো। আমি দেড় ঘন্টা মতন থেকে চলে এসেছিলাম; একটা লাইভ ব্যান্ড এর প্রোগ্রাম শুরু হতে যাচ্ছিলো; গান এমনিতে তো আমার ভালোই লাগে, তবে তাদের লোকগুলোর সাজ পোশাক দেখলে তো কার্টুন ক্যারেক্টার বলে ভুল হতে পারে! তাই ভরসা করে থাকতে পারি নি।
তবে যাই হোক, মোটের ওপরে আমার সময় টা খুব ভালো কেটেছে! আমিও এক কপি বই কিনেছি; তাতে জো এর নিজের হাতে করে দেয়া সই ও রয়েছে; এখানে এটাই নাকি নিয়ম, আমার স্বদেশীয় আর অভিজ্ঞ কিছু বন্ধু আগে থেকে আমায় বলে দিয়েছিলো, কেউ 'বুক লঞ্চ' এতে গেলে বই না কিনে আসে না; বেশ মিষ্টি বই আর প্রচুর ছবি দিয়ে করা, আর গল্প টাও কবিতার ছন্দে লেখা! মোটের ওপর আমার সময়টা খুব ই ভালো কেটেছিল।
0 Comments