জ্বলদর্চি

ছোটদের বিশেষ সংখ্যা: ২০৬

ছোটদের বিশেষ সংখ্যা: ২০৬  
সম্পাদক: স্বাগতা পাণ্ডে 
চিত্রগ্রাহক: ডাঃ প্রবোধ পঞ্চাধ্যায়ী

সম্পাদকীয় 

প্রিয় বন্ধুরা, 
সবাই নিশ্চয়ই খুব ভালো আছো? গরমের ছুটি তে বাড়িতে বসে সবাই কে কি করলে বলো? আমি কি করলাম জানো, আমি বাগানে একটা মাটির চওড়া জলভরা টব রেখে দিয়েছিলাম পাখিদের জন্য। রোজ সকালে দেখতাম কতরকমের পাখি আসছে। কেউ কেউ জল খাচ্ছে, তবে দেখলাম বেশিরভাগ পাখি ই স্নান করছে, কি সুন্দর জলের মধ্যে পেট ডুবিয়ে ডুবিয়ে স্নান করছে। কোনো পাখিকে ই আমি মাথা ডুবিয়ে স্নান করতে দেখিনি। কি অদ্ভুত বলোতো! কেউ মাথায় স্নান করে না।রোজ সকাল টা আমার বেশ মজায় কেটেছে জানোতো। রোজ পাখি গুনেছি এক এক দিন তো তিরিশের উপর পাখি এসেছে। যাই হোক, আজ শুধু আমার কথাই বলে গেলাম। তোমরা কিন্তু নিয়মিত তোমাদের লেখা আর আঁকা ছবি আমাকে পাঠিয়ে দিও। তোমাদের পত্রিকা, তোমরা না লেখা বা ছবি পাঠালে হবে কি করে। ভালো থেকো সবাই। বাড়ির সবার প্রতি যত্ন নিও। 
ইতি - তোমাদের স্বাগতাদি।

ভূতের বাড়ি
          
বিমল গুড়িয়া

এই   নিরিবিলি দুপুরে 
          ভূতে পায় খুকুরে 
         কথা কয় নাকি সুরে
              মন তার আচারে!
যেন   সে শাঁখচুন্নীর ছা
         রেলিংয়ে বসে দোলায় 
                আস্তো একটা পা!
  গা-ছম্ ছম্ ছম্ করে
     ওটা   ভূতের বাড়ি রে..
        কেউ যেও না দুপুরে!!
নাম -অনুরাগ দে
শ্রেণী - সপ্তম, গ্রিফিনস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল

পাবলো

প্রতিমা রায় 

পাবলো এমনি শান্ত ছেলে। শুধু  একটু কথা বলতে ভালোবাসে। সেটাকে কি দোষ বলা যায়? 

কিন্তু পাবলোর মা যেখানেই যায় শুনতে হয়-“  পাবলো খুব টকেটিভ। প্রচুর কথা বলে।” সেজন্য মাথার বুদ্ধিসুদ্ধি সব  দিনদিন ড্যামেজ হয়ে যাচ্ছে। এই তো সেদিন স্কুলের হাফ ইয়ারলি রেজাল্ট নিতে গিয়ে পাবলোর মা পাবলোর ক্লাস টিচারের কাছে কতগুলো কথা শুনলো-“  পাবলো ক্লাসে পড়া একদম শোনে না ।  পাশের বন্ধুর সঙ্গে খালি কথা বলে। বকুনি  দিলে একটুক্ষণ চুপচাপ থাকে, পরে আবার ভুলে যায়।“ 

টিউশন স্যারেরও একই অভিযোগ- “ভীষণ বকবক করে পাবলো। এর ফলে আমি কি বলি অর্ধেক শোনে তো অর্ধেক শোনে না।”

ইভেন  ড্রয়িং ক্লাসের স্যারও বলেছেন- “ মন দেয় না একদম- অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে টাইম পাশ করে দেয়।” পাবলোর মার এই নিয়ে মাথা খারাপ – বারবার পাবলোকে মুখ বন্ধ রাখতে বলে কোন কাজ হচ্ছে না, এর তার কাছে এমনকি পাবলোর বাবাকে বলেও ছেলেকে শুধরাতে না পেরে প্রচন্ড রকমের রেগে আছে। শাস্তি স্বরূপ বলেছে- “পাবলো যদি বেশী কথা বলে বা কারোর কাছ থেকে পাবলোর নামে যদি কোন কমপ্লেন আসে তাহলে সে আর মা হবে না। পাবলোকে ভালোবাসবে না, দুঃখে শোকে পাবলোকে ছেড়ে যেদিকে ইচ্ছে চলে যাবে।”

পাবলো পড়েছে মহা ফাঁপরে। ক্লাস থ্রি তে পড়ে। তার ছোট দুটো হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সে দেখে, এ দিয়ে  যে অনেক কিছুই করা যায় না। জামার বোতাম খুলতে পরাতে পারে না। জুতোর লেস বাঁধতে পারে না। ভালো করে ভাত মেখেও খেতে পারে না, বেশির ভাগ দিন মা খাইয়ে দেয়। রাতে ঘুমানোর সময় মা ছাড়া ঘুমোতে পারে না। মাকে জড়িয়ে ঘুমোয় – মা চলে গেলে ,,,তার খুব কান্না পায়। মাকে ছেড়ে সে তো কোনোদিন থাকে না। বাবা তো সারাদিন অফিসে থাকে, মা চলে গেলে সে থাকবে কি করে? দাদাই ঠাম্মা যে সবসময় তাদের কাছে থাকে না। পিসি কাম্মাও তো নেই। না, সে আর কথা বলবে না আজ থেকে। মাকে খুশি করবেই। মনে মনে বলে-“কাল থেকে সে ভালো হয়ে যাবে, মা আর কোন কমপ্লেন পাবে না।” তাছাড়া পাবলোর নিজের তো একটা মান সম্মান আছে নাকি! তবে অবশ্য বাবাকে সব বলতে হবে। বাবা অফিস থেকে ফিরেই আগে পাবলোকে আদর করে, চকলেট নিয়ে আসে। বাবা মায়ের মতো এতো বকুনি দেয় না, অনেকক্ষেত্রে তো সাপোর্টও করে। বাবা তো মাকে বলেওছিলে-  “বাচ্চা একটু আধটু কথা বলবে না! বরং ওদের কথা শোন, ওদের জানাতে উৎসাহ দাও”। বাবাকেই বলবে কথাটা তাহলে- “যে কাল থেকে সে আর কথা বলবে না, একদম মুখ বন্ধ রাখবে।“

যেমন ভাবনা তেমন কাজ। বাবা তাকে এব্যাপারে মতামতও দিয়েছে।

পাবলো আর বেশি কথা বলে না। এই তো সেদিন ড্রয়িং ক্লাসে অঙ্কনের কপিতে তুয়া জল ঢেলে দিয়ে, নিজেই কাঁদতে লাগলো। অঙ্কন বকুনি খেল, তুয়া স্যারকে নালিশ করায়। সবটা পাবলো দেখেছে, তুয়া যে দোষ করেছে, তাও জানে তবু কিছু বলেনি। ইচ্ছে যে করেনি ,তা নয়। মায়ের কথা মনে হতেই চুপ থেকেছে। আগের দিন স্কুলে রিমির কপিতে আঁকিবুঁকি দিয়েছে সায়ন। সায়নের পাশেই পাবলো ছিলো।‌ ম্যাম বারবার জানতে চাইলেন –“ পাবলো কি হয়েছে বলো তো সত্যিটা?” পাবলো ম্যামের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। ম্যাম রেগে গেছেন – “কিছু বলছো না কেন পাবলো?” পাবলো নিজের চোখে সব দেখেও দাঁতে দাঁত চেপে থেকেছে।

 আর আজ সকালেই ঘটনাটা  ঘটেছে- মা, ফোনে গল্প করতে করতে ব্রাশে টুথপেস্টের বদলে নিজের ফ্রেশওয়াশ নিয়ে ব্রাশ করতে গিয়ে ওয়্যাক থু করে। পাবলো ঘটনা ঘটতে দেখেও কিছু বলেনি। তবে একটু হেসেছে। মা রেগে গিয়ে বলে – “তোর মুখ নেই বলতে পারলি না! “

পাবলো একটা কাগজে তখনই লিখে জানিয়েছে মাকে- “সব দেখলেও কিছু করার ছিল না?”

“কেন তোর মুখ দিয়ে কি কথা বেরোয় না?”

“ আজকাল পাবলো মুখ বন্ধ রেখেছে কিনা! 

ওও! যত্তসব। মা রেগে যায়।

পাবলোর বাবা অবশ্য শুনে একচোট খুব হেসেছে। সঙ্গে পাবলোও। তবে  পাবলোর বাবা বুঝিয়েছেন-“সবক্ষেত্রে মুখ বন্ধ রাখতে নেই!”

মাথা নাড়ে পাবলো।

গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ : বাইশ

রতনতনু ঘাটী

দেবক সাহার মেজদি অনুলেখার বিয়ে হয়ে গেল মহা ধুমধাম করে। মধুপুর থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে গিরিডির একটা ছোট্ট শহর ডুমরিতে অনুলেখার শ্বশুরবাড়ি।। একেবারে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের পাশে। অনুলেখাদের জামাই কাজ করেন গিরিডি ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসে। ডুমরি থেকে পরেশনাথ পাহাড়ও বেশি দূর নয়। অনুলেখাদি ইচ্ছে করলে প্রতিদিনই একটা টোটোয় চড়ে পরেশনাথ পাহাড়ে ঘুরে আসতে পারে। এর মধ্যে অনুলেখাদি আর জামাইবাবু অজিতাভর সঙ্গে দেবক একদিন ঘুরেও এসেছে পরেশনাথ পাহাড়ের পাদদেশ থেকে।

   ডুমরিতে হরিনাথ বর্মা নামে একটা ছেলের সঙ্গে এই ক’দিনে দেবকের খুব বন্ধুত্ব হয়েছে। অনুলেখাদির বাড়ির গোটা পাঁচেক বাড়ির পরে হরিনাথদের বাড়ি। সে ক্লাস এইটে পড়ে ডুমরি প্রোগ্রেসিভ পাবলিক স্কুলে। এই ক’ দিনে বলা যায়, হরিনাথ তার দারুণ বন্ধু হয়ে উঠেছে। হরিনাথের সঙ্গে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতে গিয়ে দেবক তার গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচের কথাটা একেবারে ভুলেই গিয়েছিল। এখন সপ্তাহে দু’ দিন করে ক্রিকেট কোচিং হচ্ছে স্কুলে। শনিবার হাফ-ডে স্কুলের পর মাঠে ক্রিকেট কোচিং হওয়ার কথা। আর অন্য কোনও একটা দিন, যেদিন বিকেলে ক্লাস কম থাকে, সেদিন!

   কাল দেবকের বাবা বিবেকবাবু ট্রেনের টিকিট কাটতে বললেন অনুলেখাদিকে। বললেন, ‘অনু, তুমি অজিতাভকে বলো, দেবকের ছুটি তো ফুরিয়ে এল। আর মাত্র তিনদিন। ট্রেনের টিকিট কেটে ফেলতে বলো!’

   অনুলেখা বলল, ‘বাবা , তোমার অজিতাভর অফিসের ছুটি এখনও ক’টা দিন পড়ে আছে। তাই আমাদের সকলকে নিয়ে মধুবানে বেড়াতে নিয়ে যাবে বলে ঠিক করে রেখেছে অজিতাভ। পরেশনাথ পাহাড়ের পাদদেশে ভারী সুন্দর জায়গাটা! আমি অজিতাভর মুখেই শুনেছি। ওখানে কয়েকটা জৈন মন্দির আছে। আর আছে একটা জৈন মিউজিয়াম। ওখান থেকেই নাকি শুরু হয়েছে পরেশনাথ পাহাড়ের ট্রেকিং-রুট। আমরা সকলে মিলে ওখানে একটা রাত থাকব। অজিতাভ বলেছে, তোমরা চাইলে পাহাড়ের একদম চূড়ায় সম্মেদ শিখরজি মন্দিরটাও দেখে আসতে পারো! ধবধবে সাদা দেখতে মন্দিরটা। তোমাদের সঙ্গে-সঙ্গে আমারও মন্দিরটা দেখা হয়ে যাবে!’

   ‘কিন্তু শোনো অনু, দেবকের তো পনেরো দিনের ছুটি নেওয়া হয়েছে হেডস্যারের কাছ থেকে। দেরি করলে উনি রাগ করবেন খুব। তা ছাড়া...’

   ‘তা ছাড়া কী বাবা?’

   ‘ওদের গগনজ্যোতি স্কুলের ক্লাস এইটের ছেলেমেয়েদের নিয়ে এখন চলছে সপ্তাহে দু’ দিন করে ক্রিকেট কোচিং ক্লাস। কামাই হলে দেবক পিছিয়ে পড়বে কোচিংয়ে। আর দু’ মাস পরে স্কুলের অ্যানুয়াল স্পোর্টস চলাকালীন একদিন হবে ফাইনাল ক্রিকেট ম্যাচ। প্র্যাকটিস ভাল না করলে দেবক ফাইনালে তো চান্সই পাবে না? না না অনুলেখা, তুমি জেদ ধোরো না!’

   পাহাড়ের চূড়ায় কখনও ওঠেনি দেবক। তাই পাহাড়ের একদম উপরে উঠতে পারবে বলে আনন্দে লাফিয়ে উঠল দেবক। বিবেকবাবু ক্রিকেট কোচিংয়ের কথা মনে করিয়ে দিলেন। 

   তাঁর কথার উত্তরে দেবক বলল, ‘বাবা, তুমি হেডস্যারকে ফোন করে বলে দাও। উনি ছুটি বাড়িয়ে দেবেন! আমি ফিরে গিয়ে দেবোপমস্যাকে বলে ঠিক ম্যানেজ করে নেব ক্রিকেট কোচিং, তুমি ভেবো না!’

   দেবকের কথা শুনে ওর মা মাধবী বললেন, ‘আবার কবে অনুলেখার বাড়িতে আসতে পারবে দেবক, তার ঠিক কী? আর দু’ বছর পরেই তো মাধ্যমিক পরীক্ষা চলে আসবে? তার চেয়ে দেবকের ছুটিটা হেডস্যারকে বলে বরং বাড়িয়েই নাও!’

   সেইমতো বিকাশবাবু দেবকের ছুটি পাঁচদিন বাড়িয়ে দেওয়ার জন্যে অনুরোধ করে হেডস্যারকে ফোন করলেন। শুনে হেডস্যার বললেন, ‘মেজদির বিয়ের জন্যে কুড়ি দিন ছুটি, বেশি হয়ে গেল নাকি বিবেকবাবু? তার উপর দেবকের ক্রিকেট কোচিংয়েও বেশিদিন কামাই পড়ে যাবে। জানি না, তখন দেবোপম আবার কী বলবে? ঠিক আছে, ছুটি কাটিয়েই ফিরে আসুন!’

   হইহই করে দেবক অনুলেখাদি, অজিতাভ জামাইবাবুর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল পাহাড় বেড়াতে। সঙ্গে বাবা-মা ছিলেন। সকলে একসঙ্গে পরেশনাথ পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দারুণ মজা করল। সঙ্গে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল হরিনাথকেও। দেদার হুল্লোড় আর মজা করে দেবকরা ফিরে এল ডুমরিতে।  

   ওখান থেকে মাধবীর ইচ্ছে হল একবেলার জন্যে অন্তত মধুপুরটা বাপেরবাড়িটা ঘুরে ওখান থেকে ট্রেনে উঠবেন। তাই হল। ট্রেনের টিকিট পাওয়া গেল বুধবার। বৃহস্পতিবার হাওড়া স্টেশন পৌঁছল। শুক্রবার স্কুলে গেল দেবক। বন্ধুরা হইহই করে ওর মুখ থেকে বিয়েবাড়ির গল্প শোনার জন্যে ঘিরে ধরল সকলে। দেবক বন্ধুদের ফলাও করে বলল পাহাড়ের চূড়ার নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে সাদা দেখতে খুব সুন্দর সেই জৈন মন্দিরটার কথা।

   স্কুলের বারান্দায় দেবকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল দেবোপমস্যারের। দেবক জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, কাল আমি ক্রিকেট কোচিংয়ে থাকব তো?’

   দেবোপমস্যারের মুখে একটা চিন্তার ছায়া দুলে উঠল। স্যার বললেন, ‘তুমি পনেরো দিন ছুটি নিয়েছিলে। তার পরও পাঁচদিন ছুটি বাড়িয়ে নিয়েছ। এখন হেডস্যার কী বলেন দ্যাখো! তুমি শুনেছ হয়তো, কোচিংয়ে জয়েন করেছিল তোমার সেকশানের লোকন দাস, তোমার বদলে। সে দুর্দান্ত ব্যাটিং করে সকলকে চমকে দিয়েছে। আমাদের মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতিও ওর খেলা দেখে রাজস্থান রয়্যালসের বৈভব সূর্যবংশীকে দেখতে পেয়েছেন। এমনকী, একদিন কোচিংয়ে লোকনের এক্সট্রা এক ওভার ব্যাটিং দেখতে চাইলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু। তুমি টিফিন ব্রেকে হেডস্যারের সঙ্গে দেখা করে তোমার কথা বলো!’

   ক্লাসে লোকনের সঙ্গে দেখা হল। কথা বলল দেবক, ‘হ্যাঁরে লোকন, তুই নাকি ক্রিকেট কোচিংয়ে দারুণ ব্যাট করেছিস? মনে হয়, আমার ক্রিকেট কোচিংয়ে আসার পথটা বন্ধ হয়ে গেল রে! দেখি হেডস্যারের কাছে যাই। উনি কী বলেন?’

   দেবক টিফিন ব্রেকের জনে অপেক্ষা করছিল। তার আগে দেবোপমস্যার হেডস্যারের কাছে গিয়ে কথা বললেন, ‘স্যার, দেবক দিদির বিয়ে থেকে ফিরে এসেছে। আজ আমাকে জিজ্ঞেস করল, ও কাল শনিবারের ক্রিকেট কোচিংয়ে খেলতে পারবে কিনা। আমি আপনার সঙ্গে দেখা করে কথা বলতে বলেছি।’

   হেডস্যার দেবোপমস্যারের দিকে হাসি-হাসি মুখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমিই তো খেলার ব্যাপারে ডিসিশন মেকার। তুমি দেবকের ব্যাপারে যা বলবে, সেটাই ধার্য হবে। তুমি কী বলো?’

🍂

   ইতঃস্তত করে দেবোপমস্যার বললেন, ‘না স্যার, আপনি যা বলবেন!’

   ‘আমি আর কী বলব? দেবক ছুটির কথামতো ফিরে আসেনি। ওর বাবা ফোন করে ছুটি বাড়িয়ে নিলেন আরও পাঁচদিন। ক্রিকেট কোচিংয়ে বেশ ক’ দিন কামাই তো হয়ে গেল!’ কথাগুলো বলে থামলেন হেডস্যার। তারপর বললেন, ‘তা ছাড়া, লোকন যে দক্ষতার সঙ্গে কোচিংয়ে খেলেছে, আমি তো মুগ্ধ! আমাদের মুকুলকৃষ্ণবাবুও তো লোকনের ব্যাটিংয়ে একেবারে পঞ্চমুখ। আমাকে মুকুলবাবু বলেছেন, ‘দেখবেন নবনীতস্যার, এই লোকন ছেলেটি একদিন বড় ক্রিকেটার হবে। আমি বলে দিচ্ছি! ছেলেটাকে চোখে-চোখে  রাখবেন!’ এখন দেবককে তুমি কনসিডার করে যদি টিমে নিয়ে নাও, তা হলে তুমি একজন ভাবী সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারকে মিস করবে। এভাবেই তো নতুন ক্রিকেটার তৈরি হয় দেবোপম। আমার মনে হয়, লোকনকে টিমে রাখাই ঠিক হবে। তবে দেবককে তুমি এমন ভাবে কথাটা বোলো, ও যেন মনে দুঃখ না পায়, হতাশ না হয়! দেবকের সামনে যেন ক্রিকেট খেলার স্বপ্নটা নিভে না যায়।’

   এমন সময় স্কুলে টিফিন ব্রেকের ঘণ্টা পড়ল। তক্ষুনি ছুটতে ছুটতে এসে হেডস্যারের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে দেবক জিজ্ঞেস করল, ‘মে আই কামিং স্যার?’

   হেডস্যার মুখ তুলে বললেন, ‘ইয়েস, কামিং!’

   রুমে ঢুকল দেবক। হেডস্যারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, কাল থেকে আমি ক্রিকেট কোচিংয়ে যাব তো?’

   হেডস্যার মুখে হাসি এনে বললেন, ‘কোচিংয়ে যাবে না কেন? তবে আর ক’দিন লোকন কেমন খেলে দেখি। তা ছাড়া তুমি তো ছুটি মতো আসোনি দেবক! ছুটি এক্সটেইন করেছেন তোমার বাবা। এখন তোমাকে তো তার মূল্য দিতে হবে। তবে তুমি যে স্কুলের ক্রিকেট টিম থেকে একেবারে বাদ পড়লে, তা নয়। তোমাদের সি-সেকশানের আর কেউ যদি কোনও দরকারে কামাই করে, তখন তুমি সি-সেকশানের টিমে খেলতেই পারবে! মন খারাপ কোরো না! তোমার কথা মনে থাকবে আমার। এখন ক্লাসে যাও!’

   শনিবার দেবোপমস্যার স্কুল শুরুর আগে লোকনকে ডেকে বলে দিলেন, ‘লোকন, তুমি আজ ক্রিকেট কোচিংয়ে এসো!’

   লোকন কাঁচুমাচু মুখে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, দেবক তো ছুটি কাটিয়ে ফিরে এসেছে? হিসেব মতো ওরই তো কোচিংয়ে জয়েন করার কথা?’

   ‘অত বিজ্ঞের মতো কথা বলতে হবে না! মনে রেখো, তোমাকে সেরা ক্রিকেটার হতে হবে আমাদের স্কুলের ফাইনাল ক্রিকেট ম্যাচে। আর, দেবক তো ছুটি থেকে কথামতো ফিরে আসেনি। বেশ ক’দিন কোচিং কামাই করেছে!’

   ‘তা করেছে! কিন্তু ওর দিদির বিয়ে না থাকলে, দেবকই তো কোচিংয়ে ক্রিকেট খেলত। আমার খেলার সুযোগই হত না।’

   ‘তা হোক! তুমি যখন চান্স পেয়েছ, এবার কিছু করে দেখাতেই হবে লোকন! ক্রিকেটে এ ধরনের ঘটনা কম নেই। কিছুদিন আগে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন ভারতীয় ওপেনার অভিষেক শর্মা। তিনি খেলতে পারেননি। তাঁর পেটের অসুখ এবং জ্বর হয়েছিল। অভিষেককে হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত করতে হয়েছিল। তাঁর বদলে প্রথম একাদশে সঞ্জু স্যামসন খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। দেবকের ব্যাপারটা হেডস্যারকে ভাবতে দাও।’

   বাড়ি ফিরে গিয়ে দেখল পারুলমণি উঠোনে রাস্তার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। যে চোখে দেখতে পায় না, সেই দিদি কেন যে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে বন্ধ দু’ চোখ নিয়ে? লোকনের পায়ের শব্দটা পারুলমণি ঠিকই চিনতে পারে। গলা তুলে বলল, ‘ভাই এলি? আমি ভাবছিলাম, তোর দেরি হচ্ছে কেন? হ্যাঁ রে, দেবকের তো আজই স্কুলে আসার কথা? এসেছিল?’

   লোকন ঘরে ঢুকে স্কুলব্যাগটা তাকের উপর রেখে বলল, ‘জানিস দিদি, আমার ব্যাপারটা খুব খারাপ লাগছে রে! দেবক দিদির বিয়েতে পনেরো দিন ছুটি নিয়েছিল। পাঁচদিন ছুটি বাড়িয়ে তারপর ফিরে এসেছে। তাই হেডস্যার ওকে কাল ক্রিকেট কোচিংয়ে আসতে মানা করেছেন!’

   ‘দেবোপমস্যার তোকে কী বললেন?’ চটপট জানতে চাইল পারুলমণি। 

   দেবোপমস্যার বললেন, ‘তুমি একবার যখন চান্স পেয়েছ, এবার কিছু করে দেখাতেই হবে লোকন! কেউ কেউ তো চান্সই পায় না!’

   ‘ঠিকই বলেছেন! আমিও সে কথাই তোকে বলব, তুই সে ক’দিন কোচিংয়ে দারুণ খেলেছিস। অমন করে তোকে খেলতে হবে ফাইনাল পর্যন্ত! আমি বাবাকে বলেছি, তোকে যেন আকাশ থেকে বাবা ভাল ক্রিকেট খেলায় ভরসা দেয়!’

   বাইরে উঠোনে তুলসীতলার দিকে লোকন তাকিয়ে রইল মিনিট খানেক। তারপর পারুলমণিকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা দিদি, তুই আকাশের মেঘে-মেঘে মাকে দেখতে পাস না কখনও?’

   ‘পাব না কেন? সেদিন ক্রিকেট কোচিং থেকে আমরা কাচের জার কিনতে গেলাম না শিমুলতলির বাজারে? সেদিন মা-ই তো বাড়ি থেকে বেরনোর সময় আমাকে ফিসফিস করে বলে দিল, ‘পারুলমণি, লোকনকে ক্রিকেট কোচিং থেকে তুই বাজারে নিয়ে যাবি ভাবছিস। একটু কিছু খাবার নিয়ে যাস। ওর তো খিদে পেয়ে যাবে রে!’

   ‘সত্যি রে দিদি? আকাশে চলে যাওয়ার এতদিন পরে মা এখনও আমার খিদে পায় কিনা বুঝতে পারে?’

   দক্ষিণ দিকের দমকা বাতাসে লোকনের মাথার চুল এলোমেলো হয়ে গেল। এখন কেমন ভ্যাবলা ছেলের মতো দেখাচ্ছিল লোকনকে। 

   লোকন জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কেমন করে অত দূরে থাকা বাবাকে দেখতে পাস বল না রে দিদি? আমি কই বাবাকে তো আকাশে খুঁজে পাই না কখনও?’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল লোকন, ‘তুই আমাকে শিখিয়ে দিবি দিদি? বাবাকে কেমন করে আকাশ পারে খুঁজতে হয় রে?’ 

   ‘সে দেবখন’। এখন বাড়ির ভিতরে আয়, তোকে একটা নতুন জিনিস দেখাই!’

   ঘরের ভিতর ঢুকে লোকন পারুলমণির আঁচলটা জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘কী জানিস রে দিদি?’

   ভাইয়ের হাতে ধরে পারুলমণি প্রথমে খাওয়ার থালার সামনে বসিয়ে দিল। খুব খিদে পেয়েছিস লোকনের। খিদে পেলে লোকন যেমন করে খিদে সহ্য করতে পারে, অমন বুঝি পৃথিবীর কেউ খিদে সহ্য করতে পারে না, মনে-মনে ভাবল লোকন! অনেকক্ষণ খিদে সহ্য করার কোনও কম্পিটিশন থাকলে, লোকন এক কথায় ফার্স্ট হবেই হবে!

(এর পর ২৩ পর্ব)


মামলা নম্বর – ৫/০৬/২০২৬

একটি ব্যঙ্গাত্মক পরিবেশ-নাটক

কমলিকা ভট্টাচার্য

চরিত্র

বিচারক সময়, আদালতের ঘোষক, সরকারি উকিল, বিবাদীপক্ষের উকিল, মানুষ, বটগাছ, পৃথিবী, চড়ুই, নদী, পাহাড়, বন, প্লাস্টিক ব্যাগ, পেঁচা সাংবাদিক, বানর সাংবাদিক, কৃষ্ণচূড়া গাছ, ছোট মেয়ে, বিশুদ্ধ বাতাস, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত, অন্যান্য প্রাণী, গাছপালা ও ছাত্রছাত্রী।


দৃশ্য ১ : রহস্যময় আদালত

(আদালতের সাজ। বিচারক সময় প্রবেশ করেন। হাতে বিশাল ঘড়ি।)

ঘোষক: নীরবতা! নীরবতা! মহাজাগতিক আদালতের বিচারক মহামান্য সময় উপস্থিত!

বিচারক: আজকের মামলাটা কী?

সরকারি উকিল: মহামান্য, আজকের বিবাদী একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমান, শিক্ষিত, প্রযুক্তিবিদ, সভ্য এবং আত্মপ্রশংসায় পারদর্শী ব্যক্তি।

বিচারক: অভিযোগ?

উকিল: অবৈধ দখল, দূষণ, বননিধন, প্রাণহত্যা, জলদূষণ, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভবিষ্যৎ চুরি...

বিচারক: থামুন! এত অভিযোগ এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে?

উকিল: জি মহামান্য।

বিবাদীপক্ষের উকিল: আপত্তি! আমার মক্কেল অত্যন্ত সম্মানিত।

সরকারি উকিল: ঠিকই বলেছেন। এতটাই সম্মানিত যে পৃথিবীর প্রায় সব সমস্যার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে আছে!

বিবাদীপক্ষের উকিল: আমার মক্কেল সভ্যতার শিখরে পৌঁছে গেছে।

সরকারি উকিল: শিখরে পৌঁছে গেছে ঠিকই, কিন্তু শিখরে ওঠার পথে পাহাড়, নদী আর বনকে নিচে ফেলে এসেছে।

মানুষ: আমি উন্নয়ন করেছি!

সরকারি উকিল: উন্নয়ন করেছেন, না পৃথিবীকে সংস্কার করতে গিয়ে ভেঙে ফেলেছেন?

বিচারক: অর্ডার! অর্ডার! আদালতকে টিভি টক-শো বানাবেন না। সাক্ষী ডাকুন।

দৃশ্য ২ : হারানো মানুষ

(একটি বিশাল বটগাছ ধীরে ধীরে মঞ্চে আসে।)

উকিল: আপনার পরিচয়?

বটগাছ: আমি বটবৃক্ষ।বয়স তিনশো বছর। পেশা—ছায়া দেওয়া। অনেক বার মরতে মরতে, মানে ঐ কাটা পড়া থেকে বেঁচেছি।

বিচারক: অভিযোগ?

বটগাছ: আমি থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করতে গিয়েছিলাম।

বিচারক: কে হারিয়েছে?

বটগাছ: মানুষ।

উকিল: মানুষ তো এখানে আছে!

বটগাছ: শরীর আছে। মানুষটা নেই।আগে আমার ছায়ায় বসে গল্প করত। এখন সবাই মাথা নিচু করে হাঁটে।

বিচারক: কেন?

বটগাছ: হাতে একটা ছোট বাক্স থাকে। ওটার ভেতরে নাকি পুরো পৃথিবী থাকে।

বিচারক: কথার সত্যতা,আদালতে মিথ্যা বলা অপরাধ।

বটগাছ: জানি না। তবে ওরা সেই বাক্সে পৃথিবী খুঁজতে খুঁজতে সত্যিকারের পৃথিবীটা হারিয়ে ফেলেছে।

ছয় মাস খোঁজার পর পুলিশ রিপোর্ট দিল—

"মানুষকে পাওয়া গেছে, কিন্তু সে আর প্রকৃতির কাছে থাকে না।ভার্চুয়াল দুনিয়ায় থাকে,খাওয়া পড়া সব সেখানেই,এমন কি বন্ধুত্ব, প্রেমও।"

(সবার হাসি )

বিচারক: অর্ডার! অর্ডার!

দৃশ্য ৩ : পৃথিবীর রিপোর্ট কার্ড

(পৃথিবী শিক্ষিকার বেশে প্রবেশ করে। হাতে রিপোর্ট কার্ড।)

পৃথিবী শিক্ষিকা: আমি আজ বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ করতে এসেছি।

বিচারক: ছাত্রের নাম?

পৃথিবী শিক্ষিকা: মানুষ।

(মানুষ গর্ব করে উঠে দাঁড়ায়।)

পৃথিবী শিক্ষিকা রিপোর্ট পড়েন—

বিজ্ঞান – ১০০

প্রযুক্তি – ১০০

মহাকাশ অভিযান – ১০০

প্রকৃতি রক্ষা – ১২

মানবিকতা – উন্নতির প্রয়োজন

বিচারক: মন্তব্য?

পৃথিবী: ছাত্রটি অত্যন্ত মেধাবী। তবে সে নিজের বসার বেঞ্চটাই কেটে ফেলছে।

মানুষ: মহামান্য, আমি নতুন বেঞ্চ বানিয়ে নেব!

পৃথিবী: কিন্তু বসবে কোথায়?পুরো পাঠশালা যে এখন জঞ্জালের ঢের বানিয়েছ। 

(সবার হাসি)

বিচারক: অর্ডার !অর্ডার!

দৃশ্য ৪ : শেষ চড়ুইয়ের সাক্ষাৎকার

সরকারী উকিল: সাক্ষ্যদের পেশ করার আগে মহামান্য আদালতকে আমি একটি সাক্ষাৎকারের ভিডিও ক্লিপ দেখাতে চাই।

(চড়ুই আসে। পেঁচা ও বানর সাংবাদিক মাইক্রোফোন হাতে প্রবেশ করে।)

পেঁচা: দর্শকবৃন্দ, আমরা এখন লাইভ আছি "নেচার নিউজ ২৪ ঘণ্টা" থেকে।

বানর: আর আমি "গাছতলা টিভি" থেকে বলছি। আজকের ব্রেকিং নিউজ—চড়ুই পাখি এখনও বেঁচে আছে!একমাত্র আমাদের চ্যানেলেই দেখতে পাবেন,তাই দেখতে থাকুন "গাছতলা টিভি"।

চড়ুই: ধন্যবাদ। শুনে আমিও অবাক হলাম।

(ভিডিও শেষ হয়)

বিচারক:  চড়ুই ,আপনার সবচেয়ে বেশি কী মনে পড়ে?

চড়ুই: শিশুদের।

পেঁচা: গাছ নয়?

চড়ুই: গাছের সঙ্গে এখনও কথা বলি। কিন্তু বাচ্চারা এখন মাঠে আসে না।

বিচারক: কোথায় থাকে?

চড়ুই: পর্দার ভেতরে।

বিচারক: ওখানে কী খায়?

চড়ুই: লাইক, কমেন্ট আর ইমোজি!

(সবার হাসি)

বিচারক: অর্ডার! অর্ডার!

বানর: আগে মানুষদের সাক্ষাৎকার নিতাম। এখন সব প্রশ্নের উত্তরে বলে—"গুগলে দেখে নিন।"

পেঁচা: এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, শেষ কবে সূর্যাস্ত দেখেছেন?

বানর: কী বলল?

পেঁচা: বলল—"ইউটিউবে দেখেছি!"

(সবাই হেসে ওঠে)

চড়ুই: আগে বাচ্চারা আমাকে দানা দিত। এখন মোবাইলে আঙুল দিয়ে ভার্চুয়াল পাখি উড়ায়।

বানর: তাই বুঝি আসল পাখিদের চাকরি যাচ্ছে!লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

দৃশ্য ৫ : নদী, পাহাড় ও বনের সাক্ষ্য

নদী: আমার শরীরে প্লাস্টিক আর নোংরা ভরে দিয়েছে। আগে মাছ সাঁতার কাটত। এখন বোতল আর চিপসের প্যাকেট সাঁতার কাটে।

বিচারক:সমস্যা খুলে বলুন ?

নদী: মাছের চেয়ে প্লাস্টিক বেশি ধরা পড়ে।

পাহাড়: আমার বুক কেটে কেটে পাথর নিয়ে গেছে।

বিচারক: ব্যথা পাননি?

পাহাড়: পেয়েছি। কিন্তু ওরা বলেছে—"ডেভেলপমেন্ট"। ব্যথারও নাকি আধুনিক নাম হয়েছে!

বন: আমার সন্তানদের কেটে ফেলেছে।

তারপর প্রতি বছর এসে বলে—

"হ্যাপি এনভায়রনমেন্ট ডে!"

বিচারক: গাছ কেটে পরিবেশ দিবস পালন?

বন: জি। কখনও কখনও ব্যানার বানানোর জন্যও গাছ কাটে।

(সবাই হেসে ওঠে)

বিচারক: অর্ডার! অর্ডার!

বন: কাগজ বানায়, তারপর সেই কাগজে লেখে—

"গাছ বাঁচান।"

বিচারক: পরবর্তী সাক্ষ্যকে হাজির করা হোক 

দৃশ্য ৬ : একটি প্লাস্টিক ব্যাগের প্রেমপত্র

(প্লাস্টিক ব্যাগ নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রবেশ করে।)

প্লাস্টিক: আমি একটি প্রেমপত্র পড়তে চাই।

বিচারক: পড়ুন।

প্লাস্টিক:

প্রিয় মানুষ,

চল্লিশ বছর আগে তুমি আমাকে ফেলে দিয়েছিলে।

আজও আমি তোমার সঙ্গে আছি।

নদীর জলে আছি।

সমুদ্রে আছি।

মাছের পেটে আছি।

তোমার খাবারের মধ্যেও আছি।

এত ভালোবাসা আমি চাইনি।

আমি চলে যেতে চেয়েছিলাম।

তুমিই যেতে দিলে না।

ইতি—

তোমার অবিনশ্বর প্লাস্টিক।

বিচারক: অসাধারণ! এমন একতরফা প্রেম শেষ কবে দেখেছি মনে নেই!

প্লাস্টিক: মহামান্য, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সফল পর্যটক।

বিচারক: কীভাবে?

প্লাস্টিক: আমাকে কোনো ভিসা লাগে না। পৃথিবীর সব জায়গায় ঘুরি।

সরকারী উকিল: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?

প্লাস্টিক: মানুষের পেটে স্থায়ী বাসস্থান।

প্লাস্টিক( একটু থেমে ,গর্ব করে): আমাকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা বছরে পাঁচবার হয়, কিন্তু বাজারে আমি এখনও ভিআইপি!

বিচারক: অর্ডার! আদালতে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করবেন না।

দৃশ্য ৭ : পৃথিবীর জ্বর

(মঞ্চে বড় থার্মোমিটার। পৃথিবী চেয়ারে বসে।)

বিচারক: কী হয়েছে আপনার?

পৃথিবী: জ্বর।

বিচারক: কত?

পৃথিবী: আগে ছিল স্বাভাবিক। এখন বছর বছর বাড়ছে।

মানুষ: একটু গরম তো হবেই!

পৃথিবী: তোমার ঘরে এসি আছে। আমার নেই।

বিচারক: লক্ষণ?

পৃথিবী: হিমবাহ গলছে। সমুদ্র ফুলছে। খরা বাড়ছে। বন্যা বাড়ছে।

(গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত প্রবেশ করে)

গ্রীষ্ম: আগে দু-তিন মাস থাকতাম। এখন ছয় মাস ওভারটাইম করছি।

বর্ষা: কখন আসব, কখন যাব—নিজেই বুঝতে পারি না।

শীত: আমাকে তো অনেকে ভুলেই গেছে।

পেঁচা: জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে মন্তব্য?

শীত: মন্তব্য করতে করতে প্রায় বিলুপ্তির পথে!

(হাসি)

বিচারক: জ্বরের কারণ?

পৃথিবী: গাছ কমেছে। ধোঁয়া বেড়েছে। লোভ বেড়েছে।

বিচারক: ওষুধ?

পৃথিবী: আরও গাছ। কম দূষণ। আর একটু দায়িত্ববোধ।

দৃশ্য ৮ : বিশুদ্ধ বাতাসের মৃত্যু সংবাদ

(ঘোষক কালো পোশাকে।)

ঘোষক: গভীর দুঃখের সঙ্গে জানানো যাচ্ছে—

বিশুদ্ধ বাতাস আর আমাদের মধ্যে নেই।

জন্ম—পৃথিবীর সৃষ্টি লগ্নে।

মৃত্যু—মানুষের অবহেলায়।

শেষ ইচ্ছা-"আমার স্মৃতিতে ফুল নয়, কয়েকটি গাছ লাগিও।"

(সবাই মাথা নত করে)

দৃশ্য ৯ : রায় ঘোষণা

বিবাদীপক্ষের উকিল: মহামান্য, মানুষ ভুল করেছে ঠিকই, কিন্তু সে চাঁদে গেছে।

সরকারি উকিল: ঠিকই। কিন্তু নিজের নদীটাকে বাঁচাতে পারেনি।

বিবাদীপক্ষ: মানুষ প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে।

সরকারি উকিল: আর সেই প্রযুক্তির চার্জার খুঁজতে গিয়ে আধা জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে।

বিচারক: অর্ডার! আদালত চার্জার বিতরণ কেন্দ্র নয়।

বিবাদীপক্ষ: মানুষ স্মার্ট।

সরকারি উকিল: প্রকৃতি ছাড়া এক মিনিটও বাঁচতে পারে না। এত স্মার্ট হলে নিজের অক্সিজেন নিজেই বানাক।

(মানুষ মাথা নিচু করে)

(সবাই চুপ। আদালতে গম্ভীর পরিবেশ।)

বিচারক: মানুষ, তোমার পক্ষে আর কিছু বলার আছে?

মানুষ: আমি পৃথিবীকে ভালোবাসি।

নদী: ভালোবাসো?

বন: তাই বুঝি এই অবস্থা!

(সবাই হেসে ওঠে)

বিচারক: অর্ডার! অর্ডার!

বিচারক: আজকের মামলার নাম—"প্রকৃতি বনাম মানুষ"

মামলা নম্বর ৫/০৬/২০২৬

এতক্ষণে আদালত সব সাক্ষ্যপ্রমাণ শুনেছে। সেই সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত মানুষকে অপরাধী বলে সাব্যস্ত করছে।

তাই দোষী 

বিবাদী মানুষকে এক সপ্তাহ প্রকৃতি ছাড়া থাকার শাস্তি দেওয়া হলো।

মানুষ (হেসে): এইটুকু? খুব সহজ!

(হঠাৎ আলো নিভে যায়)

আলো নেই।জল নেই।অক্সিজেন নেই।খাবার নেই।

মানুষ: বাঁচাও! বাঁচাও! আমি পারছি না!

(আলো ফিরে আসে)

বিচারক: এক মিনিটও পারলে না। এক সপ্তাহ কীভাবে থাকবে?

মানুষ: মহামান্য, আমি আমার ভুল স্বীকার করছি।

বিচারক: এবার কী করবে?

মানুষ: একটা গাছ লাগাব।

বিচারক: তারপর?

মানুষ: তার সঙ্গে সেলফি তুলব।

বিচারক: অর্ডার! গাছ লাগানোই যথেষ্ট। সবকিছুর সঙ্গে সেলফি তুলতে হবে না!

(সবাই একসাথে হেসে ওঠে

সমবেত সমাপ্তি)

(সব চরিত্র সামনে আসে)

বটগাছ, নদী, পাহাড়, বন, চড়ুই ও প্রাণীরা একসঙ্গে বলে—

"পৃথিবী আমাদের সম্পত্তি নয়।"

শিশুরা বলে—

"পৃথিবী আমাদের ভবিষ্যৎ।"

(একটি ছোট মেয়ে হাতে চারা গাছ নিয়ে সামনে আসে)

ছোট মেয়ে: আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস।প্রকৃতির মামলা এখনও চলছে।

বিচারক—সময়।

সাক্ষী—পৃথিবী।

আর বিবাদী...

(সবাই দর্শকদের দিকে তাকায়)

"আমরা সবাই।"

বিচারক সময়:

"আজকের আদালত মুলতবি করা হলো। কিন্তু প্রকৃতির মামলা এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি।"

(এক মুহূর্ত নীরবতা)

সবাই একসঙ্গে—

"প্রকৃতির মামলা এখনও চলছে।রায় লেখার সময় এখনও শেষ হয়নি।"

(সব শিশুরা চারা গাছ উঁচু করে ধরে)

"চল গাছ লাগাই, পৃথিবী বাঁচাই।"

পর্দা নামবে।

ক্যুইজ - ৫ 

১. ভারতের প্রথম মঙ্গলগ্রহ অভিযান কত সালে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয় ? 

২.  কোন লেখকের ছদ্মনাম বনফুল? 

৩. পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত AQI এর পুরো কথাটি কি? 

৪.  ভারতের মোট ক'টি রাজ্য ও ক'টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আছে? 

৫. কল্পনা চাওলা কবে ও কোন মহাকাশ যানে পৃথিবীতে ফেরার পথে মারা যান? 

গত সপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর: 

১. ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সিকিমের পাকিয়ং জেলার ইয়ানটেন গ্রামে।

2. মিশর।

৩. তুঁত গাছের।

৪. রাজস্থান।

৫. জন লোগী বেয়ার্ড ( ১৯২৫ এ স্কটল্যান্ডে আবিষ্কার)

Post a Comment

0 Comments