পর্ব ৭
কমলিকা ভট্টাচার্য
শব্দের আগে
লন্ডনের আকাশটা সেই সপ্তাহে অদ্ভুত ধূসর ছিল।
সূর্য যেন উঠতেও ভুলে গিয়েছিল।
টেমসের উপর কুয়াশা থাকত সারাদিন।
রাস্তার মানুষগুলোও যেন একটু দ্রুত হাঁটছিল, একটু বেশি নীরব।
ঠিক এমন সময় হঠাৎ নাতাশা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল।
প্রথমে সাধারণ জ্বর ভেবেছিল সবাই।
কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই তার অবস্থা খারাপ হতে থাকে।
ঋদ্ধিমান ফোনে খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও আদর বুঝেছিল—কিছু একটা ঠিক নেই।
এক রাতে ভিডিও কলে সে দেখে মা বিছানায় শুয়ে।
মুখটা কেমন ফ্যাকাশে।
তবু তাকে দেখেই হেসে বলল,
“এত চিন্তা করিস না। আমি এখনও মরার প্ল্যান করিনি।”
আদরের বুক হঠাৎ ভারী হয়ে উঠেছিল।
সে জানত—এই মানুষটাই তার জীবনের প্রথম বিজ্ঞান শিক্ষক।
প্রথম বন্ধু।
প্রথম মানুষ, যে তাকে ভয় না পেয়ে বুঝতে চেয়েছিল।
পরদিনই সে কয়েকদিনের জন্য দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়।
🍂
কিন্তু আদর জানত না—এই কয়েকদিনেই অন্য কোথাও তার নাম আবার জেগে উঠছে।
হারগ্রিভের লোকেরা অনেক বছর ধরেই আদরের কোনো খোঁজ পাচ্ছিল না।
ঋদ্ধিমান আর অনির্বাণ খুব সতর্কভাবে তাকে লুকিয়ে রেখেছিল।
কিন্তু পৃথিবীতে সবথেকে বিপজ্জনক জিনিস কখনও কখনও মানুষ নিজে নয়—তার কাজ।
লিয়ামের আর্টিফিশিয়াল লেগ প্রজেক্ট-এর পর ইউনিভার্সিটির ভিতরে অদ্ভুত আলোড়ন পড়ে যায়।
যদিও অফিসিয়াল পেপার-এ আদরের নাম ছিল না, তবু রিসার্চ ল্যাব-এর নেটওয়ার্ক-এ তার অ্যাক্সেস লগ থেকে যাচ্ছিল।
কারও চোখে পড়ে যায় সেই নিউরাল আর্কিটেকচার কোডিং স্টাইল।
অদ্ভুত দ্রুত অ্যাডাপটিভ সিনক্রোনাইজেশন।
একসময় সান রোবোটিক্স-এর পুরোনো আর্কাইভড ডেটাবেস-এর সঙ্গে সেটা ম্যাচ করে।
একটা হিডেন এআই সারভেইলেন্স প্রোটোকল তখনও চুপচাপ অ্যাক্টিভ ছিল।
সেখানে অ্যালার্ট ওঠে—
“পসিবল কগনিটিভ সিগনেচার ম্যাচ ডিটেক্টেড।”
তারপর শুরু হয় ট্র্যাকিং।
কারা প্রজেক্ট অ্যাক্সেস করেছে।
কারা ইন্ডিয়া থেকে এসেছে।
কারা নিউরাল অ্যাডাপটিভ প্রস্থেটিক নিয়ে কাজ করছে।
ধীরে ধীরে একটা নাম ভেসে ওঠে—
আদর্শ অনির্বাণ সেন।
দেশে পৌঁছতেই গরম ভেজা বাতাস তার মুখে এসে লাগে।
লন্ডনের ঠান্ডা কুয়াশার পর এই শহরটা যেন সম্পূর্ণ আলাদা।
বিমানবন্দর থেকে বেরোতেই দূরের চায়ের দোকানের গন্ধ, হলুদ ট্যাক্সি, হর্নের শব্দ—সব মিলিয়ে হঠাৎ মনে হয় সে অনেকদিন পরে শ্বাস নিচ্ছে।
ইরা তাকে দেখেই জড়িয়ে ধরেছিল।
কিন্তু সেই আলিঙ্গনের ভিতরেও ভয় ছিল।
অনির্বাণের চোখে রাতজাগার ক্লান্তি।
ঋদ্ধিমান শান্ত,সবসময়ের মতোই।
নাতাশা তখনও বিছানায়।
আদর তার পাশে বসে হাত ধরতেই নাতাশা হালকা হেসে বলেছিল,
“তুই আরও রোগা হয়ে গেছিস।”
আদর ছোট্ট গলায় বলেছিল,
“তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো আগে।”
নাতাশা তার হাত চেপে ধরে বলেছিল,
“মানুষকে বাঁচানোর নেশাটা খুব ডেঞ্জারাস, আদর। নিজের জীবনটাও একটু বাঁচিয়ে রাখিস।”
কথাটা শুনে আদর চুপ করে গিয়েছিল।
কারণ সে জানত—সে ধীরে ধীরে নিজের ভিতরে হারিয়ে যাচ্ছে,মা রা সব টের পায়।
কয়েকদিন এইভাবে নিজের শহরে কেটে যায়।
বাড়ির ছাদে সন্ধ্যার হাওয়া।
দূরে ট্রামের ঘণ্টা।
ইরার রান্নাঘরের গন্ধ।
সবকিছু তাকে আবার ছোটবেলার মতো করে দিচ্ছিল।
তবু তার মন পড়ে ছিল লন্ডনে।
দৃষ্টিদের বাড়িতে।
লিয়ামের নতুন হাঁটায়।
নোয়ার নীরব মুখে।
একদিন রাতে ঋদ্ধিমান তাকে ছাদে ডেকে বলেছিল,
“তুই পাল্টে যাচ্ছিস।”
আদর আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।
“ভালো দিকে?”
ঋদ্ধিমান মৃদু হেসেছিল।
“খুব বড় হয়ে গেছিস।”
এক সপ্তাহ পরে যখন আদর লন্ডনে ফিরে আসে,সেদিন বৃষ্টি পড়ছিল।
হোস্টেলে ব্যাগ রেখেই সে ছুটে যায় দৃষ্টিদের বাড়ি।
কিন্তু গলির মুখেই সে থেমে যায়।
আজ বাড়িটার সামনে অদ্ভুত নীরবতা।
দৃষ্টি দরজা খুলতেই আদর বুঝে যায় কিছু হয়েছে।
তার চোখ লাল।
মুখ শুকনো।
আদরের বুক কেঁপে ওঠে।
“কি হয়েছে?”
দৃষ্টি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারে না।
তারপর খুব আস্তে বলে—
“পিলো নেই।”
শব্দটা শুনে যেন পুরো পৃথিবীটা কয়েক সেকেন্ড থেমে যায়।
আদর স্থির দাঁড়িয়ে থাকে।
তারপর ধীরে ভিতরে ঢোকে।
ছোট্ট ঘরটা আজ কেমন নিস্তব্ধ।
কোণের খেলনাগুলো পড়ে আছে।
ছোট্ট কম্বলটা ভাঁজ করা।
কিন্তু পিলো নেই।
যে ছেলেটা প্রতিদিন দৌড়ে এসে “ব্রাদার!” বলে জড়িয়ে ধরত—সে নেই।
জেনিভা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“তার হার্ট… খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল…”
আদর ধীরে মেঝেতে বসে পড়ে।
তার মাথার ভিতরে শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
সে পারত।
সে হয়তো কিছু একটা করতে পারত।
হয়তো সময় পেলে।
হয়তো আরও আগে বুঝলে।
তার চোখ ভিজে উঠল।
খুব আস্তে সে ফিসফিস করে বলল,
“ইউ ডিডন্ট গিভ মি আ চান্স টু ফিক্স ইওর হার্ট…”
দৃষ্টি চুপ করে তার পাশে বসে ছিল।
সেদিন প্রথমবার আদর নিজের ব্যর্থতাকে এত গভীরভাবে অনুভব করল।
তারপর থেকেই সে আরও বদলে যায়।
সে যেন নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিল না।
রাতের পর রাত ল্যাবে কাটাতে শুরু করে।
এবার তার লক্ষ্য—নোয়া।
ছেলেটা কথা বলতে পারত না।
তার উইন্ড পাইপ-এর জটিল সমস্যার জন্য শব্দ তৈরি হত না ঠিকভাবে।
কিন্তু নোয়ার চোখে এত কথা ছিল যে আদর মাঝে মাঝে অস্বস্তি বোধ করত।
একদিন নোয়া কাগজে লিখেছিল—
“যদি আমি কথা বলতে পারতাম, প্রথমে গান গাইতাম।”
সেই লাইনটা আদরের মাথায় গেঁথে যায়।
আদর নতুন প্রজেক্ট শুরু করে।
একটা অ্যাডাপটিভ ভোকাল রেজোন্যান্স ডিভাইস।
এটা গলার ভিতরে বসবে।
আর্টিফিশিয়াল হলেও শরীরের নার্ভ সিগন্যাল-এর সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নেবে।
প্রথম প্রোটোটাইপ ফেল করে।
দ্বিতীয়টাও।
তৃতীয়বার ফিটিং-এর পরেও নোয়ার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোয় না।
ল্যাবের সবাই ধীরে ধীরে হতাশ হয়ে পড়ে।
প্রফেসর হ্যারিসন একদিন খুব নরম গলায় বলেছিলেন,
“মেবি দ্য ড্যামেজ ইজ টু ডিপ।”
আদর মাথা নাড়ে।
“না। শব্দ কোথাও আছে। শুধু বেরোতে পারছে না।”
এদিকে লন্ডনের এক পুরোনো অফিস বিল্ডিং-এর ভিতরে কয়েকজন লোক মনিটরের সামনে বসে ছিল।
স্ক্রিন-এ আদরের ছবি।
তার কলেজ আইডি।
তার ল্যাব এন্ট্রি টাইমিং।
তার ভায়োলিন পারফরম্যান্স-এর ফুটেজ পর্যন্ত।
একজন ধীরে বলল,
“হি ইজ ইভলভিং ফাস্টার দ্যান প্রেডিক্টেড।”
আরেকজন জিজ্ঞেস করল,
“কনফার্মেশন?”
উত্তর এলো—
“এইটি নাইন পারসেন্ট কগনিটিভ ম্যাচ উইথ দ্য চাইল্ড প্রোটোটাইপ।”
তারপর একটা নাম উচ্চারণ করা হয়।
মিস্টার হারগ্রিভ।
অনেক বছর পরে আবার।
সেদিন সন্ধ্যায় হালকা তুষার পড়ছিল।
আদর দৃষ্টিদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
দৃষ্টি ভিতরে বাচ্চাদের ভায়োলিন শেখাচ্ছিল।
জানলার ভিতর থেকে আলো বেরোচ্ছিল।
ঠিক তখন—
একটা কালো গাড়ি রাস্তার মোড়ে ধীরে থামে।
আদর প্রথমে খেয়ালই করেনি।
গাড়ির ভিতরে বসা লোকটা দূর থেকে স্কোপ তাক করেছিল।
তার কানে শুধু একটাই নির্দেশ—
“অ্যালাইভ ইফ পসিবল। আদারওয়াইজ এলিমিনেট।”
ঠিক সেই মুহূর্তে—
নোয়া হঠাৎ জানলার দিক থেকে অদ্ভুত একটা আওয়াজ করে চিৎকার করে ওঠে—
“সা…বা…ধা…ন… আদ…র্শ!”
শব্দগুলো স্পষ্ট নয়।
ভাঙা।
কাঁপা।
তবু সেটা শব্দ।
প্রথম শব্দ।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই—
ধাম!
গুলির শব্দ।
কাঁচ ভেঙে টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
গুলিটা আদরের পাশ ঘেঁষে জানলায় লাগে।
দৃষ্টি চিৎকার করে ওঠে।
রাস্তা জুড়ে মানুষ দৌড়াতে শুরু করে।
কালো গাড়িটা মুহূর্তে ঘুরে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
কিন্তু আদর যেন কিছুই শুনছিল না।
সে স্থির দাঁড়িয়ে ছিল।
তার চোখ শুধু নোয়ার দিকে।
নোয়া কাঁপছে।
কিন্তু সে আবার চেষ্টা করছে।
“আ…দ…র্শ…”
আদরের চোখ হঠাৎ ভিজে ওঠে।
সে দৌড়ে ভিতরে ঢুকে নোয়াকে জড়িয়ে ধরে।
“তুই বলেছিস… তুই পেরেছিস…”
নোয়া কাঁদতে কাঁদতে শব্দ করার চেষ্টা করতে থাকে।
দৃষ্টি অবাক হয়ে তাকিয়ে।
চারদিকে কাঁচের টুকরো।
মানুষের চিৎকার।
ভয়ের গন্ধ।
কিন্তু সেই মুহূর্তে আদরের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শব্দ ছিল—
0 Comments