জ্বলদর্চি

শিক্ষার প্রসাধন, না কি প্রসাধনের শিক্ষা? / মৌপিয়া মুখার্জী

শিক্ষার প্রসাধন, না কি প্রসাধনের শিক্ষা?                

মৌপিয়া মুখার্জী 


“ছোট খোকা বলে অ আ/ শেখেনি সে কথা কওয়া”- ছোট খোকাখুকী যখন প্রথম ইস্কুলে যায় এই কোমল শৈশবে, তার দুনিয়া তখন ভারী সরল, উদার, স্নিগ্ধ ও নিত্যনতুন রহস্যময়। মা-বাবা তথা বাড়ির নিশ্চিত পরিমণ্ডল থেকে প্রথমবার তার সেই বেরিয়ে আসা, তার প্রথম ‘নিজের’ কিছু। ইদানিং এই নিজস্ব জগৎ তৈরি করা হয় মোটামুটি বছর দেড় কিংবা দুইয়ের মধ্যেই। কচি দুটো পা প্রথম কয়েকদিন কান্নাকাটির পর নিজের ভরসায় দাঁড়াতে শিখে যায় পৃথিবীর সামনে, অচেনা পৃথিবী। 

একসময় এই ছোট খোকাখুকুর কাঁধে যে ব্যাগ থাকত, তার চেয়েও হালকা থাকত তাদের মন। ভোরবেলার সদ্য রুটিনে পড়া ঘুম চোখ ধীরে ধীরে তাকিয়ে দেখত নতুন অক্ষর, শুনতে পেত নতুন ছন্দ। এখন অ-আ-ক-খ যদি এ-বি-সি-ডি হয়েও থাকে, শিশুমনের বর্ণমালা তো বদলায় না! কিন্তু তার পাঠশালা ক্রমশ ‘কিডস স্কুল’, ‘ইন্টারন্যাশনাল’, ইত্যাদি হতে হতে বদলে ফেলেছে তাদের জানালাগুলো। কাঠের বেঞ্চি আর খড়খড়ির জানালা ক্রমশ ‘স্লাইডিং উইন্ডো’ ও ‘এয়ার কন্ডিশন্ড’ ঘরের কাছে বেমানান হতে হতে হারিয়ে গেছে একদিন, সঙ্গে করে নিয়ে গেছে বাইরের আকাশ। অক্ষরের সরল জগৎ যেন ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ল আয়নার ঘেরাটোপে। শিশুরা কি আজ সেই কৌতূহলের পাঠশালায় যায়? দিদিমণি-মাস্টারমশায়দের নিবিড় ঘেরাটোপে নতুন নতুন ক্লাসের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে অজান্তেই শিখতে থাকে কেমন করে মূল্যবোধ, সততা, নিষ্ঠা, নিয়মানুবর্তিতা ও সংযমের রেলিঙে হাত রেখে ধাপে ধাপে উঠতে হয় ‘মানুষ’ হওয়ার সিঁড়িতে? বাস্তব সত্য এই যে, আজ আর সেই সিঁড়ি হয়ত প্রায় কোথাও নেই। শিশুর প্রথম বিদ্যালয় শুধু অক্ষর শেখার স্থান নয়; এটি তার মানসিক গঠন, নৈতিক বোধ এবং সামাজিক চেতনার ভিত্তিভূমি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিদ্যালয়-সংস্কৃতির ভাষা বদলেছে। একসময় মাস্টারমশায় বা দিদিমণির বকুনি ছিল শিশুর জীবনের একটি পরিচিত অভিজ্ঞতা। তা নিছক শাস্তি ছিল না; ছিল সংশোধনের একটি মানবিক মাধ্যম। সেই বকুনির মধ্যে থাকত উদ্বেগ, ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধের মিশ্রণ। এখন সম্পর্কের উষ্ণতার জায়গায় এসেছে ‘প্রক্রিয়া’, মানবিক শাসনের জায়গায় এসেছে নথিভুক্ত নিয়ম, আর স্বাভাবিক আচরণগত সংশোধনের জায়গায় প্রবেশ করেছে ‘কোড অফ কনডাক্ট’ নামক এক জটিল কাঠামো। এটি ভারী বিমূর্ত! আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায়, বিশেষ করে বেসরকারি কিডস স্কুলে, ‘শারীরিক বা মৌখিক শাসন’ ধীরে ধীরে নিষিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে শিশুর অধিকার সুরক্ষা। শারীরিক শাসন অবশ্যই কাম্য নয়, কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু এর পাশাপাশি স্বাভাবিক ও ন্যূনতম মৌখিক শাসনও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটেছে। শিক্ষকের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত ও সংকুচিত হয়ে গেছে। এর কিছু নথিভুক্ত নিয়মে আজকাল শিক্ষক-শিক্ষিকা সই করেন চাকরিজীবনে প্রবেশের পর। শিশুদের দিকে তাকিয়ে তাঁদের সর্বদা মাথায় রাখতে হয় কৃত্রিম নীতি, নিয়মকানুন। শিশুদের সুরক্ষার খাতিরে অবশ্যই বেশ কিছু নীতি অবলম্বন জরুরী। কিন্তু শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক যদি ‘কোড’-এ পরিণত হয়ে যায়, তাহলে শিক্ষক দিবস এমনকি সেই শিক্ষকের বিপদে কিংবা মৃত্যুতে ‘কোড’ মেনে, ‘রেগুলেশন’ মেপে সম্মান প্রদর্শনের দিন থেকে আমরা বোধহয় খুব বেশি দূরে নেই আর। এই পরিবর্তনের আরেকটি সামাজিক প্রভাব হল—শিশুরা ধীরে ধীরে ‘নিয়ম’ চিনছে, কিন্তু ‘সম্পর্ক’ অনুভব করতে শিখছে কি না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। সেটি বোধহয় ক্লাসের গণ্ডি পেরিয়ে গেলেও অধরাই থেকে যাচ্ছে। শাসনের জায়গায় যখন কেবল নির্দেশিকা থাকে, তখন শিশুর কাছে ভুল-ঠিকের ধারণা অনেক সময় আবেগহীন হয়ে পড়ে। তারা জানে কী করা যাবে না, কিন্তু কেন তা ঠিক নয়—এই নৈতিক উপলব্ধি অনেক সময় দুর্বল থেকে যায়। হোম-ওয়ার্কে আর যাই থাকুক, আজকাল মূল্যবোধ চর্চার হোম-ওয়ার্ক নিয়ে শিশুমন বাড়ি ফেরে কি না, তা প্রশ্নের মুখে। অতীতের শাসনব্যবস্থার অনেক দিকই ছিল অনিয়ন্ত্রিত ও কখনও কখনও কঠোর। তাই আধুনিক ‘চাইল্ড-ফ্রেন্ডলি’ নীতি অপরিহার্য। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের ফলে শিক্ষা তার স্বতঃস্ফূর্ত সংলাপটুকুই হারিয়ে ফেলে। শিক্ষক-শিক্ষিকার ভূমিকা সেখানে ধীরে ধীরে ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ থেকে ‘প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি’তে রূপান্তরিত হয়। সদ্য যে শিশুটি কলকাতার বুকে এক বিদ্যালয়ের চরম নিষ্ঠুরতায় প্রাণ হারিয়েছে, সেও হয়ত অভিভাবকের বদলে কিছু ‘প্রেজেন্টেবল’ প্রতিনিধির কবলে পড়েছিল অকালে! ‘হায়েস্ট-মার্কস’ আর অন্যান্য বিদ্যালয়ের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে ‘ব্র্যান্ড’ ধরে রাখার চাপে কোন অতলে তলিয়ে যাচ্ছে ‘হোমো-সেপিয়েন্স’ ব্র্যান্ডটির অসংখ্য বৈশিষ্ট্য!         

🍂

   

সমসাময়িক বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ‘ব্র্যান্ড’ স্থির করে দিচ্ছে শিক্ষককে হতে হবে ‘প্রেজেন্টেবল’। পরিচ্ছন্নতা, শালীনতা ও পেশাদারিত্ব অবশ্যই শিক্ষকের অপরিহার্য গুণ। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে বাহ্যিক সাজসজ্জা, বিশেষত প্রসাধন ও পোশাক-নির্ভর উপস্থাপনাকে প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে অচিরেই পরেরদিনের ক্লাসের প্রস্তুতির চেয়ে, বিশেষত শিক্ষিকাদের অনেক বেশি খেয়াল রাখতে হচ্ছে ‘মেক-আপ’ ইত্যাদি বিষয়ে। এই প্রবণতার আরেকটি জটিল মাত্রা হল লিঙ্গভিত্তিক প্রত্যাশা। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রে ‘আরও উপস্থাপনযোগ্য’ হওয়ার একটি সূক্ষ্ম চাপ তৈরি করে। এই চাপ সরাসরি নীতিগতভাবে সর্বত্র ঘোষিত না হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের মাধ্যমে তা কার্যকর হয়ে ওঠে। নারীর পেশাগত দক্ষতা ধামাচাপা পড়ে যায় ‘লিপস্টিকের শেড’-এ। সকলেই কি মেনে নেন মন থেকে? না। বাধা হয়ে দাঁড়ায় ‘আনএমপ্লয়মেন্ট’। শিক্ষাজগতেও লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির  সম্ভাবনা তৈরি করে দেয় এইসকল তথাকথিত নামী ‘ব্র্যান্ড’। 

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ বলে, শিশুদের শেখার প্রক্রিয়া গভীরভাবে অনুকরণনির্ভর। তারা শিক্ষক-শিক্ষিকার আচরণ, ভাষা এবং পরিবেশ থেকে তাদের ‘কোড অফ কনডাক্ট’ গ্রহণ করে। যদি শিক্ষার পরিবেশে বারবার বাহ্যিক উপস্থাপনা, বা ‘ইমেজ’-এর উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়, তবে শিশুর মধ্যে এই বোধই অগ্রাধিকার পেতে পারে যে মানবিক গুণাবলী ও ব্যক্তিত্বের চেয়ে উপস্থাপনাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 

আধুনিক কর্মক্ষেত্রে চাকরির নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রতিযোগিতামূলক চাপ অনেক সময় কর্মীদের, বিশেষত নারীদের  খোলাখুলি মত প্রকাশে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে নীরব থাকতে বাধ্য হন, কারণ বিরোধিতা করলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা থাকে। এই পরিস্থিতি কর্মক্ষেত্রের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও পেশাগত স্বাধীনতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা এবং পেশাদার উপস্থাপনা অপরিহার্য হলেও যখন এই উপস্থাপনা ধীরে ধীরে শিক্ষার মূল মানদণ্ডে রূপান্তরিত হয়, তাড়াহুড়োয় খাওয়ার সময়টুকুও না পেয়ে চুলে চিরুনি ছোঁয়াতে ভুলে যাওয়া ‘মীরা’দি’, ‘প্রতিমা’দি’, ‘রমা’দি’রা যখন নিত্যনতুন ‘ড্রেস-কোড’ সজ্জা জোগাড় করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন ছোট খোকাদের ‘কথা কওয়া’ শেখানো কেবল ‘লেসন প্ল্যান’ হয়েই থেকে যায়, ‘লেসন’ কতটা প্রদত্ত হয় বলা মুশকিল! শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক এমন এক পরিবেশ, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষিকার মূল্যায়ন হবে তাঁদের জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক গুণের ভিত্তিতে—বাহ্যিক উপস্থাপনার ভিত্তিতে নয়। একই সঙ্গে লিঙ্গসমতা ও পেশাগত স্বাধীনতার নীতিকে বাস্তবায়ন করা জরুরি, যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রকৃতই মুক্তচিন্তা ও মানবিক বিকাশের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। নয়ত, শিক্ষা কেবল জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র থাকে না, বরং একটি ‘ইমেজ-নির্ভর কর্মসংস্কৃতি’তে পরিণত হয়ে আমাদের সবাইকে পরীক্ষার কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়, জীবনের পরীক্ষায়, যেখানে পাশ-ফেল আছে বইকি!

Post a Comment

1 Comments

  1. AnonymousJune 07, 2026

    খুব সুন্দর এবং সঠিক বিশ্লেষণ ।

    ReplyDelete