দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ২৮শে জানুয়ারি, বিশ্ব তথ্য সুরক্ষা দিবস। তথ্য সুরক্ষা দিবস কি, এর গুরুত্ব এবং তাৎপর্যই বা কি, এই দিবসটি কেন পালন করা হয়, আসুন এই সব কিছুই আমরা বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
তথ্য নিরাপত্তা হলো ,(Information Security বা InfoSec) ডিজিটাল বা ভৌত—যেকোনো ধরনের তথ্যকে অননুমোদিত প্রবেশ, ব্যবহার, প্রকাশ, পরিবর্তন, পরিদর্শন, রেকর্ডিং বা ধ্বংস থেকে রক্ষা করার প্রক্রিয়া। এটি তথ্যের ঝুঁকি হ্রাসের মাধ্যমে গোপনীয়তা, অখণ্ডতা এবং প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে। এর মূল লক্ষ্য হলো সংবেদনশীল ডেটা বা সম্পদ সুরক্ষা রাখা।
বর্তমান বিশ্বে তথ্যই শক্তি। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রেই তথ্যের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এই তথ্য যদি সুরক্ষিত না থাকে, তবে তা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই প্রতি বছর ২৮শে জানুয়ারি বিশ্ব তথ্য সুরক্ষা দিবস (World Data Protection Day) পালন করা হয়।
বিশ্ব তথ্য সুরক্ষা দিবসের সূচনা হয় ২০০৭ সালে। ইউরোপ কাউন্সিল (Council of Europe) এই দিবসটির প্রবর্তন করে। ১৯৮১ সালের ২৮শে জানুয়ারি “Convention 108” নামে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ব্যক্তিগত তথ্যের স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াকরণ থেকে সুরক্ষার প্রথম আইনি দলিল। সেই ঐতিহাসিক দিনটির স্মরণে ২৮শে জানুয়ারিকে বিশ্ব তথ্য সুরক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো,ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, তথ্য ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা গড়ে তোলা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তথ্য বলতে বোঝায়, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত সব ধরনের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ব্যাংক তথ্য, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য, অনলাইন আচরণ ইত্যাদি। ডিজিটাল যুগে এই তথ্যগুলো ইন্টারনেট, মোবাইল অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন সেবার মাধ্যমে সংরক্ষিত ও আদান-প্রদান হয়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করতে,পরিচয় চুরি (Identity Theft) প্রতিরোধ করতে,আর্থিক জালিয়াতি ঠেকাতে,মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে,রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বজায় রাখতে,একটি ছোট তথ্য ফাঁসও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে,যা আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সাইবার অপরাধের মাধ্যমে দেখতে পাই।
বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্মার্টফোন, ক্লাউড কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), বিগ ডাটা ও ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে তথ্য সুরক্ষার ঝুঁকিও বাড়িয়েছে।
প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো,
সাইবার হামলা ও হ্যাকিং
ফিশিং ও ম্যালওয়্যার আক্রমণ।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত তথ্য শেয়ার,দুর্বল পাসওয়ার্ড ব্যবহার,ডেটা চুরি ও অবৈধ নজরদারি,অনেক সময় ব্যবহারকারীর অজ্ঞতা ও অসচেতনতাই তথ্য ফাঁসের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তথ্য সুরক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সমাজ—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে করণীয়
শক্তিশালী ও ভিন্ন ভিন্ন পাসওয়ার্ড ব্যবহার দুই ধাপের যাচাইকরন চালু রাখা,অপরিচিত লিংক ও ইমেইল এড়িয়ে চলা।প্রয়োজন ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে শেয়ার না করা,নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট করা। শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষাআইন প্রণয়ন,তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা,
সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো জোরদার করা
নাগরিকদের সচেতন করতে প্রশিক্ষণ ও প্রচার কার্যক্রম চালানো।
🍂
বিশ্বের অনেক দেশে তথ্য সুরক্ষার জন্য আলাদা আইন রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের GDPR (General Data Protection Regulation) তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ভারতে Digital Personal Data Protection Act ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এই আইনগুলো নাগরিকদের তথ্যের উপর অধিকার নিশ্চিত করে এবং তথ্য অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ দেয়।
এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়,তথ্য আমাদের অধিকার, কিন্তু এর সুরক্ষা আমাদের দায়িত্ব।প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে,সচেতনতা ছাড়া নিরাপত্তা অসম্ভব
স্কুল, কলেজ, অফিস ও সামাজিক সংগঠনে এই দিনে সেমিনার, কর্মশালা, আলোচনা সভা ও অনলাইন প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে তথ্য সুরক্ষার গুরুত্ব বোঝানো হয়।
বিশ্ব তথ্য সুরক্ষা দিবস কেবল একটি দিবস পালন নয়, বরং এটি একটি সচেতনতার আন্দোলন। ডিজিটাল যুগে তথ্য ছাড়া জীবন কল্পনাই করা যায় না, কিন্তু সেই তথ্য যদি নিরাপদ না থাকে, তবে উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত তথ্য ব্যবহারে সতর্ক থাকা, নিজের ও অন্যের গোপনীয়তা সম্মান করা এবং একটি নিরাপদ ডিজিটাল সমাজ গড়ে তোলা। তথ্য সুরক্ষা মানেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ।
0 Comments