বাঁচার উত্তরাধিকার
প্রথম পর্ব
কমলিকা ভট্টাচার্য
জীবনে ফেরা
অনির্বাণের জ্ঞান ফিরল তীব্র যন্ত্রণার সাথে। ব্যথাটা কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়—মনে হচ্ছিল শরীরের প্রতিটা কোষ একসঙ্গে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। যেন শরীর নিজেই তাকে প্রশ্ন করছে, কেন সে এখনো বেঁচে আছে। চোখ খুলতেই প্রথম যে জিনিসটা সে টের পেল, সেটা আলো নয়—গন্ধ। পচা রক্ত, ভাঙা লোহা, ডিজেলের তেল আর ভেজা কাঠের গন্ধ একসঙ্গে মিশে এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যা কেবল দুর্ঘটনার নয়, দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকা মৃত্যুর চিহ্ন বহন করে।
সে নড়তে পারছে না। বুকের উপর বাসের সিট চেপে বসে আছে। প্রতিবার শ্বাস নিতে গেলে বুকের ভেতর থেকে যেন ধাতব কড়কড় শব্দ ওঠছে। চারপাশে ভাঙা কাঁচ ছড়িয়ে রয়েছে, কিছু কাঁচ গেঁথে আছে তার শরীরেও। বাসের জানালা ভেঙে ঢুকে পড়েছে গাছের ডাল, পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ছেঁকে আসছে। বাইরে তাকিয়ে অনির্বাণ বুঝতে পারে—বাসটা পড়ে যায়নি। পাহাড়ের এক খাঁজে অস্বাভাবিকভাবে ঝুলে আছে। নিচে তাকালেই খাদ, আর সেই খাদ মানে নিশ্চিত মৃত্যু।
🍂
পাশে তাকাতেই তার শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। একটা শরীর। একদিন মানুষ ছিল, এখন কেবল একটা বিকৃত অবয়ব। চামড়া গলে গেছে, কোথাও কোথাও হাড় বেরিয়ে এসেছে। চোখ দুটো কোঠরের ভেতর ঢুকে কালো গর্তের মতো। মুখের ভেতর দাঁত বেরিয়ে আছে—একটা স্থির, মৃত হাসি। সেই হাসির দিকে তাকিয়ে অনির্বাণের মনে হয়, মৃত্যু যেন তাকে উপহাস করছে।
সে নিজের হাত তুলতে চায়। তখনই কেঁপে ওঠে। হাত নয়—সাদা কঙ্কাল। কোনো মাংস নেই, কোনো রক্ত নেই। অথচ সে ব্যথা অনুভব করছে। চিৎকার করতে চেয়েছিল সে, কিন্তু তখনই বুঝে যায়—তার ফুসফুসে বাতাস নেই, তবু সে মরেনি। এই অসম্ভব অবস্থাটা আতঙ্কের চেয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করে তার মনে।
হঠাৎ তার কানে ভেসে আসে এক ধরনের যান্ত্রিক শব্দ—এই পাহাড়ে যার থাকার কথা নয়।
SYSTEM CHECK… ERROR… PARTIAL BIO-REGEN ACTIVE
সে জানে না কেন, কিন্তু শব্দগুলো তার কাছে অপরিচিত মনে হয় না। মনে হয়, সে এই ভাষা আগেও শুনেছে। কোনো ল্যাবের ভেতর, কোনো কাচের দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে। স্মৃতিগুলো ভাঙা কাঁচের মতো তার মাথার ভেতর ছড়িয়ে আছে।
এই প্রথম অনির্বাণ উপলব্ধি করে—সে শুধু দুর্ঘটনার শিকার নয়। সে এমন কিছুর মধ্যে পড়ে গেছে, যার নিয়ন্ত্রণ আর তার হাতে নেই।
4 Comments
😳👌
ReplyDelete🙏
Deleteকৌতূহল বাড়লো। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। সুন্দর সূচনা।
ReplyDelete🙏
Delete