জ্বলদর্চি

জাতীয় শিশুকন্যা দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

জাতীয় শিশুকন্যা দিবস

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ২৪শে জানুয়ারি, জাতীয় শিশুকন্যা দিবস। শিশুকন্যা দিবস কি এবং আমরা তা কেন ও কিভাবে পালন করি, এছাড়া এর গুরুত্বই বা কতখানি সমাজে, আসুন সবকিছুই বিস্তারিত ভাবে জেনে নিই।

শিশুকন্যা বলতে জন্ম থেকে বয়ঃসন্ধির পূর্ব পর্যন্ত (সাধারণত ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত) নারী শিশুদের বোঝানো হয়, যাদের অধিকার, সুরক্ষা, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ভারতে ২৪শে জানুয়ারি জাতীয় শিশুকন্যা দিবস এবং বিশ্বজুড়ে ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক শিশুকন্যা দিবস পালিত হয়, যার মূল লক্ষ্য, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করা এবং তাদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করা।

জাতীয় শিশুকন্যা দিবস আমাদের সমাজে কন্যাশিশুদের অধিকার, মর্যাদা ও সম্ভাবনাকে উদযাপন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। এই দিনটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক স্মরণদিবস নয়, বরং এটি সমাজের সকল স্তরে কন্যাশিশুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের আহ্বান। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে কন্যাশিশুরা বৈষম্য, অবহেলা ও সুযোগের অভাবের শিকার হয়েছে। তাই তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সমান অধিকারের প্রশ্নগুলো সামনে এনে সচেতনতা গড়ে তোলাই এই দিনের মূল লক্ষ্য।
🍂

কন্যাশিশুরা পরিবার ও সমাজের অমূল্য সম্পদ। তাদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করা মানে একটি শক্তিশালী ও মানবিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা। জাতীয় শিশুকন্যা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কন্যা ও পুত্রের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। শিক্ষা,পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, খেলাধুলা, সৃজনশীলতা সব ক্ষেত্রেই কন্যাশিশুদের সমান সুযোগ দিতে হবে। এই দিনটি সমাজে বিদ্যমান কুসংস্কার ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা জোগায়।

আজও অনেক কন্যাশিশু নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, অপুষ্টি, বিদ্যালয়ছুট হওয়া, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সহিংসতা তাদের স্বাভাবিক শৈশবকে ব্যাহত করে। অনেক ক্ষেত্রে কন্যাশিশুদের শিক্ষা অগ্রাধিকার পায় না,ফলে তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সংকুচিত হয়। এই বাস্তবতা আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল করে তোলে রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজ একসাথে কাজ না করলে এই সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব নয়।

শিক্ষাই কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়নের প্রধান চাবিকাঠি। শিক্ষিত কন্যাশিশু আত্মবিশ্বাসী হয়, সিদ্ধান্ত নিতে শেখে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। জাতীয় শিশুকন্যা দিবসের বার্তা হলো, প্রতিটি কন্যাশিশুর মানসম্মত শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা। বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো, বিজ্ঞান,প্রযুক্তি ও ক্রীড়াক্ষেত্রে অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা এসব উদ্যোগ কন্যাশিশুদের সমানভাবে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।

কন্যাশিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা একটি মৌলিক মানবাধিকার। গর্ভকালীন পরিচর্যা থেকে শুরু করে জন্মের পর পুষ্টিকর খাদ্য, টিকাদান ও স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় সামাজিক বৈষম্যের কারণে কন্যাশিশুরা পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না। এই দিবস আমাদের সচেতন করে স্বাস্থ্য ও পুষ্টিতে লিঙ্গভিত্তিক কোনো বৈষম্য চলতে পারে না।

কন্যাশিশুদের সুরক্ষায় শক্তিশালী আইন ও কার্যকর নীতিমালা অপরিহার্য। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, শিশু শ্রম বন্ধ, নির্যাতন ও পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সদস্যদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সম্মান, ভালোবাসা ও সমর্থনের পরিবেশ তৈরি না হলে আইন একা যথেষ্ট নয়।

পরিবারই কন্যাশিশুর প্রথম পাঠশালা। পরিবারে সমান আচরণ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ কন্যাশিশুর আত্মমর্যাদা গড়ে তোলে। সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—বিদ্যালয়, গণমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন—সম্মিলিতভাবে সচেতনতা বাড়াতে পারে। ইতিবাচক গল্প ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তুলে ধরলে কন্যাশিশুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়।

জাতীয় শিশু কন্যা দিবস আমাদের একটি অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় কন্যাশিশুদের নিরাপদ, শিক্ষিত ও স্বপ্নপূরণের সুযোগসমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা। আজকের কন্যাশিশুরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে, নতুন উদ্ভাবন আনবে এবং সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই তাদের সম্ভাবনাকে অবরুদ্ধ নয়, উন্মুক্ত করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, জাতীয় শিশু কন্যা দিবস কেবল এক দিনের উদযাপন নয়; এটি একটি চলমান আন্দোলনের প্রতীক। কন্যাশিশুদের প্রতি সমান সম্মান ও সুযোগ নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই সম্ভব একটি সমতাভিত্তিক, ন্যায়সংগত ও মানবিক সমাজ গঠন করা। এই দিবস আমাদের সেই পথেই এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাক।

Post a Comment

0 Comments