জ্বলদর্চি

দূর দেশের লোকগল্প-- ২৭৩/ব্যাঙ রাজকুমার জার্মানি (ইউরোপ)/ চিন্ময় দাশ।

দূর দেশের লোকগল্প-- ২৭৩

ব্যাঙ রাজকুমার 

জার্মানি (ইউরোপ) 

চিন্ময় দাশ


একদিন এক রাজকুমারী তার সঙ্গীদের নিয়ে খেলা করছিল বাগানে। অনেক দিনের একটা পুরনো কুয়া ছিল বাগানের ভেতর। কেউ খেয়াল করেনি। 

খেলতে খেলতে বলটি সেই কুয়ার মধ্যে গিয়ে পড়েছে। 

বল কুয়ার মধ্যে পড়ে গিয়েছে। এখন খেলা হবে কী করে? বল কুয়ার মধ্যে, রাজকুমারী তার বন্ধুরা সে বল তুলবে কী করে? কী করা যায়,  কী করা যায়? 

মালীরা দৌড়ে এলো রাজবাড়ী থেকে। কর্মচারীরা দৌড়ে এলো। কিন্তু এই গভীর পুরাণো কুয়া থেকে বল তুলে আনা কারো সাধ্যে কুলোল না। 

এদিকে রাজকুমারী ধরে বসেছে- ওই বলই আমার চাই। অন্য নতুন বল চলবে না।

কিন্তু বল তুলে আনবার কোন উপায় পাওয়া যাচ্ছে না। মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে রাজকুমারীর। একবার কাঁদে। হাত-পা ছোঁড়ে একবার। বল কিন্তু থেকে যাচ্ছে কুয়ার ভেতরেই।  

এমন সময় এক কান্ড। থপ-থপ করে একটা ব্যাঙ এসে হাজির।  রাজকুমারীকে বলল-- আমি তোমার বল তুলে দেব কুয়া থেকে। কিন্তু একটি শর্ত আছে। 

রাজকুমারী তো ভারি খুশি। বলল—বলো, কী তোমার শর্ত। আমি রাজি আছি। 

ব্যাঙ বললো-- আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে। অবশ্য যদি আমি তোমার বল তুলে দিতে পারি, তবেই। তখন কিন্তু না বললে চলবে না।

রাজকুমারী বলল—হ্যাঁ গো, হ্যাঁ। তাই হবে। এতে অসুবিধা কিসের? আগে তো বলটা তোল।

ব্যাঙ ঝুপ করে নেমে গেল। ঝপ করে উঠে এলো কুয়া থেকে। বল তুলে দিল রাজকুমারীর হাতে—এই নাও তোমার বল।  

রাজকুমারী যে ভয়াণক দুষ্টু, সেটা তো ব্যাঙ জানে না।  হারাণো বল হাতে পেয়ে, আনন্দ ধরে না রাজকুমারীর। ব্যাঙের কথা ভুলে গেল। ভুলে গেল তাকে দেওয়া বন্ধুত্বের কথা। এক ছুটে রাজবাড়িতে গিয়ে ঢুকে গেল সে।

পরের দিন। খাওয়ার টেবিলে বসেছে রাজা এবং তার মেয়ে। এমন সময় দরজায় টুক-টুক আওয়াজ। 

রাজামশাই তাকিয়ে দেখলেন, একটি ব্যাঙ এসে দরজায় টোকা দিচ্ছে। রাজামশাই সেদিকে তাকাতে, ব্যাঙ বলল-- আমাকে ভেতরে আসতে দাও। রাজকুমারীর সাথে কথা আছে আমার। 

হয়েছে কী, বল হারিয়ে যাওয়া, বল খুঁজে পাওয়া, ব্যাঙের সাথে শর্ত করেও কথা রক্ষা না করা-- সমস্ত খবর রাজা মশাই জানতেন। খাবার ঘরের দরজায় ব্যাঙকে দেখে, রাজামশাই মেয়েকে বললেন-- গতকাল তোমার কথা রাখা উচিত ছিল। যাও, নিজে গিয়ে ওকে ভেতরে নিয়ে এসো। 

মন চাইছে না রাজকুমারীর। একটা ব্যাঙকে খাবার টবিলে এনে বসাতে হবে? কী ঘেন্নার কথা! কিন্তু বাবার হুকুম। বাধ্য হয়ে রাজকুমারী বায়াঙকে ভিতরে নিয়ে এল। 

ব্যাঙ বলল—রাজামশাই, আমি রাজকুমারীর পাশের চেয়ারে বসতে চাই।

রাজামশাই মাথা নেড়ে সায় দিলেন। পাশের চেয়ারে বসে খেতে লাগলো ব্যাঙ। 

খাওয়া শেষ। ব্যাঙ বলল-- রাজকুমারীর বিছানাতেই ঘুমাবো আমি। 

🍂

রাজামশাই তাতেও সম্মতি জানাবেন।

বাবার কথা শুনে রাজকুমারী তো রেগে কাঁই। সে বলল-- কক্ষনো না। একটা ব্যাঙ আমার বিছানায় উঠবে না। 

রাজামশাই বললেন-- সংকটের সময় যার উপকার নিয়েছো, তাকে উপেক্ষা করতে পারো না তুমি। কথা দিয়েছিলে। সে কথা তুমি রক্ষা করো নি। এখন তার কথা তোমার শোনা উচিত।

কী আর করে? বাধ্য হয়ে ব্যাঙকে সাথে নিয়ে নিজের শোবার ঘরে গেল রাজকুমারী। দরজা ভেজিয়ে, রাজকুমারী করল কী, ব্যাঙটাকে ঘরের এক কোণে গিয়ে রেখে দিল। বিছানায় উঠে শুয়ে পড়েছে রাজকুমারী। ব্যাঙ চুপ করে থাকবে কেন?

থুপথুপিয়ে এসে বিছানায় উঠে পড়েছে। বলল-- আমি এই বিছানাতেই শোব। এই বালিশে মাথা রেখে তোমার পাশটিতেই ঘুমোতে চাই। 

ব্যাঙের এমন কথা শুনে, মাথায় আগুন জ্বলে গেল রাজকুমারীর। চিৎকার করে বলল—ভালো করে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি তোকে। এই দেখ। বলে ব্যাঙটাকে ধরে দেয়ালে ছুঁড়ে মেরেছে। 

দেওয়ালে ঠোকা খেয়ে, মেঝেতে ছিটকে পড়েছে ব্যাঙ। অমনি এক অবাক কান্ড। কোথায় সেই কুৎসিত কদাকার পুঁচকে একটা ব্যাংক। ঝলমলে পোশাক পরা সুদর্শন এক রাজপুত্র দাঁড়িয়ে আছে ঘরের মেঝেতে। 

দেখে রাজার মেয়ে তো অবাক। চোখের পলক পরে না তার। রাজকুমারী বলল-- কে তুমি? এখানে এলে কী করে? কোথা থেকেই বা এলে? কিছুই তো বুঝতে পারছি না। 

যুবকটি বলল—আমি তোমাদের পাশের রাজ্যেরই রাজকুমার। আমার সৎ মায়ের চক্রান্তে ব্যাঙ হয়ে গিয়েছিলাম। এক ডাইনি মন্ত্র পড়ে এই অবস্থা করেছিল আমার। 

সব দেখে শুনে রাজকুমারীর এখন একেবারে গদগদ ভাব। মুখে হাসি। জানতে চাইল-- তুমি আমার বাগানে এলে কেন?

রাজকুমার বলল-- আমার তো অভিশাপ ছিল, যতদিন না কোন রাজকুমারী আমাকে ছুড়ে ফেলছে, ততদিন আমার মুক্তি নেই। তাই তো আমি তোমাদের রাজ্যে এসেছি। তোমাদের বাগানেই থাকি। আর সুযোগের অপেক্ষা করি। কাল সুযোগ হয়েছিল তোমার সাথে কথা বলবার। তাতেই তো আজ আমি মুক্ত হতে পারলাম। 

রাজকুমারী বলল-- এবার তো মুক্ত হয়েছ। এবার যাও ফিরে তোমার রাজ্যে। 

রাজকুমারের মুখে হাসি। বলল-- ফিরে তো যাবই। তার আগে তোমার শর্ত পূরণ কর।

--কী শর্ত পূরণ করব? 

রাজকুমার বলল—শর্ত মনে নেই? বল তুলে দিলে, আমার সাথে বন্ধুত্ব করবে বলেছিলে। 

আর বিলম্ব সইল না। রাজকুমারীর এগিয়ে গিয়ে, ছেলেটির হাত ধরল—চলো, বাবার ঘরে যাই। 

দুজনে হাজির হয়েছে রাজার কাছে। হাতে হাত ধরা দুজনের। 

তারপর?

 তারপর আর কী? সব শুনলেন রাজামশাই। ঘোষণা করে দিলেন-- এই ছেলের সাথেই বিয়ে হবে আমার মেয়ের।

 ঢাকঢোল পিটিয়ে দেওয়া হল সারা রাজ্যে-- সব প্রজার নেমন্তন্ন রইল রাজকুমারীর  বিয়ের ভোজসভায়।

Post a Comment

0 Comments