দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বহু গৌরবময় ও বেদনাবিধুর অধ্যায় রয়েছে। বাংলার মাটিতে সংঘটিত এমনই এক স্মরণীয় অধ্যায় হলো সলঙ্গা বিদ্রোহ। প্রতিবছর ২৭ জানুয়ারি পালিত হয় সলঙ্গা বিদ্রোহ দিবস। এই দিনটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণ নয়, বরং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ, সাহস ও প্রতিবাদের চেতনার প্রতীক।
সলঙ্গা বিদ্রোহ সংঘটিত হয়, ১৯২২ সালের ২৭শে জানুয়ারি, বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার সলঙ্গা থানায়। সে সময় ভারত ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ, আর বাংলার গ্রামাঞ্চলে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ নানা রকম অত্যাচার, করের বোঝা ও দমননীতির শিকার হচ্ছিল। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক জারি করা নানা দমনমূলক আইন ও পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ জমে উঠছিল। এই ক্ষোভই একদিন রূপ নেয় সশস্ত্র ও অসশস্ত্র প্রতিবাদে যা ইতিহাসে সলঙ্গা বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
সলঙ্গা অঞ্চলের মানুষ সেই সময় রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচেতন ছিল। খিলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন এবং স্বদেশি চেতনার প্রভাব গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। স্থানীয় নেতারা জনগণকে সংগঠিত করছিলেন ব্রিটিশ শাসনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে পুলিশ ও প্রশাসনের নির্যাতন, গ্রেপ্তার, জরিমানা এবং লাঠিচার্জ মানুষের সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯২২ সালের জানুয়ারি মাসে সলঙ্গা এলাকায় উত্তেজনা চরমে ওঠে।
🍂
২৭শে জানুয়ারি সলঙ্গা থানার সামনে বিপুল সংখ্যক মানুষ জমায়েত হন। তারা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাতে চেয়েছিলেন এবং ব্রিটিশ শাসনের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। ব্রিটিশ পুলিশ বিনা উসকানিতে জনতার ওপর গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যেই বহু নিরস্ত্র মানুষ নিহত হন। অনেকেই গুরুতর আহত হন। ইতিহাসবিদদের মতে, সেদিন প্রায় ৭০ জনেরও বেশি মানুষ শহীদ হন, যদিও সরকারি হিসেবে নিহতের সংখ্যা অনেক কম দেখানো হয়েছিল।
সলঙ্গা বিদ্রোহ ছিল, মূলত নিরস্ত্র জনগণের ওপর চালানো এক নির্মম হত্যাকাণ্ড। এই ঘটনার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের নিষ্ঠুর চেহারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গ্রামের কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ—যারা কেবল নিজেদের অধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন তাদের রক্তে রঞ্জিত হয় সলঙ্গার মাটি। এই আত্মত্যাগ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল কিন্তু বেদনাদায়ক অধ্যায়।
সলঙ্গা বিদ্রোহের প্রভাব বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদপত্র ও জাতীয় নেতারা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। ব্রিটিশ সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। গান্ধীজি সহ বহু জাতীয় নেতা এই হত্যাকাণ্ডকে ব্রিটিশ শাসনের অমানবিকতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এর ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পায়।
এই বিদ্রোহ আমাদের শেখায় যে স্বাধীনতা সহজে অর্জিত হয়নি। অগণিত নাম না জানা মানুষ নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে। সলঙ্গার শহীদরা হয়তো ইতিহাসের পাতায় খুব বেশি আলোচিত নন, কিন্তু তাদের আত্মত্যাগের মূল্য অপরিসীম। তারা দেখিয়ে গেছেন—অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহসই জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
বর্তমানে প্রতিবছর সলঙ্গা বিদ্রোহ দিবস পালন করা হয় নানা কর্মসূচির মাধ্যমে। শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভা, পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই দিনের গুরুত্ব তুলে ধরে আলোচনা করা হয়, যাতে নতুন প্রজন্ম ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হয় এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়।
সলঙ্গা বিদ্রোহ দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মূল্য। আজ আমরা যে স্বাধীন দেশে কথা বলতে পারি, মত প্রকাশ করতে পারি, তার পেছনে রয়েছে সলঙ্গার মতো অসংখ্য ঘটনার রক্তাক্ত ইতিহাস। তাই এই দিবস কেবল অতীত স্মরণ নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য এক শক্তিশালী শিক্ষা।
0 Comments