সপ্তম পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
(দর্শনের আলোকে কাম )
"কাম" বলতে বোঝায়, ব্যক্তির পার্থিব ইচ্ছা -আকাঙ্ক্ষা,যা পূরণের কামনায় ব্যক্তি নানারকম লৌকিক কর্মে প্রবৃত্ত হয়। কাম বা কামনার তবে গুণগত প্রভেদ রয়েছে-অসুস্থ কামনা ও সুস্থ কামনা।
অসুস্থ কামনা হোলো, যা মানুষের বিচারবোধকে নস্যাৎ করে শুধুমাত্র ইন্দ্রিয় তৃপ্তির জন্য কর্মে প্রবৃত্ত করায়। এই জড় কামনা বাসনা ব্যক্তিকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে দেয়। এইসব কামনা অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে অমানুষের পর্যায়ে নামিয়ে আনে। অসুস্থ কামনার উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- প্রয়োজনাতিরিক্ত অর্থ কামনা, ইন্দ্রিয় ভোগসামগ্রী কামনা ইত্যাদি। আর সুস্থ কামনা ব্যক্তি মনের সুস্থিতি এনে দেয়।সুস্থ কামনার উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- জ্ঞানের কামনা, বিভিন্ন শিল্পকলা ও নান্দনিক ব্যাপারে আগ্রহ ইত্যাদি।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ব্যক্তি নিজের সাধ্যের অতীত বিষয় কামনা করে থাকে। তবে তা লাভের জন্য যদি ব্যাক্তি সৎপথে সৎকর্মে প্রবৃত্ত হয় তো ঠিক কথা। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ব্যক্তি ওই সাধ্যাতীত কামনার বিষয় লাভের জন্য অসৎ পথে যায়- অসৎকর্মে প্রবৃত্ত হয়। যেমন, অতিরিক্ত অর্থ লাভের আশায় তথা কামনায় চুরি- ডাকাতি প্রভৃতি অসৎকর্মে প্রবৃত্ত হওয়া, অধিক ক্ষমতা বা সমাজে উচ্চ মর্যাদা লাভের কামনায় অন্যের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ ও হিংসাত্মক আচরণ করা ইত্যাদি।
🍂
কামনার বিষয় এমন নির্ধারণ করা উচিত, তা যেন মোক্ষলাভের তথা মুক্তি লাভের সহায়ক হয়। অর্থাৎ কামনার বিষয় জড়জাগতিক ইচ্ছা পূরণের সাথে সাথে যেন বিবেক-জ্ঞানের উদ্বোধক হয়, তা বিবেচনা করা উচিত। যেমন জ্ঞানলাভের কামনা থাকলে তা ব্যক্তিকে প্রকৃত জ্ঞান লাভে সহায়তা করে। ব্যক্তি প্রকৃত জ্ঞান লাভ করলে জানতে পারে যে কি তার প্রকৃত পরিচয়, কোন কাজ তার কর্তব্যকর্ম। এর ফলে সে সুরুচিসম্পন্ন মানসিকতার অধিকারী হয়, ব্যক্তির মন নির্মল হয়, চিন্তা সুদূরপ্রসারী হয়। ফলে মানুষ সুখী হয়, পরিণতিতে ক্রমে জ্ঞান সমৃদ্ধ হয়ে শান্তি লাভ করে।
কামনা হোলো, এমন একখানা ব্যাপার যা মনে একবার জাগ্রত হলে, তা সময়ের সাথে সাথে বিস্তার লাভ করে। যদি তাকে বিবেকের প্রত্যাদেশ অনুযায়ী সংযত না করা হয় তাহলে তা ধ্বংসের বা পতনের কারণ হয়।
জাগতিক কামনা-বাসনা মানুষকে কর্মে প্রবৃত্ত করে। এই দিক থেকে চিন্তা করলে বলা যায়- কাম হলো জাগতিক কর্মের প্রেরণাস্বরূপ। ব্যক্তি তার কামনা অনুসারে কর্ম করে। আর এই কর্ম হল কর্মফল ভোগের কারণ- যা, তত্ত্বগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি যেমন কর্ম করে তদনুরূপ তার ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবন নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই কামনা সঠিক পথে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।তার জন্য প্রয়োজন যথাযথ আত্মিক জ্ঞান তথা আধ্যাত্মিক জ্ঞান।
ব্যক্তিকে মনে রাখতে হবে, ব্যাক্তি যখন পৃথিবীতে আসে তখন তার যদিও বা কর্মের ফলভোক্তা আত্মার একটি দৃশ্যমান অবয়ব থাকে কিন্তু পৃথিবী থেকে বিদায়ের সময় তার ওই অবয়বটুকু হয় মাটিতে মিশে যায় অথবা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। অন্তিম যাত্রায় থাকে ওই আত্মা ও তৎসম্পৃক্ত কর্ম-জীবন কালে যে আত্মাকে জড়চেতনা সম্পন্ন ব্যক্তি জানার প্রয়োজনটুকুও মনে করে না।শুধু জাগতিক কাম্য বিষয় অনুসন্ধান করাটা জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়, আত্মিক চেতনায় সমৃদ্ধ হওয়ার সহায়ক বিষয় চর্চা ও চর্যারও প্রয়োজনীয়তা অবশ্য স্বীকার্য।।
0 Comments