জ্বলদর্চি

সুধীরচন্দ্র দাস (স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিধায়ক, কাঁথি) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ১৯৫
সুধীরচন্দ্র দাস (স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিধায়ক, কাঁথি) 

ভাস্করব্রত পতি

একাধারে তিনি ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। অন্যদিকে ছিলেন একজন যথার্থ সমাজসেবী ও সমাজ সংস্কারক। পরবর্তীতে তিনি হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার জনপ্রিয় বিধায়ক এবং মন্ত্রী। একজন সত্যিকারের কর্মতৎপর মানুষ হিসেবেই জেলাবাসী তাঁকে চেনে। ছাত্রাবস্থা থেকেই সংগ্রামী আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। যা তাঁকে পরবর্তীতে একজন দক্ষ জনসংগঠক হিসেবে পরিগণিত করেছিল। তিনি সুধীরচন্দ্র দাস। 

কাঁথির দারুয়াতে ১৯০৭ এর ১৬ ই নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন এই মানুষটি। বাবা কেদারনাথ দাস এবং মা সরোজিনী দেবী। দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন তিনি সরকারী স্কুল ছেড়ে কাঁথি জাতীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হন পড়াশুনার জন্য। ১৯২৪ সালে গৌড়ীয় সর্ববিদ্যায়তন থেকে আদ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের ইউনিয়ন বোর্ড বয়কট আন্দোলনের পর ইংরেজদের অমানবিক এবং অমানুষিক শাসন শোষণের বিরুদ্ধে প্রচার ও স্বদেশী গঠনকর্মে আত্মনিয়োগ করেন। সেসময় তিনি সান্নিধ্য লাভ করেন নিবারণচন্দ্র দাশগুপ্ত ও সতীশচন্দ্র দাশগুপ্তের। তাঁদের পথ অনুসরণ করে খদ্দর ধোলাই এবং রঙ ছাপ নিয়ে প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন। এর সাথে জ্ঞানাঞ্জন নিয়োগীর কাছে ম্যাজিক লণ্ঠনের শিক্ষালাভ করেন। 

কলকাতা কংগ্রেসে অংশগ্রহণ করেন ১৯২৮ সালে। লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সময় তিনি গোপনে সাইক্লোস্টাইল মেসিনে 'কাঁথি কংগ্রেস বার্তা' ছাপিয়ে সেসব প্রচার করতেন। তাঁর কার্যকলাপের প্রতি নজর ছিল ব্রিটিশ পুলিশের। ব্রিটিশ কতৃক 'কংগ্রেস' বেআইনী ঘোষিত হলে 'স্বদেশী শিল্প ভাণ্ডার' স্থাপনের মাধ্যমে কংগ্রেস কর্মীদের সাথে সমন্বয় রক্ষার কাজে যুক্ত হন। 

১৯৩০ এর ৮ ই মে স্রেফ সন্দেহের বশে পুলিশ গ্রেফতার করে। অমানুষিক নির্যাতনের পাশাপাশি ছ'মাসের কারাবরণও করতে হয় তাঁকে। আবারও ১৯৩২ ৩৩ নাগাদ ঝাঁপিয়ে পড়েন আইন অমান্য আন্দোলনের সাথে। ফের গ্রেফতার হন তিনি। আবারও ছ'মাসের কারাবরণ ভোগ করতে হয় তাঁকে। ১৯৩৫ সালে তৃতীয়বারের জন্য গ্রেপ্তার হয়ে এক মাস কারাবরণ করতে হয়। ১৯৪২ এর আগষ্ট আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ফলে চতুর্থ বারের জন্য গ্রেপ্তার হয়ে চার মাসের কারাদণ্ড ভোগ করেন। কিন্তু তারপরেও তাঁর জেলযাত্রায় ছেদ পড়েনি। চারমাসের কারাভোগ কাটিয়ে বাইরে বেরোনোর মুখে ফের তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পঞ্চমবারের এই জেলগমনে টানা এক বছর কারারন্তরালে থাকতে হয়। অবশেষে মুক্তি মেলে ১৯৪৩ এ। এরপর এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা সহ ত্রাণকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পান। 

১৯৪০ সালের ১৫-১৮ মার্চ বর্তমান ঝাড়খণ্ডের রামগড়ে অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ৫৩ তম বার্ষিক অধিবেশন তথা 'রামগড় সম্মেলন' বা রামগড় কংগ্রেসে প্রমথনাথ ব্যানার্জির সঙ্গে যোগ দেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সভাপতিত্বে। আসলে সুধীরচন্দ্র ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর অনুগামী। ১৯৪৬ সালে স্থাপন করেন 'আজাদ হিন্দ বীরেন্দ্র বাহিনী'। এই সংগঠন নোয়াখালিতে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকায় এবং কাঁথির বিভিন্ন স্থানে কলেরা মহামারিতে আক্রান্ত মানুষের সেবাকার্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ১৯৪৮ সালে 'দেশপ্রাণ' সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করেন। 

অবশেষে ১৯৪৭ এ এলো স্বাধীনতা। এরপর তিনি আচার্য কৃপালনীর 'সর্বভারতীয় কৃষক মজদুর প্রজা পার্টি'তে (যা পরবর্তীতে হয় 'প্রজা সোসালিষ্ট পার্টি') যোগ দেন। সেই দলের হয়ে বিধায়ক নির্বাচিত হন মেদিনীপুরের বুকে। ১৯৫০ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে কাঁথি উত্তর এবং কাঁথি দক্ষিণ বিধানসভায় বিধায়ক ছিলেন ১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৭, ১৯৬৯, ১৯৭১ ও ১৯৭২ তে। 

১৯৫২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে উত্তর কাঁথি কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। স্বাধীন ভারতের প্রথম এই নির্বাচনে তিনি ১১৮৩০ ভোটে জয়লাভ করেন। ১৯৫৭ সালের নির্বাচনে কাঁথি দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে ভোটে দাঁড়িয়ে ১৮,১৪৫ ভোট (৪৫.৩৯%) পেয়ে দ্বিতীয় স্থান পান। ফের জয়ে ফেরেন ১৯৬২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে। এবার তিনি কাঁথি দক্ষিণ আসনে ২২,৫৬৫ ভোট (৫১.০৬%) পেয়ে জয়ী হন।

১৯৬৭ সালের নির্বাচনে ২৬,০৮৯ ভোট (৫১.০৪%) পেয়ে নিজের আসনটি দখলে রাখেন। ১৯৬৯ সালের নির্বাচনে আবারও কাঁথি দক্ষিণ কেন্দ্রে জয়লাভ করেন ২৯,৭৭৬ ভোট (৫৭.০৭%) পেয়ে। এরপর এই বছরের ৯ মে তিনি তাঁর প্রজা সমাজতান্ত্রিক দলের বিধায়ক হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রীসভায় (১৯৬৯ - ১৯৭১) স্থান পান। এই মন্ত্রীসভায় তিনি পশুপালন ও পশুচিকিৎসা মন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেন।

১৯৭১ এর নির্বাচনেও পিএসপি দলের হয়ে দক্ষিণ কাঁথি বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী হন ১৮,১৬৫ (৩৮.৬৬%) ভোট পেয়ে। ফের ১৯৭২ এর নির্বাচনে এই আসনেই নির্দল প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দিতা করে ২০,০০১ ভোট (৪৩.৯০%) পেয়ে বিধায়ক হন। পরে কংগ্রেসে যোগদান করেন। ১৯৭৭ এর নির্বাচনেও নির্দল প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে হেরে যান। সেবার পেয়েছিলেন ৪,৫৫৬ ভোট (১০.২৬%)। এরপর রাজনীতির লড়াইয়ের ময়দান থেকে সরে দাঁড়ান। সারা জীবন বিভিন্ন সামাজিক কাজের সাথে যুক্ত মেদিনীপুরের এই মহান মানুষটির জীবনাবসান ঘটে ১৯৯১ এর ২৫ শে জুলাই। মেদিনীপুর হারায় এক অবিস্মরণীয় নেতৃত্বকে।
🍂

Post a Comment

0 Comments