জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার- দ্বিতীয় খন্ড/পর্ব ৩ /কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার- দ্বিতীয় খন্ড
পর্ব ৩ 
কমলিকা ভট্টাচার্য 

পর্যবেক্ষকের চোখ

অনির্বাণ প্রথম যেদিন বুঝেছিল ইরা সাধারণ মেয়ে নয়, সেদিন আসলে সে নিজের কথাই বুঝে উঠতে পারেনি। কয়েকদিনের মধ্যেই ইরা এই বাড়িতে নিজের একটা জায়গা করে নিচ্ছিল। বাড়ির কাজ সে খুব সহজেই করত, কিন্তু প্রতিটা কাজে যে পারফেক্টনেস আর নিয়মনিষ্ঠার ধারাটা ছিল, সেটা অনির্বাণের চোখ এড়ায়নি। সে হাঁটার সময় শব্দ করত না, অথচ ঘরে ঢুকলেই মনে হতো—ঘরটা যেন এক নিমেষে স্ক্যান করে নিচ্ছে। বহু বছর ডিফেন্স ল্যাবে কাজ করা অনির্বাণ জানত, এই ধরনের আচরণ আসে অভ্যাস থেকে, আর অভ্যাস আসে ট্রেনিং থেকে। তবু সে নিজেকে বোঝায়—হয়তো বেশি ভাবছি। নাতাশার পর থেকে আমি সবকিছুতেই ছায়া খুঁজি।
নাতাশা। নামটা মনে পড়লেই তার বুকের ভেতর কোথাও একটা ধাতব শব্দ হয়—যেন বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো যন্ত্র হঠাৎ বিদ্যুৎ পেয়ে গেছে। নাতাশা ছিল আলাদা। সে কখনও সরাসরি প্রশ্ন করত না, কথা বলত ফাঁকে ফাঁকে—ঠিক যেমন ইরা করে। অনির্বাণ জানে, মানুষ স্মৃতি দিয়ে বাঁচে না, বাঁচে অসমাপ্ততার ভার নিয়ে। কিন্তু ইরাকে দেখলেই আরেকটা অস্বস্তি মাথা তোলে। মেয়েটা খুব কমবয়সী—বিশ-বাইশ হবে বড়জোর। তার নিজের বয়সের প্রায় অর্ধেক। সে নিজেকে কঠোরভাবে বলে, এই বয়সে কাউকে নিয়ে এমন অনুভূতি ভাবনাতেই আসা উচিত নয়। এটা আকর্ষণ নয়, এটা স্মৃতির প্রতিধ্বনি, এটা বিভ্রান্তি। তবু মানুষ নিজের মনকে কতটাই বা শাসন করতে পারে?
ঋদ্ধিমান অবশ্য অন্য চোখে দেখছিল। তার কাছে ইরা মানে একটি চলমান অ্যালগরিদম—একটি ভেরিয়েবল, যার ইনপুট-আউটপুট এখনও পুরো ম্যাপ হয়নি। সে তিলক বাবাকে জানায়, “ওর চোখে anticipatory pause আছে। ও কথা বলার আগে ফলাফল হিসেব করে।” তিলক বাবা চুপচাপ শোনেন। বহু বছর ধরে তিনি মানুষের মুখে দেশদ্রোহ দেখেছেন, আবার দেশপ্রেমও। “তোমরা যাকে স্পাই বলো,” তিনি ধীরে বলেন, “সে সবসময় শত্রু হয় না। অনেক সময় সে শুধু ব্যবহারযোগ্য হয়।” তিলক বাবার কাজ ছিল দেশের বাইরে নয়—দেশের ভেতরে। কারণ তিনি জানতেন, সবচেয়ে বিপজ্জনক ফাঁস সীমানা পেরিয়ে আসে না; সেটা জন্মায় বিশ্বাসের ভেতর।
এই সময় অনির্বাণের ভেতরে আরেকটা যুদ্ধ চলছিল। সে লক্ষ্য করছিল—ইরা আর ঋদ্ধিমান খুব সহজে কথা বলে, হাসে, তর্ক করে, আবার হেসে ফেলে—যেন দুজন একই ফ্রিকোয়েন্সিতে চলে। আর সেই দৃশ্য দেখলেই অনির্বাণের বুকের ভেতর কোথাও অযৌক্তিক একটা চাপ তৈরি হয়। হিংসা নয়—তবু হিংসার মতো কিছু। সে নিজেকে প্রশ্ন করে, আমি কেন বিরক্ত হচ্ছি? আমি তো ওর অভিভাবকের বয়সী। তবু মন শোনে না। কারণ মানুষ যুক্তিতে চলে না—মানুষ চলে অভাব দিয়ে।
এই সবের মাঝেই ইরাকে দেখলে তার মাথা হালকা হয়, কিন্তু বুক ভারী হয়ে যায়। এক সন্ধ্যায় ইরা হঠাৎ বলে ওঠে, “আপনি যখন হাসেন না, তখন আপনার চোখ বেশি কথা বলে।” অনির্বাণ চমকে ওঠে। এই বাক্য নাতাশা একবার বলেছিল—হুবহু না, কিন্তু অনুভূতিটা একই। সেদিন রাতে সে ঘুমোতে পারে না। ড্রয়ারে রাখা নাতাশার ছবিটা বের করে। বরফ পড়ার দিনের ছবি। নাতাশা ক্যামেরার দিকে তাকায়নি—দূরে কোথাও তাকিয়ে ছিল, ঠিক যেমন ইরা তাকায়। অনির্বাণ হঠাৎ বুঝতে পারে—সে ইরার দিকে তাকাচ্ছে না, সে তাকাচ্ছে নিজের অতীতে। আর সেটা ভয়ংকর।
পরদিন সকালে তিলক বাবা অনির্বাণকে ডাকেন। “তুমি কি জানো,” তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় ভুলটা কী?” অনির্বাণ চুপ থাকে। “যখন একজন মানুষ ভাবে—সে আর ভুল করবে না।” তিনি জানতেন, অনির্বাণ এই প্রজেক্টে জড়িয়ে পড়েছে শুধু বিজ্ঞানী হিসেবে নয়। “এই মেয়েটাকে তুমি কী ভাবছ?” অনির্বাণ ধীরে বলে, “আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি।” “কিসের?” “যদি আবার কাউকে বিশ্বাস করি… আর সেটা যদি দেশের ক্ষতি করে…” তিলক বাবা শান্ত স্বরে বলেন, “দেশ বাঁচে সন্দেহে নয়, দেশ বাঁচে দায়িত্বে।”
সেদিন সন্ধ্যায় অনির্বাণ দূর থেকে ইরাকে দেখে। ইরা জানে না—তাকে ঘিরে কত স্তরের নজরদারি চলছে। সে শুধু জানে—এই বাড়িতে কিছু একটা অসম্পূর্ণ আছে। আর অনির্বাণ জানে—এই অসম্পূর্ণতার কেন্দ্রে সে নিজেই দাঁড়িয়ে আছে।
🍂


ইরার সত্য 

ঋদ্ধিমান অনেক দিন ধরেই নিশ্চিত ছিল— ইরা সাধারণ মেয়ে নয়। সে কথা বলার সময় চোখে চোখ রাখে না, কিন্তু ঘরের প্রতিটা কোণ তার নজরে থাকে। সে প্রশ্ন করলে সরাসরি উত্তর দেয়, কিন্তু কখনও অপ্রয়োজনীয় তথ্য দেয় না। এই ধরনের আচরণ natural shyness নয়, এটা trained cognitive discipline। তাই ঋদ্ধিমান সিদ্ধান্ত নেয়— ইরাকে প্রশ্ন করবে না, তার মস্তিষ্ক কীভাবে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে সেটা দেখবে।
এইখানেই আসে তিলক বাবা। তিলক বাবা একসময় দেশেরই একটি অদৃশ্য কাঠামোর অংশ ছিলেন। তাঁর কাজ ছিল— দেশের ভেতরে বসেই যারা দেশের বিরুদ্ধে কাজ করছে, তাদের চিহ্নিত করা, কিন্তু প্রয়োজনে না পড়লে প্রকাশ না করা। তিনি বলতেন, “শত্রু মানেই বন্দুক নয়। কখনও কখনও শত্রু হয় একটি প্রশ্ন।”
তিনি ঋদ্ধিমানকে বোঝান মানুষের মস্তিষ্ক সারাক্ষণ ভবিষ্যৎ অনুমান করে। এই predictive processing-এর উপর ভর করেই মানুষ মিথ্যে বলে। কিন্তু যদি মস্তিষ্ককে Theta-wave state (৪–৮ Hz)-এ আনা যায়, তাহলে এই অনুমান দুর্বল হয়। তখন মানুষ যা বলে তা নয়— তার শরীর যা বলে, সেটাই আসল তথ্য। তবে তিনি সতর্ক করেন— trained spy-দের মস্তিষ্কে থাকে false memory buffers। ওরা নিজেরাও জানে না কোনটা সত্য।
তিলক বাবার লক্ষ্য পরিষ্কার— ইরাকে ধ্বংস করা নয়, বোঝা— সে ব্যবহার হচ্ছে, না সে নিজেই চালক। তাঁর নির্দেশে ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে সিস্টেম চালু করে— micro-expression analysis, heart-rate variability, amygdala stress response। ইরা জানে না সে পরীক্ষার মধ্যে আছে।
এক সন্ধ্যায় ইরা হঠাৎ বলে ওঠে, “আমি এখানে শুধু আশ্রয় নিতে আসিনি।” এই বাক্যে তার অ্যামিগডালা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেয়। Theta-induction শুরু হয়। ইরা ধীরে ধীরে স্বীকার করে— সে সত্যিই প্রতিবেশী দেশের স্পাই। কিন্তু সে একা নয়। সে জানায়, এই প্রজেক্টে শুধু তার দেশ নয়, দেশের ভেতরের কিছু শক্তিও আগ্রহী। যদি Non-Local Presence Interface সফল হয়, তাহলে যুদ্ধ আর সৈন্যের নয়— হবে চেতনার অনুপ্রবেশ।
তিলক বাবা তখনই বুঝে যান— এই মেয়েটি শত্রু নয়, সে প্রমাণ। তিনি বলেন, “ওকে বাঁচাতে হবে। কারণ ও দেখিয়ে দিচ্ছে— আমাদের ভিতরেই ফাঁটল কোথায়।”
এইসবের মাঝেই অনির্বাণ দিল্লি যায়। একদিন ইরা তার ঘরে ঢুকে ড্রয়ারের ভিতরে একটা পুরনো ছবি পায়— নাতাশা। ইরার বুক ধক করে ওঠে। এটা তার আন্টি। শৈশবের গল্প মনে পড়ে— এক ভারতীয় ডিফেন্স ইঞ্জিনিয়ার, এক অসমাপ্ত সম্পর্ক। সব মিলিয়ে যায়।
ইরা সব বলে ঋদ্ধিমানকে। জানায়, তার আন্টি আজও অনির্বাণকে ভালোবাসে। যদিও সে স্পাই হিসেবে এসেছে, তবু সে অনির্বাণ বা ঋদ্ধিমানের কোনো ক্ষতি চায় না। অনির্বাণের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা আছে, আর ঋদ্ধিমানের প্রতি সে নিজের দুর্বলতা ও ভালোবাসার কথা স্বীকার করে।
ঋদ্ধিমান তখন সত্যিটা বলে দেয়— সে মানুষ নয়, সে হাই-স্কিল হিউম্যানয়েড। তার ভালোবাসা আছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নেই। এই কথায় ইরা ভেঙে পড়ে। সে দেশে ফিরতে চায়। কিন্তু তিলক বাবা জানেন— ফিরলে ওকে মেরে ফেলা হবে। ঋদ্ধিমান বলে সে কিছুতেই এই ঝুঁকি নিতে দেবে না। তবু ইরা বলে, ভালোবাসা মরে না— সে ফিরে আসবেই।
তারা ঠিক করে নাতাশাকে অনির্বাণের কাছে ফিরিয়ে দেবে। যাওয়ার আগে ঋদ্ধিমান ইরার নিউরাল মেমোরি থেকে সব অপারেশনাল ডেটা মুছে দেয়— রেখে দেয় শুধু অনুভূতি।
অনির্বাণ সব শুনে ফেলে। সে তিলক বাবার কাছে গিয়ে বলে সে প্রস্তুত। তিলক বাবা বলেন, “চেতনা মানে শুধু স্মৃতি নয়— চেতনা মানে দায়িত্ব।”
ইরা চলে যায়। ঋদ্ধিমান ভেঙে পড়ে। অনির্বাণ তার হাতে তুলে দেয় হিউম্যানয়েড ইরা— ঋদ্ধিমানের ভালোবাসা— আর বলে, যদি ইরার কোনো বিপদ হয়, তাকে বাঁচাতেই হবে।

ক্রমশ...

Post a Comment

8 Comments

  1. বিজ্ঞানভিত্তিক এরকম লেখা সচরাচর দেখি না। আগ্রহ বাড়লো।

    ReplyDelete
  2. কত কিছু জানা যাচ্ছে। লেখকের জ্ঞান সুদূরপ্রসারী।

    ReplyDelete
  3. কমলিকাFebruary 03, 2026

    🙏

    ReplyDelete
  4. বেশ নতুনত্ব। উপভোগ করছি।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাFebruary 08, 2026

      ধন্যবাদ

      Delete
  5. লেখার মধ্যে একটা নিজস্বতা আছে এবং বেশি নতুনত্ব ভালো লাগলো।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাFebruary 08, 2026

      ধন্যবাদ

      Delete