বাঁচার উত্তরাধিকার -দ্বিতীয় খন্ড
পর্ব ২
কমলিকা ভট্টাচার্য
ঘোর
হঠাৎ সব কিছু থেমে যায়। না তুষারের শব্দ, না যন্ত্রের গুঞ্জন। অনির্বাণ চোখ খুলে দেখে—ঘরটা আগের মতোই আছে, কিন্তু তিলক বাবা নেই। এইমাত্র যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, যিনি কথা বলছিলেন, যার উপস্থিতিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল—তিনি নেই।
ঋদ্ধিমান ধীরে বলে, “অনির্বাণ… তুমি কিছু ফিল করছো?” অনির্বাণ নিজের হাতের দিকে তাকায়। হালকা কাঁপছে। “মনে হচ্ছে যেন… কেউ আমাদের মাথার ভিতর দিয়ে হেঁটে গেল।”
ঘরের আলো অদ্ভুতভাবে নিস্তেজ হয়ে আসে, যেন সবকিছু একটা স্বপ্নের শেষে এসে দাঁড়িয়েছে। ঠিক তখনই—ধুম! ধুম! ধুম! দরজায় ধাক্কা। এইবার আর ভদ্র নয়, এইবার প্রাণ বাঁচানোর ধাক্কা। একটা কণ্ঠ কাঁপা কিন্তু তীব্র—“দরজা খোলো! প্লিজ! ওরা এসে যাবে!”
অনির্বাণ চমকে ওঠে। ঋদ্ধিমান দরজার দিকে তাকিয়ে এক পা পিছোয়। “এটা… আগের ধাক্কা না,” সে ফিসফিস করে। অনির্বাণ দরজা খুলে দেয়। এক ঝাঁক ঠান্ডা হাওয়ার সঙ্গে একটি মেয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ে। দরজা বন্ধ করে দেয় সে নিজেই। হাঁপাতে হাঁপাতে দরজায় পিঠ ঠেকায়। চুল এলোমেলো, জ্যাকেট ছেঁড়া, চোখে আতঙ্ক—কিন্তু সেই আতঙ্কের নিচে অদ্ভুত এক হিসেবি শান্তি।
“আমি… আমি বর্ডার থেকে পালিয়ে এসেছি,” সে বলে। “ওরা আমাকে খুঁজছে।”
অনির্বাণ এক মুহূর্ত ভাবতে পারে না। “কে?”
মেয়েটি মাথা নাড়ে। “বলতে পারব না। বললে… তোমরাও বিপদে পড়বে।”
ঋদ্ধিমান চুপ করে থাকে। সে মেয়েটার দিকে তাকায়—আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখের মণিতে কিছু একটা ঝিলিক দিয়ে ওঠে। এক সেকেন্ডেরও কম সময়। Brain mapping—অজান্তেই। রঙ, প্যাটার্ন, নিউরাল স্ট্রেস—সব মিলিয়ে একটা অ্যালার্ম তার ভিতরে জ্বলে ওঠে।
This girl is trained.
কিন্তু সে কিছু বলে না।
অনির্বাণ বলে ওঠে, “এখানে থাকা নিরাপদ না। আমাদের বাড়িতে চলো।”
মেয়েটি অবাক হয়ে তাকায়। “কেন?”
“কারণ,” অনির্বাণ একটু থেমে বলে, “এখানে যে কোনো মুহূর্তে কেউ এসে পড়তে পারে।”
🍂
নীরব সন্দেহ
বাড়িটা পুরনো—মায়ের স্মৃতিতে ভরা। মা মারা যাওয়ার পর ঘরটা যেন আরও বড় হয়ে গেছে, আরও ফাঁকা। অনির্বাণ অনেকদিন এই বাড়িতে কাউকে থাকতে দেয়নি। মা চলে যাওয়ার পর ঘরটা যেন একটা মিউজিয়াম হয়ে গিয়েছিল, যেখানে স্মৃতির ছোঁয়া দেওয়াও নিষেধ। আজ সেখানে হাঁটছে এক অচেনা মেয়ে।
রঘু চা বানায়, রান্না করে, সব দেখে-শুনে রাখে। মেয়েটাকে ঘরে ঢুকিয়ে অনির্বাণ বলে, “এটায়… আমাদের মা থাকতেন।” ইরা চারপাশ খুব মন দিয়ে দেখে—খুব বেশি মন দিয়ে। অনির্বাণ সেটা লক্ষ্য করে। তার বুকের ভিতর কোথাও সাইরেন বাজে, তবু সে চুপ থাকে।
“আপনার মা…” ইরা থামে। “তিনি ভালো মানুষ ছিলেন, তাই না?”
অনির্বাণ মাথা নাড়ে। “সব মায়েরাই তাই।” কথাটা বলতে বলতে তার গলাটা ভারী হয়ে আসে।
রঘু মায়ের পুরনো শাড়ি এনে ইরার হাতে তুলে দেয়। “পরো মা,” রঘু বলে, “এই বাড়িতে আর তো কোনো মহিলা নেই।” ইরা শাড়িটা ধরে। এক মুহূর্ত চোখ ভিজে ওঠে। এই চোখের জলটাই অনির্বাণের ভেতরের দেয়ালে প্রথম ফাটল ধরায়। সে ভাবে—স্পাই হলে কি এমন চোখ হয়?
“আমার নাম… ইরা,” সে ধীরে বলে।
সেই মুহূর্তে অনির্বাণ অকারণে বলে ওঠে, “তুমি এখানেই থাকবে। যতদিন নিরাপদ বোধ করো।” কথাটা বিবেচনার আগেই বেরিয়ে যায়। সে নিজেই চমকে ওঠে। ঋদ্ধিমান দূর থেকে দেখে—কিছু বলে না।
সেই দিন থেকেই ইরা ঘরের মানুষ হয়ে ওঠে। রঘুর পাশে দাঁড়িয়ে রান্না শেখে, ঘর মোছে, জানলায় রাখা গাছে জল দেয়। অনির্বাণ কাজ থেকে প্রতিদিন একটু আগেই ফেরে—যেন কেউ অপেক্ষা করছে এমন ভান করে। সে বুঝতে পারে এই অপেক্ষাটাই তার দুর্বলতা।
একদিন ইরা চা বানাতে বানাতে জিজ্ঞেস করে, “স্যাররা কী কাজ করেন?”
রঘু তাড়াতাড়ি বলে, “ওসব বড়লোকের ব্যাপার মা, আমি কিছু জানি না।” ইরা আর প্রশ্ন করে না, কিন্তু চোখ থামে না।
রাতে, বাড়ি ঘুমিয়ে পড়লে, ইরা নীরবে হাঁটে। ড্রয়ার খোলে। ফাইল ছোঁয়। দরজার তালা বোঝে। কিছু বোঝে, কিছু আন্দাজ করে—সব মনে রাখে। নিজের ব্যাপারে প্রশ্ন এলে সে শুধু বলে, “আমাকে জোর করে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। আমি পালিয়ে এসেছি।”
অনির্বাণ শুনে রেগে ওঠে—কার উপর সে নিজেই জানে না। সে ভাবে, এই মেয়েটাকে আর কখনও কেউ আঘাত করতে পারবে না। আর এই ভাবনাটাই তার সবচেয়ে বড় বিপদ।
রাতে সে মায়ের ঘরে যায়। ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “মা… আমি ওকে বেশি আপন করে ফেলছি না তো?” কোনো উত্তর আসে না। শুধু নীরবতা।
অন্যদিকে ঋদ্ধিমান সিস্টেম চালু করে। ইরার নিউরাল সিগন্যাল স্পষ্ট বলে দেয়—Field trained. Emotion controlled. Mission active. Fear আছে। Attachment নেই।
ঋদ্ধিমান ফিসফিস করে বলে, “তুমি অভিনয় করছো খুব ভালো।”
কিন্তু অনির্বাণ জানে না। সে শুধু জানে—বাড়িটা আর ফাঁকা লাগছে না। আর সেটাই তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
জানলার বাইরে তুষার পড়ে। সেই তুষারের আড়ালে এক জোড়া চোখ এই বাড়ির দিকে স্থির।
7 Comments
শেষ লাইনটার বাক্য যেন সম্পূর্ণ হল না। বিজ্ঞান এবং মানবিক মূল্যবোধের সঠিক মিশ্রণ।
ReplyDeleteThank you
Deleteসাংঘাতিক ব্যাপার। খুব ভালো লাগছে
ReplyDeleteThank you
DeleteThank you
DeleteWait for next episode
ReplyDeleteThank you
Delete