জ্বলদর্চি

বিশ্ব স্কাউট দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

বিশ্ব স্কাউট দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ২২শে ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব স্কাউট দিবস। স্কাউট কি, এর গুরুত্ব এবং তাৎপর্যই বা কি? আসুন এই সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।

স্কাউটিং হলো, তরুণ প্রজন্মের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, বুদ্ধিভিত্তিক ও আত্মিক বিকাশের লক্ষ্যে পরিচালিত বিশ্বব্যাপী একটি অরাজনৈতিক, স্বেচ্ছাসেবী ও শিক্ষামূলক আন্দোলন, ১৯০৭ সালে লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল এটি শুরু করেন। স্কাউটরা নিয়মানুবর্তিতা, চরিত্র গঠন, নেতৃত্ব, এবং সেবামূলক কাজের মাধ্যমে নিজেদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।

বিশ্ব স্কাউট দিবস প্রতি বছর ২২শে ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী উদ্‌যাপিত হয়। এই দিনটি স্কাউট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা Robert Baden-Powell-এর জন্মদিন এবং একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী স্কাউটদের জন্য একটি বিশেষ স্মরণীয় দিন। বিশ্বের কোটি কোটি স্কাউট এই দিনে স্কাউটিংয়ের আদর্শ,শপথ ও নীতিকে নতুন করে ধারণ করার অঙ্গীকার করে।

স্কাউট আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯০৭ সালে ইংল্যান্ডে। Robert Baden-Powell ব্রাউনসি দ্বীপে একটি পরীক্ষামূলক ক্যাম্পের আয়োজন করেন, যেখানে কিছু কিশোরকে নিয়ে তিনি নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, আত্মনির্ভরতা এবং দেশপ্রেমের শিক্ষা দেন। সেই ছোট উদ্যোগই আজ একটি আন্তর্জাতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১৭০টিরও বেশি দেশে স্কাউট কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বিশ্ব স্কাউট সংস্থা, অর্থাৎ World Organization of the Scout Movement (WOSM), আন্তর্জাতিকভাবে স্কাউটিং কার্যক্রম সমন্বয় করে। তাদের লক্ষ্য হলো, তরুণদের নৈতিক, মানসিক ও শারীরিক বিকাশে সহায়তা করা।
🍂

বিশ্ব স্কাউট দিবস শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়,এটি একটি আদর্শ ও মূল্যবোধের স্মরণ দিবস। স্কাউটদের মূলমন্ত্র হলো, “Be Prepared” বা “সর্বদা প্রস্তুত থাকো।” এই মন্ত্র কেবল বিপদের সময় প্রস্তুত থাকার কথা নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও সচেতন থাকার শিক্ষা দেয়।
এই দিনে স্কাউটরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজসেবায় অংশগ্রহণ করে। যেমন,
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি,
রক্তদান ও স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম,পরিচ্ছন্নতা অভিযান, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সহায়তা,এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে।
স্কাউটিংয়ের নীতি ও শপথ
স্কাউটদের তিনটি প্রধান নীতি রয়েছে,
১. সৃষ্টিকর্তার প্রতি কর্তব্য
২. দেশের প্রতি কর্তব্য
৩. নিজের প্রতি কর্তব্য
স্কাউট শপথ অনুযায়ী, একজন স্কাউট প্রতিজ্ঞা করে যে সে সততা, বিশ্বস্ততা ও সহমর্মিতার সঙ্গে জীবনযাপন করবে। স্কাউট আইনও তাদের নৈতিক আচরণের পথনির্দেশ দেয়। সত্যবাদিতা, শৃঙ্খলা, বন্ধুত্ব, সহানুভূতি এবং পরিবেশ রক্ষা,এসব গুণাবলি একজন স্কাউটের বৈশিষ্ট্য।

এই দিনে বিভিন্ন দেশে নানা আয়োজন করা হয়। স্কাউটরা ইউনিফর্ম পরে শোভাযাত্রা করে, বিশেষ সমাবেশের আয়োজন হয় এবং প্রতিষ্ঠাতার জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করা হয়। অনেক জায়গায় ক্যাম্পিং, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়। বিশ্ব স্কাউট দিবস একই সঙ্গে “Founders’ Day” নামেও পরিচিত, কারণ এটি প্রতিষ্ঠাতার জন্মদিন। এই দিনে স্কাউটরা অতীতের সাফল্য স্মরণ করে এবং ভবিষ্যতের লক্ষ্য নির্ধারণ করে।

স্কাউটিংয়ের শিক্ষা ও প্রভাব
স্কাউটিং শুধু একটি সংগঠন নয়,এটি একটি জীবনদর্শন। এখানে বইয়ের পাঠের পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হয়। ক্যাম্পিং, গিঁট বাঁধা, প্রাথমিক চিকিৎসা, আগুন জ্বালানো, মানচিত্র পড়া,এসব দক্ষতা একজন কিশোরকে আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর করে তোলে।
স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে তরুণরা দলগত কাজ, নেতৃত্ব, সময় ব্যবস্থাপনা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন করে। এসব গুণ ভবিষ্যতে তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশ্ব স্কাউট দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তরুণ প্রজন্মই জাতির ভবিষ্যৎ। স্কাউট আন্দোলন তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়। একজন স্কাউট কেবল নিজের উন্নতির জন্য নয়, সমাজ ও দেশের কল্যাণের জন্যও কাজ করে।
আজকের বিশ্বে যখন নৈতিক অবক্ষয় ও বিভাজন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন স্কাউটিংয়ের আদর্শ—সততা, সহমর্মিতা ও সেবার মানসিকতা—অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই বিশ্ব স্কাউট দিবস আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার একটি দিন, যা আমাদের শেখায়—“সর্বদা প্রস্তুত থাকো” এবং মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করা।

Post a Comment

0 Comments