আমার জীবন - ভাষার বিবর্তনের সাক্ষ্য
কমলিকা ভট্টাচার্য
ভাষা আমার কাছে কখনোই শুধু কথা বলার মাধ্যম ছিল না, ভাষা ছিল আমার নিজের ভেতরের ঘর। সেই ঘরের নাম বাংলা। আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা—সবই বাংলা ভাষার মধ্যে। বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়েছি, বাড়িতে বইয়ের লাইব্রেরি ছিল, ছোটবেলা থেকেই বই আমার নিত্যসঙ্গী। বাংলা সাহিত্যের শব্দ, বাক্য, ছন্দ—এসবের মধ্যেই আমি নিজের চিন্তাকে চিনতে শিখেছি। স্কুল ও কলেজে লেখালেখির জন্য পুরস্কারও পেয়েছি। তখন কখনো মনে হয়নি, এই ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা আমার পরিচয়ের অংশ হতে পারে। বাংলা ছিল আমার অনুভূতির প্রথম উচ্চারণ, আমার নীরবতারও ভাষা।
আমার ইংরেজির ভিত তৈরি হয়েছিল বাবার হাত ধরে। বাবা ছিলেন আমার প্রথম ইংরেজি শিক্ষক। তাঁর কাছেই পড়েছি, লিখেছি। ফলে ইংরেজি পড়তে বা লিখতে অসুবিধা হতো না। কিন্তু ভাষা শুধু পড়া বা লেখার বিষয় নয়, ভাষা বলার বিষয়ও। সেই বলার জন্য যে পরিবেশ দরকার, তা আমার ছিল না। তাই ইংরেজি আমার জ্ঞানের ভাষা ছিল, কিন্তু আমার প্রকাশের ভাষা ছিল না। এই ব্যবধান আমাকে প্রথম বুঝিয়েছিল—ভাষা শেখা আর ভাষায় বাঁচা, এই দুটো এক নয়।
বিয়ের পর আমার জীবনে প্রথম বড় ভাষাগত পরিবর্তন আসে। আমি এমন একটি প্রবাসী বাঙালি পরিবারে এলাম, যেখানে হিন্দি ছিল দৈনন্দিন কথোপকথনের ভাষা। আমার হিন্দি জ্ঞান বলতে ছিল কিছু সিনেমা দেখা, আর উচ্চারণে স্পষ্ট বাঙালি টান। কেউ সরাসরি কিছু না বললেও, আমার ভেতরে একটা সংকোচ কাজ করত। মনে হতো, আমি যেন নিজের স্বাভাবিক সত্তা নিয়ে উপস্থিত থাকতে পারছি না। তখন বুঝলাম, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা সামাজিক স্বাচ্ছন্দ্যেরও ভিত্তি।
🍂
এরপর এল বিদেশযাত্রা। প্রথম সিঙ্গাপুর, তারপর মালেশিয়া,অস্ট্রেলিয়া তারপর লন্ডন। প্রতিটি জায়গায় ভাষা আমার সামনে নতুন করে দাঁড়িয়েছে।
সিঙ্গাপুরে বুঝলাম, ভাষা না জানলে আপনি উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত। আপনি শুনছেন, দেখছেন, বুঝছেন—কিন্তু নিজেকে প্রকাশ করতে পারছেন না। নয়ডায় এসে পরিবেশের প্রয়োজনে হিন্দি শিখে ফেললাম। এটি কোনো পরিকল্পিত শিক্ষা ছিল না, এটি ছিল বেঁচে থাকার শিক্ষা। তখন প্রথম উপলব্ধি করলাম, ভাষা মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব কমায়, আবার না জানলে সেই দূরত্ব বাড়িয়েও দেয়।
কিন্তু লন্ডনে গিয়ে আবার নতুন করে শুরু। তাদের ইংরেজি আমার শেখা ইংরেজির মতো ছিল না। উচ্চারণ, ভঙ্গি, গতি—সব আলাদা। প্রথমদিকে কিছুই বুঝতে পারতাম না। তখন আমার ছোট ছেলেকে জিজ্ঞাসা করতাম, তারা কী বলছে। আমার সন্তান, যে আমার কাছ থেকে কথা বলা শিখেছিল, সে-ই তখন আমার ভাষার শিক্ষক হয়ে উঠেছিল। সেখানেই আমার প্রথম চাকরি জীবন শুরু হয়। নতুন ভাষা আমাকে নতুন পরিচয় দিয়েছিল, নতুন আত্মবিশ্বাসও দিয়েছিল।
তবু এই সব ভাষার ভিড়ের মধ্যেও বাংলা কখনো আমার ভেতর থেকে মুছে যায়নি। বাংলা ছিল আমার নীরব ভাবনার ভাষা, আমার নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনের ভাষা।
দেশে ফিরে বেঙ্গালোরে এলাম। আমার ছেলেরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করছিল। তাদের দৈনন্দিন জীবন ইংরেজির মধ্যে, কিন্তু বাড়িতে আমি সচেতনভাবে বাংলায় কথা বলতাম। কারণ আমি জানতাম, মাতৃভাষা শেখানো যায় না, মাতৃভাষা বাঁচিয়ে রাখতে হয়। ভাষা কোনো সিলেবাসের বিষয় নয়, ভাষা একটি পরিবেশ।
আমি চেয়েছিলাম, তারা বাংলা পড়ুক, বাংলা সংস্কৃতি জানুক। সেই ইচ্ছা থেকেই কলকাতায় নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলাম, ভাষাও বদলেছে, সংস্কৃতিও বদলেছে। আমার ছোটবেলার সেই নির্ভেজাল বাংলা এখন অনেকটাই মিশ্রিত। তখন বুঝলাম, শুধু প্রবাসে নয়, নিজের ভূগোলের মধ্যেও ভাষা পরিবর্তিত হচ্ছে।
এরপর পুনে, তারপর চেন্নাই। তাদের স্কুলে বাংলা পড়ার কোনো সুযোগ নেই। বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ আছে, কিন্তু মাতৃভাষা শেখার নয়। ফলে তাদের কাছে বাংলা একটি আবেগের ভাষা, কিন্তু শিক্ষার ভাষা নয়। ভাষা তাদের জীবনে উপস্থিত, কিন্তু কেন্দ্রে নয়—প্রান্তে।
আজ তারা বাংলা বলতে পারে, কিন্তু পড়তে বা লিখতে পারে না।
আর তখনই আমার ভেতরে নিঃশব্দে একটি প্রশ্ন জেগে ওঠে—
তাদের মাতৃভাষা কোনটি?
বাংলা, কারণ এটি তাদের মায়ের ভাষা?
নাকি ইংরেজি, কারণ এটি তাদের শিক্ষার ভাষা, তাদের ভাবনার ভাষা?
নাকি হিন্দি, কারণ সেটিও তাদের জীবনের একটি বাস্তব ভাষা?
তারা বাংলা বলতে পারে, কিন্তু বাংলায় ভাবে কি? বাংলায় স্বপ্ন দেখে কি? কোনো কবিতার একটি লাইন কি তাদের বুকের ভেতর হঠাৎ অকারণ কাঁপন তোলে?
আমি জানি না।
হয়তো তারা সেই একই আবেশ অনুভব করে না, যেটা আমি করি। হয়তো বাংলা তাদের কাছে আমার মতো করে কোনো স্মৃতির ভেতর বেঁচে নেই। কিন্তু এটাও সত্যি, এটি তাদের কোনো সচেতন অস্বীকার নয়। এটি কোনো ইচ্ছাকৃত দূরত্ব নয়। এটি সময়ের, পরিবেশের, এবং বাস্তবতার স্বাভাবিক পরিণতি।
কখনো কখনো তারা বাংলায় কথা বলতে গিয়ে থেমে যায়, শব্দ খুঁজে পায় না। আবার কখনো ইংরেজি বাক্যের ভেতরে হঠাৎ একটি বাংলা শব্দ এসে পড়ে—অপ্রস্তুত, কিন্তু আপন। সেই মুহূর্তে আমি বুঝি, ভাষা হয়তো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। ভাষা মানুষের ভেতরে থেকে যায়, রূপ বদলায়, উচ্চারণ বদলায়, কিন্তু সম্পূর্ণ মুছে যায় না।
বিশ্বায়নের এই সময়ে আমরা সবাই যেন এক বহুভাষিক সত্তা নিয়ে বেঁচে আছি। প্রয়োজনের ভাষা এক, শিক্ষার ভাষা আরেক, অনুভূতির ভাষা অন্য। আমরা এক ভাষায় কাজ করি, অন্য ভাষায় ভাবি, আর হয়তো আরেক ভাষায় অনুভব করি। এই বিভাজন কখনো শক্তি, কখনো নিঃশব্দ ক্ষয়।
হয়তো সেই কারণেই, বহুদিন পর আমি আবার বাংলায় লেখা শুরু করেছি। যখন আমি বাংলায় লিখি, তখন আমি শুধু একটি ভাষায় লিখি না, আমি আমার নিজের কাছে ফিরে যাই।
তাই আজ আর আমি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাই না।
শুধু এই প্রশ্নটুকু আমার সঙ্গে থাকে—
মাতৃভাষা কি শুধু জন্মের সূত্রে পাওয়া একটি পরিচয়,
নাকি এটি সেই ভাষা, যেখানে হৃদয় সবচেয়ে নিঃশব্দে নিজের কথা বলতে পারে?
হয়তো এর উত্তর আমার কাছে নেই।
হয়তো এর উত্তর সময়ের কাছেই রয়ে গেছে।
আর হয়তো মাতৃভাষা আসলে সেটাই—
0 Comments