জ্বলদর্চি

বিশ্বায়নে বিপন্ন মাতৃভাষা/সুমেধা চট্টোপাধ্যায়

বিশ্বায়নে বিপন্ন মাতৃভাষা

সুমেধা চট্টোপাধ্যায়


একটি শিশু জন্মের পর তার মাতৃভাষাতেই প্রথম শব্দ বলতে শেখে এবং শতকরা নিরানব্বই ভাগ ক্ষেত্রেই সেটা হয় 'মা'। বাড়িতেও সে ছোট থেকে মাতৃভাষাতেই কথোপকথন শোনে। এক্ষেত্রে একটা ছোট সমস্যা হয় যখন দুই ভিন্ন ভাষাভাষির মা-বাবা সন্তানের জন্ম দেন। এক্ষেত্রে আমার নিজের চোখের সামনে একটি পরিবারকে দেখেছিলাম তাদের ক্ষেত্রে শিশুটি মা এবং বাবা দুজনের মাতৃভাষাই শিখে গিয়েছিল। খুব আশ্চর্যের ব্যাপার! 
এরপর পরিস্থিতি একদম বদলে যায় স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর। তখন থেকে মাতৃভাষা চলে যায় ব্যাকসিটে। আমাদের প্রজন্মে এমন অনেকবার ঘটেছে যে বাংলায় পড়াশুনো করেই পরবর্তী জীবনে অনেক মানুষ প্রশাসন, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও বিভিন্ন পেশায় সাফল্য পেয়েছেন। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে চাকরি, উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি ও গবেষণার মতো নানা ক্ষেত্রে ভাষা হিসেবে ইংরেজির চাহিদা বেড়েছে। নিজে মাতৃভাষায় পড়াশুনো করে দেখেছি যে, 'ইংরেজি বলতে পারব না" এটা ভেবে নেওয়াটা আসলে একটা মেন্টাল ব্লকেজ। এমনভাবেই এই ভাবনা মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে যে অচিরেই অভিভাবকরা মনে করেন ইংরেজি মাধ্যমেই ভবিষ্যৎ বেশি নিরাপদ। 
🍂

ছোটদের প্রাথমিক শিক্ষা মাতৃভাষায় হলে তাদের কাছে সব বিষয় সহজে অনুমেয় হয়। তারা সহজে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে এবং শেখার ভিত্তি মজবুত হয় ও চিন্তার জগৎ বিকশিত হয়। এরপর ধীরে ধীরে ইংরেজিতে দক্ষতা গড়ে তুললে তারা দেশে-বিদেশের নানা পরীক্ষায় সুযোগ পেতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি নিজের মাতৃভাষাকেই ছোট করি তাহলে ইংরেজি-জানা ছেলেমেয়েদের মনেও হীনমন্যতার জন্ম হয়। এখন সকলেরই মনে হয় যত দামি স্কুল, তত ভালো শিক্ষা এবং দ্রুত পেশায় সাফল্য। এই ধরণের ভাবনা পুরোপুরি অমূলক। ভাষা আমাদের পরিচয়, শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ইংরেজি মাধ্যমে পড়া সত্বেও আমার অভিজ্ঞতায় আমি এমন একাধিক ছাত্র-ছাত্রীকে দেখেছি যারা সঠিক ব্যাকরণে ইংরেজিও বলতে পারে না। আবার মাতৃভাষার মাধ্যমে পড়া একাধিক ছেলে-মেয়ে যেখানে দরকার সেখানে সঠিক উচ্চারণে এবং ব্যাকরণ মেনে ইংরেজি বলে। 

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এক কিলোমিটার হাঁটলেই চারদিকে মাতৃভাষার বিজ্ঞাপন খুবই কম দেখি। মূলত ইংরেজি ভাষারই আধিক্য। চোখের সামনে বিশ্বায়নে মাতৃভাষাকে পিছনে ফেলাই এখনকার সমাজের মূল মন্ত্র। কিন্তু রোজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তাঘাটের সর্বত্র যদি এই মাতৃভাষার 'কিঞ্চিৎ ছোট করা' চোখে পড়ে,  বাঙালি জাতির কাছে এ লজ্জারই বটে। নিন্দুকেরা তর্ক করতেই পারেন যে, বাংলাতেও বিজ্ঞাপন থাকে, কিন্তু খুব ভালো করে যদি আমরা খেয়াল করি তাহলে দেখতে পাব যে, ইংরেজির তুলনায় বাংলার বিজ্ঞাপন সংখ্যায় নগণ্য। 

বিজ্ঞানে গবেষণা পত্র প্রকাশের ক্ষেত্রেও অন্যান্য অনেক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে মাতৃভাষায় পরীক্ষালব্ধ ফল প্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও, বাংলায় বিজ্ঞানের গবেষণাপত্র সেরকম কেউ লেখে না বললেই চলে। এক্ষেত্রেও খানিক সংস্কারবশত:ই আমরা মাতৃভাষায় লিখতে ভয় পাই, যদি আমাদের লোকে ব্যাকডেটেড ভাবে, যদি ভাবে ইংরেজিতে পড়তে হোঁচট খাই! এই জল্পনায় জর্জরিত হয়ে আমরা বাংলা ভাষার থেকে বিজ্ঞানক্ষেত্রে দূরে চলে যাই। 

আদতে কিন্তু ক খ গ -এর সঙ্গে এ বি সি ডি র কোনও বিরোধ নেই। এদের প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে একসঙ্গে শিখে এগিয়ে যাওয়াটাই সময়ের দাবি। ভাষার মাধ্যম যেন শুধু নম্বর তোলার জন্য না হয়ে জীবনের জন্য প্রস্তুতি হয়, যেখানে সহাবস্থানে থাকবে যুক্তিবোধ, মানবিকতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, পরিবেশ সচেতনতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ। মাতৃভাষার সঙ্গে লড়াইয়ে না গিয়ে, তাঁর সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে যদি আমরা শিক্ষার মানোন্নয়ন করি তবেই বাঙালি জাতির সার্বিক উন্নতি সম্ভব। মাতৃভাষায় দৃঢ় ভিত্তি সঙ্গে কাজের কারণে ইংরেজিতে দক্ষতা -এই দুইয়ের মিলনেই পরবর্তী প্রজন্মের উন্নতি সম্ভব, না হলে বিশ্বায়নের দোহাই দিয়ে আমরা অকারণেই তাদেরকে অন্ধকারে ঠেলে দেব।

Post a Comment

0 Comments