জ্বলদর্চি

দেশহীন/কমলিকা ভট্টাচার্য


দেশহীন

কমলিকা ভট্টাচার্য

অচেনা মানচিত্রে আঁকা প্রতিটি নৈকট্য,
বিশেষ করে তোমার দিকে যাওয়ার পথ,
কোনো ভূগোলের বইয়ে নেই,
তবু হৃদয় চিনে নেয় তার গোপন বাঁক।

কখন যে সীমান্ত বদলে যায়
কোনো ঘোষণা ছাড়াই,
কে জানে।

তোমার ওই নিশ্চিন্ত উপস্থিতি—
একটা নিরাপদ দেশের মতো,
যেখানে ক্লান্তি আশ্রয় চায়।
আর আমি,
ভিসাহীন প্রবেশের অপরাধে
নিজেকেই সমর্পণ করি।

ভাবি—
সব আশ্রয় কি নাগরিকত্ব দেয়?
নাকি কিছু ভালোবাসা
শুধুই অস্থায়ী শিবির।

ঋতু বদলের মতোই
একদিন সব পতাকা নেমে যায়,
আর আমি দাঁড়িয়ে থাকি একা—
নিজেরই ভিতরের
দেশহীন মানচিত্রে।


প্লাস্টিকের ফুল

ড্রইংরুমে রাখা
প্লাস্টিকের ফুল—
চিরবসন্তে স্থির।

পাপড়িতে ধুলো জমে,
তবু ঝরে পড়ে না কিছুই।
রঙ ফিকে হয় না,
গন্ধও ছড়ায় না।

অতিথিরা বলে—
কি সুন্দর!
আমি চুপ থাকি।
জানি,
ওদের কোনো মাটি নেই,
কোনো শিকড় নেই।

সত্যি ফুল পারবে কী করে
এই প্রতিযোগিতায়?
তার এইটুকুতেই সুখ—
শুধু ভ্রমর জানে
তার সত্যটুকু।
কী দরকার
মিথ্যা প্রশংসার মধু?

বেঠিকের কাছে

সবাই ভাবে— সেই ঠিক,
কিন্তু বেঠিক বোঝে না
কেন নয় ঠিক।

ঠিক–ভুলের হিসাব কষতে
আমি আসিনি।
আসি—
যখন সব ঠিকগুলো
শ্বাস নিতে দেয় না।

তুমিও শোনাও শোনা গল্প,
আমি শুনি।
আমার নোটে গাছ বলে—
কেউ তোকে জল দেয় না।
আমি কি জানি কেন?

হয়তো আমি গাছ নই তাই,
কারও বাগানের পরিকল্পনায় নেই।
একটার পর একটা কারণ
বেড়া টপকায়,
বৃষ্টিও আসে না নির্দেশ মেনে—
ক্ষরা জমে থাকে বুকে।

তবু দাঁড়িয়ে থাকি—
নিজের শিকড়ের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে।
অপেক্ষা নয়,
শুধু বেঁচে থাকার অভ্যাসে।


অভ্যাসের বাইরে

দীর্ঘক্ষণ
একটি আলোকে দেখি—
যার কোনো নাম নেই।

সে উচ্চারণ ছড়ায়,
আমি শব্দ শুনি না,
শুধু তরঙ্গের দিক বদল পড়ি।

রেখার ভিতরে রেখা,
ভাঁজের ভিতরে নীরবতা—
আমি সেখান থেকে কুড়িয়ে নিই
অল্প উষ্ণতা।

অদৃশ্য এক স্পর্শ
ছাপ ফেলে যায়,
চিহ্ন রেখে যায় না।
কারণ স্থায়িত্ব
অভ্যাস হয়ে যায়,
অভ্যাসে বিস্ময় মরে।

আমি চাই—
প্রতিবার দেখা হোক
প্রথমবারের মতো।
প্রতিটি অনুভব
অপরিচিত থাকুক,
তবেই সে বেঁচে থাকে।

Post a Comment

13 Comments

  1. আহা!! কবিগুরুর সেই বিখ্যাত লাইন মনে পড়ল
    তোমায় নতুন করে পাবো বলে
    হারাই ক্ষণে ক্ষণ.....

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাFebruary 28, 2026

      আমারও মনে পড়ে গেল একটি মানুষের কথা যিনি প্রথম আমায় বলেছিলেন আলোকের ঝর্না ধারার মতন আমার কবিতার ধারা বইছে,আজও তার অনুপ্রেরণা আমার পাথেয়। আপনার এই মতামত ও আমায় দীর্ঘ দিন অনুপ্রাণিত করবে।🙏

      Delete
  2. প্রত্যেক টা কবিতাই দারুন।তবে এর মধ্যে প্লাস্টিকের ফুল সবচেয়ে ভালো লাগলো। গভীর অর্থবহ। নকল সৌন্দর্য যতই কৃত্রিমতায় উজ্জ্বল এবং দীর্ঘস্থায়ী হোক না কেন, আসল সৌন্দর্য যা কিনা পুরোপুরি প্রাকৃতিক, স্বল্পস্থায়ী হলেও মনে দাগ কেটে যায়।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাFebruary 28, 2026

      অনেক ধন্যবাদ

      Delete
  3. না, সব আশ্রয়ে নাগরিকত্ব পাওয়া যায় না। তবে সেটা কাগজে ছাপা নাগরিকত্বও। মনের আশ্রয়ে নাগরিকত্ব পাওয়া খুব কঠিন, আর সেটা মনে আশা ইলিগ্যাল ইমিগ্র্যান্ট রা বেশি পেয়ে থাকে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাFebruary 28, 2026

      একদম ঠিক বলেছেন।অনেক ধন্যবাদ।

      Delete
  4. অভ্যাসের বাইরে - অভ্যাস থাকলে একঘেয়েমি আসবেই। তাই মনের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাকে অভ্যাসের গোলা তেপা থেকে মুক্ত করে মুক্ত বাতাসে বেড়ে উঠতে দিতে হয় - মুক্ত সূর্যের আলোকে সবুজ চারাগাছের মত।

    ReplyDelete
  5. Anonymous
    February 28, 2026
    অভ্যাসের বাইরে - অভ্যাস থাকলে একঘেয়েমি আসবেই। তাই মনের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাকে অভ্যাসের গলা টেপা থেকে মুক্ত করে মুক্ত বাতাসে বেড়ে উঠতে দিতে হয় - মুক্ত সূর্যের আলোকে সবুজ চারাগাছের মত।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাFebruary 28, 2026

      অনেক ধন্যবাদ

      Delete
  6. আপনার সব কবিতাগুলি ই ভালো লাগলো বিশেষ করে শেষ কবিতাটি"অভ্যাসের বাইরে "
    আপনি এই ভাবে আমাদের আপনার রচিত কবিতা দিয়ে আনন্দ দেবেন ,এই আশা করি।ভালো থাকবেন

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMarch 01, 2026

      নিশ্চয়ই চেষ্টা করব।ভালো থাকবেন।
      ধন্যবাদ

      Delete