মাতৃভাষা দিবস
অমর সাহা
মাতৃভাষা রূপখনি পূণ্য মণিজালে – মধুসূদন দত্ত
২১ ফেব্রুয়ারি। মাতৃভাষা দিবস। পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলা ভাষাকে নিয়ে যত আবেগ উচ্ছ্বাস মানুষের চেতন-অবচেতন মনে যে কল্পনাতা মাতৃভাষায় স্ফূরণ ঘটেছে। বিশ্বের ষষ্ঠ মতান্তরে পঞ্চম মাতৃভাষা বাংলা। সারাবিশ্বের ৩২-৩৫ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে।
আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। এ ভাষা বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের বরাক উপত্যকার জনগণের প্রধান কথ্য ও লেখ্য ভাষা। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানের উপর (যা বর্তমানে বাংলাদেশ) পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান) জনগণ চাপিয়ে দিতে চাইছিল। এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জোরালো আন্দোলনের ফলে তীব্র প্রতিবাদী সুর বেজে ওঠে শেষমেষ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে।
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে পালন করা হয়। বাংলাভাষা আন্দোলন ছিল ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত। পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচালিত একটি আন্দোলন। পাকিস্তান সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে দাবি করেন। ছাত্র-জনতা যখন আন্দোলন করছিলেন সেই সময় পুলিশ গুলি চালালে আব্দুল জব্বার, আব্দুল সালাম, রফিকউদ্দিন আহমেদ, আবুল বরকত, শফিউর রহমান শহিদ হন। এরফলে ভাষা আন্দোলন আরও জোরালো হয়। পাকিস্তান ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এই আন্দোলনকে স্মরণ করে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এই আন্দোলন বাঙালির জাতীয়তাবোধ ও স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত রচনা করে। শহীদদের স্মরণে ঢাকায় মেডিক্যাল কলেজের কাছে শহিদ মিনার নির্মাণ করা হয়।
বাংলা ভাষাকে নিয়ে আসামের বরাক উপত্যকায় ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে আন্দোলন হয়। আসামের বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন হয় ১৯ শে মে ১৯৬১ সালে পুলিশের গুলিতে ১১ জন বাঙালির শহিদ হন। এরপর আসাম সরকার বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হোন।
আর পুরুলিয়া আন্দোলন ছিল ১৯৬১ - ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলাকে বিহারের সঙ্গে যুক্ত করার বিরুদ্ধে আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল পুরুলিয়াকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করা এবং বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৬৩ সালে পুরুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয় ও বাংলাভাষা সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে।
২০০০ খ্রিস্টাব্দে থেকে বিশ্বের ১৮৮ দেশ মাতৃভাষা দিবস পালন করে। ভারতে স্বাধীনতার পরে রাজ্যগুলির গঠন হয়েছে ভাষাকে কেন্দ্র করে। বহুভাষিক দেশ ভারত। ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং বহুভাষিকতার জন্য প্রতিবছর মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা, ভাষাগত বৈচিত্র্য উদযাপন এবং সাংস্কৃতিক পেক্ষাপটকে তুলে ধরা হয়। মাতৃভাষা সেই ভাষা যা আমরা শৈশবে মায়ের কাছ থেকে শিখি। এটি আমাদের প্রথম ভাষা এবং আমাদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্গত। এ ভাষার জন্ম হাজার বছরেরও বেশি। ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা। বর্তমান এ ভাষা ধ্রুপদী মর্যাদা পেয়েছে। তাছাড়া এ ভাষাতেই লিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এশিয়া মহাদেশে প্রথম নোবেল পুরস্কার এনে দিয়েছিলেন। ‘মোদের গরব মোদের আশা আমরি বাংলা ভাষা’ অতুলপ্রসাদ সেনের গানটি বাঙালির মর্মে মর্মে ঢুকে পড়েছে। ‘মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ’ বলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন। আজ স্বাধীন বাংলাদেশ সমস্ত কাজকর্মের কান্ড চলেছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যেভাবে ভাষা সন্ত্রাস চলছে তাতে বোধ হয় বাঙালির বিকাশ অনেকটা ক্ষুণ্ণ। যেন বাংলাভাষাকে নিয়ে খিস্তি খেউর চলছে। তাছাড়া ভিন্ন ভিন্ন রাজ্য ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ভারতীয় ঐতিহ্য ত্যাগ ও অহিংসার। ফলে সেই ঐতিহ্য ভুলে একশ্রেণির মানুষ উগ্রজাতীয়তাবোধ উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলা ভাষায় কথা বললে মেরে ফেলছে। যেন সেই ট্রাডিশন সামনে চলেছে। বাঙালি ভাষাকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা লাভ করে। সেই বাংলা ভাষায় কথা বললে অন্য রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের মেরে ফেলা হয়। এ এক ধরনের অসহিষ্ণুতা। এই অসহিষ্ণুতা চলতে থাকলে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য লক্ষিত হবে। দেশের আভ্যন্তরীণ পরিবেশ নষ্ট হয়। এরজন্য স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রনেতাদের জুরুরিভিত্তিকে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করা। দেশ ও জনগণের সুরক্ষা রক্ষা করা। কারণ ভাষাগত মেরুদন্ডই আমাদের জাতীয় মেরুদন্ড। জগৎ সেবাই আমরা আবার সবার উপরে আসন পেতে পারি।
0 Comments