আবীর ভট্টাচার্য্য চক্রবর্তী
সে যে যায়না কভু দূরে…
সৃষ্টির প্রত্যুষকাল থেকেই ভাষা মানুষের প্রকাশ মাধ্যম। আশৈশব তার চিন্তা-ভাবনা,জাগৃতি-বোধ, সংস্কৃতি ও আত্মানুসন্ধানের স্মারক হল তার মুখের ভাষা। সেই কোন গুহাবাসকাল থেকে আজও এই স্বর-মাধ্যমেই তার আজীবনের উন্নয়ন, প্রকাশ ও অগ্রগতি। এবং স্বাভাবিকভাবেই জন্মদিন থেকে পরিচিত পরিবেশে প্রিয়মানুষদের ব্যবহৃত ভাষাতেই সে তার প্রাত্যহিক কাজে কর্মে অধিকতর স্বচ্ছন্দ।তাই মাতৃভাষার সুষম বিকাশের মাধ্যমেই যে একটি জাতির সার্বিক কল্যাণ সাধন হয়, একথা আজ প্রমাণিত।
রবীন্দ্রনাথ সার্থকভাবেই বলেছিলেন, “মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধবৎ”।
বিপরীতে মাতৃভাষা সহ যে কোন ভাষার অপব্যবহার, অবহেলা,অবক্ষয় বা অবমূল্যায়নের অর্থ শুধু স্বাধীনভাবে কথা বলার মাধ্যম হারানো নয়—একটি জাতির ইতিহাস,চেতনা,সংস্কৃতি,মূল্যবোধ ও আত্মপরিচয়েও গভীর ক্ষত ও সংকট সৃষ্টি করা।
ভাষাদিবস সম্পর্কে আলোচনা শুরুর আগে এই কথা কয়টি আমাদের অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন। কারন, পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার চাইতে বাংলাভাষার স্বাভিমান আলাদা। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো ভাষাকেই হয়তো এমন সুখমাধুরী বা দুখবিষাদের অসহায় বিরহভার বহন করতে হয়নি।
ইতিহাসের দিকে চোখ রাখলে দেখতে পাই, এক দুরূহ সংগ্রামের পরে ভাষার অধিকার আমরা পেয়েছি।ভাবতে অবাক লাগে,যে ভাষা-সাহিত্য সৃষ্টির কল্যাণে এশিয়া মহাদেশের প্রথম নোবেল পুরস্কার আমাদের প্রাপ্তি; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল, জীবনানন্দের মতো কবি তাঁদের জীবনভর কবিকৃতির জন্য যে ভাষা ব্যবহার করেছেন,তাকেও তার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে মরণপণ করতে হয়েছে!
আরও বিশদে বললে,স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে, পাশ্ববর্তী পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তাদের মাতৃভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ফলস্বরূপ ছাত্রসমাজ,বুদ্ধিজীবী,সাধারণ মানুষের সম্মিলনে এক আবেগদীপ্ত আন্দোলনে দেশ উত্তাল হয়ে পড়ে।
🍂
শাসকের দমনপীড়ন যতো বাড়ে,আন্দোলনের তীব্রতাও মাত্রাছাড়া হতে থাকে, ক্রমে তা স্কুল কলেজের ছাত্রমন্ডলীকেও প্রভাবিত করে। এবং ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির সকালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ও মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রসহ একদল
নিরস্ত্র নাগরিকবৃন্দের শান্তিপূর্ণ মিছিল ১৪৪ ধারা ভেঙে বিক্ষোভে নামলে খাজা নাজিমুদ্দিন সরকারের পুলিশ তাদের ওপরে গুলি চালায়।মারা যান আব্দুল সালাম, রফিক উদ্দিন আহম্মেদ,সফিউর রহমান,আব্দুল বরকত এবং আব্দুল জব্বারের মতো তরুণ প্রাণ। দেশের অন্যত্রও বিক্ষোভ সংঘটিত হয়, বহু প্রাণ ঝরে, সারা বিশ্বের শুভকামী মানুষেরা এই প্রতিবাদে ও আন্দোলনে সহমর্মিতা প্রকাশ করেন,গর্জে ওঠেন। ফলস্বরূপ ভাষা তার প্রাপ্য অধিকার ফিরে পায় ১৯৫৬ সালে,এবং এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতাতেই পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। সর্বোপরি ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, পৃথিবীর ইতিহাসে যা তুলনারহিত। সেই থেকে প্রতিবছর মহাসমারোহে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয় সর্বত্র।”অমর একুশে”-এর নাম আজ কে না জানে!
এতো গেল, ইতিহাসের কথা। কিন্তু এতো সংগ্রামলব্ধ উপহারের মূল্য কি আমরা রাখতে সক্ষম?
বিশেষতঃ বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই যখন আপনার ভাষাকে সর্বাঙ্গীণ স্বীকৃতি দিয়েছে,এমন কি আমাদের দক্ষিণের রাজ্যগুলিও তাদের দেশীয় ভাষায় সবরকম কাজকর্ম সম্পন্ন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আমাদের রাজ্যে বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে চুড়ান্ত অনীহা!
বিশেষতঃ তরুণ প্রজন্ম তাদের প্রাত্যহিক জীবনে ভাষা ব্যবহারে জগাখিচুড়ি এক সংস্কৃতির প্রচলন শুরু করেছে, লজ্জা ও বেদনায় মাথা নিচু হয়ে যায়।
কে বলবে,এদেরই পূর্বপ্রজন্ম শুধুমাত্র মুখের ভাষার সম্মানরক্ষায় প্রাণবলি দিয়েছে! এরা বুঝবে কবে যে বাইরের ঢক্কানিনাদ নয়, সংস্কৃতি বেঁচে থাকে উৎসের প্রতি সম্মানে, ঐতিহ্যের আত্মপরিচয়ের দৃঢ়তায়।
পরিচয়ের ক্ষতি, ইতিহাসের বিলুপ্তি, বৈচিত্র্যময় তথ্যানুসন্ধানে যদি সমন্বয় না থাকে, কখনও কোনও জাতিসত্তা জাগরিত হয়না, ইতিহাস আমাদের একথাই শিখিয়েছে। সুতরাং,ভাষাদিবসের দিন অথবা নববর্ষের দিন দুধসাদা পাজামা-পাঞ্জাবী বা লাল পাড় সাদা শাড়ীতে সেজে বাংলা গান গাইলেই ভাষাদিবস বা বাঙালীয়ানার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো হয় না,তাকে গ্রহণ করতে হয় নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের আলিঙ্গনে প্রমত্ত শ্রদ্ধায়।
তা নাহলে এতো কষ্টসাধন ব্যর্থ হয় যে!...
তবে, শুধুমাত্র হাহাকার কখনও কোনও সমস্যার সমাধান আনে না। সমস্যার উৎসমূলে গিয়ে আমরা দেখি, বর্তমানের তরুণ সম্প্রদায় কয়েকটি ভয়ানক মানসিক অসুখে আক্রান্ত।
প্রথমতঃ. বিদেশি ভাষার অতিরিক্ত ও অনাবশ্যক প্রভাবে নিজেকে বেশী যোগ্য প্রমাণের জন্য নিজের ভাষার সুললিত শব্দ থাকা সত্ত্বেও অকারণে বিদেশি শব্দ ব্যবহার করে চলেছে। এতে ভাষার মানহরণ হয়।
দ্বিতীয়তঃ. শিক্ষার মানের অবনতি:ভাষার সঠিক ব্যাকরণ, বানান ও প্রয়োগ শেখার সুযোগের খানিক ঘাটতি হওয়ার জন্য ভাষার শুদ্ধ ব্যবহারও কমে যায়।
তৃতীয়তঃ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুল ভাষার ব্যবহার,সংক্ষিপ্ত, বিকৃত বা ভুল বানানের ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা ভাষার শুদ্ধ রূপকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
চতুর্থতঃ কথ্য ভাষার অতিরিক্ত প্রাধান্য সমস্ত মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় সাহিত্যিক বা শুদ্ধ ভাষা শিক্ষার পরিবর্তে অতি আঞ্চলিক বা বিকৃত কথ্যভাষার ব্যবহার বেড়ে ভাষার মান হ্রাস হয়।
পঞ্চমতঃ সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চার অভাব।ভাষার উন্নতির জন্য সাহিত্য, বই পড়া ও সংস্কৃতিচর্চা জরুরি। পারিবারিকভাবে যদি এগুলি পুষ্ট না করা হয়, ভাষার অবক্ষয় রোধ করা যাবে না।
সবশেষে আশার কথা,কালোর মধ্যেও তো আলো জ্বলে।চারিদিকের এই বহুধাবিভক্ত লঘুচাপের চটুল বলয় এড়িয়ে কিছু তরুণ এখনও একনিষ্ঠভাবে মাতৃভাষার চর্চা ও ব্যবহারে মনোযোগ দিয়েছেন, তৈরি হচ্ছে সমৃদ্ধ সাহিত্য,গান, সিনেমা, কবিতা ও ছোটগল্পের অঞ্জলী,ফুটছে ছোট্ট ছোট্ট কথাফুল। জনপ্রিয় হচ্ছে শুদ্ধ ভাষাচর্চা।
খুব আশা করি,তাদের দেখে আরও কিছু জন এগিয়ে আসবেন,তার পেছনে আরও, আরও…
হয়তো এভাবেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তার স্বকীয়তা রক্ষার প্রতিজ্ঞায় সফল হবে।শেষ করি কয়েকটি স্বকীয় স্বরচারণের প্রণামে,
শহীদের পদচিহ্ন বেয়ে, রক্ত ঝরে আজও
ভাষাদিবস! তরুণ প্রাণের শপথ গানে বাজো
ফেব্রুয়ারীর একুশ এক আদর্শ সম্ভ্রম
পর্ণমোচী হলুদ পাতা,পলাশ বনে রঙ
ভাষা থাকুক হৃদয় জুড়ে
আলো পথের দিশা
অক্ষর তো ঝড়ের পাখি, মুক্তি অন্বেষা।
মায়ের আদর,ভায়ের প্রীতি,ভাষার সঞ্চয়।
বিপ্লবে আর আন্দোলনে,অধিকারের জয়।
মুখের ভাষা,জাগর নেশা, ইচ্ছে-ধনে নত
বিনা আয়োজনের দায়ে,বোধি প্রতীক্ষিত।
0 Comments