জ্বলদর্চি

আমি বাংলায় কথা কই​/আলোকরেখা চক্রবর্তী


আমি বাংলায় কথা কই

​আলোকরেখা চক্রবর্তী


​ভাষা শুধু শব্দ নয়,
ভাবনার মূলাধার।
হৃদয়ের সাথে হৃদয় জোড়া
ভাষার কারবার।
​ভাষা শুধুমাত্র কিছু শব্দের সমাহার তা নয়, বলা ভালো ভাষা মানুষের জীবন। আরও বিশদে বলা যায় বিশ্বব্যাপী এই যে বিশাল মানব বন্ধন গড়ে উঠেছে, এগিয়ে চলেছে মানব সভ্যতা এর মূল কৃতিত্ব অবশ্যই ভাষার। তবে এখানেই সীমাবদ্ধ নয় আরও অনেক ক্ষেত্রে ভাষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তাই ভাষার সাহায্যে গড়ে ওঠে জনজাতির স্বতন্ত্র পরিচয়। অর্থাৎ ভাষাকে নিয়ে জোর দিয়ে বলা যায়,
​ভাষা দিয়ে যায় চেনা—।
​ভাষা যেমন মিথষ্ক্রিয়ায় জনজীবনে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করে একইভাবে সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। সংস্কৃতির এই ধারা ভাষাসংস্কৃতি নামে পরিচিত এবং এই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলি হলো ব্যাকরণ, লোককথা, লোকগান ইত্যাদি। ব্যাকরণের মধ্যে প্রবাদ-প্রবচন, বাগধারা ইত্যাদির সাহায্যে একটি সমাজের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে অনেক কিছু জানা যায়। আলোচনার সুবিধার্থে উদাহরণ স্বরূপ কয়েকটি বাগধারা এখানে দেওয়া হল, যেমন— অতি দর্পে হত লঙ্কা, অগস্ত্য যাত্রা, ইন্দ্রের শচী আর যে গুলির সাহায্যে পৌরাণিক কাহিনী এবং সমাজে তাদের প্রভাব কতটা ছিল তা বোঝা যায়। এভাবেই খনার বচন যেমন— উদাহরণ স্বরূপ, 'যদি বৃষ্টি মাঘের শেষ / ধন্য রাজা পুন্য দেশ'।
​কিংবা গ্রাম্য অথচ শিক্ষণীয় প্রবাদ যেমন,
​ইঙ্গিতে পণ্ডিত বোঝে
মূর্খ বোঝে কিলে
পাড়াপড়শি বোঝে
চোখে আঙুল দিলে।
​এসবই তৎকালীন সমাজব্যবস্থা সম্বন্ধে জানতে ও বুঝতে অনেকটাই সাহায্য করে। আর লোককথা বা লোকগাথা তো কালোত্তীর্ণ। কখনো কখনো আবার একটি শব্দ বা একটি বাক্যই জাতির পরিচয় প্রদানে সক্ষম হয়ে ওঠে যেমন বাংলার মঙ্গলাচরণে 'উলুধ্বনি' কিংবা 'মাছে ভাতে বাঙালি'। অর্থাৎ এটা সুষ্পষ্ট ভাবে ধরা পড়ে মাতৃভাষা মানুষের স্বকীয় পরিচয় গড়ে তুলতে সক্ষম। তাই তো কবি বলেন,
​"আ মরি বাংলা ভাষা!"
তাই তো মাতৃভাষা নিয়ে গর্ব করে বলা যায়,
​পৃথিবীর সব ভাষা শ্রেষ্ঠ,
সব ভাষাই দামি,
মানুষের সমান মাতৃভাষা,
সবচেয়ে মধুর তার ধ্বনি।
​কিংবা
​বাংলা আমার বুকের ভাষা
বাংলা আমার গান
দুঃখ সুখ তোমাকে ঘিরে
বাঁচার অভিমান।
​মাতৃভাষা নিয়ে গর্বের শেষ নেই, আবেগেরও শেষ নেই। যদিও এ গর্ব সমস্ত বাঙালির যাদের মাতৃভাষা বাংলা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী পৃথিবীর প্রায় চার শতাংশ মানুষ এই ভাষায় কথা বলে ও একটি দেশ ছাড়াও ভারতের দুটি রাজ্যের  মাতৃভাষা বাংলা।এছাড়াও ভারতের বেশ কয়েকটি অঞ্চলের মাতৃভাষা বাংলা। যদিও বিস্তৃতি  নয় বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি ভাণ্ডারই বিশ্বপরিচিতি দিয়েছে।
যে ভাষার সমৃদ্ধিভাণ্ডারে আছে নোবেল পুরস্কার। ১৯১৩ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্যের(ইংরেজি অনুবাদ )জন্য এই পুরস্কার পান। এই আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে অতুল প্রসাদ সেন কালজয়ী সেই গান 'আ মরি বাংলা ভাষা' রচনা করেছিলেন।
​তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এত সম্মান, এত ভালোবাসার পরেও বাংলাভাষা সুরক্ষিত থাকতে পারেনি। সেই সময় পরাধীন ভারতে বহু বিদেশী ভাষার সমাবেশ ঘটেছিলো তার মধ্যে রাজকীয় ইংরেজি ভাষার আভিজাত্যের আকর্ষণে মানুষ মাতৃভাষার প্রতি বিমুখ হয়ে ইংরেজিতে ঝুঁকেছিলো।
🍂

​কিন্তু চরম আঘাতগুলো এসেছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। কারণ ভাষা তো কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, মাতৃভাষায় বেঁচে থাকা আমাদের মৌলিক অধিকার।আর এই অধিকার ধরে রাখার জন্য অকালে ঝরেছে কত তাজা প্রাণ।
​সাল ১৯৫২, পূর্ব পাকিস্তানে (অধুনা বাংলাদেশ) জোর করে চাপিয়ে দেওয়া উর্দু ভাষার বদলে তাদের মাতৃভাষা বাংলার সরকারি স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিল বাংলা প্রেমী মানুষ। ঘটে গেলো এক হৃদয় বিদারক ঘটনা।আন্দোলন চলাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ নৃশংস ভাবে গুলি চালায়। ফলস্বরূপ পুলিশের গুলিতে রফিকউদ্দিন আহমেদ, আব্দুস সালাম, আব্দুল জব্বার, আব্দুল বরকত এবং শফিউর রহমান শহীদ হন।  তাঁদের রক্তে পুনরুজ্জীবিত হয় বাংলাভাষা।
ভাষার জন্য এরূপ আন্দোলন কেবল বাংলাদেশে নয় ভারতেরও দু জায়গায় হয়েছিল। একটি হয়েছিল অসমের বরাক উপত্যকায়। ১৯৬১ সালে বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে এই ঐতিহাসিক আন্দোলন সংগঠিত হয়। ঐ সালের ১৯ মে একই ভাবে ১১ জন আন্দোলনকারী পুলিশের গুলিতে মর্মান্তিক মৃত্যু বরণ করেন। তবে তাঁদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি, বরাক উপত্যকায় বাংলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
​আরেকটি হয়েছিল মানভূমে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন। শুরু হয় ১৯১২ তে এবং শেষ হয় ১৯৫৬ তে।
​স্বস্তির বিষয় প্রতিটি আন্দোলন সার্থক ছিল, সফল হয়েছিল, সুরক্ষিত হয়েছিল বাংলা ভাষার অধিকার। এবং সম্মানের বিষয় প্রথম ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রচলন করেন। সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর, আর পালন শুরু ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী থেকে।
​এখন ভাববার বিষয় যে এত কিছুর পরেও কি আমরা যথাযোগ্য মর্যাদায় বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছি মাতৃভাষা বাংলাকে? হয়তো শুধু বাংলা নয় বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তর্জালের আবর্তে সব ভাষাই আজ বড় টলমল, বিপন্ন। জীবন-জীবিকার লড়াইয়ে গতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে মানুষ সংক্ষিপ্ত পথ বেছে নিচ্ছে। তাই তো 'Good Night'-এর পরিবর্তে 'gdn8' বা 'btw'—এই সমস্ত মোবাইল ভাষার প্রতি তারা দ্রুত আকৃষ্ট হচ্ছে। এই বিপন্নতা থেকে মুক্তি পেতে চায় সবাই। তাই ২০২৬ এর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের থিম: "বহুভাষিক শিক্ষার উপর যুবসমাজের কণ্ঠস্বর" (Youth voices on multilingual education - UNESCO)। বহুভাষিক শিক্ষা অর্থাৎ দুই বা ততোধিক ভাষায় শিক্ষাদান পদ্ধতি। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে অবশ্যই মাতৃভাষার প্রাধান্য থাকবে পরবর্তী স্তরে অন্যান্য ভাষাগুলি যুক্ত হবে। এর প্রধান উদ্দেশ্য মাতৃভাষার প্রতি জ্ঞান শ্রদ্ধা বৃদ্ধি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে বিশ্ব আঙিনায় নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া।
​এই শুভ উদ্যোগগুলি মনে করিয়ে দেয় ভাষা দিবস পালন কতটা জরুরী। কারণ পালন বছরে একদিন হয় ঠিকই কিন্তু পর্যালোচনা সারা বছর ধরে হয়।তবে সর্বজনীনভাবে বাংলাভাষা তথা মাতৃভাষা টিকিয়ে রাখতে হলে উদ্যোগ নিতে হবে অন্দরেও। মাতৃভাষার পরিসর বাড়ানোর দায় সরকারের সাথে সাথে আমাদের সবার। যে ফলপ্রসূ উদ্যোগগুলি পূর্বে বারংবার আলোচিত হয়েছে যেমন মাতৃভাষায় উচ্চমানের পাঠ্যপুস্তকের জোগান, সরকারি কাজে মাতৃভাষার সম্মানজনক ব্যবহার, নানা ধরনের প্রতিযোগিতা—গল্প বলা, গল্প ও কবিতা লেখা সেগুলির উপর নিবিড়ভাবে জোর দিতে হবে।
​পরিশেষে আবার বলতে ইচ্ছে করছে যে মাতৃভাষার বিকল্প হয় না যেমন হয় না মায়ের অপার মমতার।তাই আমরা অঙ্গীকার করব নিজের কাছে যে আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষাকে কোনোদিন হারিয়ে যেতে দেব না, মাথা উঁচু করে চিরকাল বলব—
​আমি বাংলায় কথা কই
আমি বাংলায় কথা কই
আমি বাংলায় ভাসি, বাংলায় হাসি
বাংলায় জেগে রই।
(প্রতুল মুখোপাধ্যায়)

Post a Comment

0 Comments