জ্বলদর্চি

দর্শনের আলোকে/নবম পর্ব/স্বাতী ভৌমিক

দর্শনের আলোকে
নবম পর্ব

স্বাতী ভৌমিক 

               
           ( মননে মুক্তি )

 জীবের বদ্ধ দশার কারণ সে নিজে। নিজের অজান্তে হোক বা জেনেই সে নিজেকে বেঁধে ফেলে বাঁধনের ঘেরাটোপে। আত্মা মুক্ত, জীবন মুক্ত- স্বাধীন, এদের কখনো বেঁধে রাখা যায় না। তবুও এই জড় জগতে জড়চিন্তায়  চেতনা হয় অবহেলিত। যখন ব্যাক্তি মুক্তির আকাশ খোঁজে, তখন তার বোধ হয় অনিত্যের মাঝে নিত্যতার মুক্ত বিচরণ- তখন সে মুক্তি পায়- মুক্ত চেতনার মুক্ত বাতায়নে।

 অনিত্য জিনিসের প্রাপ্তি আশায় আমরা জীবেরা শাশ্বত এর অনুসন্ধান করি না। মনকে বন্ধু বানালে জীবন অনেক সহজ হয়। তবে তার আগে এই অতীন্দ্রিয় মনকে একটু সুচেতনা সমৃদ্ধ করার প্রয়োজন হয়। কিভাবে- কোথা থেকে আসে এই সুচেতনা? আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে আসে এই সুচেতনা।

 ইহজাগতিক ভোগলিপ্সাতে নিজের অজান্তেই মানুষ নিজের দুঃখের পরিমণ্ডল রচনা করে। নিজের অন্তরস্থিত সুখসমুদ্রের খোঁজ যদি পেয়ে যায়, তাহলে ব্যক্তি বাহ্যজগতে তার বৃথা অন্বেষণ থেকে বিরত থাকে। এই মহাবিশ্ব যেমন বৃহৎ- রহস্যময়, ব্যক্তির অন্তর জগত তার তুলনায় নেহাৎ নগণ্য কিন্তু নয়। তেমন করে অন্তরদৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখলে সেই রহস্যঘন অন্তর জগতের রহস্য ব্যক্তি জানতে পারে। আর তখন ব্যক্তির কাছে ইহজাগতিক সকল সুখ দুঃখের হিসেব অনেকাংশে বৃথা বলে মনে হয়। ব্যক্তি অসীম আনন্দের সাগরের সন্ধান পেয়ে যায়। অন্তর জগতে অন্তঃস্থিত যে আনন্দ তা এই বাহ্যিক জড় চাওয়া- পাওয়ার জগতের অস্থায়ী আনন্দ থেকে অনেক অনেক আলাদা। বাহ্যিক চাওয়া- পাওয়ার ভিড়ে মানুষ প্রায়ই নিজেকে- নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলে। কিন্তু অন্তর জগতে ডুব দিলে ব্যক্তি সেই স্বচেতনার আলোকে নিজের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারে। নিজেকে এক অন্য "আমি" রূপে দেখতে পায়। যে "আমি" কখনো হারিয়ে যায় না- অক্ষয়, অব্যয়, শাশ্বত ও সচেতন সত্তা।

 জড় জগতে অনন্ত চাওয়া- পাওয়ার মাঝে ব্যক্তি শান্তি পায় না। এক চাওয়া পূরণ হতে না হতেই আরেক চাওয়া এসে হাজির হয়। ব্যক্তি দুঃখের মাঝে সুখ অনুসন্ধান করে- অপূর্ণের বাতাবরণে পূর্ণতার আস্বাদ খুঁজে,  অবশেষে বিফল হয়ে দুঃখ সাগরে নিমজ্জিত হয়।

 নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ অনুভব করার জন্য এই জড়জাগতিক কোন বিষয়ের স্বীকৃতি লাগে না, নিজের স্বপরিচয়-ই যথেষ্ট। তবে স্বপরিচয় অহংকারদৃপ্ত আত্মম্ভরিতা নয়, তা হোলো নিজে নিজেকে চেনা, নিজেকে জানা, নিজের প্রকৃত "আমি" কে উপলব্ধি করা। জড় কোলাহল- মুখরতা থেকে দূরে না গেলে নিজের অন্তরের স্নিগ্ধ শান্ত ভাব অনুভব করা যায় না। চোখ ঝলসানো জাগতিক চাকচিক্যের দিকে তাকিয়ে জীবন অতিবাহিত করলে অন্তরের অলৌকিক চেতনাসমৃদ্ধ আলোক দেখা সম্ভব হয় না। তাই নিজের সাথে নিজের শত ব্যস্ততার মাঝেও দেখা হওয়াটা খুব জরুরী।
🍂

 এই হতাশাক্লিষ্ট সুউন্নত জীবন- যাত্রার মাঝে ব্যক্তি মন হয়তো ক্ষণিক সুখের সন্ধান পেতে পারে, কিন্তু শান্তির স্নিগ্ধ বাতাবরণে মনের ক্লান্তি মেটানোর জন্য চাই, নিজের সাথে নিজের সাক্ষাৎ
 -আত্মসাক্ষাৎ।

 ব্যক্তি ভাবে, এই ক্ষুদ্র জীবনে কত তাড়াতাড়ি সে তার কাঙ্ক্ষিত বিষয় সামগ্রীকে আহরণ করে নিজেকে তৃপ্তি প্রদান করবে। কিন্তু কে বলেছে, জীবন ক্ষুদ্র! প্রকৃত জীবন তো অনন্ত- অসীম। তবে হ্যাঁ, জড় শরীর তো আত্মা বা চেতনার কর্মের মাধ্যম, জড় কামনাতে আবদ্ধ না থেকে ব্যক্তি যত তাড়াতাড়ি আত্ম উপলব্ধি করতে পারে,তত তাড়াতাড়ি সে তার আনন্দময় জীবনের সন্ধান পেয়ে যায়। তখন ব্যক্তি মনে হতাশার ঘন অন্ধকার আর জ্ঞানালোকে তথা চেতনালোকে সমৃদ্ধ মনের ঘর অন্ধকার করতে পারে না। ব্যক্তি কোন জড় বিষয় প্রাপ্তি ছাড়াই নিজের মধ্যে অপার শান্তি অনুভব করতে পারে। আর তখনই ব্যক্তির আত্মসাক্ষাৎকার ঘটে। এই আনন্দ- শান্তি, অতুলনীয়- অনির্বচনীয়। একমাত্র আত্মসাক্ষাৎ লাভকারী ব্যক্তিই জানে এর মহিমা। 

 মনের চাওয়া-পাওয়ার স্রোতকে বিবেকের আলোকে পর্যালোচনা না করে সেই স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া কি বিবেকবোধ- সম্পন্ন মানুষের উচিত কর্ম!জাগতিক মায়া- মোহ জড় 
ইন্দ্রিয়কে প্রলুব্ধ করবেই কিন্তু বিবেক চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে সেই মনকে মননের আঙিনায় আনতে হবে। তখন মন বন্ধু হয়ে যাবে। বদ্ধদশা থেকে মুক্ত হয়ে মানবমন মুক্তির খোলা আকাশের মাঝে গিয়ে উপস্থিত হবে।

 মননেই মুক্তির প্রেক্ষাপট রচিত হয়।মন যখন মননের অনুরণণে অনুরণিত হয়, তখনই মনের ঘরে শান্তির পরিবেশ রচিত হয়। ব্যক্তির বদ্ধদশা তখন অপসৃত হয়, ব্যক্তি মনোজগতে অপার শান্তি অনুভব করে।। 

 ক্রমশঃ....

Post a Comment

0 Comments