পর্ব ৩
প্রীতম সেনগুপ্ত
যে ব্রহ্মসূত্র বিষয়ে এই ধারাবাহিক রচনায় প্রয়াসী হওয়া, সেই ব্রহ্মসূত্র আদতে কী? এইভাবে যদি সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তাহলে এটাই বলার বা জানার তা হল --- ব্রহ্মবিদ্যা শাস্ত্রের নাম উপনিষদ্। সেখানে অনেক দুর্বোধ্য কথা আছে। মহর্ষি দ্বৈপায়ন উপনিষদ বুঝাবার জন্য একখানা সূত্রময় ব্যাখ্যা রচনা করেন। সেইসব সূত্রসমূহের নামই হল ব্রহ্মসূত্র বা বেদান্তসূত্র। আচার্য শঙ্করের গুরু স্বামী গোবিন্দপাদ তাঁকে বলেছিলেন যে দ্বাপর যুগের শেষে ব্রহ্মবিদ্যা লুপ্ত হবার উপক্রম হলে ভগবানের অবতার মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন তা রক্ষা করেন। গুরু পরম্পরায় সেই বিদ্যা তিনি লাভ করেন এবং বৌদ্ধ বিপ্লবের পর বেদ--উদ্ধারের জন্য তিনি (আচার্য শংকর) আবির্ভূত হলে তাঁকে সেই বিদ্যা প্রদান করতে গুরু কর্তৃক আদিষ্ট হন। তাই সহস্র বৎসর শঙ্করের অপেক্ষায় তিনি (স্বামী গোবিন্দপাদ) গুহায় সমাধিমগ্ন ছিলেন! গোবিন্দপাদ বেদের মতানুসারী ব্রহ্মসূত্রের একটি ভাষ্য রচনা করার নির্দেশ দেন শিষ্য শঙ্করকে এবং আশীর্বাদ করেন ব্রহ্মবিদ্যা শিক্ষা দান করে তাঁর (শঙ্করের) জীবনের উদ্দেশ্য যেন সফল হয়। এই কাজটি কাশীধামে গিয়ে করতে নির্দেশ দেন এবং এই নির্দেশ দানের পর মহাসমাধি লাভ করেন।
বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে যেমন বৈদিক ধর্ম লুপ্তপ্রায় হয়েছিল, তেমনই তীর্থ সমূহ পরিত্যক্ত ও বিস্মৃত হয়েছিল। প্রবাদ আছে, কাশীধাম তখন অরণ্যে পরিণত হয়, রাখালেরা সেখানে গরু চড়াতো। প্রবাদটি কতখানি সত্য সেই বিতর্কে না গিয়ে এইকথা নিশ্চিত ভাবে বলা যেতে পারে যে, কাশীধামের অবস্থা তখন খুব খারাপ ছিল। গুরুর আদেশে শঙ্কর কাশীধামে গিয়ে উপস্থিত হলেন। এক বালক সন্ন্যাসী যুবক, প্রৌঢ় ও বৃদ্ধদের কাছে অতিশয় পাণ্ডিত্য সহকারে শাস্ত্র ব্যাখ্যা করছে --- এই সংবাদ চতুর্দিকে প্রচারিত হল এবং দলে দলে লোক এই অদ্ভুত বালককে দেখতে আসতে লাগল।
এই সময় শঙ্করের অনুভবের জগত কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে বইছিল। তিনি নির্বিকল্প সমাধিযোগে নির্গুণ ব্রহ্মের অনুভব করায় বোধ করতে লাগলেন যে, এই জগত স্বপ্নে দৃষ্ট নগরীর মতো নিতান্ত অলীক, মরু-মরীচিকার মতো ভ্রান্তিমাত্র। কখনও বা বোধ করতে লাগলেন এটা স্বতই উচ্ছ্বসিত, উদ্বেলিত এক জড় সমুদ্র, এতে চৈতন্যের লেশমাত্র নেই। এর কোনও উদ্দেশ্য নেই , প্রয়োজন নেই,। মন, বুদ্ধি , দেহ ,তার থেকে স্বতন্ত্র। কঠোর বৈরাগ্য সহায়ে এসবের সংস্রব থেকে মুক্ত হয়ে নির্গুণ ব্রহ্মসমুদ্রে লীন হওয়াই মানুষের শান্তি লাভের একমাত্র উপায়। ভক্তি-উপাসনার কথা তাঁর মনেই এল না। মন সমাধিসাগরে অবগাহন থেকে বিরত হতে চাইল না। কি এক অনির্বচনীয় কারণে মাঝে মাঝে চিৎসমুদ্রে মায়ার ছায়া পড়ে ‘আমি-আমি’ বোধ এসে উপস্থিত হল, একটা তীব্র করুণার অনুভব হৃদয়ে উত্থিত হলেও কঠোর বৈরাগ্য এসে গ্রাস করে ফেলল। তিনি কেবল গুরুর আদেশ স্মরণে --যন্ত্রবৎ শিষ্যদের উপদেশ দিতে লাগলেন, এতে তাঁর আগ্রহ, উৎসাহ কিছুই ছিল না।
শঙ্করের এই উদাসীন ভাব দূর করতে ও তার মনে জগৎকল্যাণের প্রবল আগ্রহ জাগাতে কাশীশ্বরী মাতা অন্নপূর্ণা এক বিচিত্র উপায়ে তাঁকে সগুণ ব্রহ্মতত্ত্ব বুঝিয়ে দিলেন।
( সহায়তা: শঙ্কর চরিত -- শ্রী ইন্দ্রদয়াল ভট্টাচার্য, উদ্বোধন কার্যালয় )
(ক্রমশ)
0 Comments