পুলককান্তি কর
রাগে গ্যাসের ফ্লেমটা বাড়িয়ে পেঁয়াজটা ভাজতে থাকলো জবা। ও জানে এজন্য বৌদি তাকে গালি দেবে, তবু এছাড়া বউদির উপর রাগ দেখানোর অন্য কোনও রাস্তা খুঁজে পেল না সে। ভগবানের ওর উপর দয়া আছে, ও খারাপ করে রাঁধলেও রান্নার স্বাদ খারাপ হয় না, অন্তত পেঁয়াজটা পুড়িয়ে যদি তরকারীর বদনটা খারাপ করে দেওয়া যায়, তাই সই। বউদিটা জানি কেমন। অকারণে শান্ত শিষ্ট দাদাটার উপর মুখ করে, কারণে অকারণে মুখ গোঁজ করে বসে থাকে। ও বোঝে, দাদাটার ভারী কষ্ট। বিয়ে করে বেচারার শান্তি নেই। ওর বাপটা অনেকটা এই দাদার মত ছিল। ট্রাক চালাতো, কিন্তু কোনও নেশা ভাঙ করতো না। যতদিন বেঁচে ছিল ওকে খুব আদর করত, ওর পড়াশোনা নিয়ে মাথা ঘামাতো, সবচেয়ে বড় কথা সারাদিনের পর লোকাটা ঘরে এলে মায়ের যাবতীয় বকর বকর শান্ত হয়ে শুনতো, উল্টে মাথা গরম করতো না। ভগবান যে কেন লোকটাকে অসময়ে তুলে নিল!
বউদি চেঁচানি থামিয়ে কখন এসে রান্না ঘরে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি জবা। 'কতবার তোমাকে বলেছি জবা, হাই ফ্লেমে রান্না করো না, তুমি কি কথা মনে রাখো না, না কি ভাবো আমার এদিকে খেয়াল নেই?’ মালকিনের মুখে মুখে তর্ক করলে চাকরি টেকে না, জানে জবা; তবু কিনা আজ ওর রাগটা খুব বেশী বলে ও বলেই ফেলল দু-একটা কথা। বউদিও মোক্ষম অস্ত্রটা ছেড়ে দিল ‘তোমার বাপু এত তাড়াহুড়ো থাকলে টাকা নিয়ে বিদায় হও; ভাত ছাড়লে কাকের অভাব হবে না।’
🍂
ইচ্ছে করেই আলুর সাইজটা একটু বড় বড় করে কাটছিল জবা যাতে ভেতরটা একটু কম সেদ্ধ হয়- মাঝপথে কাটা থামিয়ে বলল - 'দাও টাকা, অন্য লোক দেখে নিও তবে।' বউদি তেজ করে দাদাকে হাঁক পেড়ে বলল, 'দাও তো তেরো দিনের টাকা হিসাব কর'!
ভাগ্যিস দাদাকে ডেকেছিল, দাদা এসে আজ যেন স্বভাবের বাইরে গিয়ে ধমক লাগাল বউদিকে। 'কী আবোল তাবোল কথা বল? মাসের মাঝখানে এইভাবে কাজ ছাড়ানো যায়? নাকি এটা উচিত কথা?’
– তুমি চুপ করো। মেয়েদের মাঝখানে কথা বলবে না। ওর এত বড় সাহস, আমার মুখে মুখে কথা বলে? হাজার বার বলেছি গ্যাস কমিয়ে রান্না করতে, কোনও মতে কথা কানে নেবে না।
– শান্ত হও রুপু, জবা একটু বেশী ফ্লেমে হয়তো রাঁধে, কিন্তু রান্নাটা কি খারাপ করে? সব গুণ তুমি একটা মানুষের মধ্যে পাবে? আগে কটা কাজের লোক ছাড়িয়েছ মাথায় আছে? কারোর রান্নাই তো মুখে তোলা যেত না.....
জবা পরিষ্কার দেখল বউদি চোখ দিয়ে যেন দাদাকে ভষ্ম করে দেবে। কাজের লোকের সামনে মন খুলে তার প্রশংসা, সর্বোপরি বউ এর বিরুদ্ধে গিয়ে.... বেশ বোঝা যাচ্ছে আজ দাদার কপালে দুঃখ আছে। ইশারায় বউদি ঘরের মধ্যে যাওয়ার জন্য দাদাকে ইঙ্গিত করছে, নির্ঘাত বলবে, কাজের লোককে মাথায় তুলছো? এরা ছোটলোকের জাত..... কিন্তু দাদার আজ কী হয়েছে সে কোনও ইশারাই গায়ে মাখছে না, জবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি ভাই আমাদের কাজ ছেড়ে যেও না। বউদির একটু মাথা গরম, তুমি যা করেছিলে করো গিয়ে... আর শোনো, আমাকে একটু চা করে দিও তো, মাথাটা ধরেছে...’
আর মাথা ধরবে না! এমন এক পেত্নির সাথে ঘরকন্না করলে মাথা কেন, সর্বাঙ্গ ধরবে। মনে মনে গজগজ করতে করতে জবা চা চড়ালো। দাদা আজ ওর হয়ে কথা বললো– এটাই ওকে ভীষণ উত্তেজিত করেছে। ওর রান্না দাদার ভালো লাগে! চট করে গ্যাসের ফ্লেমটা কমিয়ে পেঁয়াজ নাড়তে নাড়তে বাটনা গুলো মিশিয়ে দিল সে। দাদা মানুষটাই অন্যরকম। কী সুন্দর ভদ্র, মার্জিত, শান্ত চেহারা। কী সুন্দর করে কথা বলে সবার সাথে। সকলে ঘুম থেকে উঠে যখন বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে চুলটাকে সবশুদ্ধু পেছনের দিকে এলিয়ে দেয়, ভেজা চোখ মুখে হাত বুলোতে বুলোতে পিঁচুটির খোঁজ করে, মনে হয় এ তো আমাদের মতোই একটা লোক যাকে না বলা কষ্টগুলো বলা যায়। আবার অফিস যাওয়ার আগে গলায় তোয়ালে দিয়ে যখন দাড়ি কামায়, ওই সবুজ হয়ে ওঠা গাল দুটো দেখলে মনে হয়, এ মানুষটার দিকে ঠিক হাত বাড়ানো যায় না।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে যখন জবা দাদার সামনে দাঁড়ালো, দাদা এক মনে কাগজ পড়ছে। ঘরের ভেতরে বউদি কী ডোজ দিল, মুখ দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কী সুন্দর সুগন্ধ আসছে দাদার গা থেকে। মনে হয় নাকটা কাছে নিয়ে প্রাণ ভরে ঘ্রাণ নেয় সে। চায়ের কাপটা একটু চলকে গেল যেন। 'এই নিন দাদা আপনার চা।'
– রেখে দাও টেবিলটায়।
দাদা তো হাত বাড়িয়ে নিতে পারতো, ও যথেষ্ট সতর্ক থাকে তবু অসাবধানে যদি ওই হাত ছোঁয়া যেত একটু...! জবা দেখেছে দাদা নানান দাবী পারফিউম ইউজ করে। একবার দেখেছিল সে - রয়্যাল মিরেজ। এসব তো সাধারণ দোকানে পাওয়া যায় না, নিশ্চযই অনেক দাম। মদন যখন সুযোগ বুঝে ওকে আড়ালে টেনে নিয়ে যায়– কী চামসে গন্ধ নাকে লাগে। বমি উঠে আসে জবার। ওকে যদি এরকম একটা পারফিউম গিফট করা যেত। অবশ্য তাতে কী হত? এত সূক্ষ্ম গন্ধে কী মদ বিড়ি ঘামের গন্ধ ঢাকা যায়? এসব হল অভিজাতদের গন্ধ। ওদের জন্য ওই একশো দেড়শো টাকা দামের উগ্র গন্ধই ভালো। যদিও জবার ওই গন্ধে গা গোলায়। ছোটখাটো স্টেশনারী দোকান থেকে নিজে বেছে বেছে হালকা গন্ধওয়ালা সেন্টই কেনে সে। আর ওই সব দোকানের আবাগী বেটীগুলো কি কম নচ্ছার? তোরা তো বাবা মাইনে পাস মাসে তিন সাড়ে তিন হাজার। মুখে গাঢ় রঙের লিপস্টিক আর নেল পালিশ লাগিয়ে ভাবিস যেন স্বর্গ থেকে উর্বশী রম্ভা নেমে এসেছিস! সব যেন বাবু সামাজের মেয়ে। সাধারণ খেটে খাওয়াদের সেন্ট দেখাতে গেলে যেন যত রাজ্যের আলস্যি নেমে আসে ওদের গায়ে। ভাবটা যেন, তোরা আর কী নিবি। বাথরুমে গিয়ে নিজেকে একবার ভালো করে দেখলো জবা। গোঁফের জায়গাটা হালকা ঘেমে আছে, তবে সকালে সেজে আসা চেহারাটা খুব একটা খারাপ হয়ে নেই। চোখের হালকা কাজলটা এখনও আছে, টিপটাও যথাযথ জায়গায়। নিজের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলে জবা। ও যত পরিপাটী হয়েই আসুক, যতই পরে আসুক পরিষ্কার রুচিশীল পোশাক আশাক, দাদা কি তার দিকে চাইবে? নাকি দাদার দৃষ্টি সে আকর্ষণ করতে চায়? দাদা মানুষটাই তো এমনি। যার শিক্ষা এবং সংস্কার দুটোই শক্ত বাঁধনে বাঁধা, সে এমন অস্বাভাবিক কাজ করবে কেন? এমনও তো বহুদিন হয়েছে বউদি ঘরে নেই, ও দাদার সাথেই ছিল ঘরে, দাদা কি অন্য চোখে চেয়েছে তাকে, নাকি সুযোগ নিতে চেয়েছে কোনও ভাবে? মানুষ দেখলেই বোঝা যায়। লোভী মানুষের চোখ অন্যরকম। বিশেষ বিশেষ সময়ে মদনের চোখ যেমন জ্বলজ্বল করে। মনে মনে স্বপ্ন দেখে, বউদি এবার বাপের বাড়ী গেলে দাদার যদি ধুম জ্বর হয়, খুব করে জলপট্টি দেবে সে। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে অনেক যত্নে। হাসি পেয়ে গেল তার। সবকিছু কি আর সিনেমার মতো হয়! নাকি তাতে লাভ হবে বিশাল একটা কিছু। এটাই জীবন হে জবা! নইলে ক্লাস নাইনে উঠতে উঠলেই বাবার হঠাৎ অ্যাক্সিডেন্টই বা হবে কেন, ওর পড়াই বা ছেড়ে যাবে কেন? ওর বাবার জ্বর হলে সারাদিন ঘরে শুয়ে শুয়ে কোঁকাতো। কিছুতেই জবা কে কাছছাড়া করতো না। জবাব বারবার জলপট্টি বদলাতে গেলে ওর ছোট হাত নিয়ে বুকের উপর চেপে ধরতো। দাদার কি একবার এমন জ্বর হতে পারে না?
২
এ মাসে একটা এক্সট্রা মালিশের কাজ পেয়েছিল জবা, আজ টাকাটা পেয়েছে। এক মাসেরই চুক্তি ছিল ওটা। পাড়ার সবচেয়ে বড় যে স্টেশনারী দোকানটা, সেখানে গিয়ে মোটামুটি দামী একটা পারফিউম কিনলো সে। প্রায় ছশো টাকার। এতদিন শ'দেড়েক টাকার বেশী এই বিষয়ে খরচ করতে বিলাসিতা মনে হত। কিন্তু কখনও কখনও এই বিলাসিতারও দরকার পড়ে। গত মাসের জবার জন্মদিন কীভাবে যেন জেনে গিছিল মদন। হয়তো মা বলে থাকবে। সুন্দর একটা সালোয়ার, মনজিনিসের কেক কিনে এসেছিল, সেদিন কেক কেটে জন্মদিন পালন হয়েছিল বড়লোকদের মতো, ওর বাবা বেঁচে থাকতে যেমন করে পালন হত, তেমনি। মদনের জন্মদিন কবে, কেউ জানে না। জবা তাই ভেবেছে এবার ভ্যালেন্টাইনস ডে তে পারফিউমটা গিফট করবে। আর তো দিন চারেক বাকী। বা, এমনিও দেওয়া যেতে পারে যে কোনওদিন। ওদের আবার কীসের ভ্যালেন্টাইন। অকারণ খরচ বাড়ে। মদন সম্বন্ধে খুব শিগগিরি ডিসিশন নিতে হবে জবাকে। মা এবার একটু বাড়াবাড়ি রকমের বায়না শুরু করেছে। মা চোখ বুজলে সোমত্থ মেয়ে– একা কী ভাবে থাকবে, কে দেখবে ইত্যাদি ইত্যাদি...। মদন কি আর ওর স্বামী হওয়ার মতো? নিজেকে যতবার জিজ্ঞাসা করে জবা, দাদার মতন কোনও শিক্ষিত মার্জিত পুরুষের ছবি মনে ভাসে। জবা কোনও ভাবেই অশিক্ষিত নেশাগ্রস্ত লোককে নিজের জীবন সঙ্গী ভাবতে পারেনা। অন্তত এতদিন ভাবতে পারতো না। তবে কিনা লোকের বাড়ী কাজ করতে করতে, এই শ্রেণীর লোকেদের সাথে মিশতে মিশতে কোথাও যেন এই স্বপ্নগুলোও অবাস্তব বলে মনে হতে শুরু করেছে তার। চারপাশের যত মহিলা বস্তিতে থাকে, সবার বরই রাতে নেশা ভাঙ করে ঘরে আসে, বউ পেটায়, রাত্রে শোবার আগে গালিগালাজ করতে করতে শরীর ভাঙেচোরে, কোথাও অবচেতন মনে এটাই নিজেরও ভবিতব্য বলে মনে হতে শুরু করেছে তার। যতগুলো ছেলে ছোকরা ওর পেছনে ছোঁক ছোঁক করে, মদনই তার মধ্যে মন্দের ভালো। কোন এক মোবাইল কোম্পানিতে সার্ভিসিং এর কাজ করে। এতদিন মাঝে মাঝে মদনের আবদারে জবা সাড়া দেয়নি তা নয়, তবে মনে মনে কোথাও যেন একটা বাধা এসে ওর পথ আগলে দাঁড়ায়। ও মদনের আবেগে ভাসতে পারে না, ওর তালে তাল মিলাতে পারে না– সেই সময় ওর মনে এসে দাঁড়ায় মদনের ঘেমোগন্ধ, আদরের গলিখুঁজিতে জুতে দেওয়া আধো আধো নোংরা শব্দের ঘোঁত ঘোঁত। নিজেকে বোঝায় জবা, সবকিছু সবার ভাগ্যে জোটে না। তার এ জন্মের বিধিলিপি মদন বা মদনের মতো কেউ। জবা নিজে জানে ওকে পাওয়ার জন্য মদনকে রীতিমতো আগের দিনের মতো যুদ্ধ জয় করতে হয়েছে। পাশের কলোনীর শিবেন বহুদিন ওর পেছনে লেগেছিল। মদনের কল্যাণে আজকাল ওকে ওদের সাত নম্বর কলোনির আশেপাশে দেখতেও পাওয়া যায় না। লোকে তো বলেই জবার রকমসকম ঠিক বস্তির মেয়েদের মতো নয়। ওর একটা আলগা চটক আছে। টুসী মলুরা এজন্য ওকে কী কম ঈর্ষা করে? থাক, বীরের গলাতেই মালা দেবে জবা। এই ভ্যালেন্সটাইনে ও আশ্বস্ত করবে মদনকে। আজকেই মাকেও বলে দেবে ও।
কলোনীর রাস্তাটা রেললাইনের পাশ ধরে, খানিক এগিয়েই মানসদার রোলের দোকান। ওরা স্বামী স্ত্রী মিলে রোল চাওমিন বানায় সন্ধে হলে। আজ তিনটে এগ চিকেন রোল অর্ডার দিল জবা। রাত্রে তো মদন একবার ঢুঁ মারবেই। মনটা আজ জোর করে খুশি করে নিল জবা। দু লাইন হিন্দি গানের কলি ভাঁজতে ভাঁজতে ও যখন ওর বাড়ীর দিকের রাস্তার মোড়ে এলো, পলি ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকলো। পলি, টুসি, মলু, রীতা সবাই জটলা করতে করতে হেসে লুটিয়ে পড়ছে একে অন্যের গায়ে। জবা সাধারণত এদের জটলা এড়িয়ে চলে, কিন্তু, পলি সরাসরি ডাকলো যখন, না করাও যায় না। ও এসে পড়তেই মলু বললো, 'হ্যাঁ লো, তোর রসে বুঝি আর চিঁড়ে ভিজলো না?’ ওর কথার পিঠে হি হি করে হেসে উঠলো সবাই।
– কি হয়েছে?
– তোর নাগর যে বাবলুদার বউকে নিয়ে ফুড়ুৎ হয়ে গেছে রে! মলু অঙ্গভঙ্গি করে দেখাতে লাগল ফুড়ুৎ হওয়াটা।
– মানে কী? উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করল জবা।
– মানে বোঝো না ধেড়েবুড়ী? হি হি করে হেসে উঠলো সবাই।
পলি বললো, ‘মদনার আর দোষ কী বল! সোমত্থ বয়সের পুরুষের সামনে চোষাকাঠি ঝুলিয়ে কদ্দিন মন ভোলানো যায়? ওইসব রূপের গুমোর দিয়ে কি খেটে খাওয়া লোকদের দিন চলে? মালের সাথে টালও তো চায় নাকি? সবার প্রতিটি কথা যেন সীসার মতো জবার সর্বাঙ্গ বিঁধতে লাগলো। রীতা একটু আদুরে গলায় বলল, তোর সাথে তো ভালো রকম ইয়েই....
জবা দাঁড়ালো না আর একটুকুও। আজ সারা বস্তির মেয়ে পুরুষরা ওর চরিত্রের চিরুনি তল্লাশি চালাবে রাতভর। এসব বস্তিতে বউ নিয়ে পালানোটা নতুন কিছু নয়। এর জন্য থানা পুলিশ হয় না। ধরা যদি দু চার দিনের মধ্যে পড়ে, সালিশি বসে। পনেরো দিন পেরিয়ে গেলে তাও হয় না, মানুষ ওতেই অভ্যস্ত হয়ে যায়।
জবা ধীর পায়ে বাড়ীতে গিয়ে মা’কে বলল, এগ চিকেন রোল এনেছি, খাও।
– এতগুলো টাকা কেন খরচা করতে গেলি টুকু? সামনে বিয়ে দেব, নাই নাই করে খরচা তো কম হবে না। শুধু এগরোল হলেই তো হত।
জবা বুঝলো মদনের খবর নিয়ে এখনও প্রতিবেশীরা মায়ের কান ভরাতে এসে উঠতে পারেনি। তাহলে বোধহয় ব্যাপারটা সদ্য সদ্যই আবিষ্কৃত হয়েছে। কষ্টের পয়সায় কেনা। খবরটা জানলে মায়ের পেটে আর এসব ঢুকবে না। ও চট করে বলল, ‘গরম আছে, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও মা। আমাকেও দাও, খুব খিদে পেয়েছে।’
– তিনটে এনেছিস দেখছি। একটা কি মদনের জন্য রেখে দেব? তুই একটা ফোন করে দে । গরম গরম এসে খেয়ে যাক।
জবার মনে পড়ল, মদন মালের সাথে যেদিন মাংসের চাট খেত, সেদিন ওর আর ওর মায়ের জন্য খানিকটা মাংস দিয়ে যেত। জবা বললো, ‘ওটা মদনের জন্য আনি নি মা, মাম্পু দুদিন ধরে বলছিল, পিসি আমার জন্য চকলেট এনো, ওর জন্যই এনেছি।’
– তাহলে ডেকে আন ওকে।
– না মা, আগে আমরা খেয়ে নিই। তুমি একটু চা বসাও। তারপর বরং ওকে ডেকে দিচ্ছি।
খানিকক্ষণ বাদে বাথরুমে গিয়ে ভালো করে স্নান করল জবা। অনেকক্ষণ ধরে। পরিষ্কার ভালো জামা কাপড় পরে সাজলো সে। ওর খুব একটা খারাপ লাগছে না। বরং কোথাও একটা মুক্তির স্বাদ পাচ্ছে সে। শুধু মনে হচ্ছে অনেকগুলো টাকা দিয়ে পারফিউমটা কেনা। ওই টাকাটা গচ্ছা। ছেলেদের পারফিউম। মদনের নামে কেনা, কোনও পুরুষ বন্ধুও তো নেই ওর যাকে দেওয়া যায়। আজ ঝিলপাড়ে গিয়ে একটু বসলে হয়। অনেকদিন বসা হয়না। ছোট ভ্যানিটি ব্যাগটায় পারফিউমটা ঢুকিয়ে বাড়ী থেকে বেরোলো জবা। বাড়ীতে রাখলে মা আবার জিজ্ঞেস করবে, কার জন্য এনেছিস। রেললাইনের পাশাপাশি পাঁচ ছ মিনিট হাঁটলে একটা বড় ঝিল পড়ে। পৌরসভা থেকে ওর ঘাট-টাটগুলো বাঁধিয়ে সুন্দর করে সাজিয়েছে গেল বছর। জবা গিয়ে একটা ঘাটে চুপ করে বসে রইল। একটু দূরের ঘাটে অনেক পুরুষ কাজ থেকে ফিরে স্নান করছে। কেউ কেউ সাঁতার কাটছে। কিছু মেয়ে বউও এসে বসে আছে। জবা ধীরে ধীরে প্যাকটা খুলে পারফিউমটা বের করলো। ঝিলেই ফেলে দেবে সে এটা। এতগুলো টাকা দিয়ে কেনা, ভাবতেই খারাপ লাগলো। কোনও প্রিয়জনকে যদি দেওয়া যেত, অন্তত টাকাটার একটা সদগতি হত। মানুষের কাজে লাগতো। জলে ছোঁড়ার আগে একটু এপাশ ওপাশ চেয়ে দেখতে গিয়ে চমকে উঠলো জবা। দাদা না? নিজের চোখ দু তিনবার কচলে, ভালো করে নিরীক্ষা করে দেখল, এটা দাদাই। আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে বলল, ‘আপনি এখানে?’
ওকে দেখে খানিকটা থতমত খেয়ে ভদ্রলোক বললেন, তুমি?
– আমি তো পাশেই থাকি দাদা, এখান থেকে মিনিট পাঁচেকের পথ। চলুন না দাদা, একটু গরিবের ঘরে পায়ের ধুলো দেবেন।
– না গো জবা। বাড়ী ফিরব এখন। বৌদি চিন্তা করবে।
– আপনি এখানে এলেন যে?
– আমি তো সপ্তাহে তিন দিন এখানে আসি।
– কেন দাদা?
– এখানে আমাদের একটা এন.জি.ও আছে। এন.জি.ও মানে বোঝো?
– হ্যাঁ দাদা, আমি ক্লাস নাইন অবদি পড়েছি ।
– বাঃ। জানতাম না তো! আমাদের এন.জি.ও তে আমার একটা নৈশ্ ক্লাশ চালাই। তোমাদের এই অঞ্চলের লোকেরা যারা নানা ধরনের কাজ করে অথচ পড়াশোনা করতে চায়, তাদের রাত্রে বিনে পয়সায় পড়ানো হয়। পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
– কী লাভ তাতে?
– বা রে! পড়াশোনা করে কী লাভ তুমি জানো না? বড় হবে, বড় চাকরী করবে, এরকম কষ্টের দিন আঁকড়ে পড়ে থাকতে হবে না– সেটা কম কথা?
– দাদা আপনি একটা উদাহরণ দিতে পারবেন, আপনার এখান থেকে কেউ পড়ে বড় হয়েছে, বড় চাকরি করেছে?
ভদ্রলোক চুপ করে রইলেন।
জবা বলল, ‘এসব আপনাদের বিলাসিতা দাদা। আপনারা ভাবেন, এই তো লোকেদের জন্য কিছু করলাম। আদতে লাভ কিছু হয় না।’
ভদ্রলোক একটু থেমে বললেন, 'আসল ব্যাপার জানো কি জবা, এইসব মানুষরা স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে। সারাদিন পরিশ্রম করতে করতে রাত্রে যখন স্কুল আসে, তখন চোখ ভরা ঘুম– নিয়ম রক্ষাটাই সার হয়ে দাঁড়ায়। কিছু বই, কিছু অনুদানের লোভে কেউ কেউ আসে, সত্যি সত্যি বড় হতে চেয়ে কেউ আসে না।’
– বড় হতে চাইলে কি সত্যি বড় হওয়া যায়? মানে আমাদের শ্রেণীর লোকের অ্যাঙ্গেল থেকে বলছি।
– আমি এটা বিশ্বাস করি জবা। তুমি যদি সত্যি বড় হতে চাও, স্বপ্ন দেখ। স্বপ্ন দেখতে না পারলে বড় হতে পারবে না। স্বপ্ন দেখাটাই সবথেকে জরুরী অভ্যাস।
– সারাদিন পরিশ্রম করলে কী আর স্বপ্ন দেখা যায় দাদা? গভীর ঘুম পায়। সেই ঘুম বড় জরুরী, নইলে পরের দিনের শক্তির রসদ হয় না।
– আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির নাম জানতো তো জবা? এ.পি.জে আব্দুল কালাম।
– হ্যাঁ।
– উনি বলতেন, স্বপ্ন জেগেই দেখতে হয়। সেই স্বপ্ন তোমায় রাত্রে জাগিয়ে রাখবে। তুমি যদি বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখো, তবে সেই স্বপ্নকে লালন করো, পালন করো। যেমন তুমি নিজে খেয়ে পুষ্টি নাও, স্বপ্নকে তেমনি খাবার দাও। তবেই তুমি সফল হতে পারবে। এটা আমার চ্যালেঞ্জ।
– আমাকে ভর্তি কবে নেবেন দাদা?
– নিশ্চই। তুমি আগামী পরশু ওই সামনের ক্লাব ঘরটাই চলে এসো, সন্ধ্যা সাতটায়, আমি থাকবো।
হঠাৎ নিচু হয়ে ঢিপ করে প্রণাম করলো জবা। ভদ্রলোক ওর মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন। এত কাছ থেকে ভদ্রলোক গায়ের সুগন্ধ এসে জবার প্রাণ মন যেন জুড়িয়ে দিল। জবা খুব বিনীত গলায় বলল, ‘যদি রাগ না করেন তো একটা কথা বলব?’
– বলো না।
– আমি যদি আপনাকে একটা উপহার দিই, নেবেন?
– সে আমি নিতেই পারি। কিন্তু তুমিই বা খামোখা আমাকে উপহার দিতে চাইছ কেন?
– আপনি আমার হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নটাকে আবার দেখতে শেখালেন বলে।
– আচ্ছা দাও।
জবা সন্তর্পনে এবং সংকোচের সাথে পারফিউমটা বের করে বলল, ‘জানি আপনি অনেক দামি সেন্ট ব্যবহার করেন, কিন্তু এটার গন্ধ খারাপ না। আপনি গায়ে দিলে ভালো লাগবে।’
– সেটা ইস্যু নয়। এটা আমি ব্যবহার করতেই পারি। কিন্তু মিছিমিছি তোমার এতগুলো টাকা তুমি আমার জন্যই গিফ্টটা কিনেছ?
একটুখানি ইতস্তত করে জবা বলল, ‘না দাদা। আপনাকে কিছু উপহার কিনে দেওয়ার সাহস তো আমি কোনদিনই পাইনি। আমি আমার প্রিয় পুরুষের জন্যই এটা কিনেছিলাম আজ। আর আজই মনে হলো সেই মানুষটি আপনি।’
ভদ্রলোক একটু স্মিত হেসে বললেন, ‘দাও। নিজের হাতে ধরে থাকলে আমি নেবো কী করে?’
জবা হেসে উঠল। সে জানে এই হাসিটা সে ভুলে গিয়েছিল প্রায় ন'বছর; যবে ওর বাবা মারা গিয়েছিল রোড অ্যাক্সিডেন্টে– সেই থেকে। আজ থেকে ও হাসবে। ওকে হাসতেই হবে। হাসতে হাসতেই জয় করতে হবে। ওর এতদিনে হারিয়ে যাওয়া সব স্বপ্ন। কিন্তু সাবধানে। কোন কিছুই যেন পা হড়কে হারিয়ে যেতে না পারে।
0 Comments