জ্বলদর্চি

দর্শনের আলোকে/দ্বাদশ পর্ব/ স্বাতী ভৌমিক

দর্শনের আলোকে
দ্বাদশ পর্ব 

স্বাতী ভৌমিক

        
(জীবনের আনন্দ অনাসক্তিতে)

 জীবন হাসায়,
 জীবন কাঁদায়,
 ভেঙে গড়ে নতুন ভাবে
 জীবন আবার বাঁচতে শেখায়।

                           জীবন জীবনের কথা বুঝিয়ে দেয়, শুধু একটু মনোযোগের ও উপলব্ধির প্রয়োজন হয়। বাহ্যিক শব্দ মুখরতায়, ইন্দ্রিয়ের অদম্য আকর্ষনে ব্যক্তির অন্তরের কথা ব্যক্তির বোধগম্যতা পর্যন্ত প্রায় আসেই না।
 
 আসক্তির প্রাবল্যে ব্যক্তি সুখী হবার বদলে দুঃখী হয়। সুখের উপাদানও দুঃখের উৎসারক হয়ে পড়ে সময়ের পরিবর্তনে। কারণ, জড়জগতে কোনো কিছুই সমভাবে চিরস্থায়ী হয় না। আর ব্যক্তি যখন কোন কিছুকে এই জড় জগতে  স্থায়ীভাবে একই প্রকারে জীবনে ধরে রাখতে চায়, তখনই অজান্তে দুঃখের জালে সে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে। কারণ আসক্তির ফলে ব্যক্তি অনেকাংশে কল্পনার  জাল বুনতে শুরু করে এবং কল্পনা আর বাস্তবের ফারাক বুঝেও বুঝতে না পারার ভান করায়, মিথ্যের মধ্যে থাকতে থাকতে যখন প্রকৃতির নিয়মে বাস্তবের কঠোর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, তখনই ব্যক্তি অসহনীয় দুঃখ ভোগ করে আর দোষ দেয় পরিস্থিতি বা অন্য কোন কিছুকে।
🍂

 জীবনটা অভিনয় মঞ্চের মতোই। পার্থক্য এটাই যে, অভিনয় মঞ্চের গল্পটা সম্পূর্ণভাবে অভিনেতা অভিনেত্রীর অভিনয়ের পূর্ব থেকেই জানা থাকে। কিন্তু এই জীবন নাট্যমঞ্চের গল্পটা সাধারণ ব্যক্তির পক্ষে সম্পূর্ণভাবে জানা সম্ভব হয় না। শুধুমাত্র যখন যে ভূমিকা থাকে, সেই ভূমিকা-ই ব্যক্তি জানতে পারে। জীবনের অধিকাংশ বিষয়েরই অন্তর্নিহিত অর্থ বা ভাবার্থ ব্যক্তির বোধগম্যতার বাইরেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে থেকে যায়।

 তবে তা যে অজ্ঞেয়, তা কিন্তু নয়। তা জানা যায়। কিন্তু তার জন্য অন্তরের সাথে অন্তরময় চেতনা লাভ করার প্রয়োজন হয়।
 
       অন্তরে অন্তর না মিলালে,
         যায় না রে তা জানা।
      দৃষ্টির অগোচরে থেকেও,                     
         তার সচেতন আনাগোনা।।

-- তা জানতে গেলে, তা বুঝতে হবে- সেই ভাব খুঁজে পেতে, আত্মভাবে বিলীন হতে হবে।

 আসক্তির কারণে ব্যক্তি বেশি দুঃখ পায়। আসক্তি থেকে হারানোর ভয় আসে। আর এই ভয় থেকে ব্যক্তি প্রাপ্ত জিনিসের পুরোপুরি আনন্দ লাভ থেকেও বঞ্চিত হয়। ব্যক্তি যখন এটা বুঝে যায় যে, জীবন নাট্যমঞ্চে তাকে নির্ধারিত চরিত্রে অভিনয় করে- নির্ধারিত সময় পরে তাকে স্বস্থানে ফিরে যেতে হবে, তখন ব্যক্তি এই অহেতুক দুঃখদায়ক  আসক্তি থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে জীবনের পথে আনন্দময় চিত্তে অগ্রসর হতে পারে।

 আমাদের কল্পনা অনুসারে সব সময় বাস্তব আমাদের কাছে আসে না। বাস্তব কখনো কখনো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন করায়, যা মানুষ কখনো কল্পনাও করে না। এটা তো খুবই সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু সমস্যাটা হোলো অন্য জায়গায়। ব্যক্তি মন কিন্তু এই ব্যাপারটিকে একদমই সহজ ভাবে গ্রহণ করতে পারেনা। আসক্তি বশতঃ চাহিদার বিষয় অনাকাঙ্ক্ষিত কোন অবস্থা তৈরি করলে বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে ব্যক্তি মন গুরুত্ব অনুপাতে মানসিকভাবে বেসামাল হয়ে পড়ে।

 ব্যক্তি যদি এটা বুঝতে পারে যে, একান্তই নিজের ক্ষেত্রে হয়তো ব্যক্তির পরিস্থিতি পরিচালনার অনেকটা ক্ষমতা হাতে থাকলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাহ্যিক জগতের ব্যক্তি হোক বা পরিস্থিতি- তা কিন্তু কখনো ইচ্ছে মতো পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। ব্যক্তিমনকে তখন বাধ্য হয়ে নিজের মতো করে নিজের কাছে ব্যাখ্যা সাজিয়ে নিতে হয়।

 অনাসক্তি বন্ধনের মাঝেও মুক্তি এনে দেয়। এই জগতে কোন কিছুই অনাবিল সুখের উৎসারক হতে পারেনা। বৈচিত্রের এই জগতে যা সুখ দেয় তা দুঃখ দেবারও ক্ষমতা রাখে। নিজের ইচ্ছেমতো পরিস্থিতি না হলে ব্যক্তির মন হতাশার মধ্যে ডুবতে থাকে। ব্যক্তির 'নিজের শরীর', 'নিজের মন' যখন নিজের ইচ্ছে 
অনুসারে চলে না, তখন বাইরের পরিবেশ- পরিস্থিতি ব্যক্তির ইচ্ছে অনুসারে চিরদিন চলবে- এটা আশা করাটা কি বোকামি নয় !!!!!!

 ক্রমশঃ

Post a Comment

0 Comments