জ্বলদর্চি

ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি (অন্তিম পর্ব /৩৭ )/ চিত্রা ভট্টাচার্য্য

ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি  (অন্তিম পর্ব /৩৭ )

 চিত্রা ভট্টাচার্য্য 

   (অজানা গল্পের নজরুল ) 

‘বন্ধুগণ, আপনারা যে সওগাত আজ হাতে তুলে দিলেন, আমি তা মাথায় তুলে নিলুম। আমার সকল তনু-মন-প্রাণ আজ বীণার মতো বেজে উঠেছে। তাতে শুধু একটি মাত্র সুর ধ্বণিত হয়ে উঠেছে- আমি ধন্য হলুম, আমি ধন্য হলুম। আমায় অভিনন্দিত আপনারা সেই দিনই করেছেন, যেদিন আমার লেখা আপনাদের ভালো লেগেছে। বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরই অভিযান সেনাদলের তূর্য্যবাদকের একজন আমি- এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলে, শুধু এই দেশেরই, এই সমাজেরই নই, আমি সকল দেশের, সকল মানুষের। ''                                 

’বলেছিলেন,কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর শেষ ভাষণে। ১৯৪১ সালের ৬ এপ্রিল মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র রজত জয়ন্তী উৎসবে সভাপতির বক্তব্যে কবি নজরুল তাঁর কালজয়ী সর্বশেষ এই ভাষণ টি দিয়েছিলেন। এরপরে দূরারোগ্য ব্যাধিতে চিরজীবনের জন্য বাক-রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পূর্বক্ষণে ।  দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে কেমন করে হাসিমাখা মুখে মাথা উঁচু করে চলতে হয় তাই যেন শেখায় মুখর কবির নীরব হয়ে যাবার আগে সমবেত সভায় জীবনের শেষ ছোট্ট বক্তৃতা টি ।
🍂

মরমী কবি হয়তো উপলব্ধি করেছিলেন বিদায়ী বাঁশির করুণ রাগিনী। তাই বুঝি জীবনের কোলাহল থেকে দূরে ,নীরব সাধনায় নিজেকে গন্ধবিধুর ধূপের মত পুড়িয়ে নিঃশেষ করতে চাইলেন। ব্যক্তিগত অভিমানে বেদনাবিধুর সুরে নিঃসঙ্গতার প্রচ্ছন্ন অনুভূতির পরশ দিয়ে গেলেন ,  লিখলেন ---

'তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর 

আমি জাগিবো না, কোলাহল করে

 সারাদিনমান কারো ধ্যান ভাঙিবো না।…

 নিশ্চল-নিশ্চুপ আপনার মনে 

পুড়িবো একাকী গন্ধবিধুর ধূপ'। 

 বাংলা সাহিত্যের আসরে একদা অগ্নিবীণা হাতে প্রবেশ,করলেন যে কবি, ধূমকেতুর মতো তার আত্মপ্রকাশ। যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনে। সংগীতে সুরের আকাশে ও তিনি যে উজ্জ্বলতম ধ্রুবতারা । অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী, কাব্য সাহিত্য থেকে সুর সংগীতে সর্বত্র তার অবাধে বিচরণ।  আপামর মানুষ বিস্মিত হয়ে দেখলেন ধূমকেতুর মতো একচ্ছত্র সংগীত সম্রাটের আত্মপ্রকাশ। যাঁর অসামান্য লেখনীর ভাষায় সুকণ্ঠের শ্রুতিমধুর স্বর সংযোজনে আকাশ বাতাসের সাথে মানব হৃদয় মুখরিত হতো ,রক্তে উন্মাদনায় ভরে বুকে জাগাতো অসীম শক্তি ও সাহস। একদিন সহসা সেই উদার বাঙময় কণ্ঠ চিরনীরব হয়ে গেল দাপুটে ঝোড়ো হাওয়ায়। তাঁর জীবন তরীর চলন্ত দাঁড় হঠাৎ থমকে গিয়েছিল গভীর চোরাবালির অজানা স্রোতে। সাহিত্যের এই দিকপাল, সৃজনশীল আত্মভোলা মানুষটির প্রায় ৭৭বছরের জীবনে কর্মজগতে সক্রিয় ছিলেন মাত্র ২৩টি বছর। বাকি ৩৫টি বছর কেটে গিয়েছিল নিয়তির নির্মম পরিহাসে অসহনীয় বেদনাদায়ক এক পরিণতি।এ জগৎ সংসারে একমাত্র তাঁর মত মানসিকতার কবি স্রষ্টা শিল্পীরাই বুঝি পারেন আপন সৃষ্টির সুখের খুশিতে বিভোর থেকে জীবনের শত জ্বালা যন্ত্রনা বুকের মাঝে বহন করে এমন সাবলিল ভাবে অকপটে  মনের কথা বলতে। 

   আমার আজকের আলোচনায়  লিখতে বসেছি কবি জীবনের শেষপর্ব ' অবশেষে কলকল্লোল মুখরিত গানের পাখির জীবদ্দশাতেই একেবারে ঘুমিয়ে পড়া।  চিরতরে দূরে চলে যাওয়া '   ---করুণ গল্পের নায়ক প্রিয় কবি নজরুলের জীবনের অজানা গল্প।খুব অল্প সময়েই কালজয়ী কবিতা, সংগীত ও সুর শিল্পীর অসামান্য গান, সমাজ ও রাজনীতি সচেতন গল্প, স্বাধীকারবোধের নাটক,  খেয়ালি উপন্যাস, সাহিত্যকৃতি জাগরনের প্রবন্ধ সর্বত্র বিচরণ করেছেন কবি ।  কিন্তু সাহিত্যের সেই স্বর্ণময় যুগে গৌরবের পূর্ণতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কাব্যে গানে গল্পে উপন্যাসে গীতিময় বিশ্বকবি তাঁর  অসাধারণ প্রভাব তিনি সর্বত্রগামী । সদ্য যুবক কবি নজরুল তাঁর স্নেহধন্য চলনে-বলনে-লেখায় নিজে ছিলেন অত্যন্ত উৎসাহী গভীরভাবে রবীন্দ্রভক্ত এবং বিশ্বকবিকে ই গুরু মানতেন।  বলতেন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ,তাঁকে  অতিক্রম করা কার সাধ্য ? সে  অসম্ভব। এবং নজরুলের অসামান্য প্রতিভা ,সদাহাস্য নির্মল স্বভাবের কারণে কবিগুরুর তিনি ছিলেন অত্যন্ত কাছের প্রিয়জন ,সমর্থন ও অকাতর স্নেহ পেয়েছেন। বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করে জীবন সংগ্রামে ছন্ন ছাড়ার মত টিকে থেকে সর্বক্ষণ প্রমান করতে হয়েছে কাজী নজরুল কে তাঁর অস্তিত্বের লড়াই। 

 তাঁর জীবন যেমন ঝোড়ো হাওয়ার মতো উত্তাল, তেমনি করুণ রসে সিক্ত এক মহাকাব্য। যে মানুষটি তাঁর কলম দিয়ে ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন, যাঁর কণ্ঠে বেজে উঠেছিল বিদ্রোহের রণতূর্য, জীবনের শেষ পর্যায়ে সেই মানুষটিই শিকার হয়েছিলেন চরম অবহেলা ও একাকিত্বের। সম্প্রতি তাঁর জীবন নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ মাধ্যমের  নানা আলোচনা তাঁর পারিবারিক জীবন, অসুস্থতা এবং শেষ দিনগুলো নিয়ে নজরুল গবেষক দের যে তথ্য উঠে এসেছে, তা বাঙালির  জাতীয় চেতনার এক গভীর ক্ষতে আঘাত করে। নজরুলকে নিয়ে আমাদের প্রচলিত আবেগ আর তাঁর জীবনের রূঢ় বাস্তবের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান, তা বিশ্লেষণের ও  দাবি রাখে। 

ভাবতে মনে বড়ো বিস্ময় জাগে , বিপ্লব, সাম্য ও মানবতার কবি কাজী নজরুল অসাম্প্রদায়িক এই কবি মাত্র ২৩ বছরের লেখক জীবনে বাঙালির চিন্তা চেতনা, মনন ও অনুভূতির জগতে নানাভাবে নাড়া দিয়েছেন। ফ্যাসিবাদ, অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে শক্তহাতে ধরেছিলেন কলম, গেয়েছিলেন সাম্যের গান। কবিতার মাধ্যমে তিনি নিপীড়িত মানুষের কথা বলেছেন। মানুষের প্রতি মানুষের অন্যায় আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছেন কবিতা গান কে। কবি-সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ, সাংবাদিক পরিচয়ের বাইরে রাজনীতিবিদ ও সৈনিক হিসেবে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সর্বদাই সোচ্চার ছিলেন নজরুল। তার কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে।  

 নজরুল তাঁর সুদীর্ঘ বক্তব্যে আত্মসমীক্ষায় বলেছেন , 'সুন্দরকে স্বীকার করতে হয়, যা সুন্দর তাই দিয়ে। সুন্দরের ধ্যান, তাঁর স্তবগানই আমার ধর্ম। তবু বলছি, আমি শুধু সুন্দরের হাতে বীণা, পায়ে পদ্মফুলই দেখিনি, তাঁর চোখে চোখ ভরা জলও দেখেছি। শ্মশানের পথে, গোরস্তানের পথে তাঁকে ক্ষুধাদীর্ণ মুর্তিতে ব্যাথিত পায়ে চলে যেতে দেখেছি। যুদ্ধভূমিতে তাঁকে দেখেছি। কারাগারের অন্ধভূমিতে তাঁকে দেখেছি। ফাঁসির মঞ্চে তাঁকে দেখেছি। আমাকে বিদ্রোহী বলে খামখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। এ নিরীহ জাতটাকে আঁচড়ে-কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়াবার ইচ্ছা আমার কোনদিনই নেই। আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, যা মিথ্যা-কলুষিত-পুরাতন-পঁচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে।  ধর্মের নামে ভন্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। ''

কবির জীবনের পুরোটাই আসলে বলতে গেলে এক কঠোর সংগ্রামের গল্প। সে সংগ্রাম দারিদ্র্য, অর্থলিপ্সা, লোভ, প্রতারণা আর শোষণের বিরুদ্ধে ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা আর মানবতাকে জেতানোর সংগ্রাম। বিশেষ করে কবির জীবনের শেষের অধ্যায়টুকু ছিলো কবি আর কবি পরিবারের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়। কবি অসুস্থ হয়ে যাবার পর কবির সন্তানরা ও তাঁর পরিবার হাতে গোণা মাত্র কয়েকজন ছাড়া পাশে পায়নি তাঁর কোন বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীকেই, বরং কবির লেখা বইয়ের স্বত্ত্ব বিক্রয় বা কবিতা ছাপাতে গিয়ে পরিচিত মানুষদের দ্বারাই বারবার হয়েছেন বঞ্চিত , প্রতারিত।                           ক্রমশঃ         

তথ্য সূত্র :---১)নজরুল জীবনী / করুণা ময় গোস্বামী
২)নজরুল গবেষক ও অনুবাদক / পীযুষ ভট্টাচাৰ্য
৩)নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ মালা
৪) নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি।
৫) নজরুল / রফিকুল ইসলাম
৬)- নজরুল জীবনী, /অরুণকুমার বসু,( আনন্দ পাবলিশার্স)
৭)রবীন্দ্র নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি / (বিপ্রদাস ভট্টাচার্য্য)
৮)চিরঞ্জীব নজরুল / মুহাম্মদ নুরুল হুদা।

Post a Comment

0 Comments