দিলীপ মহান্তী-র মেঘেদের বর্ণপরিচয় নিয়ে আলোচনা করলেন অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী
" I wanderd lonely as a cloud " - মেঘ নিয়ে এমন একটি পঙক্তি পৌনে দু'শো বছর আগে উইলিয়ম ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ লিখে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে পি. বি. শেলীও মেঘের ইমেজারি এনে বহু কবিতা লিখেছেন। বাংলা কবিতায় মেঘের দ্বারস্থ হননি এমন একজনও কবিকে চিহ্নিত করা দুঃসাধ্য । বলা ভালো মেঘ নিজেই ভাসমান কবিতা। হয়তো সেই কারণেই মেঘ নিয়ে কবিতা লেখা থেমে যায়নি, যাবেও না কখনও। তবে মেঘের রিডিং এক এক কবিমনের কাছে এক এক রকম।বাংলা কবিতায় দীর্ঘদিন প্রেমবিরহকেন্দ্রিক রোমান্টিকতায় মেঘ ব্যবহৃত হয়েছে, হচ্ছেও। তবুও অনিবার্যভাবেই কোনও একদিন মেঘের নতুন রিডিং শুরু হতই এবং সেটা হয়েছেও। সাম্প্রতিক বাংলা কবিতায় মেঘ নিয়ে এমনই একটি নতুন ভাবনার ফসল কবি দিলীপ মহান্তীর এই কাব্য ' মেঘেদের বর্ণপরিচয় '।
বাহান্নটি কবিতার সঞ্চয় এই কাব্যটি পড়বার পর শ্রদ্ধেয় কবি শঙ্খ ঘোষের 'মেঘ' কবিতার চার পঙক্তির আকাঙ্ক্ষা ফিরে ফিরে আসে মনের মধ্যে —
" দিয়ে যাও এক ঘটি জল
আমাদের শুকনো বিলে
ও আমার মেঘলা আকাশ
এত দিন কোথায় ছিলে! "
মেদিনীপুরের জল মাটির গন্ধ মেখে বেড়ে ওঠা কবি দিলীপ
মহান্তী সেই আকাঙ্ক্ষিত মেঘকবি হয়েই এই নতুন বর্ণপরিচয় উপহার দিয়েছেন। কর্ণগড়, গোপগড়, রাধামণির বাজারে কিংবা কাঁসাই নদীর তীরে প্রায়শই তিনি লোকায়ত জীবনকে বারবার ছুঁয়ে দেখেছেন কবির চোখ দিয়ে। সেই লৌকিক জগতে অভিনিবেশের অভিজ্ঞতায় তাঁর এই মেঘদর্শন যে কোনও জীবননিষ্ঠ পাঠককে চমৎকৃত করবে। এই বিস্ময়ের মূল বিষয়টি হল তাঁর জীবনের বিচিত্র বোধ আর উপলব্ধির সঙ্গে মেঘকে রিলেট করার নিজস্বতা। আরও একটি মৌলিক ভঙ্গি এখানে স্পষ্ট, সেটা হল তিনি মেঘ খুঁজতে গগনচারিতার পথে হাঁটেননি , হেঁটেছেন তপ্ত ধুলোর পথে পথে , যেখানে —
" পথের উষ্ণতা মেখে পুড়ে যায় পা " / — (মেঘেদের সঞ্চার )
মেঘ এখানে বহুত্বের ব্যঞ্জনা উজাগর করে ; এখানে মেঘ কখনও বেদনার ভার , কখনও অসুখ , কখনও ধ্বস্ত হয়ে যাওয়ার ধুলো কিংবা বিষাদকথা আবার কখনও বিশল্যকরণী অক্ষরমালা।
🍂
কবি দিলীপ মহান্তীর এই ভ্রমণপথ নগর,উপনগর, মফস্বল, গ্রাম, নদী,পাহাড়, অরণ্য সর্বদিশায় ছুটিয়ে নিয়ে গেছে তাঁকে। আর খুলে গেছে আরও আরও পথের হদিশ। সেই সূত্রেই চেনা হয়ে গেছে একই সময়গ্রন্থির ভিতর উদযাপিত পৃথক পৃথক শ্রেণীজীবন এবং তাদের নিজ নিজ প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির অপার ভুবন। দীর্ঘ বিরামহীন এই হেঁটে যাওয়া শুধু নিসর্গ সন্ধান নয় তার চেয়েও অনেক বেশি করে মর্ত্যজীবনের বর্ণপরিচয় সন্ধান —
" আমাদের পথখানি বেঁকে গিয়ে স্পর্শ পেল সেই ইতিহাস
সবুজকে পড়ে নেওয়া আকাশের মতো দীর্ঘশ্বাস
পথে পথে ধাতুরিয়া, বনে বনে গনু মাহাতোর দেখা মেলে
এমনকি খলবলিয়ে হেসে ওঠে ভানুমতীরাও " — (বুরুডির কাছে)
কবির আরণ্যক ভ্রমণ এখানে বিভূতিভূষণের পায়ের ছাপ ধরে সেই দেশে পৌঁছে গেছে যেখানে এই একুশ শতকেও দোবরু পান্না আমলের এক টুকরো ভাঙা সমাজের দেখা মেলে। তিক্ত নগর জীবনে যে বিকৃত মানুষের বাস সেই বিকার থেকে এরা অনেকটা মুক্ত। এ স্বীকারোক্তি কবির নিজের —
" জঙ্গলে বিষাদ নেই; ফলমূল আছে
পশুরা অনেক ভদ্র
মানুষের মতো হিংস্র নয়। " — ( নক্ষত্রের খোঁজে )
স্পষ্টতই ' মেঘেদের বর্ণপরিচয় ' সেই সব নানাবিধ মেঘের পাঠ যে মেঘগুলো মূলত বেদনা বিষাদ আর বৈষম্যের ভারে নত হতে হতে মাটির কাছাকাছি নেমে এসেছে। এইসব মেঘ হিরোসিমার কৃষ্ণমেঘ যেন ; সভ্যতার হিংস্রতার বীভৎস বাষ্পপুঞ্জের মতো রক্তঅশ্রুবর্ষী। এইসব মেঘের শরীরে ক্ষত আর পুঁজের গন্ধ। ভুল শাসকের নির্ভুল চক্রান্তে একটু একটু করে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়া নিত্য মৃত্যুযাপনের কত ছবি সাজানো এই মেঘের অ্যালবামে।
কবি দিলীপ মহান্তীর নিরীক্ষণগুলির দিকে তাকালেই স্খলিত সময়ের নিপুণ অনুবাদ সার্থকভাবে ধরা পড়ে। তাঁর ' বিশল্যকরণী ' কবিতায় যেমন স্তব্ধবাক সত্যগুলি ভীষণ স্পর্শ করে যায় —
" কত রুগ্ন হয়ে গেছে কথারা
হালকা হয়ে গেছে বাতাস
অশ্রুরা আজ বোবা
কেমন শীতল হয়ে গেছে পথঘাট। "
' প্রতিবেশী ' কবিতায় আরও একটি পর্যবেক্ষণ আমাদের ক্রমশ একা হয়ে যাওয়ার ছবি তুলে ধরে। হিংসা, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতার বিষ আজ সব পাড়ায় উগ্র —
" আলিঙ্গন করে না, হিংসার আগুনে জ্বলে
বিষে বিষে ভরে দেয় আকাশ ও বাড়ি। "
ছবিটা আরও স্পষ্ট হয় 'শাসন ' কবিতায় যেখানে প্রশাসনের কুটিল আগ্রাসনের কথা উঠে এসেছে। ' মূর্খ বাচালে গোটা দেশ তোলপাড় ' হয়ে ওঠার এই দশক কবিকে ক্ষতবিক্ষত করে প্রতি মুহূর্তে। লোলুপ এই বণিক সভ্যতা যখন করোনা নামক মারণাস্ত্র প্রয়োগেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না তখন অসহায় সাধারণ মানুষের পক্ষে বলি হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনও অপশনও থাকে না।
' রাত্রির মেঘ ' কবিতায় এই করোনাশঙ্কিত সময়ের চিত্র রয়েছে। বর্তমান সময়ের প্রতি আরও একটু গভীর শ্লেষ প্রকাশ পেয়েছে ' মাথুর ' কবিতায়। যোগ্যতাহীন নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ আর খেদ ভাষা পেয়েছে ' দুঃসময় ' কবিতাতেও —
" চারিদিকে কত নেতা বেড়ে গেছে
মূর্খ জড়ায় ঋণে । "
এ হতভাগ্য সভ্যতার সূচনা যে পৌরুষ আধিপত্যের হাত ধরে সেই পুরুষতন্ত্র আসলে একটা ক্ষমতার কোড যা সঞ্চারিত হয়ে যায় ক্ষমতাসীন নারীর মনস্তত্বেও। যারা চিরকাল পেষাই হয়ে এসেছে তারা পিষ্ট এ কালেও। এই গণতন্ত্র নারীসমাজকে অক্ষরজ্ঞান কিছুটা দিলেও তার শরীর ঘিরে শকুনি দুঃশাসনের পাশার চাল আর পেশীর চলকে এখনও অনুমোদিত এবং অনুপ্রাণিত করে চলেছে। এই ছবিটা অবিস্মরণীয় উচ্চারণে ও আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন কবি দিলীপ মহান্তী ' বেহুলা ' কবিতায় । একটা সুসভ্য সমাজব্যবস্থায় নারীর অধিকার হননের চিত্রনাট্যে মঙ্গলকাব্যের বেহুলাকে সামনে রেখে এই উপস্থাপনা তির্যকতায় অনবদ্য —
" বেহুলার পথে দলের দালাল
বাধা দেয় প্রতি পায়ে
বেহুলার ভেলা এগিয়ে চলেছে
প্রশাসন ভয়ে কাঁপে
নিজের সম্মান ধুলোয় ভেসে যায়
নেতাদের রাঙা চোখে
বেহুলা ফিরে পায় জ্যোৎস্নার আলো
নাচ গান বেচা মুখে। "
ক্রমশ আবদ্ধ হয়ে পড়ছে মানুষের মৌলিক অধিকারের দিগন্ত। ভোগবাদের উল্লাস নৃত্য করে বেড়াচ্ছে। পালিয়ে যাওয়ার রাস্তাও খোলা নেই আর —
" রাস্তায় শুয়ে আছে ব্যস্ত অজগর
ঝোপে ঝাড়ে নেকড়ে হায়না শকুন
কী সুন্দর ভোজের উৎসব। " — ( মেঘেদের সভ্যতা )
এ কাব্যের নান্দনিকতা এর বিষয়ভাবনার পাশাপাশি নির্মাণকলার সঙ্গেও ওতপ্রোত হয়ে আছে। অজস্র লোক উপাদানে সমৃদ্ধ কবিতাগুলি লোকাভরণ শৈলীর মূর্ত বিগ্রহ যেন। তারই সঙ্গে মিশে আছে ভবিষ্যভাবনার শৈলীও। শীর্ণদেহী কবিতার সরল গড়নের বাঁকে বাঁকেও গাঁথা রয়েছে সার্থক কত দৃশ্যকল্প। প্রান্তিক শব্দের ব্যবহারে মাটির গন্ধের আবহ কখনও কখনও কবিতাগুলির অরণ্যবিসারী প্রবণতাকে চিনতে সাহায্য করে। বহুলার্থবোধক মেঘের প্যাটার্ন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কবি দিলীপ মহান্তী মূলত ধ্বনিবৃত্তের পথে হেঁটেছেন। যদিও কিছু কবিতায় অক্ষরবৃত্তের আশ্রয়ও চোখে পড়ে। কোথাও জনমনোরঞ্জনের লক্ষ্যে ব্যর্থ কোনও চমক আনেননি তিনি। কবি সুলভ প্রশংসকের তোয়াক্কা না রেখে গভীর অনুধ্যানে চেনা শব্দেরই অচেনা রসায়নে নিজের শব্দমহল্লা রচনা করেছেন। সেই শব্দযোজনা মেঘের ভিতর লুকোনো বজ্রের মতো শক্তিময় । মেঘের আড়াল থেকে এই আয়ুধ নিক্ষেপের যুদ্ধে কবি আরও নিপুণ দক্ষতায় ব্যবহার করেছেন দুর্লভ সংকেত আর লক্ষ্যভেদী ব্যঞ্জনার শর। পাশাপশি কবির উপমা সৃজনের যত্ন আলাদা করে মনোযোগ কাড়ে। বাক্যগঠনেও তীক্ষ্ম বিশেষণে বিঁধে থাকে বিশেষ্য আর সর্বনামের শৃঙ্খলিত ভাষাদেশ। এমনই বিচিত্র অভিনবত্বের দেখা মেলে ' মেঘেদের বর্ণপরিচয় ' এর পাতায় পাতায়।
বিগত দুই দশকেরও কিছু বেশি কাল ধরে বাংলা কবিতায় আত্মস্বর ঘোষণার যে প্রবণতা তৈরি হয়ে এসেছে, মেঘে মেঘে অনেকটা বেলা হয়ে যাওয়ার পর তার প্রতিষ্ঠাবৈভব এখন দৃশ্যমান। কর্পোরেট সাহিত্যের অত্যুজ্জ্বল বৃত্তের বাইরে স্বপ্রভ এমন অনেক কবিমুখ আজ নিজস্ব বিভায় উদ্ভাসিত। এ নিয়ে তর্ক তোলার জায়গা নেই। দৈত্যাকার প্রকাশনীর কৌলিন্যকে হেলাফেলা করে ছোটো ছোটো প্রকাশনার হাত ধরে বাংলা সাহিত্যের যে রোশনাই যাত্রা সূচিত হয়েছে তার একটি সৎ দৃষ্টান্ত কবি দিলীপ মহান্তীর এই কাব্য। এর সঙ্গে অন্বিত হয়ে আছে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের দীর্ঘ উজ্জ্বল ইতিহাস। সে অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতার স্রোত,তরঙ্গ, ঘূর্ণি জয়ের গৌরব একক স্বাক্ষরের গায়েও লেগে থাকে। ' মেঘেদের বর্ণপরিচয় ' কে জানার পাশাপাশি স্রষ্টার ভিতরজগতের ধারণা স্পষ্ট করে নিতেই এই পথ ও পাথেয় সংক্রান্ত ইঙ্গিতটুকু দিয়ে রাখলাম।
সবশেষে স্মরণ করিয়ে দেব , কবিতা যদি মেধাবী ভাবনার আঁত খুঁজে দেখার পাঠক্রম হয় তাহলে আপনাদের ' মেঘেদের বর্ণপরিচয় ' পড়তে হবে । মেঘের মগ্নপাঠ আরও প্রসারিত হোক।
0 Comments