জ্বলদর্চি

ভারতের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের রূপকার ছিলেন কে এন পানিক্কর/পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী

ভারতের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের রূপকার ছিলেন কে এন পানিক্কর

পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী


ভারতের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ এবং জনসাধারণের বুদ্ধিজীবী কেএন পানিক্কর ৯ই মার্চ  সোমবার কেরালার তিরুবনন্তপুরমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯।

পানিক্কর শুধু আধুনিক ভারতের  একজন  ইতিহাসবিদ ছিলেন না তিনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ ও সমালোচনামূলক ইতিহাস রচনার একজন বিশিষ্ট রক্ষকও। ভারতের প্রগতিশীল ইতিহাসচর্চায়  একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠেছিলেন তিনি । কে এন পানিক্কর  কেবল অতীতের দলিলপত্র ঘেঁটে ইতিহাস লেখেননি, বরং ইতিহাসকে বর্তমানের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেছেন।  মূলত আধুনিক ভারতের সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের ওপর কাজের জন্যই পরিচিত হয়েছিলেন তিনি ।

কয়েক দশকের পাণ্ডিত্যের মাধ্যমে, পানিক্কর যুক্তি দিয়েছিলেন যে ইতিহাস অবশ্যই বৌদ্ধিক সততার সাথে এবং আদর্শের সাথে মুক্তভাবে লেখা উচিত। তাঁর কাজের মূল বিষয়ই ছিল উপনিবেশবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এবং সাধারণ মানুষের লড়াই।
🍂

কেএন পানিক্করের জন্ম হয়েছিল ১৯৩৬ সালের ২৬শে এপ্রিল কেরালার গুরুভায়ুরে। ভারতের তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সময়েই তাঁর বেড়ে ওঠা।
ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং পরে রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পরে নিজেকে গড়ে তোলেন একজন প্রকৃত ইতিহাসবিদ, শিক্ষক ও লেখক হিসেবে । রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার পরে, তিনি ১৯৭২ সালে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। পরে তিনি সেন্টার ফর হিস্টোরিক্যাল স্টাডিজের প্রধান এবং পরে সামাজিক বিজ্ঞান স্কুলের ডিন হিসেবেও  দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি, পানিক্কর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকাও পালন করেছেন। তিনি শ্রী শঙ্করাচার্য সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং পরে কেরালা রাজ্য উচ্চশিক্ষা কাউন্সিলের ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। একই সাথে কেরালা ঐতিহাসিক গবেষণা পরিষদের  সভাপতিত্বও করেছিলেন তিনি।

পানিক্কর মার্কসবাদী ইতিহাস রচনার সাথে  নিজেকে নিয়োজিত করে রেখেছিলেন এবং আধুনিক ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন। তিনি ধর্ম, রাজনীতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক পরীক্ষা করতেন নিয়মিত। প্রায়শই প্রান্তিক সম্প্রদায় ও জনপ্রিয় আন্দোলনের উপর আলোকপাত করেছেন। 
তিনি দেখিয়েছেন, ভারতের অতীত কেবল রাজবংশের ইতিহাস নয়, বরং এটি উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক লড়াইয়ের একটি দীর্ঘ ইতিহাস। ঔপনিবেশিক শাসনের সময় ভারতীয়দের চিন্তাধারা এবং আধুনিকতার উদ্ভব কীভাবে হয়েছিল, তা তিনি তাঁর গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করতেন, রাজনীতি ও অর্থনীতি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সংস্কৃতিও ঠিক ততটাই প্রভাবশালী। সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়।

পানিক্করের ইতিহাসের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ছিল 'সংস্কৃতি'। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "কালচার, আইডিওলজি অ্যান্ড হেজিমনি - ইন্টেলেকচুয়ালস অ্যান্ড সোশ্যাল কনশাসনেস ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া"-এতে তিনি দেখিয়েছেন যে ব্রিটিশরা ভারতকে কেবল বন্দুকের জোরে শাসন করেনি, বরং তাদের সংস্কৃতি ও শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে আমাদের মনকে পরাধীন করেছিল। তিনি ঊনিশ শতাব্দীর ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কীভাবে তাঁরা আধুনিকতা এবং দেশীয় ঐতিহ্যের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।

পানিক্কর তাঁর সারাজীবনে ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেছেন। তিনি মনে করতেন, রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাসকে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনে ব্যবহার করা সমাজ ও দেশের জন্য বিপজ্জনক। তিনি বৈজ্ঞানিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চার পক্ষেই আজীবন সওয়াল করে গেছেন। অন্যান্য  ঐতিহাসিকের মতো তিনি শুধু রাজবংশ বা এলিট শ্রেণির কাহিনী লেখেননি। তাঁর লেখায় যেমন উঠেছিলেন এসেছিল কৃষক আন্দোলন,  তেমনই প্রাধান্য পেয়েছে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রান্তিক মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই । তিনি বিশ্বাস করতেন, ভারতের প্রকৃত ইতিহাস লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের সংস্কৃতির মধ্যেই।

তিনি মার্ক্সবাদী ধারার ইতিহাসবিদ হলেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের একটি গভীর বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ভারতীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি আধুনিকতার সাথে নিজেদের ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটিয়েছিল।

২০০৮ সালে, তিনি দেশের বৃহত্তম পেশাদার ইতিহাসবিদদের সংগঠন, ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। কেরালা হিস্ট্রি কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও ছিলেন তিনি।
বছরের পর বছর ধরে, তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে "আ কনসার্নড ইন্ডিয়ান্স গাইড টু কমিউনালিজম", "টুওয়ার্ডস ফ্রিডম" , "১৯৪০: আ ডকুমেন্টারি হিস্ট্রি অফ দ্য ফ্রিডম স্ট্রাগল" , "অ্যাগেইনস্ট লর্ড অ্যান্ড স্টেট: রিলিজিয়ন অ্যান্ড পিজেন্ট আপরাইসিং ইন মালাবার" , "কালচার অ্যান্ড কনশাসনেস ইন মডার্ন ইন্ডিয়া", "কালচার, আইডিওলজি অ্যান্ড হেজিমনি - ইন্টেলেকচুয়ালস অ্যান্ড সোশ্যাল কনশাসনেস ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া" এবং " বিফোর দ্য নাইট ফলস ।"
শিক্ষার বাইরেও, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং রাজনীতি সংক্রান্ত জনসাধারণের বিতর্কে তিনি ছিলেন একজন নির্ভীক কণ্ঠস্বর, প্রায়শই প্রশংসিত হয়েছেন , কখনও কখনও বিতর্কিতও হয়েছিলেন। 

ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টোরিক্যাল রিসার্চের প্রকল্প "টুওয়ার্ডস ফ্রিডম, ১৯৪০: আ ডকুমেন্টারি হিস্ট্রি অফ দ্য ফ্রিডম স্ট্রাগল" এর সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি, যেটি স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত আর্কাইভাইল উপকরণ সংগ্রহ করেছিল। পানিক্কর তাঁর পাঠকদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে ইতিহাস কোনও স্থির রেকর্ড নয়। এটি অনুসন্ধানের একটি ক্ষেত্র যা প্রমাণ, ধৈর্য এবং সাহসের দাবি করে। ভারতের অতীত এবং এর ভবিষ্যত বুঝতে আগ্রহী যে কারও জন্য এই শিক্ষাগুলি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, ইতিহাস কেবল অতীতের বিবরণ নয়, বরং বর্তমানের সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলো বোঝার অন্যতম একটি হাতিয়ার।

তিনি কেরালা সরকার কর্তৃক স্কুল পাঠ্যপুস্তক পর্যালোচনা করার জন্য নিযুক্ত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির সভাপতিত্ব করেছিলেন এবং ২০১০ সালে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জন্য একটি অনলাইন পোর্টাল "ইন্ডিয়ান রুমিনেশনস চালু' করছিলেন যেটি আজও রাজনীতি, সমাজ এবং সংস্কৃতির উপর প্রতিফলিত প্রবন্ধ, সাহিত্য এবং সাংবাদিকতামূলক লেখা পরিবেশন করে চলেছে।
২০১৭ সালে, তিনি কেরালা সাহিত্য আকাদেমির ফেলোশিপেও সম্মানিত হয়েছিলেন।

পানিক্কর বলেছিলেন,  "ইতিহাস হলো বর্তমানের সমস্যাগুলো বোঝার একটি হাতিয়ার।" আজ যখন ইতিহাসের বিকৃতি নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে, তখন পানিক্করের যুক্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর কাজ আমাদের শেখায় যে অতীতকে সঠিকভাবে না জানলে একটি সুন্দর ও ধর্মনিরপেক্ষ ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব নয়।

Post a Comment

1 Comments

  1. খুব ভাল আলোচনা

    ReplyDelete