৩৬ পর্ব
চিত্রা ভট্টাচার্য্য
(কাজী নজরুলের স্বদেশ প্রেমের গান )
"তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
ঐনূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
আস্ল এবার অনাগত প্রলয়–নেশায় নৃত্য–পাগল,
সিন্ধু–পারের সিংহ–দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল!'
'মানব মুক্তির তথা শৃঙ্খল মুক্তির কথা, ধ্বনিত করে নজরুল স্বদেশের মুক্তির গান রচনা করলেন। ' বজ্র–শিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর! স্বদেশের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর স্নেহ-মমতায় উজ্জীবিত কবি নজরুল পরাধীন দেশের ,সমাজের ভয়ে ভীত আতঙ্ক গ্রস্থ সাধারণ মানুষকে অভয়বাণী শোনালেন, বন্ধন মুক্তির আকুলতা জেল প্রাচীরের কঠিন দেয়াল যেন ভেঙ্গে পড়লো। তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন, ‘‘আমি বেদুইন, আমি চেঙ্গিস আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ’’।
বিদেশী শাসকের অত্যাচারে শোষনে আশঙ্কায় জর্জরিত দেশবাসীর গভীর নির্লিপ্ততায় সুপ্ত মানুষকে জাগিয়ে তুলতে তাঁর বিশ্বাস এবং অকুতোভয়ী হৃদয়ের দৃপ্ত চেতনায় সৃষ্টি চমৎকারিত্বে ভরা সংগীতের কথা ও সুরে মানব হৃদয় জাগ্রত হলো, গানের সুরে জয় করলেন তিনি বংগবাসী তথা অচেতন যুব সমাজ কে।
সত্যবাণী উচ্চারণ করে সমাজের মানুষকে দায়িত্ব সচেতন হতে বলেছেন। নির্যাতিত মানুষকে ডাক দিয়েছেন ‘‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর, ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল বোশেখী ঝড়’’। প্রলয়ের মাধ্যমে এক নতুন নির্মাণের স্বপ্ন দেখিয়ে গান বাঁধলেন কবি —যেখানে পুরোনো, জীর্ণ, পচে যাওয়া ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে গড়ে উঠবে এক নবজাগ্রত সমাজ।কাজী নজরুলের লেখা “প্রলয়োল্লাস” একটি শক্তিশালী বিদ্রোহাত্মক কবিতা।যেখানে তিনি রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী শাসকের নির্লজ্জ্ব শোষণ অন্যায়, অবিচার কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে তার বিরুদ্ধে দুর্বল ভীরু মনুষ্য জাতিকে জাগরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
কবি নজরুলের সংগীত সাগরে অবগাহন করে এতদিন যে টুকু সামান্য তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছি পাতা উল্টে দেখি সেখানে দেশমাতৃকার পূজারী স্বদেশপ্রেমী কবীর দেশাত্মবোধক গান নিয়ে আমার সংগ্রহের ভান্ডার প্রায় শূন্য। অথচ তাঁর প্রাণ চঞ্চল কর্মময় উদ্যমী জীবনের ধারাবাহিকতা থেকে যতটুকু জানা যায়, এই উদ্দীপনায়ময় দেশাত্মবোধক সংগীত সৃষ্টি দিয়েই কবি নজরুলের সংগীতের পথে যাত্রার প্রথম শুরু হয়েছিল। আর শুরুতেই এই গান সৃষ্টির ক্ষেত্রে কবি নজরুল জনতার কাছ থেকে যে স্বতঃস্ফূর্ত অভিনন্দন ও প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন সংগীতের ইতিহাসে তা এক বিরলতম ঘটনা। তাঁর এই ধরনের জনপ্রিয় গানে গর্জে উঠেছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধেঘরে ঘরে সংগ্রামের দুর্বার উৎসাহ।
মনে পড়ছে রক্তে সাড়া জাগানো সেই দেশ প্রেমিকের মাতৃভূমির প্রতি পূজার অঞ্জলি তে নিবেদন ‘এই শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল’, ‘কারার ওই লৌহ কপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’ আমরা শক্তি আমরা বল ,চল চল চল ইত্যাদি আরো অসংখ্য গান ।
শৃঙ্খলিত অপমানিত পরাধীনতার নাগপাশে জর্জরিত স্বদেশের মুক্তির গান গাইলেন কবি , তাঁর উদাত্ত গলায় ধ্বনিত হয় গানে গানে আহ্বান ,গভীর এক মর্ম যন্ত্রনা যেন পরাধীন দেশবাসীকে জাগানোর প্রতিশ্রুতি। বিদেশী শাসকেরা যে অবদমন নীতি করেছিল স্বাধীনতা প্রিয় মানুষকে স্তব্ধ করার জন্য , অহর্নিশ যে অত্যাচার চালিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে নজরুল বিপ্লবী চেতনায় জেগে উঠলো । স্বদেশ রক্ষার আন্দোলনে দেশ মুক্তির মন্ত্রে গেয়ে উঠলেন--‘জাগো অনশন বন্দী জগতের যত ভাগ্যাহত’’। দাসত্ব আর বন্দীদশার অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন চিত্তে মানুষের জাগরনী গান গাইলেন। কবির অগ্নিঝরা জ্বালাময়ী বাণী, নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুপ্ত আতঙ্কিত দুর্বল চিত্তে আশার প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করে সাহসী করে তুললো ঝিমিয়ে পড়া যুবশক্তি কে। পদদলিত মানুষের রক্তে প্রাণবায়ুতে চেতনার সাড়া জাগলো।
দেশনায়ক নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু নজরুলের এই উদ্দীপনামূলক গান সম্পর্কে লিখেছেন- ‘তাঁর লেখার প্রভাব অসাধারণ। তাঁর গান পড়ে আমার মতো বেরসিক লোকের জেলে বসে গান গাইবার ইচ্ছে হতো। নজরুলকে যে বিদ্রোহী কবি বলা হয় এটা সত্য কথা। তাঁর অন্তরটা যে বিদ্রোহী, তা স্পষ্ট বোঝা যায়। আমরা যখন যুদ্ধে যাব তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে, আমরা যখন কারাগারে যাব, তখনও তাঁর গান গাইবো।’আমি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সর্বদাই ঘুরে বেড়াই, বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষায় জাতীয় সংগীত শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু নজরুলের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’র মতো প্রাণমাতানো গান কোথাও শুনেছি বলে মনে হয় না। তার দেশাত্মবোধ মানুষের চেতনাকে প্রখরতা দিয়েছিল। বিপ্লবী চেতনাকে গতিময় করেছিল। স্বদেশ প্রেমে বিভোর হয়ে তিনি বললেন ‘‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি’’। এদেশের সভ্যতা এদেশের আচার আমাদের অহঙ্কার তাই তিনি গর্ববোধ করে শোনালেন ‘‘এই মাটি এই কাঁদা মেখে, এই দেশেরই আচার দেখে, সভ্য হলো নিখিল ভুবন দিব্য পরিপাটি ’’।
কাজী নজরুলের রক্তে উন্মাদনা জাগানো অনবদ্য কবিতা 'কান্ডারি হুশিয়ার '-দেশাত্মবোধক গান, স্বদেশী গানের রচনা শুরু হয় সেই হিন্দুমেলার আমল থেকে,মূলত এই ধারার গান নজরুলের পূর্বে আর কেউ রচনা করেন নি । কিছু জাতীয় সংগীতের উদ্দামতা তুলে ধরেন একমাত্র তিনি --কেদারা রাগের এই গানটি নজরুলের এক অনবদ্য সৃষ্টি। মূলত এই ধারার গান নজরুলের পূর্বে আর কেউ রচনা করেন নি । দেশাত্মবোধক গান, স্বদেশী গানের রচনা শুরু হয় সেই হিন্দুমেলার আমল থেকে, কিছু জাতীয় সংগীতের উদ্দামতা তুলে ধরে জাতিকে জাগিয়ে তোলাই ছিল এই সংগীতের মূল উদ্দেশ্য।
“দুর্গম গিরি কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার!
দুলিতেছে তরি, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।’
ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ঢাক-ঢোল, কাঁসি, করতাল থেকে শুরু করে বাঁশি, শঙ্খ ও বীণার — সুরে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের অনবদ্য ব্যবহার করে তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গানগুলোকে দিয়েছে অনন্য প্রাণশক্তি। এই দেশমাতৃকাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়ে যে গানের লিপি ও সুরে তিনি ভুবন মাতালেন তাতে আগাগোড়া রয়েছে দেশাত্মবোধের উদ্দীপনা, ও আঞ্চলিক সুরভিত্তিক ধ্বনি, লোকসঙ্গীতের মাটির গন্ধ এবং শাস্ত্রীয় সংগীতের গাম্ভীর্য। তাঁর স্বদেশি সুরচিন্তায় কীর্তন, ভাটিয়ালি, ধুয়াঁ, জারি ও শ্যামাসঙ্গীতের রূপ মিশে গেছে এক নতুন দেশাত্মবোধক সঙ্গীতের ধারায়, যা শ্রোতার মনে,সাহস এবং আত্মত্যাগের প্রেরণা জাগায়। ফলে কাজী নজরুল ইসলামের স্বদেশি গানের সুর বিশ্লেষণ কেবল সংগীত তাত্ত্বিক দিক থেকেই নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।বাংলা গান ও সুরের ভাণ্ডারে কাজী নজরুল ইসলামের স্বদেশি গান একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
কাজী নজরুল ইসলামের স্বদেশি গানের সুর বিশ্লেষণ করলে দেখাযায় যে তাঁর রচিত সংগীতের শক্তি অপরিসীম। সংগীত সুর, তাল-লয়মিশ্রিত কতগুলো কথার মালা-যা মনের ক্লান্তি দূর করে, একলা পথের সাথী হয়ে নির্জনতায় শ্রোতার হাত ধরে পথ চলে।
বাংলা গানের আসরে সংগীত নির্মাণে বহুধারার গান রচনায় অসংখ্য গীতকবির মিলন প্রতক্ষ্য করেছি । তাঁদের মধ্যে পঞ্চগীতিকবি অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন ও কাজী নজরুল ইসলাম গানের রচিত সুর ও বাণীর অপূর্ব সম্মিলনের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
(যাঁদের কথা সঙ্গীতের বিস্তারিত আলোচনা তে আগেও বলেছি।)
তাঁদের গান যুগের পর যুগ থেকে এখনো ও শ্রোতাদের মুগ্ধ করে চলেছে। এই পঞ্চকবির প্রতি জনেই তাঁদের গানের সুর ও বাণী দুই-ই নিজেরা রচনা করেছেন বলেই তাঁদের গীতিকবি আখ্যা দেওয়া হয়।কিন্তু , নজরুল ব্যতীত বাকি অন্য সকল গীতিকবিদের যে সুরের আবর্তে ঘূর্ণায়মান তা মূলত একটি সময়ের এবং প্রায় একই ধারার সুরের প্রকাশ। একটি নির্দিষ্ট সময়কাল জুড়ে প্রচলিত রাবীন্দ্রিক সুর ব্যঞ্জনাতেই তাঁরা আবদ্ধ ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের সময়কালে রচিত বাণী সকল কবিদের গানের বাণী ও সুরের ধারা প্রায় একই রকম।'অর্থাৎ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন ও অতুলপ্রসাদের সুর রচনাতে অল্পবিস্তর স্বকীয়তা প্রকাশ পেলেও মূলত সুরের একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে প্রতিজনেই আবর্তিত। এবং রবীন্দ্রনাথের গানের প্রভাব এতটা শক্তিশালী ছিলো যে, তাঁর দ্বারা গীতিকবিগণ সহজেই প্রভাবিত হতো যদিও অতুলপ্রসাদ সেনের ব্যতিক্রমধারা অর্থাৎ ঠুমরির সমন্বয়ে বাংলা গানের সুরের ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা দান করেছে। যদিও স্বদেশপর্যায়ের গানের ক্ষেত্রে তা বিশেষ পরিলক্ষিত নয়। এক্ষেত্রে কিন্তু নজরুলের গানে সম্পূর্ণ নতুন ধারার প্রচলন লক্ষ্য করা যায় যা পূর্বেকার সকল গীতিকবি বিশেষত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন ও অতুলপ্রসাদ সেনের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র ছিল । নজরুলের ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ গানটির মধ্যদিয়ে একেবারে নতুন ধারার একটি সংগীত জগতে প্রবেশ করলেন বঙ্গজাতি ।“নজরুল যুক্ত হলেন সংগীতে ১৯২৬ সালে।
প্রথম রেকর্ড জাতির নামে বজ্জাতি’ গানটি প্রকাশ পেলে মনে হল সুরের শরীরে, বাণীর শরীরে নতুন পরিধেয় বস্ত্র জড়ানো হল। এ ধরনের শব্দ সমাহার সে সময় নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। একটি অর্থে নয়, একাধিক অর্থে। যেমন সুরকার, বাণীকারের নাম। সুর-বাণী মিলে সংস্কৃতি ও পরিবেশকে চঞ্চল করে তুলেছিল। এই সেই ‘তুলেছিল’র রেশ অদ্যাবধি বয়ে চলেছে। আর তাই ১৯২৬ সালটিও বাংলা সংগীত জগতের সর্বক্ষেত্রে টার্নিং পয়েন্ট’ হয়ে শির উঁচু করে আজো অগ্রসরমান। তাই একমাত্র নজরুলের নিকটে বাংলা গানের বাণী ও সুর এককভাবে ঋণী |বাংলা স্বদেশি গানের ঐতিহ্যকে তুলে ধরতেই নজরুলের দেশাত্মবোধক গান রচনা করেন।
'নজরুল গবেষকদের মতে ''পরাধীনতার যন্ত্রণায় বৈপ্লবিক চেতনা জাগাতে জনমনে স্বদেশের প্রতি উন্মাদনা জাগ্রতকরণও নজরুলের দেশাত্মবোধক গান রচনার কারণ এবং এক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সফল তা প্রমাণিত। নজরুল তাঁর গানে মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত প্রভৃতি ছন্দ যেমন নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন, তেমনি তাঁর গানের সুরের বৈচিত্র্যতা কখনো শ্রোতাদের মনে দেয় চমক লাগানো তীক্ষ্ণতা, আবার কখনো ভাসিয়ে দেয় হৃদয় নিংড়ানো গভীরতায়।নজরুলের দেশাত্মবোধক গানের সুরে বিশেষত মার্চের সংগীতের দ্রুত লয়, আবার লোকসুরের সাদামাটা ঢং বিশেষভাবে পরিলক্ষিত। জাতীয়তাবাদী মুক্তি সংগ্রামের সমরে রচিত মার্চ সুরের গান জনমনে উন্মাদনার দোলা জাগায়। তাঁর রচিত কোরাস গান সম্মেলন সংগীতের এক নতুন ধারা।''
জনমনে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টিতে তাঁর সকল কোরাস গানের ভূমিকা অপরিসীম।
নজরুল ইসলাম রচিত কোরাস গান অত্যন্ত শক্তিশালী তাঁর বৈপ্লবিক ও উদ্দীপনা মূলক রচনার অংশ । কোরাস গানেরই একটি অনবদ্য ধারা মার্চ সংগীত, যার ব্যবহারে কবি তাঁর স্বদেশপর্যায়ের গান এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন । মার্চ সংগীতের মধ্যে স্বরের একপ্রকার চঞ্চলতা ও লাফিয়ে চলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় যা সৈন্যমনে রক্তকণিকা প্রবাহের গতিবৃদ্ধির মতো অনুভূত হয়।কবি নিজে সৈনিক ছিলেন বলেই মার্চ সংগীতের সুর বা রিদম ছিল তাঁর বিশেষ ভালো লাগার বিষয়। মূলত তাঁর রক্তে প্রবাহিত মার্শাল রক্ত কণিকার উদাহরণ এই গানটি। লেফট রাইটের ছন্দ মতন উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হয় এই গানটিতে।
১)“চল্ চল্ চল্ চল্ চল্ চল
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল
নিম্নে উতলা ধরণী-তল
অরুণ প্রাতের তরুণ দল
চল রে চল রে চল ।”
২) আমরা শক্তি আমরা বল…..
আমরা ছাত্রদল
মোদের পায়ের তলায় মূর্ছে তুফান
উর্দ্ধে বিমান ঝড় বাদল ---
আরেকটি মনে সাড়া জাগানো গান --
৩)এই শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল।
এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।।
তোদের বন্ধ কারায় আসা মোদের বন্দী হতে নয়,
ওরে ক্ষয় করতে আসা মোদের সবার বাঁধন–ভয়।
কবি নজরুলের স্বদেশি সংগীতের সুরে আছে উন্মাদনা মধ্যদিয়ে সত্যকে ছিনিয়ে আনবার শক্তি, এ ধরণের গানের সুর প্রয়োগে কোনো রকমের করুণা তাঁর সৃষ্টিতে ঠাঁই পায়নি। তাঁর এ শক্তি মাথা নোয়াতে নয় বরং চির উন্নত মম শিরের মধ্যদিয়ে দেশমাতার সম্মান রক্ষায় বদ্ধপরিকর।কবি নজরুল স্বদেশি গানের সুর প্রয়োগে বহু বিচিত্র ধারার সমন্বয় করেছেন। তাঁর মধ্যে মার্চসংগীত একটি সম্পূর্ণ নতুন ধারা যা নজরুলের পূর্বে কেউ কখনো করেননি। জাতীয় সংগীত রচনার যে স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ শব্দ চয়ন প্রয়োজন তেমনি সেখানে বিদ্যমান থাকতে হয় সুর ও ছন্দের গতিময়তা যা নজরুলের কবিমনে গেঁথে গিয়েছিল তিনি সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন সময়ে।
তথ্য সূত্র :---১)নজরুল জীবনী / করুণা ময় গোস্বামী
২)নজরুল গবেষক ও অনুবাদক / পীযুষ ভট্টাচাৰ্য
৩)নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ মালা
৪) নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি।
৫) নজরুল / রফিকুল ইসলাম
৬)- নজরুল জীবনী, /অরুণকুমার বসু,( আনন্দ পাবলিশার্স)
0 Comments