জ্বলদর্চি

বাংলার বিলীয়মান লোক উৎসব: ঘেঁটুপুজো/পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী

বাংলার বিলীয়মান লোক উৎসব: ঘেঁটুপুজো

পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী


তিনি মহাদেবের অনুচর। তিনি ভয়ঙ্কর বিষ্ণু বিদ্বেষী। বিষ্ণুর নাম তিনি কিছুতেই শুনবেন না বলে দুই কানের পাশেই সবসময় ঝুলিয়ে রাখেন ঘন্টা। তাই তাঁর নাম 'ঘন্টাকর্ণ'। অনেকেই অবশ্য তাঁকে বলেন 'ঘেঁটু দেবতা'।

তিনি দেবতা ঠিকই, কিন্ত ঘৃণিত এক লোক দেবতা। অনেকটা আমাদের অলক্ষীর মতো । বাংলার লোকসংস্কৃতিতে তাঁকে কল্পনা করা হয়েছে  ছোঁয়াচে চর্মরোগের দেবতা হিসেবে।
প্রাচীন সময়ে বসন্ত কাল ছিল খোস-পাঁচড়া জাতীয় চর্মরোগের বাড় - বাড়ন্তের মাস। ঘরে ঘরে ছিল এই রোগটির প্রাদুর্ভাব । কুষ্ঠ রোগেরও প্রকোপ ছিল। 
এদের প্রকোপ থেকে বাঁচতেই ফাল্গুন মাসের সংক্রান্তির দিনে
এই দেবতাটির পুজো শুরু হয়েছিল। মনে করা হয়, তাঁর সন্তুষ্টিতেই চর্মরোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। তাই সেই পুজো ছিল অনেকটাই অনিচ্ছার পুজো।  নিতান্তই অনাড়ম্বরের পুজো। কোনো মন্দিরে তাঁর পূজা শুরু হয়নি । জলাশয়ের পাশে বা রাস্তার মোড়ে আবর্জনার স্তূপের কাছেই করা হয়েছিল  তাঁর পুজো। কোনো পুরোহিত নয়, বাড়ির ছেলে -মেয়েরাই পুজো করতেন, এই সময়ে মাঠে ঘাটে ফুটে ওঠা ঘেঁটু ফুল দিয়ে। 

ছোট বেলায় আমার ঠাকুমাকে ফাল্গুন সংক্রান্তির দিনে সকালে এই পুজো করতে দেখেছি। রাস্তার ধারে গোবর জল দিয়ে নিকানো পুজোর স্থানে তিনি রাখতেন মুড়িভাজার জন্য  ব্যবহৃত পুরোনো ঝুলকালিমাখা একটি মাটির খোলা বা হাঁড়ি। পুজোর উপকরণ হিসেবে রাখতেন তিনটি কড়ি, ছোট ছোট তিনটি গোবর দিয়ে তৈরি ডেলা , তেল হলুদে মাখা একটুকরো  কাপড় ,  সিঁদুর, ধান , দূর্বা ঘাস ও ঘেঁটু ফুল।🍂
মুড়িভাজার হাঁড়ি বা খোলার উপরে রাখতেন তিনটি গোবরের ডেলা। তার উপরেই লাগিয়ে দিতেন তিনটি কড়ি। দুর্বা, ফুল, সিঁদুর সেজে উঠতো সেই গোবরের ডেলা। সব শেষে কাপড়ের টুকরোটি বিছিয়ে দিতেন সেই খোলা বা হাঁড়ি উপরে।
কি মন্ত্র বলতেন আজ আমার মনে নেই কিন্ত বেশ জোরে জোরে যে ছড়া বলতেন, সেটি কিছুটা মনে আছে আজও। ছড়াটি ছিল এইরকম-
"ধামা বাজা তোরা কুলো বাজা
এলো এলো দ্বারে ঘেঁটু রাজা।"

আমরা, ছোটোরা হাতের কাছে ধামা কুলো যা পেতাম তাই বাজাতাম। ঠাকুমা একটা মোটা লাঠি নিয়ে সেই মুড়িভাজার খোলাটা ভেঙে দিতেন। বলতেন,  দূর হ ..বিদায় হ...

তারপরে , পুকুরে হাত পা ধুয়ে এসে ঠাকুমা আমাদের চোখে বুলিয়ে দিতেন হলুদ তেলে মাখানো কাপড়ের টুকরোটি। ভাঙা খোলার টুকরো থেকে ভুষোকালি নিয়ে চোখ কাজলের মতো পরিয়ে দিতেন। উদ্দেশ্য এক , আমার সন্তান যেন থাকে সুরক্ষিত। প্রসাদও পেতাম আমরা। ফুটকড়াই ভাজা।

ঠাকুমা নেই। পুজোটাও আর হয় না। কিন্ত পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন  জেলায় এখনও ঘেঁটুপূজা হয়ে থাকে। এখনও সন্ধ্যেবেলায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা রঙীন কাগজ ও কঞ্চি দিয়ে ছোট্ট ডুলি বানিয়ে তাতে ঘেঁটু ফুল ও প্রদীপ দিয়ে ঘেঁটু ঠাকুরকে সাজিয়ে তা কাঁধে করে বাড়ি বাড়ি ঘোরে।  ঘেঁটুর গান গেয়ে চাল পয়সা ভিক্ষা করে- "ঘেঁটু যায়, ঘেঁটু যায়, গৃহস্থের বাড়ি। ঘেঁটুকে দাও গো চাল-পয়সা কড়ি।" কিংবা "আলোর মালা চাল দাও,
নয় খোস পাঁজোড়া দাও,
যে দেবে ধামা ধামা,
তারে ঘেটু দেবে জরির জামা।" একসাথে গান গাইতে গাইতে পাড়ায় পাড়ায় যায়। গৃহস্থের কল্যানের কথা ভেবে অনেকেই চাল ডাল টাকা তাদের হাতে তুলে দেয়।

তবে, বাংলায় তিনি আপদের দেবতা হলেও জৈন ধর্মে  তিনি 'ঘণ্টাকর্ণ মহাবীর' নামে পরিচিত এবং ৫২ জন রক্ষক দেবতার (বীর) অন্যতম। তাঁকে রোগব্যাধি ও বিপদ থেকে রক্ষাকারী হিসেবে পূজা করা হয়।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ঘণ্টাকর্ণ মহাবীর আজও এই স্থানটিকে রক্ষা করেন।
ঐতিহাসিকদের অনুমান, সম্ভবত বাঙলার নাথপন্থী সিদ্ধাচার্যদের মাধ্যমেই শিবের অনুচর ঘন্টাকর্ণ হয়ে উঠেছিলেন জৈনদের ঘন্টাকর্ণ মহাবীর। 

জৈন বিশ্বাসীরা  মনে করেন, তিনি তাঁর পূর্বজন্মে হিমালয় অঞ্চলের রাজা তুঙ্গভদ্র ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু এবং ধার্মিক। তিনি সাধারণ মানুষ ও ধর্মীয় স্থানগুলোকে দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করতেন। তাঁর ধনুক ও তীরের সাহায্যে তিনি দুষ্টের দমন করতেন, তাই তাঁর মূর্তিতে আজও হাতে ধনু-বাণ দেখা যায়। গুজরাটের মাহুদিতে তাঁর মন্দিরে আছে। ১৯২৩ সালে জৈন সাধু বুদ্ধি সাগর সুরিশ্বরজি এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই মন্দিরে  বিশেষ নিয়মে ঘণ্টাকর্ণ ঠাকুরকে আটা, ঘি ও গুড় দিয়ে তৈরি মিষ্টি 'সুখড়ি' ভোগ দেওয়া হয়। এই প্রসাদ অবশ্য মন্দিরের সীমানার বাইরে নিয়ে যাওয়া যায় না। মন্দিরের ভেতরেই খেয়ে নিতে হয়।

ঘেঁটুপুজো কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি বাংলার লোকায়ত জীবনদর্শন ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশও। বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় ও আধুনিক চিকিৎসার প্রসারে আজ চর্মরোগ থেকে মুক্তির জন্য অলৌকিক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমেছে, যার ফলে গ্রামবাংলার এই বর্ণিল উৎসবটি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।কিশোরদের সেই সমবেত ঘেঁটু গান আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল-পয়সা সংগ্রহের চপলতা এখন কেবল প্রবীণদের স্মৃতিতেই উজ্জ্বল। আমাদের লোকসংস্কৃতির শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখতে এবং বিলীয়মান এই ঐতিহ্যগুলোকে নথিবদ্ধ করতে ঘেঁটুপুজোর মতো উৎসবগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। যান্ত্রিকতার ভিড়ে আমাদের নিজস্ব এই গ্রামীণ সংস্কৃতিগুলো হারিয়ে গেলে বাংলার মাটির আসল পরিচয়টাই ফিকে হয়ে যাবে।

Post a Comment

0 Comments